ফিনল্যান্ডের ,পরিবেশ আন্দোলনের কথা

4.5
(2)

# পরিবেশ আন্দোলনের কথা : পর্ব ২ #

ফিনল্যান্ডের নেসটে ওয়ার : বাল্টিক সমুদ্র বাঁচানোর লড়াইয়ের গল্প
১৯৭০ সালের ৩০ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের হানকো পেনিনসুলার অধিবাসীরা সকালবেলা ঘুম ভেঙে একটা খবর পড়েন স্হানীয় সংবাদপত্রে। স্হানীয় কাগজ ভাসতরা ন্যায়ডাল। তারা ছেপেছে, রাস্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম উৎপাদনকারী সংস্থা নেসটে, তাদের তথা দেশের তৃতীয় তৈল শোধনাগারটি হানকো পেনিনসুলায় স্হাপন করবে বলে স্থির করেছে। খবরে আরো প্রকাশ, সরকারী উপর মহলে নিজেদের চেনাজানা কাজে লাগিয়ে প্রচুর পরিমাণে জমি কিনতে চলেছে তারা। দূষণের ভয়কে তোয়াক্কাও করতে চাইছে না নেসটে। খবরটা হানকোর মানুষদের কাছে আশ্চর্যজনক ছিল। বাতাসের মতো করে খবরটা ছোট্ট পেনিনসুলায় ছড়িয়ে পড়ে। বড়রা খবরের কাগজ থেকে জানতে পারলেন, ছোটরা জানতে পারলো বড়দের থেকে। তৈল শোধনাগার তৈরী হলে, যে পরিমাণ দূষিত ব্যর্জ সমুদ্রের জলে মিশবে, তার আন্দাজও করাও বাতুলতা। বেলা গড়ালো, দিন গড়ালো়, হানকো আর্কিপেলাগোয় দুশ্চিন্তার ছায়া গাঢ় থেকে গাঢ়তরর দিকে এগোতে থাকলো।

#ফিনল্যান্ড ও হানকো অঞ্চলের কথা #

গোটা ফিনল্যান্ডই প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। শতকরা ৭৮ ভাগ জুড়ে নির্জন তাইগার জঙ্গল। ১০ ভাগ প্রাকৃতিক হ্রদ, পুকুর, নদী নালা। ফিনল্যান্ডের দক্ষিণতম প্রান্ত হল হানকো। তার পায়ের তলা দিয়ে বিলি কেটে দিতে দিতে বয়ে চলেছে বাল্টিক সাগরের ঢেউ। পাইনের বনে পাখির ডাক আর সামুদ্রিক বাতাসের তীক্ষ্ণ শোঁ শোঁ শব্দ। প্রচন্ড শীতে মাঝে মাঝে বাল্টিক সাগর জমে যায়। উত্তর দিকে তখন বিখ্যাত পোলার নাইট চলছে, দক্ষিণে দিনে ছয় ঘন্টা মৃদু দিনের আলো হালকা খেলা করে যায়। এপ্রিলে রঙিন বসন্ত, মে জুন থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, শীতকাতুড়ে মানুষরা হানকো শহর আর আশেপাশের দ্বীপপুঞ্জগুলোতে ভরে থাকে কানায় কানায়। ৭০’এর নভেম্বর- গ্রীষ্মকাল দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। যে জায়গাটার কথা উঠে আসছে, সেটা ১৯০২ সালে হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে তৈরী তাভারমিন জুলজিক্যাল স্টেশনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। আসল খবর আরো স্পষ্ট করে জানা গেল নভেম্বরে। নেসটে থেকে সরকারী ভাবে ঘোষণা করা হল, সত্যি সত্যি তারা হানকোতে একটা তৈল শোধনাগার তৈরি করতে চান। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যদিও ভিতরের খবর হল, প্রকাশ্যে না জানালেও ভেতরে ভেতরে নেসটে ঠিক করে ফেলেছে হানকোর পূর্ব উপকূলে তারা ঘাঁটি গাড়তে চলেছে। নেসটের কর্মকর্তা ওলভে রাডে এতটাই ক্ষমতাশালী যে এমন কলকাঠি নেড়েছেন, যাতে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থেকে থাকলেও রাজনৈতিক বাধা না আসে। কিন্তু সবটাই আড়ালে আবডালে- লোকচক্ষুর অন্তরালে।

# নেসটে দূর হঠো#

প্রকাশ্যে না জানালেও, নেসটের উদ্দেশ্য নিয়ে কেউই খুব একটা নিশ্চিন্ত ছিলেন না – বিশেষ করে স্হানীয় বাসিন্দা আর তাভারমিনে জুলজিক্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানীরা। ১৯৭০ সালটা পরিবেশ পরিচিতির দিক থেকে এমনিতেই অন্যরকম। ওই বছর ইওরোপ জুড়ে পালিত হয়েছে সংরক্ষণ বর্ষ। লোকের মনে প্রকৃতি চেতনা একটু একটু করে ফুুটতে শুরু করেছে। এর মধ্যে নেসটের এই কার্যকলাপ সমুদ্রপ্রিয় হানকো, একিনেসের বাসিন্দারা কিছুতেই মন থেকে মানতে পারবেন না। হানকো এমনিতেই ফিনল্যান্ডের দক্ষিণতম বিন্দু, সমুদ্র-লাগোয়া। একেনেসও সমুদ্র তীরবর্তী ছোট্ট শহর। শহর গড়ে ওঠার আগে একটা ছোট্ট জেলেপট্টি ছিল এখানে। এখনো সেই মধ্যযুগীয় গোলকধাঁধার মতো অলিগলির কোণায় কোণায় এখনো মাছ বা বিচিত্র সামুদ্রিক জীবজন্তুর ছবি আঁকা আছে। চোখের সামনে সুবিশাল বাল্টিক সমুদ্র, জাহাজে বা ডিঙিতে সেই দিগন্তপ্রসারী জলরাশি পেরিয়ে গেলে এস্টোনিয়ার উপকূল। ১৬ নভেম্বর হানকো আর নিকটবর্তী শহর একিনেসে, ইস্কুলের ছেলেমেয়ে’রা জমায়েত হল। একিনেসে প্রায় ৪০০ জন কিশোর কিশোরী জোরে জোরে, দুলে দুলে, প্ল্যাকারড ধরে স্লোগান দিল- ‘ না নেসটে এখানে নয়’ ( No Neste Not Here ), ‘দেখতে পারো, ছুঁয়ো না’ ( Look but don’t touch), ‘ বোরগা ছেড়ে এগিও না ‘ ( Stay in Borga )। বোরগা ফিনল্যান্ডেরই আরেকটা জায়গা, যেখানে নেসটের আরেকটি কারখানা আছে। প্রায় একই সময়ে নরওয়েজীয় শহর একেসডালেও বাঁধ বানানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। হানকোর স্হানীয় অভিনেতারাও আর চুপ করে বসেছিলেন না, নিজেদের মতো করে তারাও প্রতিবাদ করতে শুরু করলেন।

# ১৯৭১ : নেসটে ওয়ার গতি পেল #

নতুন বছর মানে ১৯৭১-এর শুরুতে নেসটে প্রকাশ্যে ঘোষণা করল, হানকোতে সত্যি সত্যি একটা তৈল শোধনাগার বানানো হবে। এরপর থেকেই যে অভূতপূর্ব পরিবেশ আন্দোলন শুরু হয় ফিনল্যান্ড তা আগে দেখেনি। ২৬ জানুয়ারি ১৯৭১-এ তৈরি হল অ্যাকশন গ্রুপ ফর আর্কিপেলাগো অব নেল্যান্ড। শুধুমাত্র পুরুষ’রাই এর সদস্য হতে পারতেন, আর তারাও আসতেন মূলত: এলিট বুর্জোয়া সমাজ থেকে। এই অ্যাকশন গ্রুপ এবং দুটি স্হানীয় সংবাদপত্র ভাসতরা ন্যায়ল্যান্ড এবং ন্যায় প্রেসেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নেসটের প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটা শান্ত ও দৃঢ় জনমতের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারলেন। তারা একটা প্রতিবাদ পত্র রচনা করলেন এবং ওই পত্রের সাথে জুড়ে দেবার মতো প্রচুর সই সংগ্রহ করতে থাকলেন। একই সঙ্গে দুটি পত্রিকার সম্পাদকদের দপ্তর চিঠির বন্যায় ভেসে যায়, যার সবকটাই মূলত: নেসটের প্রকল্প বাতিল করার কথা জানিয়ে লেখা। বিজ্ঞানী’দের মতামতও প্রকাশিত হতে থাকে। অ্যাকশন গ্রুপ ফর দ্য আর্কিপেলাগো অব ন্যায়ল্যান্ড আর হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয় ছোটোখাটো সভারও আয়োজন করে, যাতে বিপদের দিকগুলো খতিয়ে বোঝানো হতে থাকে। মার্চের মধ্যে ৭৩,৬২১ টি সই সংগৃহীত হয় এবং ১ লা এপ্রিল ফিনিস প্রধানমন্ত্রী আহতি করজালাইনেনের কাছে হস্তান্তরিত করা হয়।

# সরকার কি ভাবলেন #

এত বড় বাধার সম্মুখীন হতে হবে, নেসটে কর্তৃপক্ষ ভাবতেই পারেন নি। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আহতি করজালাইনেন সেন্টার পার্টির সদস্য। এরা নীতির দিক থেকে অনেকটাই কৃষক-মুখী। তারা একটা তদন্ত- কমিটি গঠন করলেন, নেসটের তৈল শোধনাগারটির বিষয়ে খোঁজ নিতে। সেইসময় ফিনিশ শ্রমিক আন্দোলন খানিকটা নতুন শিল্পস্হাপনের পক্ষপাতী ছিল। সোশ্যাল ডেমোক্রাট ও কমিউনিস্টরা মনে করতো এর ফলে বেশ খানিকটা কর্ম-সংস্থান হতে পারে, পরিবেশের সুরক্ষার প্রশ্নটা তাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক ছিল। তবে সেই সোশ্যাল ডেমোক্রাট পার্টিরই একটা অংশ, বিশেষতঃ অল্পবয়সীরা কিছুটা পরিবেশ- সচেতন হয়ে উঠছিলেন।

৭ই জুলাই ১৯৭১’এ তদন্ত কমিটি নেসটের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু পথ পরিষ্কার ছিল না, কারণ অবামপন্হী দলগুলো প্রায় সবকটাই নেসটের বিপক্ষে। ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে সোস্যাল ডেমোক্রাটরা ক্ষমতায় আসে। রাফায়েল পাসিও প্রধানমন্ত্রী হন। সোস্যাল ডেমোক্রাটদের একটা অংশ তখনো নেসটেরই পক্ষে ছিল। দেশের মানুষ বিপক্ষে থাকলেও নেসটে তখনো আশাবাদী ছিল। কিন্তু ২১এপ্রিল ১৯৭২ ছন্দপতন। ঠিক ছয়দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নেসটের পছন্দ করা জায়গাটা ঘুরে গেছেন। ২১এপ্রিল ঘোষণা করে দিলেন, নেসটেকে হানকোতে তৈল শোধনাগার স্হাপন করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। দুবছর-ব্যাপী পরিবেশ আন্দোলন ইতিবাচক পরিসমাপ্তি ঘটল।

এটাই সম্ভবত ফিনল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম পরিবেশ আন্দোলন।

তথ্য সংগ্রহ : দ্য নেসটে ওয়ার 1970-1972 : দ্য ফার্স্ট ভিকট্রি অব দ্য বাডিং ফিনিশ এনভায়োরনমেন্টাল মুভমেন্ট;

বাই, ম্যাটিয়াস কাইহোভিরটা,হ্যানা লিন্ডবার্গ, ম্যাটস উইকসট্রম।

আর্কাডিয়া, বসন্ত, ২০১৮, নম্বর ৮

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পানকৌড়ি কথা ও কাহিনী

4.5 (2) পানকৌড়ি কথা ও কাহিনী: মনে পরে সেই সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের লেখা মাঝি মল্লাদের কবিতার লাইনটি “চুপ চুপ ওই ডুব দেয় পানকৌড়ি”,সেই পানকৌড়িদের নিয়েই আজ কথাবার্তা হবে l কবি যাদের সাথে ঘোমটা পড়া বউ-দের তুলনা করেছিলেন l গ্রামেগঞ্জে জলাশয় তে এদের নিয়মিত দেখা মেলে এখনো জানি না আর কত […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: