প্রাণীবাহিত মানুষের রােগ

poribes news
0
(0)

প্রাণীবাহিত মানুষের রােগ
ইদানীংকালে জীবাণু সংক্রান্ত মহামারীর খবর সংবাদ মাধ্যমের একটা অংশ দখল করে নিচ্ছে। সাম্প্রতিককালে ঘটা সােয়াইন ফ্লু, ‘ইবােলা অথবা তারও আগে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া,
বার্ড ফ্লু, সারস জনমানসে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বলতে দ্বিধা নেই, এদের মধ্যে বা এদের চেয়েও অনেক বেশি মারণক্ষম জীবাণুঘটিত রােগ আমাদের রাজ্যে তথা দেশে বহাল তবিয়তে বহু শতক যাবৎ আছে ও বহু মানুষকে আক্রান্ত করছে এবং মেরেও ফেলছে।

‘মাল্টি ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট’ টিবি, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরার মতাে রােগে বহু মানুষের
মৃত্যু আমাদের কাছে যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। এখন স্বল্প পরিসরে কতগুলাে উল্লেখযােগ্য
প্রাণীবাহিত মানুষের রােগ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

জাপানি এনকেফালাইটিস

জাপানিস এনকেফেলাইটিস 1817 সালে জাপানে প্রথম নথিভুক্ত হলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা এর প্রাদুর্ভাব আগেও ছিল।

এটি একটি মশাবাহিত ভাইরাসঘটিত মানুষ ও ঘােড়ার মস্তিষ্কের প্রদাহ সৃষ্টিকারী রােগ। এই রােগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসটি ‘ফ্ল্যাভিভিরিডি’ পরিবারের একটি একতন্ত্রী আর এন এ ভাইরাস।

এর গঠন অনেকটা ‘কিউবিক্যাল’। এরা বক (হেরন) জাতীয় বন্যপাখি ও বিশেষ প্রজাতির কিউলেক্স (ট্রাইটিনিওরিঙ্কাস, বিষ্ণুই, গেলিডাস প্রভৃতি) মশার মধ্যে চলাচল করে।

তবে ঐ জাতীয় পাখিতে রােগ লক্ষণ তৈরি করে না। এই ভাইরাস পাখির রক্তে থাকাকালীন মশার কামড়ের মধ্যে দিয়ে চলে আসে মশার দেহে।

2: JE virus transmission cycle ( This figure was reproduced from ...

বংশবিস্তার করে ও সংখ্যায় বাড়ে। পরে এ ধরনের ভাইরাস বহনকারী মশা যখন অন্যান্য প্রাণী বা মানুষকে কামড়ায়, তার দেহে (রক্তে) ভাইরাস প্রবেশ করার সুযােগ পায়।

এরা (ভাইরাস) রক্তের শ্বেতকণিকার মধ্যে ঢুকে পড়ার প্রবণতা দেখায়। বিশেষত লিম্ফোসাইট কোশে আশ্রয় নিয়ে রক্ত সংবহন তরে ঘুরে বেড়ায়। এই অবস্থাকে ‘ভাইরিমিয়া বলে। এর সময়কাল বিভিন্ন
প্রাণীতে বিভিন্ন।

গবাদি পশুর ক্ষেত্রে, এমনকি ঘােড়াতে এবং মানুষে তা 1-2 দিন মাত্র। অথচ শূকরে এটি প্রায় 10 দিন পর্যন্ত। এ সময়ে এরা ‘রেপলিকেশন’ করে সংখ্যায় বাড়ে। বেশিদিন পর্যন্ত রক্তে এদের উপস্থিতি মশার মাধ্যমে অন্যান্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়তে সহায়ক হয়।

সেজন্য শূকরপ্রজাতিকে রােগবর্ধক পােষক (অ্যামপ্লিফায়ার হােস্ট) বলা হয়। অন্যদিকে, বক
জাতীয় পাখি হল এই ভাইরাসের স্বাভাবিক পােষক (ন্যাচারাল হােস্ট)।উল্লেখযােগ্য বিষয় হল,
গবাদি পশুর মধ্যে এই ভাইরাস খুব বেশি দিন বাঁচতে পারে না।

মশার কামড়ের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করলেও এরা ব্লাড-ব্রেন বেরিয়ার পার করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে । পক্ষান্তরে, দেহজ প্রতিরক্ষাতন্ত্রের কোশ, বিশেষত ম্যাক্রোফাজ এদের মেরে ফেলতে
পারে এবং ধীরে ধীরে ভাইরাসের বংশ ধ্বংস হয়।

এই সমস্ত প্রাণীতে ‘ভাইরিমিক দশা’অর্থাৎ রক্তে ঘােরাঘুরির সময়কাল একদিনের কম সময় বলে রােগ ছড়ানাের ক্ষেত্রেও এদের দায়ী করা যায় না। অর্থাৎ কিছুটা হলেও গবাদি প্রাণী ভাইরাস দমনের মধ্যে দিয়ে এই রােগ নির্মূলনে রক্ষীর কাজ করে।

জাপানিস এনকেফেলাইটিস ভাইরাসটির আসল লক্ষ স্নায়ুতন্ত্রের কোশ। এরা নিউরােট্রপিক। রক্তবাহনালীর আচ্ছাদিত কোশরাশি (এন্ডােথেলিয়াল সেল)-এর মধ্যে দিয়ে রক্ত ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রাচীর (ব্লাড-ব্রেন বেরিয়ার) ভেদ করে ‘রিসেপ্টর মেডিয়েটেড এন্ডােসাইটোসিস’ পদ্ধতির মাধ্যমে মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে।

এই ভাইরাসের বাড়-বৃদ্ধির জায়গা হল মস্তিষ্কের থ্যালামাস, মেডুলা অবলাংগাটা, পনস, সাবস্ট্যানশিয়া নায়গ্রা নামক অঞ্চল।

এই সময়ে মস্তিষ্কের অ্যাস্ট্রোসাইট ও মাইক্রোগ্লায়ার কোশ আক্রান্ত হয়। এই সমস্ত কোশ নিঃসৃত কিছু বিশেষ ক্ষতিকারক জীবাণু দেহজ মস্তিষ্ক কোশের মৃত্যু ঘটায়।

এর সাথে পার্শ্ববর্তী কিছু কোশকে আকর্ষণের মাধ্যমে প্রদাহের সৃষ্টি করে। পরিভাষায় একেই বলে
এনকেফেলাইটিস।

যক্ষ্মা 

বর্তমানে মানুষের যক্ষ্মারােগের সাথে সাথে প্রাণীদেহে যক্ষ্মা পরিস্থিতিকে আরাে জটিল করে তুলেছে। আসলে যক্ষ্মা একটি ‘জুনােটিক’ রােগ। অর্থাৎ প্রাণীবাহিত মানুষের রােগ।

প্রাণী ও মানুষের যক্ষ্মা সৃষ্টিকারী জীবাণুটি একটি ব্যাকটেরিয়া। মানুষের ক্ষেত্রে মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলােসিস; গবাদি প্রাণীর ক্ষেত্রে মাইকোব্যাকটেরিয়াম
বােভিস্ আর পাখিদের ক্ষেত্রে মাইকোব্যাকটেরিয়াম এভিয়া।

২৪ মার্চ - বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস ...

মাইকোব্যাকটেরিয়ামের অনেকগুলাে প্রজাতির মধ্যে বেশির ভাগ কিন্তু রােগ সৃষ্টিকারী নয়। তবে মানুষের যক্ষ্মা সৃষ্টিকারী মাইকোব্যাকটেরিয়ামকে বলে হিউম্যান টাইপ, গবাদি প্রাণীর বােভাইন টাইপ,
মুরগি সহ পাখিদের এভিয়ান টাইপ, ইদুরের মুরাইন টাইপ ইত্যাদি।

মানুষের যক্ষ্মা হয় মূলত হিউম্যান টাইপের মাধ্যমে, তবে বােভাইন টাইপও রােগ সৃষ্টি করতে পারে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (গরু-মােষ, ঘােড়া, ভেড়া, কুকুর, বেড়াল) যক্ষ্মা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়
বােভাইন টাইপ ঘটায়।

তবে খুব কম হলেও হিউম্যান টাইপ রােগের কারণ হতে পারে। পাখিদের যক্ষ্মার জন্য মূলত এভিয়ান টাইপই দায়ী। মানুষ ও গবাদি প্রাণীর যক্ষ্মা শ্বাস- প্রশ্বাস ও খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে সংক্রামিত হয়। মুরগির ক্ষেত্রে সেটা জল ও খাদ্যের মাধ্যমে।

যক্ষ্মারােগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফুসফুস (শ্বাসযন্ত্র) আক্রান্ত হয়। একে ‘পালমােনারি টিউবারকিউলােসিস বলে। তবে ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা বা ‘একা পালমােনারি টিউবারকিউলােসিস’ অন্ত্রে, বৃকে, পাকস্থলীতে, অস্থিতে, জননঅঙ্গে, স্নায়ুতন্তে, এমনকি ত্বকেও হতে পারে।

এক্ষেত্রে জীবাণুগুলাে রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, বাসা বাঁধে ও বংশবৃদ্ধি করে। সাথে সাথে সে সমস্ত অঙ্গে রােগ বিস্তার করে।

যক্ষ্মার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আক্রান্ত অঙ্গে গুটি (নােডিউল) তৈরি করা। এগুলি কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে
ছােটো মিলেট দানার মতাে হতে পারে (মিলিয়ারি টি বি)। নােডিউলে ব্যাকটেরিয়া ছাড়া দেখা
যায় বিভিন্ন কোশের আধিক্য এবং ক্যালশিয়ামের উপস্থিতি।

কোশগুলাের মধ্যে নিউট্রোফিল, লিম্ফোসাইট ও ম্যাক্রোফেজ তত থাকেই। এছাড়া থাকে এপিথেলয়েড় কোশ ও বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত দৈত্যাকার কোশ (জায়েন্ট সেল)।

যক্ষ্মা রোগের লক্ষন | TB Lung সেবা

ফুসফুসের যক্ষ্মায় শ্বাসনালী ও ফুসফুসে পার্শ্ববর্তী লিম্ফনােড এবং ফুসফুসের অ্যালভিওলাই-এ এই সমস্ত নােডিউল বেশি চোখে পড়ে। এছাড়া পুরা ও পেরিটোনিয়ামেও দেখা যেতে পারে।

মুরগির নােডিউল যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় ও অস্ত্রে বেশি দেখা যায়। ফুসফুসে খুব কমই নজরে আসে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালাে যে ছাগল ও ভেড়ার যক্ষ্মা খুবই কম দেখা যায় এবং কুকুর, বিড়ালের যক্ষ্মার হারও ভয়াবহ নয়।
গবাদি প্রাণীর যক্ষ্মা মূলত বাতাসবাহিত জলকণার মাধ্যমে সংক্রামিত হয় (এরােসল ইনফেকশন)।

মানুষের মতাে গবাদি প্রাণীর যক্ষ্মাতেও রােগ লক্ষণ হিসাবে কম উষ্ণতায় জ্বর হয়। শ্বাসকষ্ট, শুকনাে কাশি, রােগা হয়ে যাওয়া, গাভির ক্ষেত্রে কম দুধ উৎপাদন ইত্যাদি চোখে পড়ে। মােটের ওপর যক্ষ্মা একটি ক্রনিক ক্ষয়রােগ।

এ যেন ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুরগির ক্ষেত্রে কম ডিম উৎপাদন, ক্রমাগত রােগা হয়ে যাওয়া ও কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে পাতলা পায়খানা ও মৃত্যু দেখা যায়। গবাদি প্রাণীর দেহের মধ্যে রােগ বিস্তার (ডিসিস স্পেক্ট্রাম) বেশ কয়েক মাস ব্যাপী হয়। এটা 6 থেকে 9 মাস পর্যন্ত হতে পারে।
কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে সেটা একবছরও ছাড়িয়ে যায়।

রেবিস বা জলাতঙ্ক

রেবিস বা জলাতঙ্ক একটা ভাইরাসঘটিত রােগ। এই রােগ কুকুর, শেয়াল প্রভৃতি প্রাণীর লালারসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরা যখন মানুষকে কামড়ায় মানুষও এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এই ভাইরাস স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে।

মানুষ বা প্রাণীর ত্বক, মাংস বা রক্তের মধ্যে ভাইরাস এসে পড়লে, শেষ পর্যন্ত নিউরােনের মধ্যে ঢুকে পড়ে
ও স্পাইনাল কর্ডের মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে পোঁছােয়। পরবর্তীকালে, সেখান থেকে অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে লালাগ্রন্থিতেও চলে আসে। আর তাই লালারসের মধ্যে ভাইরাস
মিশে যায়।

২৮ সেপ্টেম্বরঃ বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ...

এটা হতে অবশ্য কিছুটা সময় লাগে। সেটা কয়েকদিন থেকে কয়েকমাস এমনকি
কয়েক বছরও হতে পারে। কুকুরের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট নজরে পড়ে। প্রথমটা—স্টেজ অব মেলানকোলি’ বা নির্লিপ্ত দশা।

এই সময়ে সে তার প্রভুকেও চিনতে পারে না। অদ্ভুত ব্যবহার করে। ঘরের কোণে চুপচাপ বসে
থাকে। এমনটা 2-3 দিন ধরে চলে। এরপর ‘স্টে অ এক্সাইটমেন্ট’ বা উত্তেজিত দশা। এই
সময় কুকুরটি পাগলের মতাে লক্ষহীনভাবে এদিক ওদিক ছুটে চলে। সব কিছুই কামড়াতে চায়।
খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়।

সব সময় ভীষণ উত্তেজিত থাকে। 3-4 দিন এটা লক্ষ করা যায়। এইসময়ে এরা যাকে সামনে পায়, তাকেই কামড়ায়। ইট, কাঠ, লােহা, কোনাে প্রাণী, এমনকি মানুষ—কেউ বাদ যায় না। এটা সাংঘাতিক সময়। এই সময়েই এরা ভাইরাস ছড়ায়।

পরের 2-3 দিন এরা একেবারে চুপ মেরে যায়। এটা ‘ডাম্ব’ বা ‘প্যারালাইটিক স্টেজ’। দেহের
পেশিগুলাে শিথিল (প্যারালাইজড) হয়ে যায়। পেছনে কোমর পড়ে যায়। কুকুরটি হাঁটতে
পারে না। চোয়ালের পেশি অকেজো হয়ে যাওয়ায় এরা কিছু গিলতে পারে না। কেবল মুখ
দিয়ে লালারস পড়ে।

এর সাথে হয় ফটোফোবিয়া’ ও ‘ওয়াটারফোবিয়া। আলাে ও জল দেখলেই এরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অন্ধকারে চলে যেতে চায়। আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে এই আলাে ও জল সংক্রান্ত ভীতির দশাটাই বেশি নজরে পড়ে। ঢােক গিলতে না পারা ও শ্বাসকষ্ট হওয়া অন্যতম লক্ষণ। রােগী নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে।

কুকুরের কামড়ে করনীয় 

পাগলা কুকুর কোনাে মানুষকে কামড়ালে, সেই ক্ষতস্থান সাবান জল দিয়ে কমপক্ষে 30 মিনিট ধুতে হবে। জায়গাটিতে টিংচার অব আয়ােডিন লাগাতে হবে। এটা প্রাথমিক চিকিৎসা। এরপর ডাক্তারবাবুর পরামর্শমত টিকা (হাতের পেশিতে) নিতে হবে।

বার্ড ফ্লু

বার্ড ফ্লু (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা) পাখিদের একটি ভাইরাস ঘটিত রােগ যা আজ থেকে প্রায় একশাে বছর আগে ইতালিতে প্রথম দেখা যায়। এই রােগে সর্দি জ্বরের উপশম নিয়ে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে পক্ষীকুলের প্রায় সকলকেই। মুরগি, হাঁস, ‘গেম ফাউল’, পরিযায়ী পাখি (মাইগ্রেটরি বার্ড)—সব শ্রেণির পাখিদের মধ্যেই ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উপস্থিতি নজরে পড়ে।

Bird Flu | Influenza A | Avian Flu | MedlinePlus

এই ভাইরাসটি অর্থোমিক্সোভিরিডি’ শ্রেণির একটি হেলিক্যাল’ (কিছুটা লম্বাটে) আকৃতির ভাইরাস। জেনাস ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, বি এবং সি। অবশ্য প্রাণীদেহে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ-ই বেশি পাওয়া যায়।

ভাইরাসের প্রােটিন খােলকের মধ্যে থাকে 10টি খণ্ডিত রাইবােনিউক্লিয়িক অ্যাসিড’ (আর এন এ) এবং কিছু প্রােটিন। এই ভাইরাসটির চারদিকে একটা স্নেহজাতীয় পদার্থের চাদর (এনভেলপ) থাকে। আর বাইরের দিকে গ্লাইকোপ্রােটিনের আধুনিক জীববিদ্যা ও জনস্বাস্থ্যের সহজপাঠ কিছু প্রত্যঙ্গ পেরেকের মতাে বেরিয়ে থাকে।

তাদের কতগুলাে ‘হিমাগুটিনিন’, আর কতগুলাে ‘নিউরামিনিডেজ। মােট চোদ্দ রকমের হিমাগুটিনিন এবং নয় রকমের নিউরামিনিডেজ বিভিন্ন ভাইরাসে পাওয়া গেছে। তাদের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে
ভাইরাসের বিভিন্ন নামকরণ (সাবটাইপ) করা হয়েছে। যেমন, এইচ ওয়ান এন ওয়ান্
(H1N1), এইচ ফাইভ এন্ ওয়ান (H5N5), এইচ থ্রি এন্ টু (H5N2), এইচ থ্রি এন এইট
(H3N2), এইচ সেভেন এন ওয়ান (H7N1) ইত্যাদি।

পাখিদের মধ্যে এই সব রকম ভাইরাসই পাওয়া গেছে। H3N2, এবং H3N8, আবার যথাক্রমে শূকর ও ঘােড়ার দেহেও পাওয়া যায়। তবে H5 ও H7—এই দুই সাবটাইপই কিন্তু বেশি সংক্রামক ও রােগসৃষ্টিক্ষম।

অর্থাৎ, আপাত স্বাভাবিক পাখিদের মধ্যেও কিন্তু বিভিন্ন সাবটাইপের ভাইরাস থাকে, যা রােগ সৃষ্টিক্ষম নয়।

ভাইরাসের একটি জীবনচক্র তাই সর্বদাই পাখিদের মধ্যে চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে।

অবশ্য মানুষ কেবলমাত্র H5N1 এবং H3N8 দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আর-একটি বিষয় হল ‘রিঅ্যাসর্টমেন্ট বা জিন পরিবর্তন, অর্থাৎ হতে পারে অল্প পরিবর্তন করে জেনেটিক ড্রিফট’—যাতে H ও N প্রােটিন অণুর সামান্য পরিবর্তন হয়।

আবার হতে পারে জেনেটিক শিফট’। তৈরি হয় নতুন প্রজাতি (স্ট্রেন)। H1N1 পরিবর্তিত হয়ে হয়তাে হল H2N2। আবার দু-ধরনের স্ট্রেন একটি প্রাণীকে আক্রমণ করলে তৈরি হতে পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নতুন ধরনের স্ট্রেন।

প্রাণীটি সেক্ষেত্রে ‘জিন মিশ্রণের আধার হিসাবে কাজ করতে পারে। ‘হাইলি প্যাথােজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’ অর্থাৎ অধিক রােগক্ষম বার্ড ফ্লু, যা দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার দেশগুলােতে দেখা গেছে, তার বেশির ভাগটাই H5N1 গােষ্ঠীর ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট।

এই ভাইরাস মূলত শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীকে আক্রমণ করে এবং মলের মাধ্যমে নির্গত হয়। কোনাে অবস্থাতেই ডিমের (খােলক ভেদ করে) কুসুম বা সাদা অংশ (অ্যালবুমেন)-এর মধ্যে অবস্থান করে না। আর বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে না বলে খুব সহজে মুরগি থেকে মানুষের সংক্রমণ হবার কথা নয়।

হ্যা, এটা ঠিক যে, মৃত মুরগির দেহ ও মল নাড়াঘাটার ফলে এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। অন্যান্য অনেক ভাইরাসের মতাে এই ভাইরাস উচ্চউষ্ণতায় (79°C-এর ওপর) বেঁচে
থাকতে পারে না। অ্যাসিড ও অন্যান্য কয়েকটি রাসায়নিক এদের যম।

লেখক

ড. সিদ্ধার্থ জোয়ারদার ও ড. অনিন্দিতা জোয়ারদার

লেখাটি গবরডাঙ্গা গবেষণা পরিষৎ থেকে  প্রকাশিত

আধুনিক জীববিদ্যা ও জনস্বাস্থ্যের সহজপাঠ       থেকে সংগৃহিত।

WhatsApp Image 2020-06-20 at 21.41.39

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পরিবেশ কর্মী সঞ্জিত কাষ্ঠ

0 (0) এক অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও লড়াই এর নাম সঞ্জিত কাষ্ঠ,আজ দীর্ঘ 20 বছরেরও বেশী সময় ধরে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির কথা বলে যাচ্ছেন । তাঁর নির্ভীক কণ্ঠ সবুজ পৃথিবীর কথা বলে যায় । সুন্দর পৃথিবীর সংকল্পে ব্রতী পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এবং একজন সক্রিয় কর্মী হলেন সঞ্জিত কাষ্ঠ […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: