গিরগিটি রঙ বদলায় কি করে ?

রঙ বাজি : রঙবাজ দের কাজ রঙবাজি করা, এই রকম এক রঙ বাজ প্রাণীকে নিয়ে আজ কথা বলবো যদিও সে রঙ বদলানো তে সিদ্ধ হস্ত কিন্তু, আমাদের সাথে পাল্লায় পারবে না । যাক অনেক রঙে রাঙানো হলো, এবার কথায় আসি! আজ পালা গির্গিটির;যার বিশেষ খ্যাতি আছে রঙের দুনিয়ায় । এদের কালারেশান প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ রূপেই একটি অভিযোজোন মূলক স্ট্রাটিজি!

ইংরেজীতে একটা কথা আছে কেমোফ্লাজ অর্থাৎ তারা এমন বর্ণ ধারণ করে যাতে করে পার্শ্বস্থ জিনিসের সমবর্ণ হয়ে মিশে যেতে পারে ।

ভুল নামের জন্যই মরছে উপকারী 'গিরগিটি ...

বর্ণ পরিবর্তনের একাধিক কারণ পাওয়া যায়,মূলত আত্মরক্ষা হলেও বিভিন্ন রকম সংকেত এই বর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে গিরগিটি তাদের সম প্রজাতির জীবের মধ্যে প্রদান করে যেমন: বিপদ সংকেত, খাবারের সন্ধান,অন্য গিরগিটি দেখে ভয় পেলে, বিপরীত লিঙ্গের গিরগিটিকে আকর্ষণ করার জন্য, প্রজননের সংকেত বহন করার জন্য ইত্যাদি ।

গিরগিটি ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে এই বর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। সামুদ্রিক বিভিন্ন স্কুইড, অক্টোপাস,সাপ, ব্যাঙ, বিভিন্ন পতঙ্গ, মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের মধ্যে রঙ বদলানোর প্রবণতা দেখা যায়। স্কুইড এবং অক্টোপাসের মতো গিরগিটি চামড়ার রং বদলে ফেলে না। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, গিরগিটি এই কাজটা তার শরীরের কোষের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়ে করে থাকে।

গিরগিটি রিটার্নস - Home | Facebook

আমরা জানি যে, কোন পদার্থের কি রং হবে তা নির্ভর করে পদার্থটি কি রং শোষণ করে আর কি রঙের প্রতিফলন ঘটায়।আর গিরগিটি তার চামড়ার গঠনের পরিবর্তন ঘটিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রঙের প্রতিফলন ঘটায়।
বিজ্ঞানীরা ৫ টি পুরুষ, ৪ টি মহিলা, ৪ টি অপত্য গিরগিটি যাদের বৈজ্ঞানিক নাম panther chameleons যা মাদাগাস্কারে পাওয়া যায়,ওই গিরগিটিদের উপর গবেষণা করে দেখতে পেয়েছেন যে, তাদের চামড়ায় মধ্যবর্তী স্তরে ২ ধরনের iridophore কোষ থাকে।

Iridophore কোষে বিভিন্ন সাইজের ন্যানো পর্টিকেল থাকে, যা মুলত এই রং পরিবর্তনের জন্য দায়ী। গিরগিটি তার শরীরের চামড়া উত্তেজিত বা শান্ত করে তার কোষের গঠনগত পরিবর্তন করে থাকে। যা এই রং পরিবর্তনের কারণ।

যখন কোষগুলো শান্ত থাকে তখন iridophore কোষগুলো কাছাকাছি থাকে। আর তখন ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের রশ্মি প্রতিফলিত হয়, ফলে নীল রঙের দেখায়। আর যখন উত্তেজিত থাকে তখন iridophore কোষগুলোর দূরত্ব বেড়ে যায়। যার ফলে দীর্ঘ তরঙ্গের রশ্মি যেমন লাল, কমলা, হলুদ দেখায়।
মজার বেপার হলো শুধু রং না, রঙের উজ্জ্বল্যতাও তারা বদলাতে পারে। সূর্যালোক বা অন্য উজ্জ্বল আলোর উপস্থিতিতে এরা হালকা বর্ণ ধারণ করে এবং অন্ধোকারে গাঢ় বর্ণ ধারণ করে থাকে। গিরগিটির ত্বকের আশ্চর্য গুণ ...

Ectotherm : যে সব প্রাণীর রক্ত খুব ঠান্ডা, দেহের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে বাইরে থেকে তাপ নেয়। গিরগিটিও ওই ectotherm-দের দলেই পড়ে। যখন খুব ঠান্ডা তখন দেহের মধ্যে যাতে বেশি তাপ শোষণ হয় তার জন্য বেশ গাঢ় রঙের হয়ে যায় আবার যখন বেশ গরম তখন হালকা রঙের হয়ে যায় যাতে তাপ প্রতিফলিত করে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

বাইরের তাপমাত্রা, আলোক তীব্রতা অনুভব করে এরা নিজেদের রঙ বদলায়। এমনও দেখা যায় যে গিরগিটি রাতের বেলায় বেশ গাঢ় রঙের হয়ে ঘুমোচ্ছে, এমন সময় শরীরের কোনও অংশে টর্চের আলো ফেললে সেই অংশের রং আস্তে-আস্তে হালকা হয়ে যায়।

এদের ত্বকে মোট তিনটি স্তর থাকে আর প্রত্যেক স্তরে এক-এক রকমের chromatophore বা রঞ্জকগ্রন্থি থাকে। সব চেয়ে বাইরের যে স্তর তাতে থাকে xanthophore, যেগুলো লাল আর হলুদ রঙের জন্য দায়ী। মধ্যবর্তী স্তরে থাকে iridophore যেগুলো নীল রঙের জন্য দায়ী, এই iridophore-কে আবার guanophores-ও বলে, কারণ ওই গ্রন্থীগুলোতে বর্ণহীন guanine crystal থাকে, আর এগুলোর মধ্যেই আলো প্রতিফলিত এবং বিচ্ছুরিত হয়ে নীল দেখায়।অন্তর্বতী স্তরটি তে থাকে কালো রঙের রঞ্জক পদার্থ নিঃসরণকারী গ্রন্থী melanosome তাই ওটার নাম melanophore, আর এগুলোই রং বদলানোর মূল কারিগর!ওই রঙ মিস্ত্রি ভাবতেই পারেন।

ঐ melanophores গুলো তারার ন্যায় আকৃতি বিশিষ্ট হয়, আর এর ভেতরেই রয়েছে Melanosomes- যখন এগুলি ছড়িয়ে পড়ে ত্বকে তখন ত্বক কে গাঢ় দেখায় আর তারার কেন্দ্রে থাকলে ত্বকের রঙ ফিকে হয়ে যায়। melanosomes- এর বিস্তার বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থকে প্রচ্ছন্ন ভাবে ঢেকে দের দেয় এবং রঞ্জকের উপস্থিতির তারতম্য অনুযাযী ত্বকের রং বদলে যায়। এই রঞ্জক পদার্থগুলো একেবারে মিশে যায়,যা খুব ছোট ছোট থলির মধ্যে থাকে আর ত্বকের বিভিন্ন স্তর সঙ্কুচিত-প্রসারিত হয়ে ত্বকের বিভিন্ন অংশে রঞ্জক পদার্থের ঘনত্ব-এর তারতম্যে আলাদা আলাদা রং দেখায়।

বহুরূপী গিরগিটি | আয়োজন | The Daily Ittefaq

গিরগিটিদের চামড়ায় কিছু receptors থাকে যারা বাইরের তাপমাত্রা অনুভব করে এমন কিছু neuronal বা hormonal signal central nervous system-কে পাঠায়, সেখান থেকে রং পরিবর্তনের সংকেত আসে, যার বহিঃপ্রকাশ এই রং পরিবর্তন।

সাধারণত, পুরুষ গিরগিটি অন্য পুরুষ গিরগিটিদের তাড়াতে বা স্ত্রী গিরগিটিদের আকৃষ্ট করতে এই পরিবর্তন ক্রমান্বয়ে করে থাকে ।এরা খুব লাজুক স্বভাবের, তাই এদের দেখতে গেলেই গাছের আড়ালে, ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে পড়ে। আলোর থেকে লুকিয়ে অন্ধকারে গেলেই রং যায় পাল্টে।
প্রাণী জগতের এই রঙ বাজের রঙ বাজির কথাতো পড়লেন, মেকানিজম জানা হলো কিন্তু তা সত্বেও এদের এক নম্বরে রাখতে পারলাম না, ওই স্থানটি নিজেদেরকেই দিতে হলো !

 

সৌভিক রায়

Leave a Reply

%d bloggers like this: