পানকৌড়ি কথা ও কাহিনী

File:Little Cormorant (Phalacrocorax niger) in Hyderabad W IMG ...

পানকৌড়ি কথা ও কাহিনী: মনে পরে সেই সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের লেখা মাঝি মল্লাদের কবিতার লাইনটি “চুপ চুপ ওই ডুব দেয় পানকৌড়ি”,সেই পানকৌড়িদের নিয়েই আজ কথাবার্তা হবে l কবি যাদের সাথে ঘোমটা পড়া বউ-দের তুলনা করেছিলেন l গ্রামেগঞ্জে জলাশয় তে এদের নিয়মিত দেখা মেলে এখনো জানি না আর কত দিন,এই সোনার দিন থাকবে?যাক যতদিন থাকে ততই মঙ্গল কারণ পুকুরের বাস্তুতন্ত্রের এ এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য l
পানকৌড়ি হলো Phalacrocoracidae (ফ্যালাক্রোকোরাসিডি) গোত্রের Phalacrocorax (ফ্যালাক্রোকোরাক্স) গণের অন্তর্ভুক্ত একদল জলচর পাখি। পানকৌড়ির, বৈজ্ঞানিক নাম Phalacrocorax niger. ইংরেজিতে এরা কর্মোরেন্ট ও শ্যাগ নামে পরিচিত। পানকৌড়ির শ্রেণীবিন্যাসে বর্গ, গোত্র ও গণ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে এবং সম্প্রতি বেশ কয়েকটি নতুন গণের নামও প্রস্তাব করা হয়েছে।হয়তো জীববিদ্যায় নতুন ভাবে নতুন আঙ্গিকে উঠে আসবে, পানকৌড়ি !

পৃথিবীতে প্রায় 40টি প্রজাতির পানকৌড়ি রয়েছে এবং এদের সবার দেহেরই বর্ণ কালো কিন্তু তার গাঢ়ত্বের তারতম্য রয়েছে। পানকৌড়ি খুব ভাল সাঁতারু ও এদের খাদ্য হলো প্রধানত মাছ, এই কারণে খাদ্যের খোঁজে এরা জলের গভীরে ডুব দিতে সক্ষম lপানকৌড়ি জলে নেমে মাছেদের স্বর্গরাজ্যে গিয়ে ধাওয়া দিয়ে শিকার ধরে, ভাাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকে না। তার শিকার ধরার মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট কোনো কৌশল দেখা যায় না, বরং তার চেয়ে দৈহিক তৎপরতা এবং শ্রমই অনেক গুন বেশি।
দুই বাংলায় পানকৌড়ি অতি পরিচিত পাখি, বিশেষ করে খাল বিল যুক্ত অঞ্চলে। এরা উচ্চতায় প্রায় 50-55 সেন্টিমিটারের হয়ে থাকে । সারা দেহই, কুচকুচে কালো, তাতে সামান্য উজ্জ্বল চকচকে আভা দেখা যায় । গলায় সাদা একটি দাগ, পাখার নিচের পালক ধূসর রংয়ের। লেজের আকৃতি অনেকটা নৌকার বৈঠার মতো। ঠোঁট সরু, কিছুটা বাঁকানো ধরনের, ঠোঁটের অগ্রভাগ বড়শির মতো বাঁকানো। যা মাছ শিকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, পা দুটি ছোটো এব দৃঢ় হয়ে থাকে। হাঁসের পায়ের মতো অর্থাৎ লিপ্তপদের মতো এদের পায়ের পাতা জোড়া লাগানো থাকে । জলের মধ্যে গমনের সময় নৌকার দাঁড়ের মতো পা দিয়ে জল ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যায়।এদের চোখ-এর বর্ণ সবুজাভ বাদামি।এদের যৌন দ্বিরূপতা দেখা যায় না অর্থাৎ স্ত্রী-পুরুষ প্রাণী দুটি দেখতে একই রকম হয় ফলে সাধারণত আমরা এদের পার্থক্য করতে পারি না। এদের জুভিনাইল অবস্থায় নাকের ফুটো অর্থাৎ বহিঃনাসারন্ধ্র থাকে কিন্তু বয়স্কদের বাইরের দিকে নাকের ফুটা থাকে না।
ডিম পাড়ার সময় এদের গলার দাগটি মিলিয়ে যায়।যা এদের যৌবন বা যৌন পরিণতির নিদর্শন,ডিম পাড়ার সময় এদের দেহে কয়েকটি সাদা পালক দেখা দেয়; আর গলার দুপাশে কয়েকটি মিহি সাদা কোমল পালক,দেখা যায় । বাদামি রংয়ের ঠোঁট এই প্রজননের সময় লাল হয়ে ওঠে। বিবাহ অনুষ্ঠানে সাজসজ্জা ও অলঙ্করণ কেবল মানুষেরই রীতি নয়, পশুপাখির এই বৃহদ জগতেও এটি একটি সহজাত প্রাকৃতিক নিয়ম।
পানকৌড়ি সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল, হ্রদ ও নদীনালায় বসবাস করে। ডালপালা, সামুদ্রিক আগাছা ও ঝোপঝাড়, বৃক্ষ কিংবা সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ের খাঁজে এরা বসবাস করে। নতুন ডিমের বর্ণ নীলচে, তবে সময়ের সাথে সাথে চকচকে সাদা বর্ণ ধারণ করে যা বলেদেয় ডিম পরিণত হচ্ছে এবং ডিম ফোটার সময় আগত। তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। তিন বছর বয়সে এরা বয়োঃপ্রাপ্ত হয়। পানকৌড়ি একবারে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো লম্বা ধরনের। একদিক সরু হয়ে থাকে। সবুজ আভাযুক্ত নীল, খোসা বেশ শক্ত। প্রথম দিকে ডিমগুলোতে চকের মতো সাদা এবং নীলাভ সাদা গুড়া মাখানো থাকে। ডিম ফোটার আগ দিয়ে হলদে ও বাদামি রংয়ের হয়ে পড়ে।

Little Cormorant (Phalacrocorax niger) photo - RAINBIRDER photos ...

পানকৌড়ি উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের পাখি ফলে অনুকূল পরিবেশ হওয়ায় দুই বাংলার প্রায় সর্বত্রই এদের দেখা যায়। এখানকার জলবায়ু, নদী, খালবিল এদের প্রিয় বিচরণক্ষেত্র। সমুদ্রের তীরে এদের দেখা গেলেও পানকৌড়ি কিন্তু সম্পূর্ণ মিষ্টি জলের জলাশয়ের পাখি। বড় পুকুর ও বিল অঞ্চলই এরা বেশি পছন্দ করে। সুন্দরবন অঞ্চলের জোয়ারের জলে পুষ্ট নদীগুলো এদের খুবই প্রিয়। হাঁসের মতো এরাও জলের সাঁতার কাটে। তবে পানকৌড়ি, সাঁতরানোর সময় তাদের শরীর জলের নিচে ডুবে থাকে, কেবল গলা ও মুখটি থাকে জলের উপর। আবার অনেক সময় ডুব দিয়েই থাকে থেকে থেকে মাথা তোলে আবার ডুব দেয়, মাছের সন্ধানে এরা জলের অনেক নীচে পর্যন্ত চলে যায়। ডুবসাঁতারেও এরা পারদর্শী। অনেক সময় একসঙ্গে অনেক পানকৌড়ি দল বেঁধে একই দিকে ডুব দিয়ে দিয়ে চলতে থাকে।

Cormorant & Heron Eating Fish, Float the Fish - পানকৌড়ি ...

 

পানকৌড়ির প্রধান খাদ্য ছোট মাছ,এছাড়াও কাঁকড়া, ব্যাঙাচি, ব্যাঙ ইত্যাদিও খায়। সাঁতার কাটার সময় কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিলে শুধু মাথা এবং গলাটুকু জলের উপর বের করে রেখে ডুবে থাকতে পারে। জল থেকে ওঠার সময় এদের একটু বেগ পেতে হয়। এরা জল থেকে উঠে ডাঙাতে কিংবা শক্ত কোনো জিনিসের উপর বসে পাখা শুকায়। জলের উপর কোনো ডালপালা থাকলে সেখানেও এরা সোজা হয়ে বসে পড়ে। তখন রোদে পাখা মেলে বহুক্ষণ ধরে একইভাবে বসে থাকে।
পানকৌড়ি প্রধানত বাসা তৈরি করে জলাশয় তীরবর্তী যেকোনো গাছের উপর। ঝিল বা পুকুরের ধারে কিংবা জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, এমন গাছও এরা পছন্দ করে। ছোট ছোট কাঠকুটো দিয়ে বাসা বানায়। পানকৌড়ির শরীরের গঠনের তুলনায় বাসা অনেক ছোট।ভালো বাসা তৈরিতে এরা দক্ষ নয়। কাক বা বকের বানানো পুরোনো বাসা পেলেই তা দিয়েই এরা বাসস্থানের প্রয়োজন মিটিয়ে নেয়। একই গাছে কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে বাস করে কারণ এরা সামাজিক পাখি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এরা শুধু নিজেরাই দল বেঁধে থাকে না, অন্য প্রজাতির পাখি যেমন বক,নিশিবক, শামুকখোল ইত্যাদি পাখির সঙ্গে একই গাছে বাসা বেঁধে একসঙ্গে থাকে।
পানকৌড়ির মল থেকে উৎপন্ন সার গুয়ানো একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে যথেষ্ট সমাদৃত এবং পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক এখন ব্যবহার করার জন্য l চীন ও জাপান-এর মানুষেরা মাছ ধরার জন্য বিশেষত পানকৌড়ি পোষে। সুন্দরবনেও বহু জেলে এখন এই পদ্ধতিতে মাছ ধরে থাকেন l পানকৌড়িদের গলায় একটা ধাতব গোলাকার চাকতির মতো কিছু পরিয়ে তাতে লম্বা শক্ত সুতা বেঁধে জলে নামিয়ে দেয়। ডুব দিয়ে মাছ ধরে যখন জলে উপর ভেসে ওঠে তখন সুতো টেনে পাখির মুখ থেকে মাছ খুলে নেওয়া হয় । গলায় ওই জিনিস পড়ানো থাকে বলে পানকৌড়ি মাছ ধরেই গিলে ফেলতে পারে না। কিছুদিন এমন অভ্যাস হয়ে গেলে তখন আর গলায় কিছু পরানোর দরকার হয় না; তখন নিজে থেকেই মাছ এনে প্রতিপালকের কাছে দেয়।অর্থাৎ এরা যে পোষ মানে,সেটা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত এবং এরা আমাদের উপকারী প্রাণী কারণ কোনো রকম ক্ষতি করে না l এরা অতিখাদক না অল্প কিছু মাছ খেয়েই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায় পেট ভরলেই l কিন্তু ভেরী বা জলাশয় তে জাল দিয়ে একাকার করে আমরাই এদের ঠেলে দিচ্ছি বিপদের মুখে আর তাছাড়া এদের মাংস খাওয়ার একটা রেওয়াজ রয়েছে l তাও আমাদের সবুজ গ্রাম বাংলার স্মৃতির সাথে জড়িত এরা,সূর্যাস্তের সময় জলের মধ্যে এদের ডুব দেওয়ার দৃশ্য আমাদের নস্টালজিয়াকে জাগিয়ে দেয় l সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য যেন না হারিয়ে যায়,এটাই অনুরোধ সকলের কাছে l

সৌভিক রায়

Leave a Reply

%d bloggers like this: