“আয়ােডিন লবন” কতটা জরুরি

একটা লবনের প্যাকেট হাত নিলে তাতে দেখা যায় আয়োডাইজ্ড সল্ট (অর্থাৎ আয়ােডিন সমৃদ্ধ লবন) কথাটা। বড় বড় করে লেখা আছে।
এখনকার  লবনের ওপর বিজ্ঞাপন গুলােতেও জোর গলায় ‘আয়ােডিন যুক্ত লবন’ (Iodized salt)কথাটা বলা হচ্ছে।সত্যি আয়ােডিন কতটা থাকবে অথবা আদৌ থাকাটা উপযুক্ত কিনা কিংবা লবন খাওয়া কতটা যুক্তিপূর্ণ তা আমাদের জানা দরকার।

ভারতীয় লবণের আগ্রাসন: খুলনার ৩৬ লবণ ...

উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর মত মানুষের জৈবনিক ক্রিয়াকলাপ গুলি পরিচালনার জন্য শক্তির
দরকার হয়। এই শক্তি আমরা যে খাবার খাই তা পুষ্টির মাধ্যমে দেহে কোষে কোষে তৈরি হয়।

পুষ্টির জন্য খাদ্যের মধ্যে উপযুক্ত মাত্রায় শর্করা, প্রােটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবন ও জল থাকাটা জরুরী। মানুষের জৈবনিক ক্রিয়াকলাপে শুস্ক ওজনের প্রায় ১০ শতাংশ নানাপ্রকার অজৈব লবন (২০ রকমের) গুরুত্বপূর্ণ ভাবে অংশ নেয়।

 শরীর আয়োডিন পায় কোথা থেকে  ?

সোডিয়াম,পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, লােহা, তামা, বােরণ, ক্লোরিন ইত্যাদির মতই
আয়ােডিনও তার মধ্যে একটি। আয়ােডিনও এইসব খনিজলবন আমরা দৈনন্দিন খাবার টাটকা
শাকসজি, ফল, চাল, গম, নানারকম দানাশস্য ইত্যাদি থেকে পেয়ে যাই।

এছাড়া আমরা যে বিশুদ্ধ জল পান করি তাতে আয়োডিনও থাকে। শরীর মুক্ত রাখতে আমাদের দিনে প্রায় তিনগ্রামের মত এইসব লবনই যথেষ্ট। তবুও যেসন পুষ্টিকর খাবান প্রতিদিন খাই তাতে ১০
গ্রামের মত লবন বা তার বেশি শারীরে চলে যায়।

শরীরে লবনের প্রয়জনিয়তা

সুদৃশ্য মোড়কে যে লবন বাজার থেকে কিনে আনছি সেই লবন (NaCl) সােডিয়াম ও
ক্লোরিনের রাসায়নিক মিশ্রণে তৈরি হয়।

আয়োডিন যুক্ত লবণ দেবে স্বাস্থ্য ...

সােডিয়াম, ক্লোরিন এবং আয়োডিন যখন আলাদাভাবে প্রতিদিনকার খাদ্যের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছি,
তখন অনর্থক বেশি শসা খরচ করে বাজারে চালু আয়ােডিনযুক্ত লবন তিভাবে শরীরের চালান দেওয়ার কোন মানে আছে কি?

অতিরিক্ত লবন খেলে কি হয় ?

সুস্থ মানুষের কিডনি সারাদিনে ৪ থেকে ৫ গ্রামের মত লবন শরীর থেকে বের করতে পারে । ফলে যে অতিরিক্ত কেনা লবন আমরা দিনের পর দিন খেয়ে যাচ্ছি তা মােটেই শরীর থেকে বের হওয়ার সুযােগ পায় না।

ফলে এই  রাসায়নিক লবন কিডনির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত করে আর শরীরে অন্যান্য কাজে জটিলতা বাড়িয়ে তােলে। সাধারণ লবন খাওয়ার ফলে শরীরে ভিটামিন গুলােকে তা নষ্ট করে দেয়, চর্মরােগ,
হাইপ্রেসার, গেটেবাত বা গাউট ইত্যাদির মত রােগের সৃষ্টি করে।দেখা যাচ্ছে আজকালকার মানুষ কিন্তু এইসব রােগে বেশি ভুগছে।

থাইরয়েড গ্রন্থি কি ?

মানুষসহ সকল মেরুদন্ডী প্রাণীদের শ্বাসনালীর উপরিভাগে স্বরযন্ত্রের নিচে আছে একটিমাত্র থাইরয়েড গ্রন্থি।

থাইরক্সিন হরমোন কি ?

এই গ্রন্থি থেকে যেসকল হরমােন নিঃসৃত হয় তার মধ্যে থাইরক্সিন অন্যতম।

শরীরে আয়ডিনের কি প্রয়োজন ?

এই থাইরক্সিন হরমােন হল আয়ােডিন যুক্ত অ্যামাইনাে অ্যাসিড। অর্থাৎ থাইরক্সিন তৈরিতে আয়ােডিন দরকার পড়ে।থাইরয়েড গ্রন্থী থেকে থাইরক্সিন হরমোন তৈরি ও থাইরয়েড গ্রন্থি, থেকে বেরােবার ব্যাপারে মস্তিষ্কে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

আসলে এই গ্রন্থির  থাইরয়েড সিমুলেটিং হরমোন (সংক্ষেপে T.S.H) থাইরয়েডের অভিভাবকের কাজ করে।

State the exact location of the following structur toppr.com

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন সাধারণ মাত্রার বেশি নিঃসৃত হলে গ্রেভস্ ডিজিজ (Graves
disease) বা এক্সঅপত্যালমিক গয়টার (exoptholmic goiter) রােগ হয়। ফলে মানুষের থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে ওঠে ও চোখ দুটো ঠেলে যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। চোখের পাতা কান ওঠানামা করে, হ্যৎপিন্ডের স্পন্দন হার বেড়ে যায়, প্রস্রাব ঘন ঘন হয়। দেহের
ওজন কমে যায়।

গলগন্ডরোগ কি?

বা

থাইরক্সিনের কম ক্ষরণেও আছে বিপত্তি হয় ?

থাইরক্সিনের কম ক্ষরণেও আছে বিপত্তি। কম ক্ষরণে শিশুদের ক্রেটিনিজম (cretisism) ও বয়স্কদের মিক্সিড়িমা (myxoedem) রোগ হয়। এইসব রােগ থেকে অব্যাহতি দিতে পারে
নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ােডিন। অন্যদিকে দেহে শুধুমাত্র আয়োডিন নির্দিষ্ট পরিমাণের কম হলে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় এবং এই অবস্থাকে সাধারণ গলগন্ড (simple goiter) বলে থাকি।

পলাশবাড়ীর গলগন্ড (ঘ্যাগ) রোগীর ...
গলগন্ড (simple goiter)

থাইরক্সিন হরমোন কম বা বেশি পরিমাণ নিঃসৃত হলে যেসব লক্ষণ শরীরে প্রকাশিত হয়,
তা গলগন্ডের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয় না। এখানে শু্ধু, থাইরয়েড গ্রন্থি স্ফীত হওয়ার ফলে আশপাশের অন্যান্য অঙ্গগুলোর উপর চাপ বাড়ে।

সেই চাপে কিছু লক্ষণ প্রকাশিত হয়। যেসব স্থানের পানীয় জলে ও, খা্বারে আয়ােডিন কম থাকে, সেইসব স্থানের লোকেদের এই সকল প্রকৃতির গলগন্ড দেখা যায়।

কোন এলাকায় শাকসজি,  ফলপাকড়, জল এ আয়োডিন আছে?

সমুদ্রতীরবর্তী ও তার আশপাশ এলাকার (যেমন- পশ্চিম বঙ্গ, উড়িষ্যা, কাটক, তামিলনাড়ু, গুজরাট ইত্যাদি অঞ্চলের) শাকসজি,  ফলপাকড়, জল ইত্যাদিতে ব্যাপক সন্ধান মেলে
আয়ােডিনের। এখানকার মানুষের আয়ােডিনের ঘাটতি কখনই থাকে । তাই বাইরে থেকে লবনের সাথে আয়ােডিন শরীরে যােগান দেওয়ার প্রয়ােজন নেই।

কোন এলাকায় আয়োডিন ঘাটতি আছে?

অন্যদিকে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে বহু দূরের পার্বত্য অঞ্চলে বা ঊষর বন্ধ্যা অঞ্চলের জল, ফল, শাকসজিতে আয়ােডিন ততটা নেই। ফলে সেদিককার লােকেদের সত্যিই আয়ােডিনের
ঘাটতি দেখা যায়।

এক্ষেত্রে বেশ কিছুদিন ধরে শরীরে আয়ােডিন কম থাকলে থাইরক্সিন হরমােন তৈরির কাজ কমে যায়। সেইজন্য উঃ পূর্ব ভারতের পার্বত্য এলাকায় গলগন্ড রােগী প্রচুর দেখা যায়।

কোথায় লবনে আয়োডিন দরকার ?

এইসব ( উঃ পূর্ব ভারত ও পার্বত্য  ) এলাকায় পরিমিত শাকসজি, ফল ইত্যাদি গ্রহণেও আয়ােডিনের অভাব থাকলে বাইরে থেকে তা যােগান দেবার প্রয়ােজন আছে। আমাদের জেনে রাখা দরকার সাধারণ লবনে অশুদ্ধি হিসেবে সামান্য মাত্রায় আয়ােডিন থাকে।

লবনে কতটা পরিমান আয়ােডিন মেশান হয় ?

ব্যবসায়িক খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় প্রস্তুতকারক লবনে আয়ােডিন মিশিয়ে বাজারে ছেড়েছে, তাহলেও
অনেক কোম্পানীর প্যাকেটে কোথাও লেখা থাকে না কতটা পরিমাণ আয়ােডিন লবনে মেশানাে আছে আর আমাদের শরীরে কতটা দরকার। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের জানার অধিকার আছে। না
জানতে পারার জন্য কিন্তু আমরাই দায়ী। আমরাই তাদের এভাবে ব্যবসা চালাতে সাহায্য করছি। সামান্য তথ্যটুকু জানার জন্য প্রতিবাদও করছি না। লবনের প্যাকেটে আয়ােডিনের পরিমাণটুকু লিখে ক্রেতাদের কাছে সততা বােধের পরিচয়টুকু দিতে পারে না কেন?

আসলে ‘আয়ােডিনাইজড সল্ট কথাটা একটা ব্যবসায়িক ফাঁদ মাত্র। আর এই ফাঁদে আমরা জড়িয়ে
গেছি। মজার ব্যাপার লবন প্রস্তুতকারক ও ব্যাবসাদাররা যেসব অঞ্চলে এই লবনের দরকার নেই সেখানেও আয়ােডিনযুক্ত লবন রমরমিয়ে বিক্রি করে চলেছে।

বেশিরভাগ মানুষের সম্যক বুদ্ধির অভাবেই ব্যাবসাদাররা তাদের এইভাবে ঠকিয়ে মুনাফা লুটে নিচ্ছে যা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। আগেই বলা হয়েছে সাধারণ লবনেও মিশে থাকে আয়ােডিন,
আকরিক আসঙ্গ্তী। তাই সব জায়গার লবনে আয়ােডিন বাইরে থেকে মেশানাের দরকার পড়ে না। ভারত সরকার কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চল চিহ্নিত করে সেসব জায়গার লবনে আয়োডিন রাখার কথা ঘােষণা করেছে। সব জায়গায় নয়। আমাদের পশ্চিম বঙ্গের সমতল অংশে আয়ােডিনযুক্ত লবনের দরকার নেই। তাই আমরা,পশ্চিম বঙ্গবাসীরা  আয়ােডিনযুক্ত লবন থেকে যতটা দুরে সরে থাকতে পারবো ততই মঙ্গল।

তুশারকন্তি গলুই

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক পত্রিকার বর্ষ ৬ সংখ্যা -২ মার্চ-এপ্রিল ২০০৯ থেকে সংগৃহীত ।

WhatsApp Image 2020-06-30 at 23.06.16

Leave a Reply

%d bloggers like this: