রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চেতনা

5
(1)

বিজ্ঞানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগ তার বিভিন্ন রচনায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাবে উপস্থিত।
প্রকৃতি ও মানব অনুভূতি সমূহের যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ তার বিজ্ঞানমনষ্কতার স্বাক্ষর রাখে।

প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যেমন বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্তি প্রয়ােজন, একই ভাবে প্রথাবহির্ভূত যে জনশিক্ষা
সেখানেও বিজ্ঞানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান আনে মুক্তি—– তমসা থেকে, জড়তা থেকে, অন্ধতা থেকে মুক্তি।

Rabindranath Tagore | Biography & Facts | Britannica

সে মুক্তি শুধু ব্যক্তি মানুষের ক্রিয়াকলাপেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সমাজের সর্বস্তরে তার প্রতিফলন ঘটে। এ
কথাও উপলব্ধি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
“পশ্চিম দেশে পােলিটিক্যাল স্বাতন্ত্রের যথার্থ বিকাশ হতে আরম্ভ হয়েছে কখন থেকে? অর্থাৎ, কখন থেকে দেশের সকল লােক এই কথা বুঝেছে, যে রাষ্ট্রনিয়ম ব্যক্তি বিশেষের বা সম্প্রদায় বিশেষের খেয়ালের জিনিস নয়, সেই নিয়মের সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের সম্মতির সম্বন্ধ আছে? যখন থেকে বিজ্ঞানের আলােচনায় তাদের মনকে ভয়মুক্ত করেছে।” (শিক্ষার মিলন)

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চর্চার কথা গুঠলে প্রথমেই মনে পড়ে যায় ‘বিশ্বপরিচয়’-এর কথা। এই প্রবন্ধ সংগ্রহটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন স্নেহাস্পদ বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে।

মুখবন্ধে প্রবন্ধটি রচনার উদ্দেশ্যে সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন-“শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গােড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভান্ডারে না হােক, বিজ্ঞানের আঙ্গিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে তাতে অগৌরব
নেই।”

তার আলােচনা তিনি সীমাবদ্ধ রেখেছেন পরমানুলােক,নক্ষত্রলােক, সৌরজগৎ, গ্রহলােক এবং ভূলােক— এই কটি বিষয়ের মধ্যে। রচনাটি সাধারণের হাতে তুলে দেওয়ার বিশেষ উদ্দেশ্যটি ছিল সাধারণের মধ্যে
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করা।

যা তার নিজের ভাষায়—“বিজ্ঞানচর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরাে জিনিসগুলি কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্তভূমিতে অবৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে বৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়। কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতার্থ করে রাখছে।’

“বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের নক্ষত্রলােক প্রবন্ধে তিনি বর্ণনা করেছেন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যার প্রথম প্রকাশ ১৯১৬ সালে তিনি লিখেছেন, ‘বস্তুমাত্র যে আকাশে থাকে তার একটা বাঁকানাে
গুণ আছে, মহাকর্যে তারই প্রকাশ। এটা সর্বব্যপী, এটা অপরিবর্তনীয়। এমনকি আলােককেও এই বাকা বিশ্বের ধারা মানতে হয়, তার নানা প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যকার ...

রবীন্দ্রনাথ শুনিয়েছেন সেকিড তারার সাহায্যে কী করে বার করা যায় তারার দূরত্ব। তিনি লিখেছেন, “একদল তারা আছে তাদের দীপ্তি বাইরের কোনাে জোয়ার-ভাটায়, একবার কমে একবার বাড়ে।…এদের
নাম হয়েছে সিফাউডস। এদের খোঁজ পাওয়ার পর থেকে নক্ষত্র জগতের দূরত্ব বের করার একটা মস্ত সুবিধা হয়েছে।” দূরত্ব বার করার উপায় প্রস্তাবিত হয়েছিল ১৯১২ সালে হেনরিয়েটা লেয়াভিট-এর গবেষণায়।

মহাবিশ্ব যে প্রসারমান, সে কথা তিনি বলেছেন। “কাছের দুটো-তিনটে ছাড়া বাকী নক্ষত্র জগৎগুলাে আমাদের জগতের কাছ থেকে কেবলই সরে ঢলেছে।…এইসব নক্ষত্র জগতের সৃষ্টি নিয়ে যে বিশ্বকে
আমরা জানি,.. সে ক্রমশই ফুলে উঠছে।” একথা জানা গিয়েছিল ১৯২৯ সালে এডউইন হালএর পর্যবেক্ষণ থেকে।

পরমাণুলােকের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন মেঘনাদ সাহার আবিষ্কৃত একটি সূত্র ব্যবহার করে কী করে সূর্যে বিভিন্ন পরমাণুর সন্ধান পাওয়া গেছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘তাঁর পথ বেয়ে প্রায় সবগুলিরই গৰৰ
মিলেছে। আজও যেগুলি গরঠিকানা, মাঝপথেই পৃথিবীর হাওয়া তাদের সংবাদ শুষে নেয়’। এই সূত্র এবং তার সম্ভাব্য প্রয়ােগের কথা মেঘনাদ সাহা আলােচনা করেছিলেন ১৯২০-২১ সালে লেখা কয়েকটি
গবেষণাপত্রে।

রবীন্দ্রনাথ পাঠককে পজিট্রন কণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তার ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের ‘পরমাণুলােক‘ প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, মােটের উপরে সব ইলেকট্রনই না-ধর্মী বটে, কিন্তু এমন এক জাতের ইলেকট্রন ধরা পড়েছে যারা হাঁ-ধৰ্মী, অথচ ওজনে ইলেকট্রনেরই সমান। এদের নাম দেওয়া হয়েছে পজিট্রন।’ রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন ১৯৩৮ সালে, পজিট্রন কণা আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৩৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনােলজিতে। আবিষ্কার করেছিলেন সিডি অ্যান্ডারসন।

এখানে বুঝতে হবে যে, বিজ্ঞান জগতের সর্বাধুনিক আবিষ্কার সম্বন্ধে তিনি কতখানি ওয়াকিবহাল থাকতেন। নিউট্রন কণা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “কখনাে কখনাে দেখা গেছে বিশেষ হাইড্রোজেনের পরমাণু সাধারনের চেয়ে ডবল ভারী। পরীক্ষায় বেরিয়ে পড়ল কেন্দ্রস্থলেই প্রােটনের সঙ্গে আছে তার এক
সহযােগী। পূর্বেই বলেছি প্রােটন হাঁ-ধর্মী। তার কেন্দ্রের শরিকটিকে পরখ করে দেখা গেল সে সাম্যধর্মী, হাঁ-ধর্মীও নয়, না-ধর্মীও নয়। অতএব সে বিদ্যুৎ ধর্ম বর্জিত।…এই কণার নাম দেওয়া হয়েছে নিউট্রন।”

 

নিউট্রন কণা আবিষ্কৃত হয় ১৯৩২ সালে। আবিষ্কার করেন জেমস স্যাডউইক। আলােকের তরঙ্গ-ধর্ম ও কণা-ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে রবীন্দ্রনাথ কত সহজ করে সাবলীলভাবে ব্যক্ত করেছেন, তার
‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের পরমাণুলােক’ প্রবন্ধে।

‘আকাশে আলাের এই চলাচলের খবর পেয়ে বিজ্ঞানে একটা প্রশ্ন উঠল, তার চলার ভঙ্গীটা কি রকম। সেও এক আশ্চর্য কথা। উত্তর পাওয়া গেছে, তার চলা অতি সূক্ষ্ম ঢেউয়ের মতাে। কিসের ঢেউ সে
কথা ভেবে পাওয়া যায় না; কেবল আলাের ব্যবহার থেকে এটা মােটামুটি জানা গেছে—ওটা ঢেউ বটে। কিন্তু মানুষের মনকে হয়রান করবার জন্যে সঙ্গে সঙ্গেই একটা জুড়ি খবর তার সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে
হাজির হল, জানিয়ে দিলে আলাে অসংখ্য জ্যোতিষ্কণা নিয়ে; অতি খুদে ছিটে গুলির মতাে ক্রমাগত তার বর্ষণ। এই দুটো উলটো খবরের মিলন হল কোন্‌খানে তা ভেবে পাওয়া যায় না। এর চেয়েও আশ্চর্য
একটা পরম্পর উলটো কথা আছে সে হচ্ছে এই যে, বাইরে যেটা ঘটছে সেটা একটা কিছু ঢেউ আর বর্ষণ, আর ভিতরে আমরা যা পাচ্ছি তা না এটা, না-ওটা, তাকে আমরা বলি আলাে-এর মানে কী, কোনাে
পন্ডিত তা বলতে পারলেন না।”

নক্ষত্রের আলাের উৎস আলােচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ইলেকট্রন-প্রােটনের যােগে যদি কখনাে একটি হিলিয়ামের পরমাণু সৃষ্টি করা যায় তা হলে সেই সৃষ্টিকার্যে যে প্রচন্ড তেজের উদ্ভব হবে
তার আঘাতে আমাদের পৃথিবীতে এক সর্বনাশী প্রলয়কান্ড ঘটবে।..এই
রকম কান্ডটাই ঘটছে নক্ষত্রমন্ডলীর মধ্যে।” (সৌরজগৎ / বিশ্বপরিচয়)

মহাকাশ ও তার গ্রহ-নক্ষত্ররাজি কবি মনে গভীর প্রভাব বিস্তার
করেছিল। একাধিক রচনায় আমরা তার প্রকাশ দেখতে পাই—
“….ওই যে সুদূর নীহারিকা
           যারা করে আছে ভিড়
আকাশের নীড়,
         ওই যারা দিনরাত্রি
আলাে-হাতে চালিয়াছে আঁধারের যাত্রী।
গহ তালা রবি….”     (ছবি/বলাকা)

অথবা

“আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মাের স্থান।”

উভয় ক্ষেত্রেই তিনি অপার বিস্ময়ে, মহাজাগতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জাগতিক কর্মকান্ডের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
প্রাণের প্রথম সৃষ্টির দিনে প্রাণীকুলের রক্ষণের দায়িত্ব যাঁর সেই সূর্য প্রথম প্রাণের জন্ম পরিচয় জানতে চেয়েছিল, পারেনি। সূর্যাস্তের এক শান্ত সন্ধ্যায় এসেও কিন্তু সেই রহস্য তার কাছে অনাবৃত হল না।

“প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে,
কে তুমি—
মেলে নি উত্তর।

বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে ,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
কে তুমি—
পেল না উত্তর”

(প্রথম দিনের সূর্য/ শেষ লেখা)

রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের বর্তমান পরিমন্ডল এবং গঠন সম্বন্ধে এক কাব্যিক বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন।
শুনেছি একদিন চাঁদের  দেহ ঘিরে

ছিল হাওয়ার আর্বত।
তখন ছিল তার রঙের শিল্প,

ছিল সুরের মন্ত্র,
ছিল সে নিত্য নবীন।

দিনে দিনে উদাসী কেন ঘুচিয়ে দিল
আপন লীলার প্রবাহ।

কেন হল সে আপনার মাধুর্যকে নিয়ে।
আজ শুধু তার মধ্যে আছে/

আলােছায়ার মৈত্রীবিহীন দ্বন্দ্ব
ফোটে না ফুল,

বহে না কলমুখরা নিঝরিনী।”—(উদাসীন পত্রপুট)

পল্লীগ্রাম ছিল রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি। গ্রামের উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানের প্রয়ােগের প্রয়ােজনীয়তা তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। পল্লী প্রকৃতি’ প্রবন্ধে পল্লী সমাজের উন্নয়নের আলােচনা
প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন-

বিজ্ঞান মানুষকে মহাশক্তি দিয়েছে। সেইশক্তি যখন সমস্ত সমাজের হয়ে কাজ করবে তখনি সত্যযুগ আসবে।”

বােলপুরের কাছে শ্রীনিকেতনে কৃষি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে, গ্রামীন মানুষের কাছে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন এবং নিজ পুত্র
রথীন্দ্রনাথকে কৃষি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে প্রেরণও করেছিলেন।

রাশিয়ার চিঠিতে তিনি বিজ্ঞানের প্রয়ােগের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশীর সঙ্গে সঙ্গে হাতে কলমে কাজ ও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার প্রয়ােজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
‘বিজ্ঞান শিক্ষায় পুঁথির পড়ার সঙ্গে চোখের দেখার যােগ থাকা চাই, নইলে সে শিক্ষার বারাে আনা ফঁাকি৷ শুধু বিজ্ঞান কেন, অধিকাংশ শিক্ষাতেই এ কথা খাটে।”

প্রবন্ধ শেষ করব। রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান-ভাবনার এমন হাজারাে নজির ছড়িয়ে আছে তার লেখায় লেখায়। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন একজন কুসংস্কার মুক্ত, বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ।

গােবিন্দ দাস

লেখাটি বিজ্ঞান আন্বেষক পত্রিকার বর্ষ-৭, সংখ্যা- ৬,নভেম্বর-ডিসেম্বর /২০১০ থেকে সংগৃহীত।

WhatsApp Image 2020-07-01 at 16.11.30(1)

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

হারিয়ে যাচ্ছে পরিচিত দেশি মাছ

5 (1) সব যেন বদলে যাছে। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। আজ যা দেখলাম। কাল তা দেখব কিনা বলা মুস্কিল। বহু উদ্ভিদ প্রানী হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। বিবর্তনে যারা প্রকৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না তারাই হারিয়ে যায়। যেমন হারিয়ে গেছে ‘ডাইনােসর’, হারিয়ে গেছে আর্কিওপটেরিক্স ইত্যাদট প্রাণী। মাছেদের মধ্যে বিরল প্রজাতি, […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: