গুইসাপ

5
(4)

এক সরীসৃপের গল্প: সরীসৃপ বলতেই প্রথমেই আমাদের কেমন এক গা ছম ছমে ব্যাপার !নাম টা শুনলেই ভয় কিন্তু সরীসৃপ এক নিরীহ শ্রেণীর প্রাণী বই অন্য কিছু না; সেই সুকুমার রায়ের বাবুরাম সাপুড়ে তো আমাদের সবার মনে আছেই,কিন্তু আজ বলবো অন্য সাপের কথা যার হাত পা চোখ সব আছে,তবে একে চলতি বাংলায় আমরা গোসাপ বা গুইসাপ বলে থাকি ।

এতো বড় গুইসাপ!!! - YouTube
গুইসাপ

মনসামঙ্গল কাব্যনুযায়ী, চাঁদ সওদাগরের স্ত্রী সনকা দেবীচন্ডির পুজো করতো এবং দেবীচন্ডী স্বর্ণগোধিকার বেশে মর্তে আসেন । এই গোধিকাই হলো গুইসাপ! আবার মুসলিম ধর্মীয় সাহিত্যে ‘দব’,বলে এক জাতীয় বুকে ভর দিয়ে চলা প্রাণীর কথা জানা যায় ,যা থেকে ধারণা করা যাই এই গুইসাপের কথাই ওখানে বর্ণনা করা হয়েছে l এই ধর্মীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এদের উপস্থিতি ইঙ্গিত করে জীববৈচিত্র-এ এটি একটি প্রাচীন সদস্য !

গুই সাপ বা গোসাপ হিসাবে পরিচিত প্রাণীটির ইংরেজি নাম মনিটর লির্জাড। অর্থাৎ এরা সাপ নয়।এদের বরং বড়সড় টিকটিকির বা গিরগিটির মতো দেখতে কিন্তু সাপের মতো দ্বিখণ্ডিত জিভসম্পন্ন প্রাণী। এটি ভ্যারানিডি গোত্রের সরীসৃপ।

চামড়ার জন্য ব্যাপক নিধনের কারণে আজ ...
গুইসাপ       Scientific name: Varanus salvator

‘গুই/গো’ নামটি এসেছে ‘গোধিকা’ থেকে। বৃহত্তম গুই সাপ হল ইন্দোনিশিয়ার কোমোডো ড্রাগন। সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে কোমোডো ড্রাগনেরও বিষ আছে। পৃথিবীতে প্রায় 73 টি প্রজাতির গুইসাপ রয়েছে,বাংলায় মূলত তিন প্রজাতির গুইসাপ দেখা যায় এগুলো হলে জলগোধিকা, স্থলগোধিকা ও স্বর্ণগোধিকা।এরা সর্বোচ্চ 10 ফুটের মতো লম্বা হয়। গড় দৈর্ঘ্যসাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত হয় এবং এদের পরিণত এক একটির ওজন প্রায় 25 কেজি মতো হয়ে থাকে l গুই সাপ দেখতে গাঢ় বাদামি বা কলচে রঙের হয় এবং তাতে হলুদ রঙের ছোপ বিদ্যমান। পা ও নখ লম্বাটে এবং এদের লেজ চ্যাপ্টা ও শিরযুক্ত লম্বা হয় এবং লেজের শেষের প্রান্ত সরু হয়।

 

এরা দ্রুত গাছে উঠতে পারে। সাঁতরে খাল বিল পুকুর সহজেই পাড়ি দিতে পারে। এদের প্রধান খাদ্য কাঁকড়া, শামুক, ইঁদুর, হাঁস মুরগি ডিম, পচা গলা প্রাণীদেহ ও উচ্ছিষ্ট। এছাড়াও গুইসাপ মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও পাখি খায়। তারা ছোট কুমির, কুমিরের ডিম ও কচ্ছপও খায়। প্রধানত দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় দেখা যায় এদের, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে জঙ্গল ঝোপজাতীয় অঞ্চলে বা জলাভূমিতে এদের পাওয়া যায় ।

গুইসাপ নিয়ে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে একাধিক মিথ চলে,যেমন গুইসাপ নাকি তার লেজ দিয়ে বারি মারে এবং ওই আঘাতপ্রাপড়া স্থান নাকি পঁচতে শুরু করে,বিষয়টি নিছক নিরক্ষরতার দৃষ্টান্ত মাত্র,এই জাতীয় কিছুই হয় না ।

সংখ্যা কমতে কমতে আজ বিলুপ্তির পথে গুইসাপ! যার ফলে ক্ষতির মুখে মানবজাতি ও পরিবেশ l এই সরীসৃপ শ্রেণির প্রাণীটি, এক সময় বাংলার প্রায় সর্বত্রই বিশেষ করে বসত বাড়ির আশেপাশে, বনজঙ্গল, ঝোপঝাড়, কৃষি জমিতে দেখা যেত। তবে এখন আর তেমন একটা দেখা পাওয়া যায়না গুই সাপের।
সারা পৃথিবীতে 73 প্রজাতির গুই সাপের সন্ধান পাওয়া গেলেও বাংলায় যে তিন প্রজাতির গুইসাপ বসবাস করে, স্থানীয় নাম অনুযায়ী তারা সোনা গুই, কালো গুই ও রামগদি বা বড় গুই নামে পরিচিত।

কালো গুইসাপ দেশের সর্বত্র পাওয়া যায়। সোনা গুই পাহাড়ি এলাকায় থাকে আর রামগদির আবাস হলো মিষ্টি জল ও নোনা জলের সঙ্গম অঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল, নদীর মোহনা ও সুন্দরবন।

বাংলা গুই বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক ...
গুইসাপ

কিন্তু নির্বিকারে হত্যা করা হচ্ছে এদের বেশ কয়েক দশক ধরেই। সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরেও থামছে না গুইসাপের পোচিং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণেই উপকারী প্রাণীটি বিলুপ্তির আশংকায় আছে।এরা ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম উপাদান কারণ যে কোনো প্রাণীর সংখ্যা অত্যাধিক বৃদ্ধি পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর,এরা মূলত সাপ পোকা মাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীববৈচিত্র ও বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (IUCN)বর্তমানে কালো গুইসাপকে সংকটাপন্ন তালিকায় এবং সোনা গুইসাপ ও রামগদি গুই সাপকে বিপন্নের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গুই সাপের চামড়ার বাণিজ্যিক মূল্য অনেক বেশি,এর চামড়া দিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ, ম্যানি ব্যাগ, বেল্ট তৈরি করা হয়। তাই কিছু অসাধু লোক গুই সাপ হত্যা করে চামড়া আহোরন করে। কিছু লোক কবিরাজি ঔষধ তৈরির কাজে গুই সাপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে। উপজাতি ও সাঁওতাল সম্প্রদায় গুই সাপের মাংস খাওয়ার জন্যও ব্যাপকভাবে তারা প্রাণীটি হত্যা করে। প্রজনন ক্ষেত্র এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া গুইসাপ কমে যাওয়ার আরো একটি কারণ।

যা প্রায় সব প্রবন্ধের শেষে বলতে হয় আমাদের বাঁচার জন্য এদের রক্ষা করতে হবে,কিন্তু সত্যি কথা বলতে পরিবেশ বলে দিয়ে গেলো তারও সীমা আছে; ধারণ ক্ষমতা আছে তাই এখন অন্তত আমরা বিচার-বুদ্ধি দিয়ে কাজ করি । একটু সচেতন হই । আগে পরিবেশ জীব বৈচিত্র তারপর জীব ।

 

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ক্যান্সার সম্পর্কে প্রচলিত 'ধারণা', 'বিশ্বাস' ও তার সত্য-মিথ্যা

5 (4) ক্যান্সার নিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসার শেষ নেই, প্রশ্নের শেষ নেই। তৃতীয় বিশ্বের দেশে তাে এমন সব খারণা গড়ে উঠেছে ক্যান্সারকে নিয়ে যে, তা মাঝেমাঝে মানসিক বিকারে পরিশত হয়ে পড়ে। পিছিয়ে পড়া দেশগুলির কথা বাদই দিলাম। ইউকরােপের উন্নত দেশগুলি এবং আমেরিকার মত আতি অগ্রসর দেশেও মানুষের মধ্যে ক্যান্সার সম্পর্কে এমন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: