জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ একটি সাক্ষাৎকার

4.1
(9)

   ভারতবার্যের অন্যতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। একদিকে  সাধারণ মানুষকে আজীবন শিক্ষকতায় মগ্ন, অন্যদিকে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রামী।

ছেলেবেলা

পত্রিকাঃ আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন ..।
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  বাগানান থেকে ছয় কিমি দূরে মুণ্ডকাল্যান গ্রামে আমার জন্ম। বাবা ছিলো ঐ গ্রামেরই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আমিও ঐ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। ১৫ বছর গ্রামের মাঠে প্রান্ত বলে খেলাধুলা করেছি। সাঁতার কেটছি। এই দাপাদাপিই আমাকে-  এখনও শারীরিক ভাবে সামর্থ রেখেছে।

Remembering Amalendu Bandopadhyay | SabrangIndia
জ্যোতির্বিজ্ঞানী অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পড়াশুনা ও সংগ্রাম

পত্রিকাঃ আপনার পড়াশুনা কিভাবে হলাে ?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আর্থিক অনটনের কারণে উচ্চ শিক্ষার জন্য কাশিতে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। টিউশনি করে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি।।
বাড়ী থেকে ছয় মাইল দূরে পায়ে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতাম।
পরে  সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল ছোগাড় করে যাতায়াত  করতাম।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ

পত্রিকা ঃ জ্যোতিবিজ্ঞানে আগ্রহ কেমনভাবে হলাে?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  আমার বিষয় ছিল গণিত। স্পেশাল পেপার নিয়েছিলাম এ্যাষ্ট্রনমি। তখন এ্যাস্ট্রনমি পড়াতেন প্রফেসর বিশ্বরূপ বাসুদেব নালিকর। কেমব্রিজের ‘নিউটন’ প্রাইজ বিজেতা। অসাধারণ পণ্ডিত।
অসাধারণ সুন্দর করে পড়াতেন। আগের দিন একটি বিষয় ঠিক করে দিতেন ‘ও পরের দিন ঐ বিষয়ের তর উপর পাঁচ সাত মিনিট আমাদের বক্তৃতা দিতে বলতেন। উনি বলতেন, বক্তব্য রাখার সময় দর্শকদের
সামনে বিষয়ের উপর ছবি প্রদর্শন করবে।দেখবে  প্রাণবন্ত হবে বক্তৃতা।
বক্তৃতা রাখার সময় মনে রাখবে দর্শকরা  বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানে না।

সেইমতাে বক্তব্য সহজ ভাবে তাদের নিকট পরিবেশন করবে। তোমাকে ভাবতে হবে তারা কি করে বুঝবে। কি করে তাদের  হৃদয়ঙ্গম হবে।ওনার কাছেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রেরণা পেয়েছিলাম।

কর্মজীবন ও মেঘনাথ সাহা

পত্রিকাঃ পাস করার পর কি করলেন?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  বেনারসের D.A.V. College-এ পাঁচ বছর গণিতের অধ্যাপক হিসাবে ছিলাম।
১৯৫৬ সালে মেথনাদ সাহা প্রতিষ্ঠা করলেন নটিক্যালি অ্যালমানক ইউনিট (NAU) | তখন Calender Reform এর কাজের সুত্রে মেথনাথ সাহার সান্নিধ্যে এসেছিলাম। মেথনাথ সাহার আহ্বানে NAU তে যোগ
দিলাম । এখানে জ্যোতিবিজ্ঞানে Coputeresation এ বিভিন্ন কাজ শিখেছি। মাঝে মাঝে ওনার সঙ্গে দেখা হত।

পত্রিকাঃ মেঘনাদ সাহা সম্পর্কে কিছু বলুন?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  মেঘনাদ সাহার ধ্যানজ্ঞান ছিল ভারতের উন্নতি। বিরাট কর্মবীর। সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিইয়ার ফিজিক্স, কালটিভেশন অব সায়েন্স, সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইনস্টিটিউট মেঘনাদ সাহার কীর্তি। তিনি আমেরিকার Tenessey ভ্যালির বাঁধ দেখেDVC বাধের কথা ভাবেন এবং গঠন করেন।

পত্রিকাঃ এরপর কর্মজীবন কিভাবে এগােল?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  এরপর দমদম এয়া্পোর্টের আবহাওয়া দপ্তরে সাত বছর কাজ
করেছি। ১৯৬৮ সালের পরে Nautical Unit এ্রর  “Officer-in-charge” রুপে কাজ করেছি। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরে ছিয়া আমাদের ১২ জনের এই ছোট্ট অফিসটি। পরে হিরেন মুখার্জীর আগ্রহে তদানিন্তন
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজা রামান্নার সুপারিশে ১৯৮০ সালে
National Positional Astronomy গঠন হল ও আমি তার ডিরেক্টর
হলাম।

১৯৮৮ সালে অবসর নিয়ে Birla  Planetorium এর সিনিয়র লেকচারার হিসাবে গবেষণা ও শিক্ষকতার কাজ করছি।

         গ্যালিলিও

পত্রিকাঃ ২০০৯ সালকে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বর্ষ হিসাবেশ ঘােষণা করা হয়েছে। এই সম্পর্কে বলুন।

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:  হ্যাঁ। এই ঘােষণা করেছেন . UNO,UNESCO.IAU (International Astronomical Union} কারন প্রায় চারশ বছর আগে  গ্যালিলিও তাঁর  নিজের আবিস্কৃত প্রথম টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদ দেখেছিলেন। এতদিন এরিসটটল বলেছিলেন চাঁদ সম্পূর্ণ মসৃণ গোলক।
গ্যালিলিও বললেন, ‘ঠিক না, চাঁদ এবড়ো খেবড়ো গহ্বর, পাহাড সমৃদ্ধ”।

আগে বলা হত এক পাউন্ড ও দশ পাউন্ডের সীসের বল, উপর থেকে ফেললে দশ পাউন্ডের বল আগে পড়বে। গ্যালিলিও বললেন, “না,এটি ঠিক নয়”। পরীক্ষার জন্য পিসার-এর হেলানাে টাওয়ারের
উপর থেকে এক পাউন্ড ও দশ পাউন্ডের সীসের বল ফেললেন।

অধ্যাপক ও ছাত্রেরা দেখলেন একই সঙ্গে দুটি পড়ল। তিনি বললেন, ‘Laws of falling bodies’ এটা নির্ভর করে উচ্চতার উপরে। ভরের উপরে নয়।

গ্যালিলিও এক অনন্য সাধারণ প্রতিভা। তিনি কোপার্নিকাসের তত্ত্ব সমর্থন করেন। দেখলেন শুক্র গ্রহের কলা আছে। কখনও একফালি, কখনও আধ্যালি। চাঁদেরও কলা দেখা যায়। সূর্যকে
ঘিরে পৃথিবী ঘুরছে। আবার পৃথিবী ঘিরে চাঁদ ঘুরছে। সূর্যের আলো  চাঁদে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে আসছে। ফলে চাঁদকে বিভিন্ন আকারে দেখছি।

গ্যালিলিও এর জীবনী ~ জীবনের প্রতিচ্ছবি

এই তত্ত্ব বাইবেলের বিরুদ্ধে গেল। ব্যাস। ৬৯ বছরের বৃদ্ধের বিচার হল। বিচারে তার “মৃত্যুদন্ড” হল। তার হাতে পেরেক মেরে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে তাকে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হল।

মৃত্যুদন্ডের আগের দিন পােপের দপ্তরের এক শুভাকাঙ্খী যাজক বললেন, গ্যালিলিও। তুমি বাঁচলে আরও গবেষণা করতে পারবে। তোমার বাঁচার দরকার। তাই তুমি পোপকে বল “আমি এতদিন যা বলেছি তা মিথ্যে। আমি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করছি। আমাকে ক্ষমা করুন”।

গ্যালিলিও সহমত হলেনও তাই বললেন… মৃত্যুদন্ড না দিয়ে তাকে ফ্লোরেন্সের একটি বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হল। আরও নয় বছর তিনি বেঁচেছিলেন। এই কয় বছরে তিনি Statics, dynamics,hydrostaties এর এমন সব গবেষণা করেছিলেন, যাতে আজও মানুষ তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ

       পূর্ণ সূর্যগ্রহণ

পত্রিকাঃ পুর্ণ সূর্যগ্রহণ সূর্যের অজানা তথ্য জানাতে কেমনভাবে সাহায্য করে ?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আসলে সূর্যের চারিদিকে তিনটি আবহমন্ডল আছে। প্রথমে
ফন্টোস্ফিয়ার -আলোক মন্ডল। তার উপরে তার উপরে ক্রমােস্ফিয়ার -বর্ণমন্ডল তারও উপরে করোনাস্ফিয়ার- ছটা মন্ডল।দিনের বেলায় আলােকমন্ডলের তীব্র আলাে বাকি দুটি মন্ডলের ক্ষীণ আলােককে দেখতে দেয় না। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ পুরােপুরি আলােকমন্ডলকে
ঢেকে ফেলে। তখনই ছটা ও বর্ণমণ্ডলকে দেখতে পাই। এর উপরে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করা যায়।

আরেকটা কথা আকাশে অগণিত তারা লক্ষ লক্ষ আলােকবর্ষ দূরে। তাদের সম্পর্কে জানতে পারি না।
সূর্য ও একটি তারা। সূর্য সম্পর্কে যদি জানা যায়, তবে অগণিত তারা সম্পর্কেও জানা যাবে। ১৮৬৮ সালের আগষ্ট মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টরের তামাক ক্ষেত্রে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় একজন ফরাসী
জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেঁসে স্পেকট্রোস্কোপ দিয়ে করােনার Spectrum- দেখলেন একটি অজানা দাগ। আবিষ্কার হল হিলিয়াম। ১৯১২ সালে আইনস্টাইন বললেন, ‘দূরের তারার আলাে যখন আর একটি তারার
পাশ দিয়ে আসে তখন ঐ তারার অসাধারণ অভিকর্ষ বলের ফলে অন্য তারার আলােক টানবে। পৃথিবীতে দেখবাে ঐ আলােটি কিঞ্চিত সরে গেছে”। কিন্তু এটি ছিল লিখিত তত্ত্ব। ১৯২৯ সালে আর্থার এডিংটন
ম্যাডাস্করে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আইনস্টাইনের
তত্ত্বকে সঠিক বলে প্রমাণ করেন।

পত্রিকাঃ বছরে ন্যূনতম সূর্যগ্রহণের সংখ্যা, তা যে ধরনেরই হােক না কেন তার কি কোন হিসাব আছে?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: ন্যূনতম দুই এবং সবচেয়ে বেশি সাত।

পত্রিকাঃ পূর্ণ সূর্যগ্রহণে গভীর রাতের অন্ধকার নেমে আসে না কেন?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আলােকমন্ডল ঢেকে গেলেও, ছটা মন্ডলের ক্ষীণ আলাের প্রভাবে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে না।

পত্রিকা: চাঁদ ছাড়া অন্য কোন গ্রহ বা মহাজাগতির বস্তু কি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটাতে পারে?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: না। ১৪ লক্ষ কিমি ব্যাস সূর্যের। চঁাদের ব্যাস সাড়ে তিন হাজার কিমি। সূর্যের দুই প্রান্তের আলাে ত্রিভুজাকারে পৃথিবীর উপর পড়লে angular diameter ½০(হাফ ডিগ্রী) হয়। এবং চাদের প্রতিফলিত আলােও পৃথিবীর উপর ½০(হাফ ডিগ্রী) angular diameter তৈরী করে। ফলে সূর্য ও
চাঁদ পৃথিবীর উপর একটি মিলিত ছায়া তৈরি করে।চাঁদ যদি ছােট বা বড় হত কিংবা পৃথিবীর থেকে আরেকটু দূরে  বা কাছে হত, তাহলেকোনদিনই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যেত না।

https://i1.wp.com/www.drishtiias.com/images/uploads/928image4.jpg?w=640&ssl=1

শুক্র এবং বুধ কখনাে কখনো পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে এসে পড়ে। কিন্তু তাদের angular diameter
সূর্যের angular diameter এর সাথে সমান না হওয়ায়, এদের দ্বারা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সম্ভব হয় না।

           বিগ ব্যাং

পত্রিকা: বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টিতে ‘বিগ ব্যাং’ সম্পর্কে কিছু বলুন। এটাইকি শেষ কথা ?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘বিশাল বিস্ফোরণ তত্ত্ব (Big Bang Theory) অনুযায়ী প্রায়
একহাজার থেকে দুহাজার কোটি বছর আগে সমগ্র বিশ্বের যাবতীয় বস্তু এবং শক্তি একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এই সময় একটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে যার ফলে পরিদৃশ্যমান বস্তুপুঞ্জের সৃষ্টি হয় । চারিদিকে ব্যতির ফলে গ্যালাক্সি তৈরি। গ্যালাক্সি থেকে তারা দের উৎপত্তি।
তারাদের থেকে গ্রহ ও মুহাণুর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এটা একটা ধারণা।
(Concept)। মােটামুটিভাবে এই তত্ত্বই এখন পর্যন্ত গৃহীত।

বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা

পত্রিকা: বিজ্ঞান ধ্রুব সত্য নয় –বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। অন্যরা বলেন, বিজ্ঞানের কথাতাে পাল্টায়।
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: NASA-র বিজ্ঞানীর বিখ্যাত উক্তি—“বিজ্ঞান কখনও বলে না এই তার শেষ কথা”।

কোপার্নিকাসের তত্ত্বের আগে আড়াই হাজার বছর পর্যন্ত সকলে জানত কেন্দ্রে পৃথিবী। পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ও অন্যান্য গ্রহরা ঘুরছে। কোপার্নিকাস সতেরাে বছর আকাশ পর্যবেক্ষণ করে বললেন, ‘না। সূর্য কেন্দ্রে। সূর্যের চারধারে বৃত্তাকারে গ্রহগুলি ঘুরছে। কিন্তু কোপারনিকাসের এই ‘বৃত্তাকার পথে পরিভ্রমণ তত্ত্বে ভুল ছিল। জোহান কেপলার আট বছর মঙ্গল গ্রহ পর্যবেক্ষণ করে বললেন, বৃত্তাকারে নয় উপবৃত্তাকার( Elliptical) পথে গ্রহগুলি ঘুরছে। এইভাবে বিজ্ঞান এগিয়ে চলে।

পত্রিকা:সেইক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবনা তাদের নিজ নিজ বিশ্বতত্ত্বকে হাজার হাজার বছর ধরে আকড়ে রয়েছে ?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: হ্যা। একেবারে আকড়ে ধরে রয়েছে।

   বিজ্ঞান ও কুসংস্কার

পত্রিকা: স্বাধীনতার বাষট্টি বছর পরেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রত্যন্ত কুসংস্কার অঞ্চলে বর্তমান। যেমন এখনও লােকে ভাবে সূর্যগ্রহণেরসময় রাহু সূর্যকে গিলে খায়। ইত্যাদি।

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আসলে সংস্কারগুলাে হাড়ে মজ্জায় ঢুকে যায়। ছােটবেলা থেকে মা ঠাকুমারা এগুলাে ঢুকিয়ে দেয়। এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া খুব কঠিন। ১৯৮০ সালে হায়দ্রাবাদের ওলকুন্ডা পাহাড়ে সূর্যগ্রহণের দৃশ্য দর্শন ও পরীক্ষার জন্য সাত আটটি বিদেশী দল সহ আমরা ছিলাম। সূর্যগ্রহণের
সময় ওরা আমাদের কফি ও বিস্কুট দিলেন। আমরা খাচ্ছি। কিন্তু একজন
তামিল ব্রাহ্মণ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক খেলেন না। জিজ্ঞেস করাতে
বললেন, তার দিদিমার দেওয়া সংস্কার থেকে তিনি বেরােতে পারছেন না।

পত্রিকা: কিন্তু ১৯৯৫ সালে, সূর্যগ্রহণের কুসংস্কারগুলি কাটাতে আপনি ও গণমাধ্যমগুলি ব্যাপক প্রচার করেছিলেন। ফলে প্রচুর মানুষ সূর্যগ্রহণ দর্শন করেছিলেন। তাহলে কি কুসংস্কারগুলি কাটানাে সম্ভব?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: ১৯৮০ সালে গণমাধ্যমই বলেছিল সূর্যগ্রহণ দেখো না। আবার
১৯৯৫ সালে তারাই বলেছিল দেখ। এ বিষয়ে ৪৬টা লেকচার দিয়েছিলাম। এখনও আমাকে অনেকেই বলে আপনি বলেছিলেন বলে আমরা দেখেছি।

বিজ্ঞান ও পড়াশুনা ও বিজ্ঞান মনস্কতা

পত্রিকা: বিজ্ঞান পড়াশুনা ও বিজ্ঞান মনস্কতা কি একই জিনিষ ?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:বছর পাঁচেক আগে আমি জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে রাজাবাজার
সায়েন্স কলেজের মেঘনাথ সাহা অডিটোরিয়ামে একটি লেকচার দিয়েছিলাম। প্রেক্ষাগৃহ অধ্যাপকও ছাত্রছাত্রীতে ভর্তি ছিল। বলেছিলাম, জ্যোতিষ শাস্ত্র অলীক। কোনও বিজ্ঞানই নয়।’ লেকচারের পরে Radio Physics এর একজন অধ্যাপক এবং Applied Physics -এর আরেকজন
অধ্যাপক ঠাট্টা করে আমাকে বললেন, “আমলেন্দুবাবু আপনি জ্যোতিষ শাস্ত্র সব জেনে গেছেন”? আপনিতাে ভগবান হয়ে গেছেন। অবধারিতভাবে ঐ বিজ্ঞানীদ্বয়ের হাতে বিভিন্ন পাথর সহ আংটি শােভা পাচ্ছিল।

পত্রিকা: তাহলে বিজ্ঞান মনস্কতা কি আলাদা? কেউ তেমনভাবে বিজ্ঞান না পড়েওতাে বিজ্ঞান মনস্ক হতে পারেন?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আসলে rationality যুক্তিবাদিতা। যুক্তি দিয়ে বােঝা। এইটা করতে হবে।

পত্রিকা: পাথরের উপর বিভিন্ন রশ্মি পড়ছে, ফলে তার দ্বারা কোন বিপদ কেটে যাচ্ছে। এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা কোন গবেষণা করেছেন কি?
অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আমেরিকার Stanford University -র ‘Dept. of Geologist’
এবং Dept. of Medicine’ এর বিজ্ঞানীরা বছর তিনেক ধরে মানুষ, গিনিপিগ ইত্যাদির উপর গবেষণা করে কোন পরিবর্তন পাননি।

একটা ঘটনা বলি -একবার আমার এক ধনী নিকট আত্মীয়ের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিল। তিনি একটি বড় জুয়েলার্সের বড় জ্যোতিষীর কাছে গেলেন। তিনি ঐ আত্মীয়ের জন্ম ছক ইত্যাদি দেখে আঙ্ক কষে বললেন, আপনার উপর রাহুর দৃষ্টি পড়েছে। আপনাকে কুড়ি রতির গােমেদের আংটি পরতে হবে। আংটির মূল্য ৩৬০০০ টাকা। তিন মাস ঐ আংটি ধারণ করার পরও ব্যবসার কোন রূপ পরিবর্তন হল না।

তখন তিনি আমাকে সব ঘটনা খুলে বলার পর, তাকে দেখালাম। ‘চাদ পৃথিবীকে ঢেউয়ের মত প্রদক্ষিণ করে। যখন উপর দিকে উঠছে, তাকে বলে ascending path (রাহু)। আবার যখন নিচের দিকে নামছে তখন তাকে descending path (কেতু) বলে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে-১ Based on true story-1

রাহু ও কেতু চাদের ও পৃথিবীর পরিক্রমা পথের intersecting point! ওরা কোন জ্যোতিষ্ক নয়। কেবলমাত্র ছেদন বিন্দু। একটা বিন্দু কি করে আপনার উপর প্রভাব ফেলবে? আপনি আংটি
সিন্দুকে তুলে রাখুন। এবং কোন ব্যবসা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। তামার কথামত চলে তার দুমাসের মধ্যে ব্যবসার অবস্থা ফিরল ।

পত্রিকা: অনেকসময় জ্যোতিষী ও জ্যোতিষে বিশ্বাসীরা কোন একটি ঘটনাকে তাদের চর্চার উপকারী পরিমাণ হিসাবে দেখান। এরকম ঘটনা কি লক্ষ্যে অনেকগুলি ঢিল ছোড়ার ফলে একটি লক্ষ্যভেদ করার ঘটনা নয়?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: নিশ্চয়ই। কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোন নির্দিষ্ট স্থানে গুটিকয় গ্রহ নক্ষত্রের
অবস্থান যখন নির্দিষ্ট। তখন একই সময়ে জন্মানাে দুটি শিশুর ভবিষ্যত
আলাদা হচ্ছে কি করে ?

পত্রিকা:ওনারা যুক্তি দেন যে তাদের কর্মফল আলাদা।

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: ও! তাহলে তােমার জ্যোতিষ শাস্ত্র এখানে খাটছে না? হিরােসিমাতে অ্যাটম বােমা ফেলার ফলে ৬৮০০০ লােক মারা গেল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা – তাদের এক ছক ছিল? কি বলে জ্যোতিষ শাস্ত্র ?

পত্রিকা: বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষের সুযােগ সুবিধা বাড়ছে। জ্ঞানেরও প্রসার ঘটছে। তা সত্ত্বেও কুসংস্কারগুলি সমান্তরালভাবে মানুষের মনে রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের কুসংস্কার মুক্তি কতটা ঘটল? কমেছে? নাকি একই রকম রয়ে গেছে?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: একটুও কমেনি। একই জায়গায় রয়ে গিয়েছে।

পত্রিকা: জুয়েলার্সগুলি জ্যোতিষীর প্রচার অর্থাৎ রত্ন বিক্রির জন্য, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, গণমাধ্যমগুলিকে বিজ্ঞান প্রসারের কাজে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে ?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:
ঠিক।

পত্রিকা: বিজ্ঞান মনস্কতা প্রসারে সরকারের উদ্যোগ কতটুকু ?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: নেই। সরকারের অনেক মন্ত্রীইতাে জ্যোতিষ ইত্যাদি মানেন। কারা
সচেতনতা আনবেন?

পত্রিকা: বিদেশে এই ব্যাপারটা কেমন?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: সেখানেও বিভিন্ন রকম কুসংস্কার আছে। তবে আমাদের দেশের
তুলনায় কম।

পত্রিকা: তাহলে কুসংস্কার নির্মূল করতে গেলে কি করতে হবে?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: আসলে গণমাধ্যমের সাহায্য দরকার।

পত্রিকা:আপনি যে কুসংস্কার বিরােধী লেকচার বিভিন্ন জায়গায় দেন— এতে কাজ কিছু হচ্ছে কি?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: সামান্য কাজ হচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদালয়ে এরকম একটি লেকচারের
৭২ বছর বয়স্কা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তার ১৪ বছর বয়সে মায়ের দেওয়া পলার আংটি ফেলে দিলেন।

পত্রিকা:  বিদ্যালয়ে কোন সচেতনতা পাঠক্রম করানাে যায় ?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়:কারা করবে? বরঞ্চ U G C ভারতের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – তারা জ্যোতিষচর্চাকে পাঠক্রম হিসাবে এনেছে। তাহলে কি আশা কর?

পত্রিকা: তাহলে কোন আলােক দর্শন হচ্ছে না?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: না না।

পত্রিকা: সামাজিক চর্চায় যুক্তিবাদিতাই কি উপায়?

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: হ্যাঁ। বুদ্ধ তার শিষ্যদের বলছেন, “আমি তােমাদের গুরু। আমি যা বলছি তা গ্রহণ করাে না। তােমার পিতা, তােমার শিক্ষক পরমগুরু। কিন্তু পিতা বা শিক্ষক বললেই তাকে গ্রহণ করাে না। তুমি নিজে বিচার করে দেখবে। আমি বা পিতা বা শিক্ষক যা বলছেন তা করলে অধিকাংশ মানুষের
মঙ্গল হবে কি? তবে গ্রহণ করবে। কি অসাধারণ rationality, চিন্তা।

পত্রিকা: অনেক কিছু জানলাম আপনার সঙ্গে কথা বলে, রাতও বাড়লাে – আজ তাহলে উঠি, অজস্র ধন্যবাদ আপনাকে।

অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: ধন্যবাদ।

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক পত্রিকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবর  –২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

( ১২-০৭-২০০৯ তারিখের সাক্ষাৎকার)পত্রিকার তরফে
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাপস মজুমদার ও রতন দেবনাথ

WhatsApp Image 2020-06-25 at 12.01.16

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.1 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

কালাজ্বর কি?কালাজ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা

4.1 (9) বিগত শতকে কালাজ্বর ভয়াবহ মহামারী রূপে কয়েকবার আমাদের দেশের ওপর আঘাত এনেছে। ঘটে গেছে বহু অকালমৃত্যু। আক্রান্ত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানাবিধ উন্নতির সাথে তালমিলিয়ে আমরাও সাধ্যমত লড়াই করেছি। এই বীভৎস রােগটির বিরুদ্ধে।কিন্তু অস্বীকার করার কোনাে উপায় নেই যে, আজও আমরা কালাজ্বর সৃষ্টিকারী পরজীবীটিকে পুরােপুরি শায়েস্তা […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: