মাথাভাঙা চূর্ণী আন্দোলন ।পশ্চিম বাংলার নদী বাঁচাও আন্দোলন । ভারতের পরিবেশ আন্দোলন

@
4.6
(42)

নদী আমাদের কাছে মা আবার সেই নদীই আমাদের আবর্জনা ফেলার জায়গা ! এই কন্ট্রাডিকশন বোধ করি ভারত বলেই সম্ভব । আসলে জলই তো জীবনের অপর নাম,জল ছাড়া প্রাণ সঞ্চার অসম্ভব যদিও একটি টেলিভিশন চ্যানেল বর্তমানে আমাদের কাছে জীবনের অন্য নাম ! যাক সে কথা,আসুন জানা যাক বাংলার এক নদী আন্দোলন এবং তার ইতিহাস ।

মাথাভাঙা নদী যার সৃষ্টি বাংলাদেশ থেকে,এক সময় এটি পদ্মার সঙ্গে যুক্ত ছিলো কিন্তু বর্তমানে সে সংযোগ বিচ্ছিন্ন । যদি ইংরেজি “Y”অক্ষরের সাথে তুলনা করা যায় তাহলে y এর লেজ টি মাথা ভাঙা যা পূর্ব এবং পশ্চিমে দু -ভাগে ভাগ হয়ে গেছে একটি চূর্ণী এবং অপরটি হলো ইছামতি,কোনো মানুষ সৃষ্ট বা প্রাকৃতিক কারণে মাথাভাঙ্গার সাথে ইছামতির সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং বর্ষা কালেই কেবল মাত্র জল স্তর বাড়ার ফলে এই দুটি যুক্ত হয়ে পরে ।

চূর্ণি নদীকে নদিয়ার আন্তঃ জেলা নদী বলা যেতে পারে, এই নদীর জলজ প্রাণ আক্রান্ত ! যার মূল কারণ হলো জল দূষণ । চূর্ণী নদীর সৃষ্টি হয়েছে পাবাখালি অঞ্চল থেকে,এর কিছুটা দূরেই রয়েছে বাংলাদেশ,বাংলাদেশের দর্শনা এলাকায় রয়েছে কেরু & কো । একসময়,এটি বিদেশী একটি কোম্পানি ছিলো কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনরাষ্ট্র হওয়ার পর এর জাতীয়করন ঘটে ।  এই বিশাল কারখানায় আগে আখ থেকে চিনি উৎপাদন চলতো,কিন্তু বর্তমানে মদ,স্পিরিট এই রকম বিভিন্ন প্রায় 16 রকমের জিনিস উৎপন্ন হয় । এই কারখানাই নদীর ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ, এক সময়ে চূর্ণি নদীতে প্রচুর জল থাকতো এবং সেই জল স্তর ছিলো স্বচ্ছ কিন্তু বর্তমানে জলের প্রধান উৎস বৃষ্টির জল এবং সবচেয়ে ক্ষতি কারক হলো ওই কারখানা হতে নির্গত রাসায়নিক মেশা দূষিত জল । ওই কেরু কোম্পানি জল কোনো রকম পরিশ্রুত না করেই,দূষকসহ সে জল চূর্ণি নদীতে নিক্ষেপ করে,যার ফলে শুধু মাছ নয় জলজ সব প্রাণ মারা যায় ।  কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সুকৌশলে এই জল অনির্দিষ্ট সময় অন্তর নিয়মিত ভাবে ছাড়ে । যার ফলে নদীর জীব বৈচিত্র ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে,এমন কি নদীর উপরে পাখি পর্যন্ত উড়তে দেখা যায় না ।  ওই রাসায়নিক মেশা জলের গন্ধ এতোটাই মারাত্মক তীব্র যে নদীর দু- আড়াই কিলোমিটার দূর থেকেও সে গন্ধ সহ্য করা যায় না .  নদী অববাহিকায় বসবাস করা লক্ষাধিক মানুষ এবং চূর্ণী ও মাথাভাঙা মিলিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার নদী পথের প্রায় ১২০ টি গ্রাম সম্পূর্ণ রূপে ক্ষতি গ্রস্থ এবং অধিকাংশ মানুষ ধীবর সম্প্রদায়ের অর্থাৎ যাঁদের জীবিকা হলো নদীর মাছ ধরা,সেই মৎস জীবিদের জীবিকা বিপন্ন,তাঁদের জীবন ধারণের জন্য অন্য জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে ।

এই ছিলো আন্তর্জাতিক এবং প্রধান সমস্যা,এছাড়াও আছে দুটি ভয়ানক সমস্যা প্রথমত, নদীর গতিপথে বাঁধাল দেওয়ার সমস্যা, প্রভাবশালী মৎস্যজীবীরা নদীর মধ্যে জাল এবং বাঁশ দিয়ে বাঁধাল তৈরী করে মাছ ধরে,আবার কখনো কখনো কার্বাইড বা ওই ধরণের কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে মাছ মেরে ফেলে সহজেই সেই মাছ ধরে ।  দ্বিতীয়ত, চূর্ণী নদী ভাগীরথীতে মিশেছে রানাঘাটের কাছে,এই রানাঘাটের সমস্ত বর্জ্য এবং আবর্জনা ও দূষিত জল সরাসরি ড্রেনেজের মাধ্যমে মিশছে চূর্ণীর জলে; এছাড়াও ওই অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক তন্তুবায় মানুষের বাস,তাঁদের বিভিন্ন বর্জ্য এবং সুতো রং সবই মিশছে জলে ফলে আরো বিষিয়ে উঠছে জল । নদীয়ার কল্যাণীর একজন স্কুল শিক্ষক নদী প্রেমী এবং নদী বিশেষজ্ঞ শ্রী অনুপ হালদার আমাদের জানিয়েছেন, যে যাদবপুরের একদল গবেষকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ওই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলে এবং ওখানকার শাক সবজি,ফল মুলে প্রচুর পরিমানে নাইট্রেট এবং বিভিন্ন ভারী ধাতব দূষকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে,আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয় তাঁর অনুমান ওই দূষিত জলই এই সকল ঘটনার কারণ ।

 

এবার আসি আন্দোলনের কথায়, ৮০ এর দশকে প্রথম এই বিষয়টি দৃষ্টি গোচর হতে শুরু করে,৯০  এর দশকের গোড়ায় শুরু হয় আন্দোলন । নদী রক্ষার এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন শ্রী স্বপন ভৌমিক,তৈরী করেন মাথাভাঙ্গা চূর্ণী নদী বাঁচাও কমিটি, বর্তমানে যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৬০০ জন যার অধিকাংশই নদী নির্ভর ধীবর মানুষজন ।  দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি লড়াই করে যাচ্ছেন,তাঁর কথানুযায়ী হয়তো লড়াই এর কোনো সরাসরি বা প্রত্যক্ষ লাভ হয়নি কিন্তু মানুষ প্রকৃতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরী হয়েছে । এতোগুলো মানুষকে নিয়ে এই ধারাবাহিক লড়াই কে সাধুবাদ দিতেই হয়,নদীয়া জেলা ও বাংলার অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তর আন্দোলন এটি ।  এই নদী বাঁচাতে নদী বাঁচাও কমিটি সর্বত্র দরবার করেছেন ঢাকা থেকে দিল্লি,রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত তাঁরা বারম্বার ছুঁটে গিয়েছেন কিন্তু দুঃখের বিষয় আশানুরূপ কিছুই ফল হয়নি ।
২০১৪  সালে তাঁরা প্রথম আদালতের দ্বারস্থ হয়,২০১৬, ১৮ বিভিন্ন রায়ই তাঁদের পক্ষে যায়,এবং সরকার কে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে বলে, ২০২০ সালে জানুয়ারীতে স্বপনবাবু আবার পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হন,ফেব্রুয়ারীতে আদালত রায় দেয় অনতি বিলম্বে ভারত সরকার ব্যবস্থা নিতে হবে ।  তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বপন বাবু  ভারত সরকার তরফে মার্চ ২০২০ একটি চিঠি পান,সেই চিঠির উত্তরের বিষয়বস্তু হলো,ভারতসরকার উক্ত বিষয়টি দেখছেন এবং বাংলাদেশ প্রশাসনের সাথেও আলোচনা চলছে । বর্তমানে এই পরিস্থিতি তে দাঁড়িয়ে আছে এই আন্দোলন ।  The Green Walk -এর পক্ষ থেকেও নদী বাঁচাও আন্দোলনের সমর্থনে চূর্নী নদীর মোহনা থেকে উৎস  হাঁটা হয়েছে ।

 

পরিশেষে বলবো,শুধুই ফলের আশায় না থেকে আমাদের কাজ করে যেতে হবে কারণ লড়াই টা জারি রাখা প্রয়োজন ! স্বপন বাবু ,একজন ৬৫ বছরের পরিবেশ কর্মী আমাদের জানিয়েছেন “ তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অর্থাৎ আমৃত্যু তিনি লড়ে যাবেন নদী বাঁচানোর জন্য”,আমরা তাঁর এই উদ্যোগ কে সন্মান করি ,ভরসা পাই এখনো কিছু মানুষ আছেন যাঁদের কাছে পরিবেশ সন্তানতুল্য,হয়তো এই জন্য শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না !

 

সোর্স – মহানগর , July 30, 2019

এই সময়, 19 Jun 2017

বর্তমান, 13th  February, 2019

– সমসাময়িক পত্র পত্রিকা

মাথাভাঙা চূর্ণী আন্দোলন  ও অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আপনার আরো তথ্য দেওয়ার থাকলে আমাদের জানান । Mail – poribesnews@gmail.com

 

লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 42

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

মানুষের দয়ায় পৃথিবী বেঁচে থাকবে না

4.6 (42) সমস্ত পৃথিবীই একটা সমাজ, এক বৃহৎ সমাজের মধ্যে কোটি কোটি সমাজ গড়ে উঠেছে , যেগুলি স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতির নিয়মেই গড়ে উঠেছে – প্রকৃতির উপাদানগুলি যেমন – গাছ পালা, নদী নালা, পাহাড় সমুদ্র, পশু পাখি, মানুষ প্রভৃতির মধ্যে যেকোন একটি বা একাধিক যদি নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে যায় – বিবর্তনের ধারায় […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: