আইনস্টাইনের ছেলেবেলা

আইনস্টাইনের ছেলেবেলা নিউইয়র্কের হাডসন নদীর তীরে ব্রিভারসাইড চার্চ। ১৯৩০ সালে
চার্চে এলেন এক প্রৌঢ় দম্পতি।একসময় ভদ্রমহিলা তার স্বামীকে এক মূর্তির কাছে নিয়ে এসে
বললেন, ‘আলবারতল, ওই দেখ তােমার মূর্তি। ভদ্রলােক মূর্তিটি দেখলেন।তার অবিন্যস্ত চুল আরাে
অবিন্যস্ত হলাে। চোখের দৃষ্টিহলাে আরাে স্বপ্নালু। তাদের চোখের সামনে যে ছ’শাে মূর্তি তাদের মধ্যে
পাঁচশ নিরানব্বইটি মৃত মনীষীর।

অবশিষ্ট মুর্তিটি জীবন্ত এক মনীষীর যিনি সশরীরে তখন তার নিজের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে।এই
ভদ্রলােকটি বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সম্পূর্ণ এর জীবনী - লেখাপড়া বিডি

 

অ্যালবার্টের জন্ম ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানীর উলম শহরে এক ইহুদি পরিবারে। বাবা
হেরম্যান আইনস্টাইন একজন ব্যবসায়ী। গণিতশাস্ত্রে তার প্রবল আগ্রহ ছিল।

মা পলিন সঙ্গীত খুব ভালােবাসতেন। ভালাে গাইতেও পারতেন। পিয়ানােও খুব ভালাে বাজাতেন। এসবের প্রভাব পড়েছিল শিশু অ্যালবার্টের উপর।

হেরম্যানের ভাই জ্যাকব ছিলেন একজন ভালাে ইঞ্জিনীয়ার। অ্যালবার্টের কাকা জ্যাকব
অ্যালবার্টদের সাথেই থাকতেন। ১৯৮০ সালে অ্যালবার্টরা চলে
আসেন মিউনিখে।

অ্যালবার্টের বাবা ও কাকা নিউনিখে ইলেকট্রিকের যন্ত্রপাতির একটি ছােট্ট কারখানা খুললেন।
মিউনিখের খুব কাছে সেন্ডুলিং- এ নিজেদের বসবাসের বাড়ি তৈরী কবুলেন।

১৮৮১ সালে অ্যালবার্টের বােন মারিয়ার জন্ম হল। অ্যাাবার্ট বােনকে মাজা বলে ডাকতেন। মিউনিখে গাছপালায় ঘেরা অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা ছিল।এসব জায়গায় হেরম্যানার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে
আইনস্টাইনের ছেলেবেলা আসতেন পিকনিক করতে।

এসব পিকনিকে হেসিনগেন থেকে সপরিবারে এসে যােগ দিতেন হেরম্যানের খুড়তুতাে ভাই রুডলফ
আইনস্টাইন। সঙ্গে থাকতেন মেয়ে এলসা। এলসা ছিলেন
আইনস্টাইনের মাসতুতাে বােন বা পিতার দিক থেকে খুড়তুতাে বােন।

অ্যালবার্ট ও এলসা একসাথে খেলাধূলা করে বহু দিন কাটিয়েছেন।

ছােটবেলায় অ্যালবার্ট ছিলেন বেশ গম্ভীর এবং কিছুটা চাপা প্রকৃতির। ছিলেন শান্ত ও নম্র।
চুপচাপ আপনমনে থাকতেই পছন্দ করতেন। বেশি সঙ্গীসাথী পছন্দ করতেন না।

অ্যালবার্ট কথাও বলতে শুরু করেছিলেন অনেক দেরিতে। সেইজন্য নিজের কথা
ঠিকমতাে সবসময় বােঝাতেও পারতেন না।

সৈন্যদের মার্চ করে যাওয়া দেখে তিনি ভীষণ ভয় পেতেন। যুদ্ধের বাজনা এবংসেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ একদম সহ্য করতে পারতেন না। অথচ এই বাজনা প্রায় সব ছেলেরাই ভালােবাসে।

অ্যালবার্ট ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তার এই অনুভূতির্তাকে ভবিষ্যৎ জীবনে এক শান্তিবাদী হিসাবে গড়ে তুলেছিল। একসময় ইহুদিদের উপর হিটলার এবং তার নাৎসী বাহিনীরঅকথ্য অত্যাচারের
বিরুদ্ধে আলবার্টের শান্তিবাদী মন প্রতিবাদীর ভূমিকা নিয়েছিল।

ফলে তাকে কম সমস্যায় পড়তে হয়নি। জুটেছে অনেক লাঞ্ছনা। অ্যালবার্টের বাবা ও কাকা ভালাে গাইতে পারতেন। আবৃত্তিও করতেন খুব সুন্দর।

আগেই বলেছি অ্যালবার্টের মা পলিন ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞা। খুব ভালাে পিয়ানাে বাজাতেন তিনি। অ্যালবার্টদের বাড়িতে মাঝে মাঝে সঙ্গীতের সান্ধ্য আসর বসত।

কী ছিলো আইনস্টাইনের 'গড লেটারে'? | অন্য ছবি

সেখানে পলিন পিয়ানােতে বিটোভেন,মােজার্ট ইত্যাদি বিখ্যাত জার্মান সঙ্গীতকারদের রচনা বাজাতেন।হেরম্যান কখনাে গ্যেটে, শীলার ইত্যাদি বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিকদের লেখা পাঠ করে
শােনাতেন।

জেকব কখনাে আবৃত্তি করতেন। আবার সবাই মিলে কখনাে জার্মানীর প্রাচীন পল্লীগীতি গাইতেন। ছােটবেলায় অ্যালবার্টও সান্ধ্য আসরে যােগ দিতেন।

পিতামাতার সঙ্গীতানুরাগ ছােট্ট অ্যালবার্টের মনে গভীর প্রভাব  বিস্তার করে। আস্তে আস্তে তিনি।
সনাতন সঙ্গীত ও সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে ওঠেন।

গ্যেটে ও শীলারের লেখা তিনি পড়তে পছন্দ করতেন।ফাইস্টের কাব্যছিল তার খুব প্রিয়। তিনি প্রায়ই ফাউস্ট থেকে আবৃত্তিকরতেন।আইনস্টাইনের অটোগ্রাফ – মুক্তমনা বাংলা ব্লগ

ছয় বছর বয়স থেকে তিনি শিক্ষকের কাছে বেহালা শিখতে শুরু করেন। চোদ্দ বছর বয়স থেকে পারিবারিক সান্ধ্য আসরে যােগ দেন।

ভবিষৎ জীবনে তিনি বহু জায়গায় বেহালা বাজিয়েছেন। তিনি উঁচু স্তরের বেহালাবাদক ছিলেন না ঠিকই
কিন্তু তার আন্তরিকতা ছিল যথেষ্ট।

অ্যালবার্ট পিয়ানাে বাজাতেও খুব ভালােবাসতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, বাইরে কোথাও গেলে,
আমার খুব মনে হতাে কখন বাড়ি গিয়ে, পিয়ানাের ঘাটগুলির উপর
দিয়ে আঙুল চালাবাে।

অ্যালবার্টের এই সঙ্গীত ও সুরপ্রীতির সঙ্গে মিশে যায় তার বিজ্ঞান-ভাবনা।
ভৌত জগৎ যে গাণিতিক নিয়ম। ও ছন্দে বাধা তা উপলব্ধি করতে প্রয়াসী হতে সাহায্য করে তার এই
সঙ্গীত প্রীতি।

অ্যালবার্টের বয়স যখন প্রায় পাঁচ বছর তখন তিনি একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমনিতেই
তাে চুপচাপ থাকতেন, আরাে চুপচাপ হয়ে গেলেন। তা দেখে কোন বাবা মা-র ভালাে লাগে!

বাবা হেরম্যান তার জন্য একটি খেলনা এনে দিলেন। নৌ কম্পাস। খেলনা পেলে ছােটদের ভালােই
লাগে। অ্যালবার্টেরও লেগেছিল।

কম্পাসের কাটার সব সময় একটা নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে থাকা এবং কাটাটাকে একটু ঘুরিয়ে ছেড়ে দিলে
আবার আগের নির্দিষ্ট দিকে চলে আসার বিষয়টি ছােট্ট অ্যালবার্টকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।

তার মনে প্রবল বিস্ময় ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। তিনি সারাক্ষণ কম্পাসটি নিয়ে
নাড়াচাড়া করতেন।

এমনকি বিছানায় শুতে যাবার সময় কম্পাসটি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এই কম্পাস তার মনে এক গভীর ও
স্থায়ী অনুভূতি জাগিয়ে ছিল। মানব-চেতনা-নিরপেক্ষ জগতের সত্তা সম্পর্কে তার বিশ্বাস দৃঢ়
হয়েছিল।

গােবিন্দ দাস

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক পত্রিকার বর্ষ ২,দ্বিতীয় সংখ্যা মার্চ-এপ্রিল /২০০৫ থেকে সংগৃহীত

WhatsApp Image 2020-06-27 at 9.33.23 PM

Leave a Reply

%d bloggers like this: