মাটির তলার জল তােলার বিপদ

1
0
(0)

ভূগর্ভস্থ জল

মাটির তলার জল তােলার বিপদ বিষয়টা উপলব্ধির মধ্যে আসে ষাটের দশকে। তখন আমার বয়স ৫-৬বছর। আসলে বহু বছর আগে আমার ঠাকুদা কোলকাতার বড় বাজার থেকে একটা টিউবঅয়েলের বডি আর তিনটে টাটা কেম্পানির ২০ ফুটের পাইপ আর একটা ফিল্টার চালের লরির মাথায় চাপিয়ে এনে পুঁতেছিলেন। মিস্ত্রি এসেছিল কোলকাতা থেকে। যাতে ভালাে জল পাওয়া যায়, তার জন্য ৫ কেজি
দুধ আর বাতাসা দেওয়া হয়েছিল কলের গোড়ায়।

Give Water - Global One

যখন প্রথম চাপে,মাটির তলার জল উঠল কি আনন্দ পাড়ার সব মানুষের। সবাই শিশুর মত হাততালি দিয়ে উঠল। আমার ঠাকুদা সেইসময় বলেছিলেন যাক এখন আর পুকুরের জল খেতে হবে না। আর কলেরা, ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচবে এলাকার মানুষ।এই সবই আমার ঠাকুমার মুখে শােনা।

কিন্তু বছর পাঁচেক যেতেই কল গেল বিকল হয়ে, কোলকাতার মিস্ত্রি বললাে, জলস্তর নেমে গেছে। তাই আরাে তিনটে ২০ ফুটের পাইপ লাগবে। আবার কল তােলা হল লাগানাে হল ২টি পাইপ। ফিলটারটাও পালটানাে হল। আবার বছর চারেক। আবার কল গেলাে বিগড়ে। আর টিউবঅয়েলের জল গেলাে নেবে। এখন কলটিতে ১২টি পাইপ আর ২টি ফিলটার। গরম কালে জল ওঠেনা, বর্ষার সময় অল্প অল্প। পৌরসভার ট্যাপ কল আসার পর থেকেই আমাদের বাড়ির টিউবঅয়েলটি অনেকটা হেরিটেজের মত।

কিন্তু এই টিউবঅয়েল পোঁতার পর থেকেই মানুষের জল খাওয়ার অভ্যাস গেছে পাল্টে। খাবার জলের পুকুরটাও গেছে দূষিত হয়ে। এরপরে কল থেকে যখন জল উঠছেনা, তখন সবার মুখে যে আতঙ্কের ছবি দেখেছি, আজ তরান্বিত। আমাদের সংগঠনের বন্ধরা একটা শ্লোগান দেয়,

ভালাে জলের স্বাদ পেয়েছি
খারাপ জল আর খাবাে না।

সংগঠনের এটাইকথা ,এটাই মােদের ভাবনা।

পৌরাণিক কাহিনিতে ভূগর্ভস্থ জল

আসলে মাটির তলার জল যে কতখানি মূল্যবান, তা এখনও উপলব্ধির মধ্যে আনতে পারেনি সাধারণ মানুষ। মহাভারতে ভিষ্মের শরশয্যার কাহিনী প্রায় সবার জানা। পিতামহ ভিষ্ম যখন অর্জুনের কাছে তাঁর প্রয়ানের সময় বিশুদ্ধজল পানের আহ্বান রাখেন, তখন অর্জুন মাটিতে বাণ নিক্ষেপ করেন ও মাটির তলার জলের ধারা পিতামহ ভিম্মের মুখে এসে পড়ে এবং এরপর তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন। তখনও জল পানের রীতি ছিল নদীর জল ব সরােবরের জলপান করা।

বিদেশে মাটির নিচের (ভুগর্ভস্থ) জল

আমেরিকা সহ পৃথিবীর সমস্ত উন্নত দেশে মাটির তলার জল তােলা নিষিদ্ধ। আমাদের দেশেও ভূগর্ভস্থ জল পানের সংস্কৃতি ছিল না। নদী এবং পুকুরের জল পানাইছিল আমাদের জল পানের ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই সেনা ক্যাম্পে টিউবঅয়েল বসিয়ে জল খাওয়ার পদ্ধতি চালু হল। কেননা সেনাদল নদীতে জল পান করতে গেলে শত্রু পক্ষের হামলার শিকার হতে পারে। তাই ক্যাম্পেই তৈরী হল পানীয় জলের উৎস।

ভারতে পানীয় জল

মাটির তলার জলের অপব্যবহারের সূত্রপাত তখন থেকেই। পশ্চিমবঙ্গ বাদে অন্য রজ্যে মাটির তলার জল তােলার য়ে রীতি তা খুব একটা নেই। বড় ইঁদারা আর বৃষ্টির জল ধরে রাখার একটা কালচার বহু দিনের গুজরাট, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের মানুষদের। আজ বর্তমানে মুম্বাইতে পানীয় জলের মূল উৎসবৃষ্টির জল, তা পরিশােধন করেই মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন পাইপ লাইনের মধ্যে দিয়ে মানুষদের কাছে জল পৌঁছে দেয়।

দাকোপে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে দুই ...

টাটানগরের প্রধান পানীয় জলের উৎস ডিমনা নালা। সারা টাটানগরে যে বিশুদ্ধপানীয় জল সরবরাহ হয় তা ঐ জলাধার থেকেই আসে। এখানে পাথুরে মাটিতে বোরিং করে নল কূপ খনন ব্যয় সাপেক্ষ। তাই ঐ অঞ্চলের আদিবাসী মানুষেরা প্রথম থেকেই জলাধারের জল পান করেন।

কোলকাতায় ভূগর্ভস্থ জল দূষণের কারন !

কোলকাতা শহরে পানীয় জল প্রধানত হুগলি নদীর জলের উপরই নির্ভরশীল। কিন্তু শতকরা ২০ ভাগ থেকে ২৫ ভাগ জল এখনও ভূ-গর্ভস্থ থেকে তােলা হয়। বিশেষ করে কোলকাতা শহরে যে বড় বড় উপনগরি ও বহুতল তৈরী হচ্ছে সেই নির্মান কার্যে প্রমােটার গণ মাটির তলার জল ব্যবহার করেন।

Home | Online মুর্শিদাবাদ

কোলকাতা শহরে ভূগর্ভস্থ জল তুলে ফেলার ফলে বহু স্থানে জলস্ত নেমে গেছে। যেমন কোলকাতা মধ্য অঞ্চল (বিবাদি বাগ, এসপ্ল্যানেড, পার্কষ্টিট, লােয়ার সার্কুলার রােড় ও পার্কসার্কাস) বিগত ৪০ বছরে ৮-১০ মিটার জলস্তর নেমে গেছে। এখন ১৫০-২০০ মিটারের নিচে মিষ্টি জল পাওয়া সম্ভব। সেইরূপ দক্ষিণ অঞ্চলে অর্থাৎ গড়িয়াহাট, রাসবিহারি, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, টালিগঞ্জ ও বেহালা অঞ্চলে যে সুস্বাদু ও সুন্দর ভূ-গর্ভস্থ জল ছিল তা আজ আর নেই। ঐ অঞ্চলগুলিতে একই জলস্তরে কোথাও মিষ্টি জল বা লবনাক্ত জল পাওয়া যায়। তুলনামূলকভাবে এই অঞ্চলে জনবসতি ও জনঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ভূতল জলের ব্যবহারও বেড়ে গেছে অনেকখানি। ফলে জল তল ৫-১০ মিটারের বেশি নেমে গেছে। এছাড়া দক্ষিণ কোলকাতা থেকে। ব্যারাকপুর পর্যন্ত বহু বড় বড় জলাশয় এবং নয়ানজুলি বন্ধকরে গড়ে উঠেছে।

উপনগরি, শপিংমল, ফিল্মসিটি। অনুমােদন নেওয়ার তােয়াক্কাও করে না এরা। কোথাও কোথাও পঞ্চায়েত পৌরসভার অনুমতি আদায় করে নিয়েছেন এরা বড় বড় পিচের রাস্তা তৈরী হচ্ছে, রাস্তার পাশের নয়নজুলিগুলাে আজ বন্ধ। ফুটপাত না রেখে, গাছনা লাগিয়ে উন্নয়ন চলছে। পাড়ায় পাড়ায় বস্তি উন্নয়নের টাকা দিয়ে পঞ্চয়েত ও পৌরসভার অলিগলি কংক্রিটের ঢালাই রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে মাটির তলায় আর বৃষ্টির জল প্রবেশ করছে না।

বৃষ্টির জল ড্রেন দিয়ে সােজা গঙ্গা নদীতে পড়ছে জল। যা সমুদ্রের নােনা জলকে বাড়িয়ে তুলছে। এবং জলস্তরের নােনা জলের প্রবেশ ঘটছে। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হুগলি ও উত্তর ২৪ পরগনায় বােরাে ধানের চাযের ফলেও প্রচুর মাটির তলার জল তুলে ফেলা হচ্ছে। সাবমার্সেবল পাম্প দিয়ে। ও চাষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানীয় জল এখন পন্য !

এছাড়া পানীয় জল এখন পন্য। পাড়ার কেলাে ভুলাে থেকে পঞ্চায়েত পৌরসভা সবাই মাটির তলার জল তুলে বিক্রি করতে ব্যস্ত। বড় বড় প্লাস্টিকের ডাব্বা করে বাড়িতে বাড়িতে মাসিক  টাকায় পানীয় জল বলে যে জল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, তা আদৌও কি পানীয়? এই জল পানীয় জল কিনা তা পরীক্ষা করার মত সরকারের কোনাে পরিকাঠামো নেই। এছাড়া জেনে রাখা ভালো সরকারী ভাবেই আপনার পায়ের তলার ভূগর্ভস্থ জল কিছুদিনের মধ্যেই দেশি ও বিদেশি বহুজাতিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। বিশ্বব্যাঙ্কও      আই এম এফ জল বেসরকারীকরণের জন্য প্রায় সমস্ত রকম ব্যবস্থা করে ফেলেছে। প্রকৃতি লুটের মত লুঠ হয়ে যাবে মাটির তলার জল। তাই একটি পরিসংখ্যানের মধ্যে দিয়েই তা প্রমাণিত হয়ে যাবে।

Bottling Plant - Bottle Packaging Line Latest Price, Manufacturers ...

জল লুটের মূল নায়ক কোলা কোম্পানিকে কে চেনেন না এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। আপনার পরিবারের জলের ঘড়া, কলসি, ঘটি আর গ্লাসকে কখন ওরা ট্রাঙ্কে পুরে দিয়েছে তা আপনি ভাবতেও পারেননি। এখন জল খাওয়া হয় বােতলে। ১৯৯১ সালে বােতল জলের চাহিদা ছিল ২০ লক্ষ পেটি। ২০০৪-২০০৫ সালে তার বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ১৫০০ লক্ষ পেটি।

ভারতে সরকারি নির্দেশনামা মেনে(২০১৪ সালে) বােতল কারখানার পরিমাণ ৪০০০ এর ওপর। তাদের মধ্যে তামিলনাড়ুতে প্রায় ১৫০০ বােতল কারখানা। প্রতিদিন গড়ে এই বােতল কারখানায় ২ লক্ষেরও বেশি বােতল তৈরি হয়। সুতরাং মাটির তলার জল তােলার পরিমাণ কিভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা এই পরিসংখ্যান
থেকে বােঝা সম্ভব।

এর মধ্যে সারা ভারতবর্ষে জল তুলে বােতল বন্দি করার কারখানাগুলাের সাথে স্থানীয় জনগােষ্ঠি বিশেষ করে কৃষক সম্প্রদায়ের সাথে বিপুল সংঘর্ষ তৈরী হচ্ছে। কেরালায় কোকোকোলা কোম্পানীর সাথে স্থানীয়
কৃষকদের লড়াই-এর কথা আমাদের জানা।

অতিরিক্ত মাটির নিচের জল তোলার বিপদ !

প্রচুর মাটির তলার জল তুলে ফেলায় আর্সেনিক থেকে আর্সেনােকোসিস রোগ ও ফ্লোরাইড থেকে দাঁত,
নােখ ও হাড়ের ক্ষয় হচ্ছে। শেষে মারা যাচ্ছেন ক্যানসারের মত মারণ রোগে। বর্ধমান ও দুর্গাপুর অঞ্চলে জলস্তর নেমে যাওয়ায় বড় বড় বাড়ির দেওয়ালে ও ছাদে ফাটল দেখা যাচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণে কি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে

আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা আতঙ্কিত এই জল লুটের ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে। সরকার, পৌরসভা, পঞ্চায়েতের কর্তা ব্যক্তিগণ এ ব্যাপারে এখনও যদি সজাগ না হন তবে জলাভাবে বলিভিয়ার মত এদেশেও জলযুদ্ধ স্বাভাবিক।

শুধু আইন করে হবে না। সমস্যাটা বােঝাতে হবে তৃণমূল স্তরের মানুষদের। যেসব বৃহৎ জল কারবারি যারা জল লুটে ব্যস্ত তাদের বিরুদ্ধেও জনমত গঠন করতে হবে। বৃষ্টির জল ধরে তাকে কিভাবে বহুমুখী ব্যবহার করা সম্ভব তার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। আমরা চাই বিজ্ঞানসম্মত কর্মোদ্যোগ। তবে বাঁচব আমরা, বাঁচবে পৃথিবী আর পরবর্তী প্রজন্ম।

লেখকঃ বিবর্তন ভট্টাচার্য

(বিজ্ঞানকর্মী) চাকদহ বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক পত্রিকায় বর্ষ-১১  সংখ্যা-৪ জুলাই- আগস্ট ২০১৪ থেকে সংগৃহীত ।

 

WhatsApp Image 2020-07-04 at 11.30.21 PM

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “মাটির তলার জল তােলার বিপদ

Leave a Reply

Next Post

পানীয় জল নষ্ট হচ্ছে

0 (0) শিল্প কারখানা থেকে নির্গত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থগুলি নদীনালা- খালের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলাশয়ের মাধ্যমে সমুদ্রের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে বহু দেশেই পানীয় জলের সংকট ঘনিয়ে এসেছে। মধ্য প্রাচ্যের বহুদেশই ,মেরু অঞ্চলের বরফ কেটে জাহাজে করে নিয়ে আসার কথা ভাবছে। পেট্রোলিয়াম তেল বা তৈলজাত পদার্থ যখন এক দেশ থেকে অন্য […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: