ডিএনএ (D.N.A), ফিংগার প্রিন্টিং

ডিএনএ (D.N.A)

ডি,এন,এ (D.N.A)  র সজ্জাগত (উপাদানগত) হেরফের প্রতিটি মানুষের মধ্যে আলাদা  রকম।
আর তাই, প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই কেবলমাত্র কোশীয়
উপাদানকে কাজে লাগানাে হয় ভিএমন এ, ফিংগার প্রিন্টিং পদ্ধতিতে।

ব্যক্তি চিহ্নিতকরনের কাজে লাগে বলে এই প্রযুক্তিকে অপরাধী ছাড়াও পিতৃত্ব নির্ণয়, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত ব্যক্তির শনাক্তকরণের কাজে লাগানো হয়।

DNA fingerprinting discovery was a happy accident, admits ...
অ্যালেক জাফ্রে : ডিএনএ
ফিংগার প্রিন্টিং এর জনক

সাম্প্রতিককালে অপরাধমূলক সংবাদ কাগজের অনেকখানি জায়গা জুড়ে চোখে
পড়ছে। নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধগুলাে জনমানসে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। বাসে
লােকাল ট্রেনে কান পাতলে সেটা বেশ শোনাও যায়। এর সাথে তৈরি হচ্ছে নানা কৌতূহল।

এই ধরনের অপরাধমূলক সংবাদে মূল অপরাধীকে ধরার কাজে ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তির
কথা হামেশাই শুনতে পাচ্ছি ডি,এন,এ, ফিংগার প্রিন্টিং। ভুল হতে পারে, একে টিপ ছাপ
দেওয়ার ব্যাপার মনে কালে। আসলে এই প্রযুক্তিতে আঙ্গুলের ছাপ নয়;করা হয় শরীরের
কোশের কিছু উপাদানের বিশ্লেষণ। তাই এর নামকরণ অবশ্যই প্রতিশব্দের বিভ্রান্তি (অর্থাৎ,
এটি একটি ‘মিসূনমার’)।

অপরাধের বিষয়বস্তু যেহেতু আইন আদালতের সঙ্গে যুক্ত, এই শব্দটাও মূলত আদালত বিজ্ঞান (“ফরেন্সিক সায়েন্স) সংক্রান্ত।

একথা আমরা সবাই জানিযে, আমাদের শরীর একটা বাড়ির মতো। আর বাড়ি তৈরির মূল উপাদান কোশ।  অর্থাৎ অসংখ্য কোশ দিয়ে আমাদের পুরো শরীরটা তৈরি। কিন্তু বাড়ি বা ইট নির্জীব বা জড় পদার্থ।

ডিএনএ (D.N.A) কি ?  ডিএনএ (D.N.A) দেখতে কেমন ?

অন্যদিকে শরীর বা কোশগুলাে সজীব, তাই কোষগুলােকে পরিচালনা করতে লাগে কিছু চালক, ঠিক যেমন বাস চালাতে ‘ড্রাইভার প্রয়ােজন। তা এ হেন ড্রাইভার রয়েছে কোশের মধ্যমণি হয়ে, তার পােষাকি নাম ‘নিউক্লিয়াস‘।

কোষের ডি এন এ তে চলচ্চিত্র সংরক্ষণ ...

এই নিউক্লিয়াসের মধ্যে পাকানাে দড়ির মতাে কিছু বস্তু থাকে যারা এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম আমাদের গুণাগুণ গুলােকে বয়ে নিয়ে যায়। আর তাই তাে আপনার ভালাে বা মন্দ গুণ।
আপনার ছেলেমেয়ের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।

এই পাকানাে দড়ির চেহারাটা অনেকটা আমাদের মা-ঠাকুরমাদের চুলের। লম্বা বিনুনির আদলের। এই দড়ির কিছুটা অংশ অত্যন্ত সক্রিয়, বাকিটা ততটা নয়।

এই দড়িটার উপাদান একটি জৈব- রাসায়নিক বস্তু। এরই নাম ডি-অক্সিরাইবােনিউক্লিয়িক অ্যাসিড,
সংক্ষেপে ডি.এন.এ.(D.N.A)

‘জিন’ কি?

ডি.এন.এ.(D.N.A)সক্রিয় অংশগুলি আমাদের দেহের সমস্ত কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এদেরকে পরিভাষায় বলে ‘জিন’।
কাজের ‘জিন’গুলাে আমাদের আকৃতি ও স্বভাবের বেশিরভাগ গুণাবলির জন্য দায়ী।

অন্যদিকে দড়ির বাকি অংশের উপাদান আপাতভাবে অপ্রয়ােজনীয় মনে হয়। পরীক্ষা করে দেখা
গেছে, কিছু কিছু জায়গার উপাদানের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে দড়ির দৈর্ঘ্যজুড়ে। এই জায়গায় জায়গায় উপাদানের পুনরাবৃত্তি হওয়াটাকে কাজে লাগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

PCR finger printing patterns from genomic DNA of Pseudomonas ...

ভালাে করে নজর করলে বােঝা যাবে এই পুনরাবৃত্তিগুলাের (পরিভাষায় ‘রিপিট’) সংখ্যা এক একজন মানুষের এক এক রকম।

আর এই ‘রিপিট’গুলাে দড়ির দৈর্ঘ্যের কোথায় হবে, তাও প্রত্যেকেরডি.এন.এ.(D.N.A)ফিংগার
ক্ষেত্রে আলাদা রকম। এই ‘রিপিট’গুলাে লম্বায় ২ থেকে ২৫০ ‘বেসপেয়ার’ যুক্ত একটি বিশেষ ডি.এন.এ. সজ্জার।

সংখ্যায় এরকম “রিপিট’ একটি ডি.এন.এ. দড়িতে প্রায় কয়েক হাজার পর্যন্ত থাকতে পারে। এরা সংখ্যায় বিভিন্ন ডি.এন.এ.- তে বিভিন্ন বলে বাস্তবে ডি.এন.এ.-দের মধ্যে তফাৎ তৈরি করতে পারে।

‘রিপিট’-এর সংখ্যা বিভিন্ন ডি.এন.এ.-তে বিভিন্ন বলে এদেরকে ‘ভ্যারিয়েবেল নাম্বার ট্যানডেম
(পাশাপাশি) রিপিট’ বা সংক্ষেপে ভি.এন.টি.আর. বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষ পদ্ধতির
সাহায্যে রিপিটগুলাের এই পার্থক্যকে কাজে লাগানাে হয় ব্যক্তি চিহ্নিতকরণের কাজে।

ডিএনএ (D.N.A), ফিংগার প্রিন্টিং পরীক্ষা কি ভাবে  করা হয়।

প্রথমে ‘রেস্ট্রিকশন এন্ডােনিউক্লিয়েজ’ এনজাইম বা উৎসেচকের সাহায্যে ডি.এন.এ. সজ্জার
বিশেষ জায়গা গুলােকে কাটা হয়। এরপর টুকরাে করা ডি.এন.এ. খণ্ডগুলােকে জেল
ইলেক্ট্রোফোরেসিস পদ্ধতির সাহায্যে আলাদা করা হয়।

রিপিটগুলাের উপাদান যে নিউক্লিওটাইডগুলাে, বিশেষভাবে তাদের ওপর উৎসেচকগুলাে কাজ করে ভেঙে দেয় বলে
রিপিট’-এর দৈর্ঘ্য ও সংখ্যার তারতম্য তৈরি করে। খণ্ডিত ডি.এন.এ.-র বড়াে টুকরােগুলাে
ভারী বলে ইলেক্ট্রোফোরেসিস’ চলাকালীন জেল’-এ মধ্যে ছােটো টুকরাের থেকে কম
দূরত্ব যেতে পারে।

ফলে ছােটোবড়াে-মাঝারি মাপের টুকরােগুলাে পরস্পরের পৃথক হয়ে পর পর দাগ কাটা ধাপ বা সিঁড়ির মতাে মনে হয়। তবে এদের এই বিশেষ সজ্জা নজর করতে গেলে আরও একটি প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হয়। তার নাম হাইব্রিডাইজেশন’।

DNA Fingerprinting- Definition, Steps, Methods and Applications

‘সাউদার্ন ব্লটিং’ পদ্ধতিতে আলাদা হয়ে যাওয়া ডি.এন.এ.-র টুকরােগুলােকে জেল থেকে নাইলন মেমব্রেনে তুলে নিয়ে আসা হয়। এরপর ‘জিন প্রাে দিয়ে ডি.এন.এ.ডি.এন.এ. হাইব্রিডাইস’ (সংযুক্ত) করিয়ে নাইলন মেমব্রেনে তাদের চিহ্নিত করা হয় ‘অটোরেডিওগ্রাফি’
পদ্ধতির মাধ্যমে।

ডি.এন.এ. টুকরােগুলাের সজ্জা ‘এক্স রে’ ফিল্মে পর্যবেক্ষণ করা হয় অটোরেডিওগ্রাফির মাধ্যমে।

‘জিন প্রোব’ হল, জানা আছে এমন কতকগুলাে নিউক্লিওটাইড দিয়ে তৈরি এক খণ্ড ডি.এন.এ. যার সঙ্গে সূচক (মার্কার) হিসাবে কোনাে রেডিও আইসােটোপ জোড়া লাগানাে থাকে। এক কথায় আমাদের শরীরের কোশের মধ্যের কিছু রাসায়নিক উপাদানের (ডি.এন.এ.র) পার্থক্য ব্যক্তি চিহ্নিতকরণের মাপকাঠি মনে করা যেতে পারে।

এখানে অপরাধীকে ধরতে, তার যে কোনাে কোশের অস্তিত্বই যথেষ্ট। রক্তে বা প্লাজমায় অবস্থিত রক্তকণিকা, হাড়ের মজ্জার কোশ, বীর্যের শুক্রাণু কোশ এই প্রযুক্তিরক্ষেত্রে প্রারম্ভিক উপাদান বা স্যাম্পেল হিসাবে গণ্য হয়।

আঙুলের ছাপ যেমন প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা রকম। আর তাই প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়াই কেবলমাত্র কোশীয় উপাদানকে কাজে লাগানাে হয় এই পদ্ধতিতে। প্রযুক্তিকে
গােয়েন্দাগিরিতে কাজে লাগানাে আর কি!

লেখক

সিদ্ধার্থ জোয়ারদার ও অনিন্দিতা জোয়ারদার

লেখাটি গবরডাঙ্গা গবেষণা পরিষৎ থেকে  প্রকাশিত

আধুনিক জীববিদ্যা ও জনস্বাস্থ্যের সহজপাঠ       থেকে সংগৃহিত।

WhatsApp Image 2020-06-20 at 21.41.39

Leave a Reply

%d bloggers like this: