ফরেস্ট ম্যানদের উপাখ্যান-2

poribes news
5
(2)

 

আগের পর্বে ভারতের তিন অরণ্য প্রাণ মানুষের কথা বলেছিলাম যাঁরা নিরালস ভাবে বনভূমি রক্ষা করার চেষ্টা এবং নতুন বনভূমি বিস্তার করে যাচ্ছেন l এই রকমই দুজনের কথা আমরা এই পর্বে জানবো,প্রথম জন কিন্তু ভারতের বাইরে সেনেগালের এক বুড়ো!Eloubali03p

এক-একটি ম্যানগ্রোভ গাছের চারাকে জলের নিচে কাদার ভিতর পুঁতে দিচ্ছেন বৃদ্ধ মানুষটি। একটি চারার থেকে নির্দিষ্ট কিছুটা দূরে অন্য আরেকটি চারা, তারপর আরও একটি, এইভাবে জলের নিচে কাদায় চারার পর চারা বুনেই চলেছেন হায়দার এল আলি। গত এক দশকে এভাবেই আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ সেননেগালের কাসামাঞ্চে দ্বীপে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল একটি ম্যানগ্রোভ অরণ্য। প্রকান্ড এই বনভূমির আয়তন  শুনলে চমকে যাবেনই  এবং বলা যায়, অ্যাভিচেনা গাছের অরণ্যগুলির মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম। মনে হতেই পারে অলীক কিন্তু এটি অবিশ্বাস্য তো  নয়ই বরং ঘোর বাস্তব।

স্থানীয় মানুষেদের সাহায্য নিয়ে 15 কোটিরও কিছু বেশি ম্যানগ্রোভের চারা লাগিয়ে ফেলেছেন  হায়দার এল আলি।

একসময় নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ম্যানগ্রোভশূন্য হতে বসেছিল এই অঞ্চল। যার ফলে সমস্যায় পরে কৃষি এবং  চাষ , এমনকি  ধানের জমিতেও বাড়তে থাকে লবণের পরিমা, নষ্ট হয়ে যায় ফসল। তখনই হায়দার ঠিক করেন, প্রকৃতিকে তার অরণ্যে, চেনা ছন্দে ফিরিয়ে দেবেন। শুরু হয় অসম্ভবকে সম্ভব করার  এক পাহাড় প্রমান কর্মযজ্ঞ । তারপর 10 বছর ধরে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে তিনি বুনেছেন 15 কোটির বেশি ম্যানগ্রোভ চারা। ক্রমে ক্রমে বন্ধ্যা অঞ্চল ফের পরিণত হয়েছে বনে।মরুভূমি হতে বসা  ভূমি ফিরে পেয়েছে প্রাণ!

অ্যাভিচেনা গাছ জল থেকে শুষে নেয় অতিরিক্ত লবন ফলে, বনের পাশেই  চলছে ধানচাষ। ম্যানগ্রোভের শিকড়ে বাসা বাঁধছে শামুক, সেই শামুক মাছেদের প্রিয় খাদ্য। ফলে, ম্যানগ্রোভ-সংলগ্ন নদীতে মাছেদের সংখ্যাও বাড়ছে। সেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন স্থানীয় মানুষরা। সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্র-এর ভারসাম্য  ও মানুষের জীবন এবং  জীবিকাকে বাঁচিয়ে রাখছে এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য !
হায়দার আলী, সেনেগালের মৎস্যমন্ত্রী হয়েছেন, বাস্তুতন্ত্রের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীও হয়েছেন,তবুও  তাঁর প্রধান নেশা এই ম্যানগ্রোভ বনভূমি বাঁচিয়ে রাখা আর ক্রমাগত বাড়িয়ে তোলা আজও বহাল এবং কর্মে এখনও তিনি ব্রতী। এক-একটি ম্যানগ্রোভের বেড়ে উঠতে যতটা সময় লাগে, আমরা সেই সময় হারিয়ে ফেলেছি বা বলা ভালো সেই সময় আর নেই আমাদের কাছে । এখন প্রতিটা মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পৃথিবীর অনেক অনেক গাছ দরকার, বন দরকার।এই সদুক্তি স্বয়ং হায়দারের l

এবার চলুন ভারতের এক ফরেস্ট ম্যানকে চিনেনি, যত দিন যাচ্ছে, পরিবেশের অবস্থা আরও বেশি করে বিপদজনক হয়ে যাচ্ছে। জাতীয়, আন্তর্জাতিক সমস্ত স্তর থেকে একটাই বার্তা আসছে পরিবেশ বাঁচাও । মণিপুরের মোইরাংথেম লোইয়া এক পা হেঁটেছেন পরিবেশ কে রক্ষার ইচ্ছায়,যে যা তা ইচ্ছা নয়!  একেবারে জঙ্গল বানানোর ইচ্ছা । তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে, প্রায় একার চেষ্টায় 300 একরের মতো জমিতে জঙ্গল তৈরি করেছেন!

মণিপুরের সেনাপতি জেলা এমনিতে সবুজই ছিল। সেখানের কৌব্রু চূড়ায় ছোটবেলায় মাঝে মাঝেই যেতেন লোইয়া। একসম় পড়াশোনার জন্য বাইরে চলে যান। যখন ফিরে আসেন, তখন চিত্রটা বদলে গেছে। সেই সবুজে ভরা জায়গা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ততদিনে অবশ্য মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি কিন্তু ছেড়ে দিলেন সেই কাজ।

 

পাহাড়ের কাছে একটি জায়গায় গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেন লোইয়া। তারপর, দীর্ঘ ছয় বছরের নিরলস প্রচেষ্টা। প্রায় 300 একর জায়গা জুড়ে তৈরি হয় সবুজের মেলা,আবার আগের মতো l উন্নয়নের জন্য যখন এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল বলি হচ্ছে অরণ্য , তখন লোইয়ার মতো মানুষদের এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং  প্রচেষ্টা এখনও আশার সঞ্চার করছে,ভরসা জোগাচ্ছে।

এদের জন্যই অরণ্য এখনও অলীক স্বপ্ন হয়ে যায়নি,তাই সর্বশক্তিমানের কাছে চাই  এই সব মানুষ গুলোর সংখ্যা যেন আরও কিছুটা বাড়ে !

(C)সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

জলবাহিত রােগ ও তার প্রতিকার

5 (2) ডায়ারিয়া (Diarrhoea) গ্যাসট্রো-এন্টারিটিস (Gastroenteretis) কারণ      সাধারণতঃ জীবাণুমুক্ত জল ও খাবারের সঙ্গে এই রােগ ছড়ায়। মাছি এই রােগ ছড়াবার ক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা পালন করে। ভাইরাস :    রােটাভাইরাস, এন্টারাে ভাইরাস, অ্যাডিনাে ভাইরাস। ব্যাকটিরিয়া :     ভিব্রিও কলেরা, ই, কোলাই, সালমােনেলা, সিগেলা। প্রােটোজোয়া :এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা, জিয়ারডিয়া (Giardia lamblia)। 5 বছরের […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: