কেন হারিয়ে যাচ্ছে চড়ুই ?

poribes news
5
(4)

চড়ুই-কথা : বাংলা সাহিত্যে চড়ুই পাখি নিয়ে কবিকুল অনেক ছড়া-কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্র-নজরুল এবং আরও অনেকে। কিন্তু আদতে সেই চড়ুইপাখি আজ চূড়ান্ত ভাবে বিপন্ন। এখন থেকেই সতর্ক না হয়ে উঠলে বিভিন্ন এলাকা থেকে ধাপে ধাপে হারিয়ে যাবে বিভিন্ন বন্যপ্রাণ, পাখি। ইতিহাসের পাতায় যে ভাবে বিলুপ্ত ডোডো পাখির কথা জানা যায়, হয়তো কোনও একদিন ইতিহাসে সে ভাবেই লেখা থাকবে চড়ুইপাখির কথাও! এ ঘটনা কিন্তু কখনোই, কখনই কাম্য নয়। তাতে চিরপরিচিত প্রাকৃতিক মাধুর্যই শুধু বিনষ্ট হবে না, একই সঙ্গে ভেঙে পড়বে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও।

2010 সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রথম পালিত হয় চড়ুই দিবস। প্রতি বছর 20 শে মার্চ নীরবেই পালিত হয় বিশ্ব চড়ুই দিবস বা World Sparrow Day।(চড়ুই এর ইংরাজী Sparrow)
আমাদের অত্যন্ত পরিচিত পাখি হলো এই চড়ুই,একে আমরা প্রতিবেশী ভাবতেই পারি,কি বলুন?  আমাদের দেওয়ালির বাজি আর দূষণ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই ছোটো পাখি দের !

চড়ুই পাখিকে নিয়ে রজনীকান্ত সেন-এর বিখ্যাত সেই ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটা মনে পড়ে।–

‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,পাতি চড়ুই - উইকিপিডিয়া
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তাই ?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”

সকালে সেই ওদের, কিচিরমিচির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেতো । চড়ুই দূরান্ত ,ছটফটে পাখি। সব সময় ব্যস্ত এরা । সাধারণত এরা মানুষের আশেপাশে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। ইতিহাস বলে, চড়ুই মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের সান্নিধ্যেই ঘোরাফেরা করত। বিশ্বের যে কোনও লোকালয়ের আশপাশেই এদের দেখা যায়। এরা মানুষের বাড়ির আশপাশে বেশি থাকতে পছন্দ করে বলেই এদের ‘হাউস স্প্যারো’ বা গৃহস্থালির চড়ুই বলা হয়।

মোটামুটি ভাবে শুকনো ঘাসপাতা, খড়কুটো দিয়ে চড়ুই বাসা বাঁধে। শস্যদানা ছোট ছোট পোকা মাকড় ইত্যাদি এদের খাদ্য। সাধারণত বাড়ির কড়িকাঠে বা কার্নিশে এরা বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ার জন্য।মনে করা হয়, এদের আদি নিবাস ইউরেশিয়া অঞ্চল এবং আফ্রিকা মহাদেশে ছিল। তারপর এরা সেখান থেকেই আস্তে আস্তে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

পৃথিবীতে মোট 48 টি প্রজাতির চড়ুই দেখতে পাওয়া যায়। জীববিজ্ঞান অনুযায়ী এদের 11টি গণে বিভক্ত করা হয় ।“গৃহস্থালির চড়ুই” এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত, এদের আদি নিবাস ছিল মূলত ইউরেশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ। তবে বর্তমানে ইউরোপ থেকে গিয়ে জনবসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে এরা উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চড়ুই দেখতে পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। বাংলাদেশ এবং ভারত ছড়াও, নেপাল, পাকিস্তান, জাপান, কোরিয়া, ইরান, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারেও চড়ুই আছে। ঘাসের মধ্যেও পোকামাকড় খুঁজে বেড়ায় গ্রামের মাঠের কাছে, ঝোপ-জঙ্গলে, নদীর ধারে, শহরের চালের গুদামের কাছে দল বেঁধে থাকে। ঝোপ জাতীয় গাছে, পুরনো বিল্ডিংয়ের ভেন্টিলেটরে বাসা করে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে (মার্চ থেকে আগস্ট মাসে)।জাপানের দম্পতির সন্তান চড়ুই পাখি ...

যেহেতু এই পাখি মানুষের সঙ্গে থাকতে অভ্যস্ত, তাই যে কোনও গৃহস্থ পরিবারের বাড়িতে ঘুলঘুলির ফাঁকে এদের দেখতে পাওয়া যায়। এদের দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় 15 সেন্টিমিটার, ওজন প্রায় 20থেকে 30 গ্রাম পর্যন্ত হয়,এদের যৌন দ্বিরূপতা দেখা যায় । ছেলে ও মেয়ে পাখি উভয়ের রকম এবং মাথা, ঘাড় ও পুরো মাথার পালকের রঙ মরচে বাদামি বা বাদামি। পুরুষ-স্ত্রী চড়ুই দেখতে আলাদা। পুরুষের মাথা ধূসর ও নীল মেশানো, ঘাড় পিঠ ও পাখনা খয়েরি লাল বা পিঙ্গল। চোখের পেছন থেকে ঘাড় অবধি মোটা গাঢ় লালচে বাদামি বর্ণের। লেজ ও লেজের গোড়া ধূসর।

স্ত্রী পাখির রঙ ওপরের দিকে ধূসর বাদামি, তার ওপরে কালচে বা পিঙ্গল দাগ, পেট সাদাটে। জীবের নিয়মানুযায়ী, পুরুষ পাখিটি দেখতে তুলনায় বেশি সুন্দর হয়।এরা 4 থেকে 6টি ডিম পাড়ে যা ফুটতে সময় লাগে প্রায় 13-15 দিন। ছানারা উড়তে শিখলে বড়দের সঙ্গে মাঠে খাবার খেতে যায়। প্রজনন মৌসুমে পাতি চড়ুই খড়কুটো, কাঠি, শুকনো ঘাস, পালক দিয়ে মানুষের ঘরে বাসা বানায়। গ্রামের ঘরের টিনের চালের কোণে বাসা বাঁধে। শহরের ভেন্টিলেটর, মিটার, সিলিং, পাইপের ফোকরে চড়ুইদের বাসা দেখা যায়। পাতি চড়ুইদের পায়রার খোপে, কলার কাঁদির ভেতর ও খড়ের গাদায় বাসা বাঁধতে দেখা যায়। বাচ্চা ফুটলে দু’জনেই তাদের লালন-পালন করে। গ্রামে তো ঝাঁকে ঝাঁকে ধান ক্ষেতে, ধান শুকানোর উঠানে ধান খেতে নামে।

কিন্তু শহরের ইমরাতগুলোতে ওদের সেই জায়গা আর থাকছে না। নতুন নতুন নকশায় ইমারত নির্মাণ চলছে। চড়ুই থাকলে ডিসটেম্পার রঙ নষ্ট হয়ে যাবে, তাই এই নতুন ব্যবস্থা। বিশ্বের কোথাও চড়ুইদের অবস্থা আশংকাজনক নয়। পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে তারা সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।
কিন্তু বিশ্ব জুড়ে যখন থেকে, প্রযুক্তি দ্রুত গতিতে এগোতে শুরু হল, তখন থেকেই চড়ুই পাখিরও সংখ্যা ক্রমাগত কমতে শুরু করল। বর্তমানে সারা ভারতেই চড়ুই পাখির সংখ্যা কমে এসেছে।

বছর দশেক আগে অর্থাৎ গত দশকে যে সংখ্যায় চড়ুই দেখা যেত, বর্তমানে তা আর দেখা যাচ্ছে না। ক্রমশ কমে যাচ্ছে ওদের সংখ্যা। গত 10 -15 বছর ধরে যে ভাবে বহুতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, মফস্‌সল এবং প্রান্তিক অঞ্চলে,ফলে পুরনো বাড়ির সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। সেই কারণে সেই সব বাড়ির ঘুলঘুলি আর দেখতে পাওয়া যায় না। তার জায়গা দখল করেছে ফ্ল্যাট বাড়ি। সেখানে চড়ুইয়ের পক্ষে বাসা বানানো খুবই কষ্টকর কাজ। তাই চড়ুইয়ের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

একদিকে বহুতলের দাপট, অন্যদিকে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন। আর তার সঙ্গে গত দু’দশক ধরে মোবাইল ফোনের বিস্তারের জন্যে যত্রতত্র মোবাইল টাওয়ার তৈরি করা। শহর বা গ্রামীণ এলাকা, সর্বত্র এই একই ছবি। মোবাইল টাওয়ারের তীব্র চৌম্বক বিকিরণ শুধু চড়ুইয়েরই নয়, আরও বিভিন্ন পাখিকে বিপন্ন করে তুলেছে। যা আশঙ্কাজনক ভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে অনেকাংশেই নষ্ট করছে।সম্প্রতি রোবট-2 ছবিটি এই সমস্যার উপর নির্ভর করেই নির্মিত !

তাই সকাল গুলি এখন আর সেই ভাবে চড়ুইপাখির কিচিরমিচিরে জেগে ওঠে না। কৃষিক্ষেত্রে জমিতে যে পরিমাণ কীটনাশক এখন দেওয়া হয়, তাতে চড়ুইয়ের মতো ছোট পাখিদের খাদ্যে রীতিমতো বিষ ঢুকে যাচ্ছে। যার ফলে তাদের মৃত্যু ঘটছে, বংশবৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই প্রতিকূল যান্ত্রিক পরিবেশে চড়ুই পাখিদের বেঁচে থাকাটাই সমস্যা হয়ে উঠেছে।

চড়ুই বিনামূল্যে ছবি ডাউনলোড ...

নির্বিচারে চড়ুই পাখি হত্যার পরিণাম যে কি ভয়ানক হতে পারে, তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চীন। চড়ুই ফসলের ক্ষতি করে, এ ভ্রান্ত ধারণায় 50-এর দশকে সরকারি নির্দেশে লাখ লাখ চড়ুই নিধন করা হয়। কিন্তু পরবর্তী চার–পাঁচ বছরের মাথায় চড়ুইয়ের অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্যসংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় 20 মিলিয়ন মানুষ। এরপর নিরুপায় হয়ে, শুরু হয় চড়ুই রক্ষার আন্দোলন।

চড়ুই পাখি আমাদের জীবন জীবিকার কোনো ক্ষতি করে না।হারাতে বসা সবুজ, আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর দূষণ ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চড়ুইদের বংশবৃদ্ধি ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। মেঘের গর্জনে, বৃষ্টিতে, ঝড়ে এরা দলে দলে আশ্রয় নেয় বাড়ির বারান্দায়,কার্নিশে । কীটপতঙ্গ এবং মাছি সাবাড় করে পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে অবদান রাখছে এরা।বাঁচাচ্ছে নাগরী ও সভ্যতাকে ! ভেবে দেখুন আজ  চড়ুই পাখি সঠিক সংখ্যায় থাকলে আর আমাদের ভাবতে হতো না, আজকের পঙ্গপালের হামলা নিয়ে ।চড়ুই পাখিদের বাঁচতে সাহায্য করুন । প্রত্যেকের প্রতি অনুরোধ, জীবিকা আর বিনোদনের ফাঁকে প্রতিদিন দুবেলা ছাদে বা বারান্দায় চড়ুইদের জন্য সামান্য খাবার ছিটিয়ে রাখুন । বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, কোনো জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোনো প্রাণীই সামান্য নয়। শুধুমাত্র জৈব প্রবৃত্তি পূরণের জন্য মানুষের জীবন নয়। আসুন, কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশন আর ফোন নির্ভর যান্ত্রিক বিনোদনের আসক্তি কমিয়ে গড়ে তুলি চড়ুই পাখির সঙ্গে বাধুত্ব,সবাই মিলে বাঁচি ।এ পৃথিবী শুধু যে মানুষের নয়, চড়ুইয়েরও, এবং অন্য বন্যপ্রাণেরও,গাছেরও সেটা, মানুষ আর কবে বুঝবে!আদেও কি আজ অবধি বোঝার চেষ্টা করেছে, সময় কড়া নাড়ছে ! এবার একটু ভাবুন,সময় যে আর বাঁধন মানবে না l

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বাদুড় : এক উড়ন্ত স্তন্যপায়ী

5 (4) বাদুড় : এক উড়ন্ত স্তন্যপায়ী-এর গল্প বাদুড় বলে, ওরে ও ভাই সজারু, আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু। বাদুড়ের প্রজাতি আজকে সেই বাদুড়ের গল্প হবে, উঁচু গাছে দিনের বেলা উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা নিশাচর প্রাণী বাদুড়।একমাত্র উড়ন্ত বাদুড় ! পৃথিবী -তে মোট ১৪১১ টি প্রজাতির বাদুড় রয়েছে,আর ভারতে ১২৮টি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: