মহা প্রলয়ের পর

3
(2)

সুপার সাইক্লোন হিসেবেই রাজ্যে ল্যান্ডফল হবে আমফান-এর; ভয়ঙ্কর হবে গতি

বুধবার, ২০শে মে ২০২০র দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা ১১০ -১৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতির বয়ে যাওয়া ঝড়ো বাতাসের পর দক্ষিণ বঙ্গের ছয়টি জেলার বিস্তির্ণ অংশে যে লন্ডভন্ড কান্ড ঘটেছে তাকে মহা প্রলয় ছাড়া অন্য কোন ভাবে বাখ্যা করা যায়না। এই অতি প্রবল ক্রান্তীয় ঘুর্ণিঝড়ের সাথে অনেকে ২০০৯ সালের ঘুর্ণিঝড় আয়লার তুলনা করছেন বটে তবে তা অসম তুলনা। আয়লা ছিল অনেক কম তীব্রতার। তুলনা যদি করতেই হয় তবে সেটা ১৮৬৪ সালের ৫ই অক্টোবরের ঝড়ের সাথে তুলনা করাই সমিচীন হবে। সেদিন ঝড় দক্ষিণ বঙ্গের মেদিনীপুর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করেছিল। তারপর দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার উপর দিয়ে কলকাতা হাওড়া হুগলী বর্ধমান নদিয়া হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের উপর গিয়ে দুর্বল হয়েছিল ২০শে মে ২০২০ তারিখের ঝড়ের মত। সেই ঝড়ের একটি অনুপুঙ্খ বর্ণনা বাংলার গভর্নর পাঠিয়ে ছিলেন ইংল্যান্ডের রাণীর কাছে। প্রায় ৪০০ পাতার সেই রিপোর্টের একটা পি ডি এফ কপি আছে আমার সংগ্রহে। ১৫৬ বছর আগের সেই ঝড়ে মারা গেছেন ৮০হাজার মানুষ। তার পর থেকে তদানীন্তন ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ৭০টির বেশি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণশালাকে একত্রে নিয়ে এসে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারই ফলশ্রুতি ১৮৭৫ সালে স্থাপিত India Meteorolgical Department বা ভারত মৌসম বিজ্ঞান বিভাগ যার প্রধান কার্যালয় ছিল কলকাতায়। পরে তা নয়াদিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমান আলিপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণশালা ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের বাগানবাড়ি। এক সময় এই বাড়িটিকে ঘিরে কিছু উপকথা প্রচলিত ছিল যেমন গভীর রাতে বাইজিদের নুপুরের শব্দ শোনা যায়। অশরীরী চলাফেরার কথাও বলতেন কেউ কেউ। বাড়ির নীচে একটি কুঠুরি আছে। আগে সেখানে ভূকম্পন মাপার যন্ত্র বসানো ছিল। সেই কুঠুরি নিয়েও নানা গল্প প্রচলিত আছে। এখনও নিস্তব্ধ চাঁদনী রাতে সাদা রঙের অবজারভেটরি বিল্ডিং বড় রহস্যময় মনে হয়। চাকরিতে থাকার সময় শীতের মাঝরাতে জ্যোৎস্না বিধৌত সাদা রঙের বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার ইংরেজ নরনারীর মদের নেশায় মশগুল বিচিত্র সংলাপ, পিয়ানোর সুরে বল নাচ কিংবা গোপন প্রেমের চোরা চাহনি মনে মনে অনুভব করেছি। গোপন প্রেমের ফলশ্রুতি দুই ইংরেজ প্রেমিকের ডুয়েল লড়াই এই বাড়িটির সমনের রাস্তায় হয়েছিল। তাই আজও আলিপুর আবহাওয়া অফিসের ঠিকানা ৪(4)নং ডুয়েল এভিনিউ যদিও মূল রাস্তা বা এভিনিউটির
অস্তিত্ব এখন আর নেই। সুপার সাইক্লোন আম্ফানে ১ মৃত্যু, নিখোঁজ আরও একজন
আমার এই এক দোষ কোন কথা দিয়ে শুরু করে কোথায় চলে যাই। শুরু করেছি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী অবস্থা নিয়ে কিছু বলব বলে। ঝড়ের পর ছয় ছটি দিন কেটে গেছে এখনও সব জায়গায় পানীয় জল ও বিদ্যুৎ পরিসেবা চালু হয় নি। জন জীবন এখনও বিপর্যস্ত। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রথম সবচেয়ে বেশি শক্তি নিয়ে ঘুর্ণিঝড় ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই যায়গায় ঠিক কি কি ঘটেছে তা জানার উপায় নেই। সামুদ্রিক ঢেউ নদিবাঁধ ভেঙে দিয়েছে। নোনা জল ঢুকে আগামী কয়েক বছরের জন্য জমি চাষ আবাদের অযোগ্য করে দিয়েছে। সরকারি হিসেবে ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু পাঁচ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরেও যে কত জন থেকে গিয়েছেন তার কোন হিসেব আছে কি? তাদের কী হয়েছে আমরা জানতে পারবো না । তাছাড়া দুই ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া হুগলী এই পাঁচ জেলায় মাঠের ফসল আর শাক সব্জি সব নষ্ঠ হয়ে গেছে অন্ততঃ যে সব জাগার উপর দিয়ে ঝড়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল গিয়েছে। জমিতে জমে থাকা জল সরিয়ে নুতন করে চাষবাস করে শাক সব্জি ফলাতে আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। হুগলী জেলার কলা ও পেঁপে বাগান নুতন করে তৈরি করতে বেশ কিছু দিন সময় লাগবে। তাই রোজকার খাদ্য তালিকায় শাক সব্জির বিকল্প হিসেবে সয়াবিন, রাজমা, ছোলা, মটর ও অন্যান্য দানা জাতীয় শস্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আমি তাই করি। আলু ও পেঁয়াজ নষ্ঠ হয়নি। তবে আমাদের মধ্যে শর্করা রোগ অনেক বেশি তাই সবার পক্ষে বিকল্প ব্যবস্থা একটু মুশকিল। হুগলী জেলার হিম সাগর ও অন্যান্য আম গছ থেকে ঝরে গেছে। গাছ ফাঁকা। মাত্র একদিন পর জামাই ষষ্ঠী। করোনা জনিত লকডাউন ও ঝড়ের জন্য বিদ্ধস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা। গত কালের ঈদের মত জামাই ষষ্ঠীও নম নম করে সারতে হবে। এতে কোন পক্ষ লাভবান হবেন জামাই না শ্বশুর কূল বলা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত এক পক্ষ লাভবান হলে অন্য পক্ষের ক্ষতি। বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে দুবার কথা না বললেই নয়। এই সময় গাঙ্গেয় পশ্চিম বঙ্গের উপর দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে বাতাস বইছে গত ছয় দিন ধরে। নিম্নচাপের হাত ধরে আন্দামানে বর্ষা এসেছে ১৭ই মে। ঝড়ের হাত ধরে মনসুন কারেন্ট চলে এসেছে দক্ষিণ বঙ্গের উপর । উত্তর পূর্ব ভারতের উপর থাকা জোরালো পশ্চিমী ঝঞ্ঝার টানে সেই বাতাস ফিরে যেতে পারছে না। অথচ এটা বলার উপায় নেই যে বর্ষা চলে এসেছে। দুদিন পর বাতাসের তীব্রতা কমবে। মনসুন কারেন্ট পিছিয়ে যাবে। ২৮/ ২৯ তারিখ বৃষ্টি হবে গাঙ্গেয় পশ্চিম বঙ্গেরর কিছু জায়গায়। কেরলেও বৃষ্টি হবে মাসের শেষ কটা দিন। তবে মৌসম ভবন কেরলে বর্ষা আসার কথা কবে ঘোষণা করবে সেটা তারাই ঠিক করবে। উত্তর, উত্তর পশ্চিম, মধ্যে ও পশ্চিম ভারতে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। মে মাসের ২৫ তারিখ থেকে জুন মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত নয় দিন ধরে একটানা তাপপ্রবাহ ও লু বইতে থাকে। এর স্থানীয় নাম ন’তপা বা নয় দিনের তপন তাপ।এই নয় দিনের প্রবল উষ্ণতা ভালো বর্ষার দ্যোতক বলে প্রচলিত লোক বিশ্বাস। অনেকে মনে করছেন ন’তপা ঐ অঞ্চলে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে সহায়ক হবে।একটা ঘুর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর উপকূলের কাছে। আগামী মাসের গোড়ায়। উত্তর পশ্চিম আরব সাগর অঞ্চলে। তা হলেও নাম হবে নিসর্গ। অবশ্য বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত। শেষে আমার বাগান কথা। আমার ঢেড়স গাছ ঝড়ে হেলে পড়লেও নষ্ঠ হয়নি। কঞ্চি পুতে গত দু তিনদিনে সোজা করে দিয়েছি। লংকা বেগুন ও তাই। ঝিঙ্গে মাচা হেলে পড়েছিল আজ সোজা করে দিয়েছি। পাট শাক হেলে শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু গাছের প্রাণশক্তি যে কতটা প্রবল তার পরিচয় পেলাম আমার এক টুকরো পাট শাকের ক্ষেতে। গাছগুলো নিজের শক্তিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার অন্য বাগানে দুটি পেঁপে গাছ পড়েছে। আম গাছের গোড়া আলগা হয়ে গছে। গাছের ডাল ছেঁটে হাল্কা করে ঠেকনা দিয়ে রেখেছি যাতে কালবৈশাখী ঝড়ে যাতে পড়ে না যায়। এই সব করতে গিয়ে বেশ কিছু ডেঁয়ে পিঁপড়ের কামড় খেতে হয়েছে। প্রকৃতি চলে তার নিজের ছন্দে, নিজের গতিতে, নিজের তাল লয় মিলিয়ে। মানুষ প্রকৃতির সথে পাঞ্জা লড়ে চলেছে তাকে নিজের নিয়মে চালিত করার নেশায়। কিন্তু সেটা সম্ভব নয় মানুষের সেটা বুঝতে হবে। নাহলে প্রকৃতি নিজেই বুঝিয়ে দেয় কখনো করোনায় কখনো উমপুনে।

অজয় নাথ

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

চন্দ্র কলা হ্রাস বৃদ্ধি

3 (2) কজন প্রশ্ন করেছে সরু এক ফালি বা কাস্তের মত চাঁদ সন্ধ্যার কিছু সময় পর আর দেখা যায় না কেন ? আজ সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। একটা পাঠশালার (প্রাইমারি স্টেন্ডার্ডের) বাচ্চাও জানে চন্দ্র কলার হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। অমাবস্যার পর শুক্লপক্ষে কলা বৃদ্ধি ও পূর্ণিমার পর কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্র কলা হ্রাস […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: