গর্ভবতী হস্তিনী হত্যা আর গনেশ পুজা

4.4
(7)

Pregnant elephant dies after being fed crackers-stuffed pineapple ...

‘মান’ আর ‘হুঁশ’ ‌এ দুইয়ের নৈকট্য কবে ঘটবে?
বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে ” -সঞ্জীব বাবুর এই লাইনটা,এখন নাইস টু কোট হয়েগেছে; কিন্তু মানে না কেউ l কি করলেন স্বাক্ষরতার শীর্ষে থাকা কেরলবাসী ! বন্য শিশু- কে না থাকতে দিলেন বনে আর কোল?সে তো সুদূরের বস্তু ! আলোই তো দেখা হলো না l ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট পড়েছি অনেকবার,আর যতবার জেনেছি; মনে হয়েছে “বা রে! আমার শ্রেষ্ঠ প্রাণী ! কিন্তু গর্বের কেরলবাসী যা করলো তাতে পৃথিবীর সব হোমো সেপিয়েন্সদের মাথা লজ্জায় ও স্বজাতির প্রতি ঘৃনায় নেমে আসে l মানুষ আর পশুর দ্বৈরথ-এর খবর প্রায়শই আমরা শুনতে পাই,পড়তে পাই দৈনিকের পাতা জুড়ে l খাবার বা অন্য কোনো জৈবিক প্রয়োজনে,যখন লোকালয়ে চলে আসে;তখন তাদের নানা অত্যাচার চলে l মেরে পিটিয়ে,তাড়া করে তাদের মেরে ফেলা হয়,আগুন জ্বালিয়ে বাঁজি ফাটিয়ে ইত্যাদি করে তাদের বিরক্ত করে,মেরে ফেলা হয়,আর সেই দৃশ্য দেখে পৈশাচিক আনন্দ,দর্শকদের আনন্দ উল্লাস l প্রতিবছরই বহু বন্যপ্রাণী এই ভাবে, শিকার হচ্ছে আমাদের প্রতক্ষ্য হিংসার l
একটা গল্প বলি,শুনুন এক গর্ভবতী মহিলা খিদের জ্বালায় থাকতে না পেরে, খাবার খুঁজতে পথে নেমেছিলো। একদল মানুষ তাকে- “খাবার খাবে? এই নাও!” বলে, মুখের মধ্যে গুঁজে দিলো বোম। সেই বোম ফেটে যখন মহিলার জিভ, গাল ছিন্নভিন্ন তখন সেই মানুষগুলো তাকে ঘিরে ধরে উল্লাস শুরু করলো। তীব্র যন্ত্রণা রেহাই থেকে পেতে, পেটের মধ্যে বাচ্চাটাকে নিয়ে মহিলাটি যখন ছোটাছুটি শুরু করলো এদিক-ওদিক, কেউ এগিয়ে এলো না। শেষে একটা নদী দেখতে পেয়ে নিজের জ্বালাপোড়া কমাতে মহিলাটি ঝাঁপ দিলো তার মধ্যেই। পাড়ে তখন “মজা” দেখতে হাজির হয়েছে মানুষেরা। রাগে, দুঃখে, ঘেন্নায় জল থেকে আর উঠে এলো না মহিলাটি। একগলা জলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে ওখানেই মারা গেলো সে। মারা গেলো তার পেটের ভিতরে থাকা সন্তানটিও।
খাবারের সন্ধানে সেই 15বছর বয়সী মা আর তার অনাগত সন্তান ,তার কি অপরাধ ? না; সে গ্রামে চলে এসেছিলো ! হ্যাঁ খাবার মিললো ঠিকই, তবে খাবারের সাথে উপরি পাওনা মৃত্যু ! কেরলের Silent valley national park এর একটি 15 বছরের অন্তঃসত্ত্বা হাতি Malappuram এর একটি গ্রামের কাছে চলে আসে খাবারের সন্ধানে। সেখানে গ্রামবাসীরা তাকে একটা আনারস খেতে দেয় । অবলা প্রাণীটা সেটি খেয়েও নেয়। আনারসটির ভেতরে ছিল বারুদ ভর্তি। খাওয়া মাত্রই বাজি গুলো তার মুখে ফেটে যায়। রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সারা মুখ।
তবুও নিজের সন্তানের কথা ভেবে সেই রক্তাক্ত শরীর নিয়েই ছুটে বেড়ায় সারা গ্রাম একটু খাবারের খোঁজে। শেষ অবধি সে খাবার পায়নি আঘাত ও করেনি কোনো গ্রামবাসী কে, ভাঙেনি কোনো ঘর। সোজা চলে এসে মাঝ নদীতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। বহু চেষ্টাতেও তাকে সরানো যায়নি সেখান থেকে।Animal Abuse: Pregnant Elephant in Kerala Dies Eating Firecracker ...
এই দুঃখের ঘটনাটা হলো আমাদের ভারতবর্ষের কেরালার রাজ্যের মালাপ্পুরমের। সেখানে একটা গর্ভবতী হস্তিনী খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। সেখানকার মানুষ আনারসের মধ্যে বাজিপটকা স্টাফ করে সেই আনারস তাকে খেতে দিয়েছিল। বিশ্বাসী হস্তিনীটি তা খেয়ে ফেলে। তারপর সেই আনারস পেটে গেলে সেই বাজি ফেটে পড়ে।হাতিটি যন্ত্রণায় সেই সময় সেই হস্তিনী গোটা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়।এত যন্ত্রণার মধ্যে সে একটিও ঘর বাড়ি ও গাছ ভাঙেনি। সারা গ্রাম যন্ত্রনায় দাঁপিয়ে বেড়ানো সেই হস্তিনী কিন্তু কাউকে কোনো আঘাত করেনি, কোনো ক্ষতি করেনি l সেই হস্তিনী শেষে একটি নদীর মধ্যে যায় । যন্ত্রনা অনুভব করতে করতে অন্ধকারের দিকে চলে যায় চিরকালের মতো। সে তার মা হওয়াটা পৃথিবীর সব থেকে সভ্য জীবের শিক্ষা ও ব্যবহারের স্বীকারে শিকারী হয়।
মহাভারতে ভীষ্ম-এর শেষ সময়ে,তার মা গঙ্গা এসেছিলেন,স্বেচ্ছামৃত্যতে,এও ঠিক তাই তবে এই মা তার গর্ভের সন্তান নিয়েই নদীর মধ্যে জলে দাঁড়িয়ে প্রাণ দিলেন নীরবে,শিক্ষিত আর সভ্য মানুষদের দিকে আবিশ্ব জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়েই,কারণ তাদের অপরাধ তো তাদের জানানো হলোই না l তবে এটি স্বেচ্ছা মৃত্যু নয়,বরং মানুষের l লঘু পাপে নয়,খিদের জন্য গুরুদণ্ড হয়ে গেলো অশ্রু আর জল যে একাকার হয়ে গেলো, শিক্ষিত কেরল? কেরাল যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রথম সেটা আমরা জানি,ওই প্রতি 100জনে 94জন কে তথাকথিত শিক্ষিত বলা যায় (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কেরালার স্বাক্ষরতা ৯৩.৯১%)। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা থাকলেই হয় না মানুষ হতে গেলে আগে মানবতার বন্ধু হতে হয় সেটা আবারো স্পষ্ট । এই নারকীয় ঘটনার পর আজ আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেলো, শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা থাকলেই মানুষের মনুষ্যত্ব গড়ে ওঠে না! একমাত্র ভালোবাসাই মানুষ ও অমানুষের পার্থক্য গড়ে দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে- মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে।ভগবানের দেশে কি নিষ্ঠুর পরিণতি তাঁর প্রদত্ত প্রাণের!
মানুষ খুন হলে পরে মানুষই তার বিচার করে কিন্তু এই নরকীয় ঘটনার বিচার কে করবে,আনারসের সাথে বাজিপটকা আর খাবারের সাথে বিষ-একই জিনিস ! সে চারপায়ের মা বলে,সে ভোটার নয় বলে বিচার পাবে না? আমি সৌভিক রায় এক জন সাধারণ ভারতবাসী হিসেবে এই পাশবিকতা ও নরকীয়তার বিচার চাই,আর কতো দিন ওরা মানুষের লোভ,মজা আর অশিক্ষার শিকার হবে? জবাব টা দিতে হবে কিন্তু………..India: Pregnant elephant dies in Kerala after being fed pineapple ...
এই নরকীয়তার বিবরণ জেনে নিন,সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বন দফতরের ঘটনা ক্রমিক বিবরণের মাধ্যমে;ফরেস্ট অফিসার মোহন যখন সংবাদ মাধ্যমকে তার বিবৃতি দিলেন তখন সেটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন সমস্ত সাংবাদিক। তিনি বলেছিলেন, ডাক্তার যখন হাতিটির ময়নাতদন্ত করেন তখন তিনি বলেন যে হাতিটি 6 মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আরও জানান যে হাতিটির মধ্যে একটা অভূতপূর্ব অনুভূতি কাজ করেছিল। সে জানতো তার মৃত্যু আসন্ন। শুঁড় সহ গোটা শরীর রক্তময়, যন্ত্রণায় জ্বলছিল সারা দেহ। এই অবস্থায় সে তার সন্তানের কথা ভেবে চলে যায় নদীর মাঝে জলের মধ্যে যাতে সেই রক্তাক্ত জায়গায় পোকা-মাকড় না বসে। যতক্ষণ প্রাণ ছিল সে চেষ্টা করেছিল যাতে তার সন্তানের কষ্ট একটু হলেও কম হয়।আর শেষ অবধি সে ওই মাঝ নদীতেই প্রাণ ত্যাগ করে। ”

সৌভিক রায়

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পরিবেশ দূষণ

4.4 (7)                চাই দূষণ মুক্ত পৃথিবী ৫জুন : বিশ্ব পরিবেশ দিবস কি ও কেন ? ১৯৭২ সালের জুন মাসের ১ম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মানব পরিবেশ শীর্ষক আন্তর্জাতিক স্টকহােম কনভেনশন থেকে ৫ জুন দিনটি বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে স্বীকৃত। ঐ কনভেনশনে ২৬টি অনুচ্ছেদের প্রত্যেকটিতে মানুষের জীবন, […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: