পরিবেশ কর্মী সঞ্জিত কাষ্ঠ

@ 2
4.5
(97)

এক অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও লড়াই এর নাম সঞ্জিত কাষ্ঠ,আজ দীর্ঘ 20 বছরেরও বেশী সময় ধরে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির কথা বলে যাচ্ছেন । তাঁর নির্ভীক কণ্ঠ সবুজ পৃথিবীর কথা বলে যায় । সুন্দর পৃথিবীর সংকল্পে ব্রতী পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এবং একজন সক্রিয় কর্মী হলেন সঞ্জিত কাষ্ঠ ,তাঁর বসবাস বাংলার অন্যতম প্রান্তিক জেলা, নদীয়ার শান্তিপুরে । তাঁর কর্মকান্ডের পরিসর বর্তমানে সমগ্র রাজ্যে ছড়িয়ে । তিনি বাংলার পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যাক্তিত্ব এবং বর্তমানে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের তিনি একজন পথপ্রদর্শক । বহু তরুণ আজ তাঁর অনুপ্রেরণায় এসে যুক্ত হচ্ছে এই বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে ।

 

সঞ্জিত কাষ্ঠের জন্ম হয় 15ই ডিসেম্বর,1981 সালে শান্তিপুরেই । তাঁর পিতা শ্রী সুব্রত কাষ্ঠ এবং মা হলেন শ্রীমতি রেখা কাষ্ঠ । তাঁর শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা সবই শান্তিপুর শহরেই । তাঁর পড়াশুনা অর্থাৎ স্কুল এবং কলেজ সবই শান্তিপুর শহরে,তিনি বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন । বর্তমানে, তিনি সাংবাদিকতা করেন । নিজস্ব সম্পাদনায় তাঁর একটি পত্রিকা রয়েছে,যার নাম “নদিয়ার পরশমনি” । জীবন ও জীবিকার জন্য, তিনি পেশাগত ভাবে টোটো চালক । এই কাজ থেকেই তাঁর ও পরিবারের জীবনধারণ হয়,কিন্তু এই সব পরিচিতির ঊর্ধ্বে তাঁর প্রকৃত পরিচিতি হলো,তিনি একজন আদ্যপ্রান্ত পরিবেশকর্মী এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ প্রেমী মানুষ ।

ছাত্রজীবনে 1997 সালে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় সহপাঠীদের সঙ্গে তিনিও একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং বিজয়ী হন । যার আয়োজক ছিলো স্বামীজী নেতাজি ইয়ুথ সোসাইটি ,এই প্রতিযোগিতায় তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবনী বিষয়ক একটি বই পুরস্কার স্বরূপ পান এবং পড়তে শুরু করেন । এই বই তাঁকে সমৃদ্ধ করে এবং উদ্বুদ্ধ করে । এই অনুপ্রেরণা কে পাথেয় করেই তিনি যুক্ত হয়ে পড়েন একের পর এক মহতী উদ্যোগে । ওই সময় থেকেই তিনি বিপ্লবী ও বিশেষ করে নেতাজির জীবনী পড়তে শুরু করেন । এই ভাবেই তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও যুক্ত হতে শুরু করেন । তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণা হলো নেতাজির দর্শন এবং সংগ্রাম । প্রথমেই তিনি ইয়ুথ সোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁদের সাথে যোগদান করেন সক্রিয় বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচিতে । 2000 সালে তিনি শুরু করেন বিভিন্ন সামাজিক,মানবাধিকার আন্দোলন এছাড়াও তিনি নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একাধিকবার গর্জে উঠেছেন । একাধিকবার সরব হয়েছেন বিভিন্ন অসামাজিক কাজ কর্ম এবং বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে । আক্রান্ত হয়েছেন বহুবার ।

পরিবেশের প্রয়োজনে পরিবেশ রক্ষায় তিনি শুরু করলেন পরিবেশ আন্দোলন, যুক্ত হয়ে পড়লেন শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী আম বাগান বাঁচাও আন্দোলনে, শান্তিপুরে বহুদিন ধরেই চলছে নির্বিচারে বৃক্ষ ছেদন; তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন সঞ্জিত কাষ্ঠরা বারবার, আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু লড়াই থামান নি । 2015 সালের এপ্রিলে তিনি ভীষণ ভাবে আক্রান্ত হন,তাঁর রীতিমতো প্রাণনাশের উপক্রম পর্যন্ত হয়েছিল । এখনো শান্তিপুরের ঐতিহ্যপূর্ণ আমবাগান গুলি যে অক্ষত আছে, সেই কৃতিত্বের অনেকটাই দাবিদার তাঁর এবং তাঁদের সম্মিলিত আম গাছ বাঁচাও আন্দোলন । তিনি এর পাশাপাশি শান্তিপুরের পুকুর ভরাট বিরোধী আন্দোলনেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ।

শব্দ দূষণ বিরোধী আন্দোলনেও সঞ্জিত বাবুর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলো এবং আছেও । 2019 এর নভেম্বরে কার্তিক পুজোর বিসর্জনের শোভা যাত্রায় মাত্রাতিরিক্ত শব্দে ডিজে বাজানোর প্রতিবাদ করায়,তাঁকে পুনরায় আক্রান্ত হতে হয় । এই সময়ের মধ্যেই তিনি তৈরী করেছেন নদিয়ার যুগবার্তা পরিবার,একটি সংগঠন যা মানুষ ও প্রকৃতির কথা বলে, তিনি নদিয়ার পরিবেশ আন্দোলনের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছেন আজ প্রায় দু-আড়াই দশক ।  সঞ্জিত কাষ্ঠ  নদীয়া পরিবেশ ভাবনা মঞ্চের একজন গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্রিয় সদস্য ।  নদিয়ার সবুজ মঞ্চের হয়েও তিনি আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন । পশ্চিম বঙ্গে ২০১৭ থেকে  পরিবেশ আন্দোলনের  অগ্রণী ভাব ধারা –  ‘দ্য গ্রিণ ওয়াক ( The Green Walk )’ চলতে থাকে – সঞ্জিত কাষ্ঠ প্রথম থেকেই দ্য গ্রিণ ওয়াক ভাবধারার পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকেছেন ।

2018 সালের 19শে ফেব্রুয়ারী থেকে ২৫ শে মার্চ পশ্চিম বঙ্গের  টাইগার হিল থেকে সাগর দ্বীপ পর্যন্ত দীর্ঘ 35 দিন ব্যাপী, পরিবেশের জন্য এক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল  । পদযাত্রাটি শুরু করেন দ্য গ্রিন ওয়াক ভাবধারার পরিবেশকর্মীরা ও তাতে ভারতের প্রায় ৩০০ টির উপর পরিবেশ সংগঠন যোগ দান    করে । প্রায় 1075 কিমি পথ পরিবেশের জন্য পায়ে হেটে অতিক্রম করেন পরিবেশ কর্মীরা, মাত্র ৩৫ দিনে এতটা পথের পদযাত্রা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম , এই পদযাত্রায় পুরোভাগে ছিলেন সঞ্জিত কাষ্ঠ । এছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার টাকি রোড ও যাশোর রোড গাছ বাঁচাও আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। শান্তিনিকেতনের বৃক্ষ রক্ষা  আন্দোলনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ।

সঞ্জিত কাষ্ঠ পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের পরিবেশ আন্দোলন, মেদিনীপুরের লালগড়ের জন্য,গরুমরা ও লাটাগুড়ির জঙ্গল রক্ষার আন্দোলনের The Green walk এর পক্ষ থেকে পদযাত্রায় অংশ গ্রহণ করেন । নদিয়ার অন্যতম নদী, চূর্ণী ও মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলনের জন্য  The Green walk- এর নদীর উৎস থেকে মোহনা পদযাত্রায় তিনি ছিলেন অন্যতম ।

জীবন ও জীবিকার জন্য লড়াই এর পাশাপাশি তিনি পরিবেশের জন্য লড়ে চলেছেন, হুমকি প্রাণনাশের ভয় উপেক্ষা করে লড়ে গিয়েছেন সুন্দর পৃথিবীর জন্য,চলছে সেই অসম লড়াই । দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সঞ্জিত কাষ্ঠ । একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তিনি পালন করেন মানবি ধর্ম, 2020 সালের COVID 19  এবং লকডাউন অবহেও তাঁর কর্ম কান্ড থেমে নেই,তিনি লড়ে চলেছেন এবং আগামী দিনেও লড়বেন । মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন ।  তাঁর ইচ্ছা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি পরিবেশ আন্দোলন করে যেতে চান ।  তিনি স্বপ্রতিজ্ঞ যে, পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইতে তিনি বাকি জীবনটাও যুক্ত থাকবেন ।

 

ছবি গ্যালারি

 

 

সোর্স – আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ নভেম্বর, ২০১৯

সংবাদ প্রভাকর, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮

আনন্দবাজার পত্রিকা

Dream Wanderlust | Feb 10 , 2018

আনন্দবাজার পত্রিকা

– সমসাময়িক পত্র পত্রিকা

 

লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক

       –

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 97

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

2 thoughts on “পরিবেশ কর্মী সঞ্জিত কাষ্ঠ

  1. ভাই সঞ্জিতের এর মতো মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃতি-পরিবেশ কে ভালবেসে অন্তর থেকে কাজ করা মানুষের সংখ্যা যেদিন আরো বাড়বে সেদিন সত্যিই আমাদের পৃথিবীতে বদল আসবে

Leave a Reply

Next Post

মাটির তলার জল তােলার বিপদ

4.5 (97) ভূগর্ভস্থ জল মাটির তলার জল তােলার বিপদ বিষয়টা উপলব্ধির মধ্যে আসে ষাটের দশকে। তখন আমার বয়স ৫-৬বছর। আসলে বহু বছর আগে আমার ঠাকুদা কোলকাতার বড় বাজার থেকে একটা টিউবঅয়েলের বডি আর তিনটে টাটা কেম্পানির ২০ ফুটের পাইপ আর একটা ফিল্টার চালের লরির মাথায় চাপিয়ে এনে পুঁতেছিলেন। মিস্ত্রি এসেছিল […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: