কাকেদের বুদ্ধি

4
(4)

বুদ্ধিমত্তায় সেরা পাখি কাক | বিশেষ ...

হ-য-ব-র-ল নিশ্চয়ই পড়েছেন,তাহলে কাকেশ্বর কুচকুচে-কে নিশ্চয়ই চেনেন l আসলে কাক আমাদের কাছের পাখি তো,রোজ প্রতিনিয়তই সবসময় আমরা কাক দেখি তাই; গেঁয়ো যোগী ভিক্ষ পায় না l কাকের ক্ষেত্রেও তেমন হয়েছে l

এমনিতেই ভারতের কাক কে নিয়ে মিথের শেষ নেই,যমের সাথে সরাসরি টাচে থাকা পাখি থেকে কাক ভোজন করিয়ে সৌভাগ্য লাভ ! ভারতের সবই সম্ভব !

উষ্ণমণ্ডলীয় সব মহাদেশে প্রায় ৪০ প্রজাতির কাক দেখা যায়। কাকের দেহ বর্ণ কালো রঙের হয়,এটাই তার সবচেয়ে বড়ো ট্রেডমার্ক বলতে পারেন ।যদিও অ্যালবিনো বা সাদা কাকও দেখা যায়, এরা ‘করভিড’ পরিবারের সদস্য। এদেরকে দলবদ্ধভাবে থাকতে দেখা যায়। কাক সর্বভূক । এরা সাধারণত ২০-৩০ বছর বাঁচে। কিন্তু কিছু প্রজাতির উত্তর আমেরিকার কাক প্রায় ৫৯ বছর পর্যন্তও বাঁচে। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ‘Corvus Brachyrhynchos’ । নানা প্রজাতির কাক থাকলেও আমাদের দেশে এবং বাংলায় সাধারণত পাতি কাক, দাঁড় কাক ও পাহাড়ি কাক দেখতে পাওয়া যায়।

আমাদের আশেপাশে সর্বক্ষণ দেখতে পাওয়া এই পাখি কে আমরা মূলত কুৎসিত ও কর্কশকণ্ঠী পাখি হিসেবেই জানি। পাখি সমাজের সে ব্যাড বয় মতো অনেকটা,আমাদের কাছে ব্রাত্য ! কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, কাক পাখি জগতের সর্বাপেক্ষা ‘বুদ্ধিমান পাখি’। শুধু তা-ই নয়, প্রাণীজগতের অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে এদের গণ্য করা হয়। কাকের মাথার স্নায়ু কোশ প্রমাণ করে যে, তারা খুব বুদ্ধিমান ও কৌশলী প্রাণী ।

কাক খুবই ধূর্ত প্রাণী। যখন কাক কোনো শক্ত খাবার পায় তখন সেটি রাস্তায় ফেলে রাখে। এক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য এবং পর্যবেক্ষণ একদম নিখুঁত থাকে। কাকেরা ট্রাফিক সিগন্যাল মুখস্থ রাখে। সেই অনুযায়ী তারা সঠিক মুহূর্তে উপর থেকে শক্ত খাবারটি ছেড়ে দেয় এবং অপেক্ষায় থাকে কখন একটি গাড়ি এসে পিষে দেবে ওই শক্ত খোলকটিকে।

শুধু এখানেই শেষ নয়। গাড়ীর তলায় পিষে খাবারটা যখন পড়ে থাকে, তখন কাকেরা একদম তাড়াহুড়ো করে না। অপেক্ষা করে যখন লাল আলো জ্বলে ওঠে, তখন লাফিয়ে এসে ঠোঁটে তুলে নেয় খাবারটা। আবার গাছের ফল খাওয়ার জন্য একেবারে সঠিক উচ্চতা থেকে নিচে ফেলে দেয়, যাতে ফলটা ফেটে গিয়ে তার খাওয়ার উপযোগী হয়। এমন বুদ্ধির প্রশংসা না করে অন্য কোনো উপায় আছে কি!
আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কাক যে কেবল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে তাই নয়, যন্ত্রপাতি নির্মাণেও এরা পারদর্শী।জীববিজ্ঞানীরা এদেরকে ‘পাখাওয়ালা প্রাইমেট’ বলেন, কারণ এই পাখিরা ছোটখাট যন্ত্রপাতি তৈরি করতে জানে। এদের উদ্ভাবনী শক্তি আছে, কারণ এরা কৌতূহলী ও পরিশ্রমী। ঈশপের গল্পে কাকের জল খাওয়া অর্থাৎ কলসির মধ্যে নুড়ি পাথর ফেলে ফেলে জল কে কাছে নিয়ে আসার মধ্যেই তো তার উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাথে আমাদের পরিচয় হয় l

কাকের অভিযোজন ক্ষমতা মারাত্মক,কাক মানিয়ে নিতে সক্ষম যেকোনো পরিস্থিতিতে। খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য কাক দু’ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে।

প্রথমত, এরা বাঁকানো গাছের ডালপালা সংগ্রহ করে। এরপর গাছের গায়ে গর্ত থাকলে ওই ডালপালা দিয়ে খোঁচায়। উদ্দেশ্য, গর্তের ভিতর পোকা থাকলে তা বের করে আনা এবং খাবার হিসেবে তা গ্রহণ করা l দ্বিতীয়ত, এরা শক্ত পাতাকে টুকরো টুকরো করে সেগুলো দিয়ে পোকা বা অমেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করে থাকে। এমনকি শিকার ধরতে এরা সোজা কোনো ধাতব তার বাঁকিয়ে হুক বানানোর কৌশলও আয়ত্ত্ব করে কোনো কোনো সময়ে।একটি কাকের দিকে যত সময় নিয়েই তাকিয়ে থাকুন না কেন, পরে অন্য কাক থেকে সেই কাককে আপনি ঠিক আলাদা করতে পারবেন না, অর্থাৎ এদের শনাক্ত করার যায় না, আপনার আমার চোখ ডিস্টিংগুইশিং মার্ক ধরা দেবে না ! তবে সেই কাকটি কিন্তু ঠিকই অন্য মানুষ থেকে আপনাকে আলাদা করে চিনতে পারবে।

এমনই একটি পরীক্ষা করে, ওয়াশিংটনের সিয়াটলে গবেষকরা কাকদের পর্যবেক্ষণ করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। তারা ৭টি কাককে নিয়ে এই পরীক্ষা চালান। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ৭টি কাক ধরে চিহ্নিত করে ছেড়ে দেন। এ সময় গবেষকরা মুখোশ পরেছিলেন। পর্যবেক্ষণের বিষয় ছিল, কাকেরা মানুষর মুখ মনে রাখতে পারে কি না। দেখা গেছে, কাক যে শুধু মুখ মনে রাখতে পারে তা নয়, বরং কাক কারো বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুষে রাখতে সক্ষম। তাই কখনো কোনো কাককে ভুলেও আঘাত করবেন না। কারণ বেঁচে থাকলে এরা শত্রুর চেহারা ৫ বছর পর্যন্ত মনে রাখতে পারে! এমনকি দলের অন্য কাকদেরও চিনিয়ে রাখে আঘাতকারীর চেহারা।

অবাক কাণ্ড! রাস্তায় পড়ে থাকা ...

গবেষকরা যখন মুখোশ পরিহিত অবস্থায় ক্যাম্পাসে বের হয়েছেন, তখন কাকেরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ করেছে। কেবল ৭টি কাকই নয়, ক্যাম্পাসের প্রায় সব কাক তাদের উপর আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু যে কাকদের গবেষণাগারে আটকানো হয়নি তারা কীভাবে মুখোশ চিনতে পারলো? গবেষকরা ধারণা করেছেন যে, মুখোশের কথা সেই ৭ কাক তাদের বাকি সঙ্গীদের জানিয়েছে।কাক কেবল কা কা ধ্বনির মাধ্যমে ডাকাডাকিই করে না। একে অন্যের সাথে যোগাযোগও করে থাকে।একটি কাক অন্য কাকের সাথে কথা বলে এবং তারা নির্দিষ্ট বস্তুকে আক্রমণ করার ব্যাপারে শলাপরামর্শ করে থাকে। অবাক করার ব্যাপার হলো, কাকেদের শুধু ভাষাই নয়, আছে অঞ্চলভেদে আলাদা আলাদা উচ্চারণ রুপ। কাকেরা শুধু দৃষ্টিসীমার জিনিসকেই শনাক্ত করতে পারে তা নয়, বরং তারা বিস্তারিত ভাবে সে জিনিস মনে রাখতে পারে। মুখোশগুলোকে চিনে নিয়েছিল ৭টি কাক এবং সেই মুখোশগুলোর বর্ণনা তাদের দলের অন্য কাকদের জানিয়ে দেয়। তাই যেসব কাকেরা মুখোশ দেখতে পায়নি তারা সেই ৭টি কাক থেকে বর্ণনা শুনে মুখোশগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। তাদের হামলার ব্যাপার থেকেই সেটা বোঝা যায়। তাছাড়া কোথায় কোন জায়গা আছে তা এরা হুবহু মনে রাখতে পারে।

কাক পরিকল্পনা করে কাজ করে,কোনো কাজ করার আগে আমরা যেমন পরিকল্পনা করি, তেমনভাবে কাকও পরিকল্পনা করে থাকে। যেহেতু কাক সুচতুর এবং সুযোগসন্ধানী। কাক প্রায়ই গর্ত করে খাবার লুকিয়ে রাখে। আরেকদিকে চোখ রাখে, অন্য কাক এই লুকানোর ব্যাপারটি দেখে ফেলল কি না! যখন দেখে অন্য কাক দেখে ফেলেছে, তখন সে গর্তে খাবার লুকানোর ভান করে।

আসলে সে খাবারটি নিয়ে দ্রুতগতিতে উড়ে গিয়ে অন্য কোথাও গর্ত করে রাখে। কিন্তু যে কাকটি এই লুকানোর ঘটনা দেখেছিলো সে-ও আড়াল থেকে কাকটিকে অনুসরণ করে এবং লুকানোর আসল জায়গা দেখে ফেলে। কিন্তু এরা দুজনই জানে এরপর দ্বিতীয় কাকটি গর্ত থেকে খাবার নিলে প্রথম কাকটিও আড়াল থেকে তাকে লক্ষ্য রাখবে। এভাবে তাদের মধ্যে ক্রমাগত চোর-পুলিশের মতো খেলা চলতেই থাকে।

কখন কী খাবার খাবে, কোথায় খাবার পাবে, সে তার সঙ্গীকে খাবার থেকে কতটুকু দিবে এগুলো সে আগেই পরিকল্পনা করে রাখে। কাকেদের মধ্যে চৌর্যবৃত্তির অভ্যাস আছে এবং অধিকাংশই বেশ পরিকল্পিত চুরিরঘটনা। এমনকি একই দলের অন্যান্য সদস্যরা কোন পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ করছে সেটা দেখে নিজের স্বভাব-চরিত্র ঠিক রাখার পরিকল্পনাও করে এরা। কাক আবার পরিবেশ বান্ধবও বটে,সমাজ বন্ধু উপকারী পাখি আবর্জনা খেয়ে সাফ করে l পরিবেশ পরিছন্ন রাখে l
তাহলে বুঝলেন তো কাক কি জিনিস,আর কলকাতার কাক বাঙালিদের মানে আমাদের সংস্বর্গ লাভ করে আরো পটু হয়ে গেছে !আপনার বাড়ির ময়লা কোথা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়,সাফাই কর্মী কোন রাস্তায় আসে,সেটা কোথায় ফেলা হয় সব এদের জানা,আপনি কখন বাজার থেকে এসে মাছ মাংস ধোবেন সব এদের নখদর্পনে তাই একটু সামলে চলবেন,নয়তো এবার থেকে দেয়ালে লেখা শুরু করবেন কাক হইতে সাবধান l

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা

4 (4) বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানমনস্কতা শব্দ দুটো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে-গায়ে লাগা। কিন্তু অর্থের ফারাক অনেক, বিরাট দূরত্ব দু’এর মধ্যে।বিজ্ঞান জানলেই কি বিজ্ঞানমনস্ক হয়? হওয়া উচিত, কিন্তু বাস্তবে তা হতে দেখি না আমরা। ভূত-প্রেত-আত্মার অস্তিত্ব বিজ্ঞানের চোখে হাস্যকর, আমরা জানি, অথচ বহু প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আত্মা বা ভৌতিক শক্তিতে বিশ্বাস করেছেন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: