প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান

poribes news
2
(1)

প্রাচীন যুগ (৩০০০ খৃষ্টপূর্ব-পূর্বাব্দ – ১২০০ খৃষ্টাব্দ)

ইতিহাস পুস্তকে সাধারণভাবে আলােচিত বিষয়গুলির পাশাপাশি বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস বিষয়টিও আলােচিত হওয়া প্রয়ােজন। কিন্তু এ বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। বর্তমান নিবন্ধে ‘প্রাচীন যুগে ভারতের
ইতিহাসে বিজ্ঞান বিষয়ে এক খণ্ডচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রাচীন ভারতের নগর সভ্যতা

খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের অনুরূপ সময়ে সিন্ধু নদের উপত্যকায় এক সভ্যতার উন্মেষ হয়। মহেঞ্জোদড়াে
ও হরপ্পার এই সভ্যতার নগর পরিকল্পনা, মৃৎপাত্র, বাটখারা,মাপনী, অলঙ্কার, শীলমােহর প্রভৃতির বিচিত্র নক্সা,পরিকল্পনা ওই সভ্যতার মানুষের জ্যামিতি, পরিমিতি তথা বিজ্ঞানের বিচিত্র
জ্ঞানের পরিচায়ক।

 

সিন্ধু উপত্যকার ভারতীয়রা রসায়নবিদ্যা, পূর্তবিদ্যা, কারিগরী বিদ্যাতেও বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
বৈদিকযুগের মানুষ গণিত চর্চা করতেন। সে যুগে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা ছিল।

প্রাচীন ভারতে গনিত

সমসাময়িক কালের চীন ও মিশর দেশের জ্যামিতির তুলনায় ভারতীয় জ্যামিতি উন্নত ছিল।
ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন ‘It should never be forgotten that the world owes
its first lessons in geometry, not to Greece, but to India.’

প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান চর্চা Archives ...

পাটিগণিতে যােগ, বিয়ােগ, গুণ, ভাগ, বর্গ নির্ণয়, বর্গমূল নির্ণয় প্রক্রিয়াগুলি আলােচিত হয়েছে।
অমূলদ ও সামান্য ভগ্নাংশের ব্যবহারও ভারতীয়রা জানতেন।
তঁাদের বীজগাণিতিক জ্ঞানের পরিচয় শুল্ক সূত্রগুলিতে  পরিলক্ষিত হয়।

খৃষ্টীয় প্রথম থেকে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে কোনও এক সময় ভারতীয়রা দশমিক স্থানীয় মান অঙ্কপাতন পদ্ধতি এবং শূন্য’ এই সংখ্যাটি আবিষ্কার করেন। সমগ্র বিশ্বে গণিত তথা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই দুই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম।

একে গণিতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার বলে গণ্য করা হয়। হপার হিন্দু অঙ্ক পাতন পদ্ধতিকে ‘The new and revolutionary method’ বলে বর্ণনা করেছেন।

পরবর্তীকালে ভারত গণিতচর্চার কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। পরবর্তী ৭০০ বছরে জন্মগ্রহণ করেন আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, শ্রীধর আচার্য, মহাবীর, ভাস্করাচার্যের মতাে গণিতবিদ।

প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিদ্য

গণিতশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় এঁদের অবদান সমগ্র বিশ্ব সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে।
জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারত একটি উল্লেখযােগ্য স্থান দখল করেছিল।

পৃথিবী যে গােলকের আকারবিশিষ্ট একথা ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এ উল্লেখ আছে।
প্রাচীন ভারতীয়রা রাশিচক্রের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

আকাশে সূর্যের আপাত গতিপথ (Ecliptic) কে বৈদিক সাহিত্যে ‘রবিমার্গ’ বা ক্রান্তিবৃত্ত’ বলা হতাে।

চন্দ্রের যে নিজস্ব আলাে নেই, সূর্যের আলােতেই যে সে আলােকিত একথা তারা জানতেন। তঁারা সূর্যের
বিষুব ও অয়নান্ত পরিক্রমা লক্ষ্য করতেন।

পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ের পদ্ধতি তাদের জানা ছিল।

সূর্যসিদ্ধান্ত’-এ পৃথিবীর ব্যাসের মান দেওয়া আছে। ১৬০০ যােজন। (১ যােজন = ৫ মাইল ধরা হত)।

তাদেরপাঁচটি গ্রহের কথা জানা ছিল। প্রদ্যুম্ন মঙ্গল ও শনি গ্রহ এবং বিজয় নন্দী বুধ গ্রহ সম্পর্কে বিশেষভাবে গবেষণা করেন।

দিন বা রাতের প্রহরে প্রহরে আকাশে নক্ষত্রদের যে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ধীরে ধীরে সরে
যেতে দেখা যায়, তার কারণ আসলে পৃথিবীর পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন। আর্যভট্ট এ সত্য
উপলব্ধি করেছিলেন।

তিনি একথা তার ‘আর্যভটীয়’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তিনি হিন্দু জ্যোতিষে ‘ঔদয়িক’ ও ‘আর্ধরাত্রিক’ নামে
দুটি গণনা পদ্ধতির প্রবর্তন করেন।

ব্রহ্মগুপ্ত ও ভাস্করার্যের রচনায় লম্বনের পরিমাণ নির্ণয় পদ্ধতি আলােচিত হয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘কাল সমীকরণ (Equation of time) নামে যে ধারণাটি ব্যবহার করা হয়,বেদোত্তর
যুগের ভারতবাসীরা সে সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন।

প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাবিদ্যা

প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাবিদ্যা চর্চার বিষয়টিকে অবহেলা করা যায় না।

খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আত্রেয়-এর প্রচেষ্টায় তার ছাত্র জীবক, অগ্নিবেশ গবেষণা করে ভেষজ চিকিৎসা এবং শল্য চিকিৎসার প্রসার ঘটান।

শল্য চিকিৎসক শুশ্রুত | বাংলায় বিজ্ঞান

পরবর্তীকালে চরক ও সুশ্রুত চিকিৎসাশাস্ত্রে উল্লেখযােগ্য গবেষণা করেন। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে চন্দ্রগুপ্তের শাসনকালে পশুচিকিৎসার উন্নতি হয়েছিল।

খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে অশােকের সময়ে চিকিৎসাবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্য’ ও স্থাপত্যবিদ্যা প্রসার
লাভ করে।

প্রাচীন ভারতে রসায়নচর্চা

প্রাচীন ভারতে রসায়নচর্চা বিষয়টিও উল্লেখের দাবী রাখে।পারদ রসায়ন ও তার বহুল ব্যাবহার প্রমান করে
রসায়ন চর্চার ব্যাপকতা।

প্রাচীন ভারতে ধাতুবিদ্যা

সেকালে রসায়নবিদদের মধ্যে ৭০০ খৃষ্টাব্দের নাগার্জুনের নাম উল্লেখযােগ্য।
লৌহ সম্পর্কিত বিজ্ঞান সেকালের ভারত জানতাে। দিনী, ভূবনেশ্বর ও কোনারকের লৌহ স্তম্ভগুলি সেকথা প্রমাণ করে।

দিল্লির লৌহস্তম্ভ - রওনক এর বাংলা ...

লৌহ ছাড়া দস্তা, তামা সম্বন্ধে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের জ্ঞান ছিল। তক্ষশীলায় খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর
পিতলের পাত্র পাওয়া গেছে। এই পিতল তামা ও দস্তার মিশ্রণের বিগলনেই তৈরি করা হয়েছিল।

নবম শতাব্দীতে মহম্মদ-ইবন-মুসা-আল খােওয়ারিজমি আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে
ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতীয় জ্যোতিষ ও গণিতের সঙ্গে তিনি পরিচিত হন।

তিনি ভারতীয় জ্যোতিষ, অঙ্কপাতন পদ্ধতি ও বীজগণিত সম্বন্ধে কিতাবুল হিন্দ এবং ‘আলজেবর-ওয়ালা।
মুকাবলা’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

দশম-একাদশ শতাব্দীতে আবু রেহান-মহম্মদ- আল ইরন-আজমেদ আলবেরুনি ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ,
জ্যোতির্বিদও চিকিৎসা বিশারদ।

তিনি গজনি ও ভারতবর্ষের নানা স্থান জুড়ে তার বৈজ্ঞানিক কর্ম প্রতিভার পরিচয় রাখেন।

প্রাচীন যুগে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অগ্রগতি ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল।

ভারতের ইতিহাসে বিজ্ঞান চর্চার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হওয়া প্রয়ােজন।

—গােবিন্দ দাস

লেখাটি বিজ্ঞান আন্বেষক পত্রিকার বর্ষ-১ ষষ্ঠ সংখ্যা নভেম্বর- ডিসেম্বর/২০০৪ থেকে সংগৃহীত

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 2 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

আধুনিক টিকার জনক—এডওয়ার্ড জেনার

2 (1) আধুনিক টিকার জনক—এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner ) অতীতে সারা বিশ্বে যে সব রােগ মহামারি সৃষ্টি করেছে, তাদের মধ্যে ভাইরাস ঘটিত রােগ অন্যতম (যেমন গুটি বসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রভৃতি)। এছাড়া কিছু জীবাণু ও পরজীবী ঘটিত রােগ মহামারীর জন্য দায়ী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কলেরা, প্লেগ ও কালাজ্বরের কথা। মহামারী দেখা দিলে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: