কালাজ্বর কি?কালাজ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা

5
(1)

বিগত শতকে কালাজ্বর ভয়াবহ মহামারী রূপে কয়েকবার আমাদের দেশের ওপর
আঘাত এনেছে। ঘটে গেছে বহু অকালমৃত্যু। আক্রান্ত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানাবিধ উন্নতির সাথে তালমিলিয়ে আমরাও সাধ্যমত লড়াই করেছি। এই বীভৎস রােগটির বিরুদ্ধে।কিন্তু অস্বীকার করার কোনাে উপায় নেই যে, আজও আমরা কালাজ্বর সৃষ্টিকারী পরজীবীটিকে পুরােপুরি শায়েস্তা করতে পারিনি।

পারিনি এই রােগটিকে সমূলে উৎখাত করতে। মহামারী আকারে না হলেও বিক্ষিপ্ত ভাবে এখনও পূর্ব ভারতে বিশেষত পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, আসাম ও পশ্চিম বাংলায় কালাজ্বরে আক্রান্ত
হবার ঘটনা প্রায়শই দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিষুব অঞ্চলে ভয়াবহতার নিরিখে
ম্যালেরিয়ার পর পরজীবীঘটিত রােগগুলাের মধ্যে কালাজ্বরের স্থান দ্বিতীয়। এই ভয়াবহ
রােগটি সম্পর্কে তাই আজ আরও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়ােজন রয়েছে।

Kala Azar - INSIGHTSIAS
কালাজ্বর আক্রান্ত শিশু

কালাজ্বর আসলে একটি এককোশী পরজীবীঘটিত রােগ। এই পরজীবীটির নাম-‘লিশম্যানিয়া’। তাই কালাজ্বরকে অনেক সময় লিশম্যানিয়েসিসও বলা হয়। অবশ্য লিশম্যানিয়া কোনও কোনও সময়ে ত্বকের প্রদাহ বা উদরের বিভিন্ন অংশে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই কালাজ্বরকে উদরের লিশম্যানিয়েসিস্ বলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে।

১৯০৩ সালে ‘লিশম্যান’ ও ‘ডােনােভ্যান’ নামক দুই বিজ্ঞানী একই সাথে যথাক্রমে ইংল্যান্ডে ও ভারতে
কালাজ্বরের পরজীবীটি আবিষ্কার করেন। সেবছরই ‘রস’ কালাজ্বর সৃষ্টিকারী এই পরজীবীটির নাম রাখেন ‘লিশম্যানিয়া ডােনােভ্যানি’।

কালাজ্বর সমগ্র বিষুব অঞ্চলে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে বেশ কয়েকবার মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। কেবল ১৯৭৮ সালেই কালাজ্বরে আমাদের দেশে মােট কুড়ি হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯৯১ সালে আবার ভয়াবহরূপে এটি দেখা দেয় ভারতে ও সুদানে। ভারতবর্ষে ঐ সময়ে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। ভারত ও সুদান মিলিয়ে মৃত্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ হাজার। সারা পৃথিবীতে এখনও প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ কালাজ্বরে আক্রান্ত হন।

এডস-এর প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে কালাজ্বরে আক্রান্ত রােগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এডস ভাইরাস যেহেতু দেহজ প্রতিরক্ষাতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়, এ রােগীর শরীরে অন্যান্য অনেক রােগের সঙ্গে কালাজ্বর হওয়ার সম্ভাবনা থেকে থাকে।

অনেক সময়েই এডস-রােগী কালাজ্বর সৃষ্টিকারী পরজীবীর বাহক হয়ে ওঠেন। ভারতবর্যে এরকম
রােগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

ভারতে কালাজ্বরের পরজীবী ‘লিশম্যানিয়া ডােনােভ্যানি’ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় ‘স্যান্ডফ্লাই’ নামক একরকম মাছির মাধ্যমে, যার বিজ্ঞানসম্মত নাম—ফ্লেবােটোমাস্ আরজেন্টিপস

এই পরজীবীর জীবনচক্রের একটি ভাগ (প্রেম্যাস্টিগােট অবস্থা) অতিবাহিত হয় এই প্রকার মাছির খাদ্যনালীতে। আর অপরভাগ (আম্যাস্টিগােট) আক্রান্ত মানুষের ম্যাক্রোফাজ নামক কোশে।

রক্তে ছড়িয়ে পড়া আম্যাস্টিগােট ফ্লেবােটোমাসের দেহে চলে যায় রক্ত শােষণের মাধ্যমে। তারপর তা ঐ মাছির দেহে প্রোম্যাস্টিগােটে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে সেই মাছি যখন কোন সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তখন হুলের মধ্যে দিয়ে তা চলে আসে সেই ব্যক্তির রক্তে। রক্তের প্রোম্যাস্টিগােট ম্যাক্রোফাজ কোশের আম্যাস্টিগােটে পরিণত হয়।

আম্যাস্টিগােটগুলাে বংশবৃদ্ধি করে তাদের সংখ্যা বাড়ায় ও পরিশেষে ম্যাক্রোফাজকে ফাটিয়ে রক্তে চলে আসে। আর এভাবেই তাদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ হয়।

কালাজ্বরে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে জ্বর, ক্ষুধামন্দা, আলস্যভাব ইত্যাদি নজরে এলেও যকৃত ও প্লীহার বড়াে হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসকরা মূল রােগলক্ষণ বলে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে কালাজ্বরের নামকরণ কীভাবে হ’ল তা একটু জেনে নেওয়া যাক।

কালাজ্বর শব্দটি এসেছে কাল-আজার (kala-azar) শব্দটি থেকে। অসমিয়া ভাষায় azar শব্দের অর্থ জ্বর। এই জ্বর হলে রােগীর শরীরের রঙ কালাে হয়ে যেত বলে রােগটিকে কালাজ্বর বলা হয়।

অর্থাৎ রােগীর ত্বকের কালাে রঙও এই রােগের আরেকটি লক্ষণ। অবশ্য কালাজ্বরের রােগ নির্ণয় সম্পূর্ণ হয়েছে তখনই মনে করা হয় যখন এর পরজীবীকে রক্ত অথবা অস্থিমজ্জা যকৃৎ প্রভৃতি অঙ্গের নির্যাসের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানীমহলের নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজও কিন্তু এই রােগের কোনাে প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আশার কথা একবার যদি কালাজ্বর আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবে সাধারণত তার আর দ্বিতীয়বার রােগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে না।

দেহজ প্রতিরক্ষাতন্ত্র দ্বিতীয়বার আক্রমণের মােকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ঠিকমত ওষুধ খেলে কালাজ্বরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব নয়। বাজারে কালাজ্বরের ওষুধ সুলভেই পাওয়া যায়। লিশম্যানিয়রা বিরুদ্ধে প্রথম অ্যান্টিমনির যৌগ ‘হউরিয়া স্টিবামিন’ ব্যবহার করে সারা বিশ্বে যিনি হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন তাঁর নাম আজ আমাদের শ্ৰদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেই হবে। তিনি হলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী ডা. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

Mamata Banerjee on Twitter: "Tribute to Upendranath Brahmachari on ...

পরবর্তীকালে অবশ্য অন্য অ্যান্টিমনির যৌগ  অ্যান্টিমনি গ্লুকোটন (পেন্টোস্টম) এবং অ্যান্টিমনি মিথাইল  গ্লুটামিন (গ্লুকান্টিন) বাজারে এসে যায়।

যখন রােগপ্রতিরোধে অ্যান্টিমনির যৌগগুলো কাজে আসে না তখন বিকল্প হিসাবে পেন্টামিডিন বা অ্যাম্ফোটেরিসিন-বি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা এই সমস্থ যৌগগুলির ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

এর ওপর আছে ‘ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট’ লিশম্যানিয়ার আবির্ভাব। একটি সমীক্ষায় জানা গেছে, বিহারে ১৯৯৪-৯৭ সালে ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট কালাজ্বর বেড়েছে ৩৪-৬৪%। সঠিক কী কারণে ‘ড্রাগ রেসিন্যাস্ট’ লিশম্যানিয়ারা সংখ্যায় এত বাড়ছে তা না জানা গেলেও রােগীদের ওষুধের কোর্স সম্পূর্ণ না করে ছেড়ে দেওয়াকে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এই প্রবণতা মারাত্মকভাবে দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট লিশম্যানিয়ার ওপর ভারতবর্যে নিরলস গবেষণা চলছে।

পরীক্ষাগারে কৃত্রিম উপায়ে প্রোম্যাস্টিগােট ও আম্যাস্টিগোট কালচার (চাষ) সম্ভব এবং এদের ‘ ড্রাগ রেসিস্ট্যান্স’ নিয়ে এখন নিরন্তর গবেষণা চালাচ্ছেন বর্তমান বিজ্ঞানীরা।

দেখা গেছে পেন্টামিডিন ও অ্যামফোটেরিসিন-বি যৌগগুলির বিরুদ্ধে ড্রাগ রেসিন্যান্স তৈরি হচ্ছে। তাই এখন প্রশ্ন উঠেছে এনিয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তার। এই সমস্ত যৌগগুলির যথেচ্ছ ব্যবহার ড্রাগ রেসিস্ট্যান্সকে আরও বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে কালাজ্বরের চিকিৎসায় এক বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

তাই এখন চাই সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যচেতনা এবং ওষধের ব্যবহার সম্পর্কে মানুষকে সজাগ করে তােলার
জন্য উদ্যোগ। কেবলমাত্র তখনই ‘সবার জন্য সুস্বাস্থ্য’—আমাদের এই আশা বাস্তবায়িত হবে।

লেখক

সিদ্ধার্থ জোয়ারদার ও অনিন্দিতা জোয়ারদার

 

লেখাটি গবরডাঙ্গা গবেষণা পরিষৎ থেকে প্রকাশিত

আধুনিক জীববিদ্যা ও জনস্বাস্থ্যের সহজপাঠ       থেকে সংগৃহিত।

WhatsApp Image 2020-06-20 at 21.41.39

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ডাইনােসর বিলুপ্তির সঠিক কারণগুলি ?

5 (1) নানা মতবাদের আড়ালে রয়ে গেল ডাইনােসরদের এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার রহস্য। কেন এই দৈত্যাকার প্রাণীগুলির হারিয়ে গেল এই পৃথিবী থেকে? প্রায় সাড়ে সাত কোটি বছর আগে যে প্রাণীগুলাে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াতো, তাদের কেন হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে হলাে? এ বিষয়ে যে সব মতবাদ আছে তার কয়েকটি এখানে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: