শান্তিপুরের আম বাগান বাঁচাও আন্দোলন । পশ্চিম বাংলার পরিবেশ আন্দোলন । ভারতের পরিবেশ আন্দোলন

@
4.9
(38)

পরিবেশ আন্দোলন এই শব্দ বন্ধটির মূল্য অপরিমেয় । পরিবেশ যা আমাদের যাবতীয় আবশ্যক জিনিসের উৎস ! শুধু উৎসই সেই উৎস হলো এক বিপুল ভান্ডার ।  আমরা প্রয়োজনে এবং লোভের বশবর্তী হয়ে, আমাদের সৃষ্টির সাথেই দ্বৈরথে যাই আর কিছু মানুষ আছেন যার রুখে দাঁড়ান পরিবেশের স্বার্থে,পরিবেশ রক্ষায় । তারা আক্রান্ত হন আমাদের বিদ্রুপের শিকার হন কিন্তু তাও কাজটা করতে থাকেন । আমাদের বাংলার প্রতিটি প্রান্তে চলে একাধিক পরিবেশ আন্দোলন,হয়তো সেই কারণেই এখনো কিছুটা হলেও বাংলা অক্ষত ! আমরা বড্ডো চটকে বিশ্বাসী তাই বাংলার গ্রেটা থুনবার্গদের চোখে পড়ে না আমাদের বা হয়তো গেঁয়ো যোগী বলেই তারা খ্যাতি বা স্বীকৃতি পায় না ? আসলে ঘাসের উপর শিশির বিন্দুটা আমরা দেখেই দেখি না ,এটাই আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হয়েগিয়েছে ! বৈজ্ঞানিক ভাবে পরিবেশ রক্ষা,এই সহজ সরল বিষয়টা আমরা এখনো বাস্তবায়িত করতে বাস্তবেই ব্যার্থ ।

বাংলার এক পরিবেশ আন্দোলনের কথা আজ বলবো, আমাদের বাসস্থান জীবন এবং জীবিকার জন্য অনেক কিছুই প্রয়োজন,বন-জঙ্গল কেটেই তৈরী হয় নগর গড়ে ওঠে সভ্যতা কিন্তু তার একটা নির্দিষ্ট প্রয়োজন থাকে । সেই পরিবেশ ধ্বংস -এর কারণ জনস্বার্থ ! কিন্তু নিছক মুনাফার জন্য কোনো কারণ ছাড়াই যখন অসদুপায়ে লাভের চেষ্টায় পরিবেশ ধ্বংস করা হয়, তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলা শুধুই আবশ্যক নয় বরং আমাদের কর্তব্য এবং সময়ের আহ্বানে সাড়া দেওয়া অনিবার্য ।

পশ্চিমবাংলার অন্যতম প্রাচীন জেলা নদিয়ার সুপ্রাচীন প্রসিদ্ধ একটি শহর হলো শান্তিপুর,ঐতিহ্যমন্ডিত এই শহরের অন্যতম প্রাচীন সামাজিক কর্মীরা আক্রান্ত  হচ্ছে ক্রমাগত । বহু বছর ধরেই এই শহর সবুজ আর সেই বৃক্ষরাজ দের দিকেই নজর পড়েছে লোভীদের । সমগ্র শান্তিপুর জুড়েই ছিলো অসংখ্য আমগাছ এবং একাধিক আম বাগান,প্রতিটি বাগানের নির্দিষ্ট নাম রয়েছে ।  বাগান এবং গাছগুলির অধিকাংশই পার করে ফেলেছে কয়েক শতাব্দী । গাছ গুলি যে সুপ্রাচীন সেটা প্রমান করে গাছেদের গায়ে জন্মানো অর্কিডদের উপস্থিতি ।

দুটি বিষয় ছিলো এই লোভের,প্রথমত; এই সব সুপ্রাচীন বহু মূল্যবান আমগাছ কেটে বিক্রি করতে পারলেই বিপুল পরিমান অর্থাগম হয় ।  দ্বিতীয়ত, বাগান কেটে সাফ করতে পারলেই বিপুল পরিমান ফাঁকা জমি পাওয়া যায় এবং তাকে বাস্তুজমি হিসেবে প্লট আকারে বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থলাভ । মূলত এই দুটি কারণেই আক্রান্ত হচ্ছিলো আমবাগান গুলি, এই আক্রমণের শুরু আজ থেকে নয়,দীর্ঘ চার পাঁচ দশক থেকেই চলে আসছে গাছ এবং বাগানের উপর মানুষের এই অত্যাচার । সত্তর এর দশকে এই আম বাগান আক্রমণ শুরু হয়,তারপর থেকেই প্রতিরোধ গড়ে উঠতে শুরু হয় ।  যারা এই গাছ এবং জমির লোভে ক্রমাগত বাগান ধংস করতে শুরু করে তারা এলাকায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে থাকে । প্রচ্ছন্ন মদত এবং সাহায্য পেতে থাকেন ওই সব দুর্বৃত্তেরা ! এই সময়েই পাল্টা পরিবেশ রক্ষায় মানুষ এগিয়ে আসতে শুরু করেন ।  পরিবেশ সংগঠন তৈরী হতে থাকে,আন্দোলন সংগঠিত হতে শুরু হয় ।

এই ভাবেই আন্দোলন চরমে পৌঁছায় 90 এর দশকে ।  পরিবেশকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও লড়াই এর ফলস্বরূপ 1994 সালে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয় যে,যে শান্তিপুরের কোনো গাছে কাটা যাবে না এবং কোনো পুকুর ভরাট করা যাবে না ।  কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই আদেশ মানা হয়নি । নির্বিচারে বৃক্ষছেদন আর আন্দোলন চলতে থাকে একই সঙ্গে, পরিবেশ কর্মীরা সমস্ত প্রশাসনিক স্তরে ঘুরতে থাকেন ।  গাছ কাটা বন্ধ থাকে আবার কিছু দিন পর শুরু হয় কখনো রাতে মেশিনের সাহায্যে কখনো গাছের চারিদিকে গর্ত করে বিভিন্ন ভাবে চলতে থাকে বৃক্ষ নিধন ।  আড়ালে বা লোকচক্ষুর সামনে ।  কিন্তু প্রতিবারই সেই লোভীদের পথ আগলে দাঁড়াতে থাকেন পরিবেশ কর্মীরা ।  স্বভাবতই গাছেদের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ কর্মীদের উপর আঘাত নেমে আসতে শুরু করে ।  পরিবেশকর্মীরা প্রথম দিকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনীয় স্তরে তেমন কোনো সাহায্য পাননি,আন্দোলনের অন্যতম সামনের সারির নেতৃস্থানীয় পরিবেশ প্রেমীরা আক্রান্ত হতে শুরু করেন, নিত্যদিন চলে হুমকি,প্রাণসংশয় নিয়েও তাঁরা পরিবেশ রক্ষায় লড়তে থাকেন ।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী ডাক্তার শ্রী গৌতম পাল ,আন্দোলনের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিত্ব বহু দিন ধরেই আক্রান্ত হচ্ছিলেন,নিয়মিত হুমকি ও আক্রমণ চলছিলই, 2015 সালের এপ্রিল মাসে আক্রমণ চরমে পৌঁছায় । ডাক্তারবাবুর চেম্বারে কতিপয় দুর্বৃত্ত চড়াও হয়ে তাঁকে এবং তাঁর সহকারী সঞ্জিত কাষ্ঠকে বেদম প্রহার করে,সঞ্জিত বাবুর কথা অনুযায়ী তারা ডাক্তার বাবুকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে এসেছিলো,বাঁধা দেওয়ায় তাঁকেও ভয়ানক আঘাত করা হয় , হয়তো কোনো চরম পরিণতি তাঁদের জন্য ঐদিন অপেক্ষা করছিলো ।  প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকা সত্বেও তাঁরা কোনোক্রমে রক্ষা পান । গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁদের স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়, তারপরই টনক নড়ে প্রশাসনের ।  সংবাদপত্র সমস্ত ঘটনা প্রকাশিত হয়, প্রশাসনিক ও পুলিশি সর্বোচ্চ স্তর থেকে ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয় ।
নদীয়া ও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশ কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন আম বাগান রক্ষায় ।  শিক্ষিত যুবরা সরাসরি যুক্ত হতে শুরু করেন আন্দোলনে,স্থানীয় মানুষদের মধ্যে ব্যাপক হারে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায় । মানুষের স্বতঃষ্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনের ভিতকে দৃঢ় করে তোলে,অপর দিকে অল্প মাত্রায় হলেও চলতে থাকে বৃক্ষ নিধন ।

নদীয়া এবং অন্যান্য বিভিন্ন জেলার প্রকৃতি পরিবেশ প্রেমী মানুষ জন,সংগঠন, গণসংগঠন এবং সংস্কৃতিক ও নাট্য সংস্থা মিলিত হয়ে তৈরী করে পরিবেশ ভাবনা মঞ্চ,প্রায় 45টি সংস্থা নিয়ে এটি তৈরী হয় । এছাড়াও 2016 থেকে 2018 এর মধ্যে পরিবেশকর্মীরাও শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন,তাঁরাও লড়ে যাচ্ছেন পরিবেশের স্বার্থে এবং তাঁদের কথাঅনুযায়ী তাঁরা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন শেষ পর্যন্ত ।  রক্ষা করবেন তাঁদের ঐতিহ্যের আম বাগান ।

পরিবেশ ভাবনা মঞ্চের সভাপতি শ্রী সুব্রত বিশ্বাস এর কথা অনুযায়ী আজ যেটুকু আম বাগান শান্তিপুরে অক্ষত আছে,সেটা সম্পূর্ণ তাঁদের সকলের সম্মিলিত আন্দোলের ফলশ্রুতি; যেখানে শহরের সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত পরিবেশের রক্ষায় তাঁদের সাথে হাতে হাত রেখে লড়ছেন । এখানেই তাঁদের সাফল্য এবং এই আন্দোলন এখনো চলছে কারণ যখন তখন ওই সব লোভী দুষ্কৃতীরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেন এবং সুযোগ পেলেই পরিবেশ ধ্বংসের তান্ডবলীলা চালায় ।  এই আন্দোলন হয়তো উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাবে,বৃদ্ধি পাবে আক্রমণও কিন্তু পরিবেশ যেনো অক্ষত থেকে যায় ।  জয় হয় পরিবেশকর্মীদের এবং পরিবেশের ।  শ্রী সঞ্জিত কাষ্ঠ আমাদের জানিয়েছেন অবিলম্বে গাছ গুলিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে,প্ৰশাসন তরফে আম বাগান রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক ।

আমরা বলি,যতদিন পর্যন্ত এই আমবাগান আক্রমণ চিরতরে বন্ধ হচ্ছে ,চলতে থাক এই আন্দোলন,আন্দোলনে যুক্ত সকল পরিবেশকর্মীদের কুর্নিশ জানাই ! তাঁদের এই লড়াই নদীয়ার পরিবেশ আন্দোলনে শুধু নয় ; পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ।

 

সোর্স – গাছ কাটার প্রতিবাদ করায় শান্তিপুরে প্রহৃত পরিবেশ কর্মী । ৩০ এপ্রিল, ২০১৫ । আনন্দবাজার পত্রিকা

পরিবেশ কর্মীর বাড়িতে বোমা । ১ মে, ২০১৬ । আনন্দবাজার পত্রিকা

– সমসাময়িক পত্র, পত্রিকা

 

শান্তিপুরের আম বাগান বাঁচাও আন্দোলন ও অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আপনার আরো তথ্য দেওয়ার থাকলে আমাদের জানান । Mail – poribesnews@gmail.com

 

 লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 38

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সমাজ শিক্ষক উইপােকা

4.9 (38) “উই আর ইদুরের দেখ ব্যবহার যাহা পায় তাহা করে কেটে ছারখার।” আসুন এবার দেখা যাক ‘উইপোকার’  ‘উই’-এর ব্যবহার সত্যি সত্যিই এমন ন্যক্কারজনক কিনা! মানুষের ভারি গর্ব যে, সে সমাজবদ্ধ জীব, সমাজের নিয়মকানুন, আদবকায়দা সবই মেনে চলে, কিন্তু প্রকৃত দলগত ও সামাজিক ঐক্য মানুষের মধ্যে কতটুকুই বা আছে – […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: