সমাজ শিক্ষক উইপােকা

1.5
(2)

“উই আর ইদুরের দেখ ব্যবহার
যাহা পায় তাহা করে কেটে ছারখার।”

আসুন এবার দেখা যাক ‘উইপোকার’  ‘উই’-এর ব্যবহার সত্যি সত্যিই এমন ন্যক্কারজনক কিনা!

মানুষের ভারি গর্ব যে, সে সমাজবদ্ধ জীব, সমাজের নিয়মকানুন, আদবকায়দা সবই মেনে
চলে, কিন্তু প্রকৃত দলগত ও সামাজিক ঐক্য মানুষের মধ্যে কতটুকুই বা আছে – যা আছে পতঙ্গ
শ্রেণীর প্রাণী উইপােকাদের মধ্যে?

উইপোকার তাড়াতে, ঘরোয়া 'পেস্ট ...

আপনারা হয়তঅনেকেই জানেন দলগত ঐক্যের দিক থেকে পতঙ্গ শ্রেণীর কিছু কিছু প্রাণী শ্রেষ্ঠত্বের
দাবী রাখে। এমনই একটি দলবদ্ধ সামাজিক পতঙ্গ হল আমাদের সবার পরিচিত পতঙ্গ ।

উইপােকা পরিবার

উইপােকা আইসপ্টেরা( Isoptera) ,এদের প্রজাতি সংখ্যা কয়েক হাজার। এদের মত এত বড় পরিবার কেউ গঠন করতে পারে না। সংখ্যায় লক্ষ লক্ষ কিন্তু তবুও দলের মধ্যে ঝগড়াঝাটি, মারপিট, হাঙ্গামা কিছুই হয় না, এরা সবাই দলের হয়েই কাজ করে।

দলের স্বার্থে আত্মত্যাগ করে, ভালাে মন্দটা নিজের জন্য রাখার মানসিকতাও নেই এদের। ধর্মের বন্ধন বা জারিজুরি এদের লাগে না –মানুষ কেন এমন পারে না।

উইপোকা, মানুষের থেকে ভাল ইঞ্জিনিয়ার

মানুষ তার নিজের উয়তার তুলনায় কতই বা বড় এবং উচু বাড়ি বানায় ? উইপােকারা বাড়ি বানায় নিজেদের উইকার হাজার গুন বড়, দেখতে যেন চুড়ওয়ালা মন্দির। এর মধ্যে অসংখ্য কুঠুরি, কোনটি রানীর জন্য, কোনটি ডিম রাখার জন্য, কোনটি খাবার রাখার জন্য প্রভৃতি বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত
হয়,

উইপোকার বাড়ি

উইপোকারা কেউ অলস নয়, সবাই দক্ষ কারিগর, প্রশস্ত ঘরে বাস করে,  প্রয়ােজন পড়লেই নতুন নতুন কুঠুরি বানিয়ে নেয়, কখনও মাটির নীচে, কখনও ভিজে জায়গায়, কখনও বাঁশ, কাঠ, খকে অবলম্বন করে বাসা বানায়।

মরুময়তা ঠেকায় উইপোকা
উইপোকার বাড়ি

উইপোকার চোখ ও যোগাযোগ

উইপােকাদের চোখ নেই, দেখতে পায় না, দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে,ভাব বিনময় করতে, শত্রুর মােকাবিলা করতে এক ধরণের মৃদু সৌরভ ছড়ায় যাকে বলে ফেরোমন’ এটি নির্গত হয় এদের দেহের বিশেষ একটি গ্রন্থি থেকে, বিনা কথায়, বিনা ডাক ব্যবস্থায় এমন অদ্ভুত যােগাযোগ মানুষের কাছে এক

উইপোকার খাবার

উইপােকারা খায় কাঠ, খড়-সবাই উদ্ভিজ উপাদান। হজম করতে পারে না বলে একজাতীয় ব্যাকটেরিয়াকে (মানুষেরও এদের লাগে হজম করতে) অন্ত্রে আশ্রয় দেয় – এরাই কাঠ খড়কে ওদের খাদ্য উপযােগী করে তােলে, পরিবর্তে উইপােকাদের অন্ত্রে নিরাপদে বাস করে থাকে। এই সহাবস্থান নীতিও বড়
আশ্চর্যের।

উইপোকার সামাজিক বিন্যাস

দলের মধ্যে চার শ্রেণীর উইপােকা থাকে-পুরুষ, রানী, কর্মী ও রক্ষী। পুরুষ ও রানীর পাখনা থাকে, কর্মী ও রক্ষীদের থাকেনা, একমাত্র রানী ডিম পাড়তে পারে। একটি রানী সারা জীবনে ১০ লক্ষের মত ডিম পারতে
পারে।

উইপােকা আত্মরক্ষার কৌশল

এদের আত্মরক্ষার কৌশলটিও ভারি চমৎকার, কেউ কামড়ে দিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করে, কোন প্রজাতির মাথায় থাকে ধারালাে এক উপাঙ্গ, আবার কোন প্রজাতি শত্রুর দিকে বিষাক্ত এক ধরণের তরল ছুঁড়ে মারে।

উইপােকার ইতিহাস

এদের আবির্ভাব ঘটেছিল ‘ইওসিন’ যুগ অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি বছর আগে। বিবর্তনের পথ ধরে নানা রূপান্তরের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, আজকের এই পরিচিত পতঙ্গটি।

উইপোকার উপকারিতা

এদের আমরা ক্ষতিকর পতঙ্গ রূপেই গন্য করে থাকি।ক্ষতি করলেও উপকারও যে কিছু করে না, এমন নয়।উইপোকা খাবার হিসাবে কাঠ, খড় প্রভৃতি উপাদানকে যৌগিক পদার্থে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতিরই বুকে এবং উদ্ভিদের বংশবিস্তারের পথকে সুগম করে।

উইপােকার পাখা

উইপােকারা মাঝে মাঝে গর্ত ছেড়ে বেড়িয়ে এসে আকাশে উড়তে থাকে জৈবিক তাড়নায়। আকাশে রানীরা পুরুষ সঙ্গীকে নির্বাচন করে।

উই পোকার বুদ্ধিমত্তা – Intelligence of Termite ...

এই সময়ই অধিকাংশ পােকারা পাখীদের পেটে যায়, জলে কাদায় প্রাণ হারায়, কেউবা পতঙ্গভুকদের শিকার হয়।

উইপােকার ডিম

নির্বাচন শেষে যারা বেঁচে থাকে, তারা বাসায় ফিরে আসে, ডিম পাড়ার সময় হলে রানী উইপােকার দেহের আয়তন বেড়ে যায়। প্রথমে রানীকর্মী ও রক্ষীর জন্ম দেয় ও পরে জন্ম নেয় পক্ষধারী পুরুষ ও রানী।

উইপােকার রানী

উইপােকদের জীবন খুবই সাদামাটা, পতঙ্গ হলেও স্বভাবে এরা খুবই উদার।রানীর আদেশে কর্মী ও রক্ষীরা  কাজ করে রানী ঝগড়াটে নয়, পতিপ্রেমে রানীর জুড়ি নেই, বাসায় নতুন রানী এলেও প্রতিবাদ করে না। নতুন রানীও ঐ বাসায় ডিম পাড়ে ও বংশবিস্তার করে।

উই পোকার বুদ্ধিমত্তা – Intelligence of Termite ...

উইপােকাদের  কর্তব্যপরায়নতা

রনী ও কর্মীরা বৃদ্ধ রাজা ও রানীকে তাদের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সযত্নে প্রতিপালন করে। অধুনা মনুষ্য সমাজে, বৃদ্ধ বাবা মায়েদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবার মানসিকতা (আমেরিকান দর্শণ ও জীবনচর্চার ভ্রষ্ট অনুকরণ) থাকে কিন্তু এরা বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি কর্তব্যের কথা কখনও ভুলে যায় না এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত দলের হয়েই কাজ করে।

ডিম পাড়তে অক্ষম হয়ে গেলে রানীকে তাড়িয়েও দেয়না। উইপােকাদের এই কর্তব্যপরায়নতা
থেকে মনুষ্য সমাজকে লজ্জা থেকে রেহাই পেতে শিখতে হবে।

এরা কি মানুষের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে পারে না, যে—“তােমরা প্রাণী জগতের শ্রেষ্ঠতর জীব হতে পারে কিন্তু আমরাও তােমাদের চেয়ে কম নয়।”

অবশেষে

রচনার শেষে জানাতে চাই এদের জন্য, রচনাটির প্রারম্ভে উল্লেখিত ‘কবিতাটি’ যতটা কৌতুক সঞ্চার করে। এদের জীবনচর্চা কিন্তু ততখানি হেয় করার নয়। এদের জীবন যাত্রা মনুষ্য সমাজকে শিক্ষা দেবার ক্ষমতা রাখে।
অবিজ্ঞের মত এদের কীটনাশক দিয়ে বিনাশ করতে গিয়ে আমরা বরং পরিবেশের ভয়ংকর সর্বনাশ করছি।

তথ্য সূত্রঃ

১) পতঙ্গ রাজ্যের অভিনব রূপকথা —সুধাংশু পাত্র।
২) জীববিজ্ঞান – চৌধুরী, সাঁতরা।
৩) বংশগতি ও অভিযােজন —সাঁতরা।

লেখিকাঃ পারুল দাস

লেখাটি বিজ্ঞান আন্বেষক পত্রিকার বর্ষ-১১, সংখ্যা -৫সেপটেম্বর-অক্টোবর/২০১৪ থেকে সংগৃহীত

WhatsApp Image 2020-07-02 at 20.27.41

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 1.5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বাঘ সংরক্ষণের উপায়

1.5 (2) ভারত বিশ্বের অন্যতম বন্যপ্রাণী বৈচিত্র সম্পন্ন দেশ। সারা পৃথিবীতে আবিষ্কৃত প্রায় ১৬ লক্ষ প্রজাতির মধ্যে ভারতে প্রাপ্ত প্রজাতির সংখ্যা ৪ লক্ষ প্রায় যা সারা পৃথিবীর ৮ শতাংশ। বিশ্বের বারটি মহা বৈচিত্র্য Mega Diversity যুক্ত অঞ্চলের মধ্যে দুটিই রয়েছে এই দেশেই। এই মুহুতে ভারতে প্রায় ২৫,০০০  প্রজাতির মাছ, ১৮২টি […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: