পিঁপড়ের নানা কথা

poribes news
0
(0)

যাবে নাকি পিঁপড়ের দেশে? কী হল? ভয় করছে? যদি কামড়ে দেয় ? কিন্তু ওদের কথা জানতে হলে ওদের দেশে তাে যেতেই হয়।

পিঁপড়ের ভয় পায় না এমন কেউ নেই। সৈন্য সামন্ত নিয়ে এরা যখন পাতালপুড়ী থেকে হাজারে হাজারে লাখে লাখে বেড়িয়ে আসে, তখন বনের জন্তু-জানােয়ার তাে বটেই মানুষও ভয়ে দে পিঠটান। দলবদ্ধ এই
ছােট্ট ছােট্ট প্রাণীগুলাের সঙ্গে যুদ্ধে জেতা অসম্ভব।ঘরের পিঁপড়া দূর করুন খুব সহজে

কত পিঁপড়ে পৃথিবীতে? বলতে পারাে পৃথিবীতে কত পিপড়ে আছে?

শুনলে তাজ্জব বনে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে পৃথিবীতে যত পিঁপড়ে আছে তাকে যদি এক জায়গায় জড়াে করে ওজন করা যায় তবে সেই ওজন পৃথিবীতে যত মানুষ আছে তাদের মােট ওজনের থেকে বেশি
হবে। জন সংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষ আজ নানা সমস্যার সম্মুখীন। পরিবেশ সংকট, খাদ্য সংকট, জল সংকট প্রভৃতি নানা প্রযুক্তির সাহায্যেও পৃথিবীর বুদ্ধিমান জীব এই সমস্যা সমাধান নাকানি চোবানি খাচ্ছে। অথচ এর চেয়েও অনেক বেশি পিঁপড়ে সংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও তারা সুস্থভাবে নিয়মানুবর্তিতা সঙ্গে সামাজিক জীবন যাপন করছে। তাই পিঁপড়েদের কাছে আমাদের এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।

নানা প্রজাতির পিপড়ে         পৃথিবীতে পিঁপড়ে আছে কত রকমের?

জুলজিক্যাল সার্ভে অবম ইন্ডিয়ার সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায় যে পৃথিবীতে প্রায় আট হাজার
আটশ প্রজাতির পিঁপড়ে আছে। এদের মধ্যে একশ তিরিশ ধরণের পিঁপড়ে পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়।

পিঁপড়ে পৃথিবীতে কতদিন ?

এরা পৃথিবীতে এসেছে মানুষ পৃথিবীতে আসার অনেক আগে। ফসিলের বয়স প্রায় আট কোটি বছর। তাই বলা যায় সেই ক্লিটেসিয়াম যুগ থেকে এরা আছে। সেই সময়কার বহু প্রাণী এমনকী ডায়নােসারের মত অতিকায় এবংঅতিবলবান জীবগুলােও পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। অথচ এরা ক্ষুদেশরীর নিয়ে শুধু টিকেই আছে নয়, বিশাল পপুলেশন, বাসস্থান, খাদ্য, আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতির সমস্যা সবই সুষ্ঠ ভাবে সামলে চলেছে।

পিঁপড়ের কামড় !

পিঁপড়ে যখন কামড়ায় তখন ভীষণ জ্বালা করে। কে জান ?

পিঁপড়ে কামড়ানাের জয়গায় ফরমিক অ্যাসিড ঢেলে দেয়। এই কারণে চুলকোতে চুলকোতে জায়গাটা ফুলে ওঠে। এই অ্যাসিড এদের শরীরেই উৎপন্ন হয়। ফরমিক অ্যাসিড তৈরি করতে পারে বলে এরা ফরমিসিডির পরিবারভূক্ত। এদের নিকট আত্মীয় বােলতা, মৌমাছি,ভীমরুল ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে পিঁপড়ের ক্রমবিকাশ বােলতা থেকে। পিঁপড়েদের মধ্যে ডেঁয়ো পিপড়েরা সাংঘাতিক। এরা একবার কামড়ে ধরলে ছাড়তে চায় না। টানা হেঁচড়া করলে সেখানটা কামড়ে ধরে থাকে সেখানকার মাংস ছিড়ে বেরিয়ে আসে। অনেক সময় টানাটানিতে এদের দেহাংশ ছিড়ে যায় কিন্তু মুখ আলগা করানাে যায় না। কোনও কোনও পিপড়ের পেছনে হুল থাকে।বিপদ বুঝলে এরা হুল ফুটিয়ে দেয়।নালসো পিঁপড়েরা বিভিন্ন ফলের গাছে পাতা দিয়ে বাসা বানিয়ে থাকে। এইসব গাছে ফল পাড়তে উঠলে আর দেখতে হবে না। এদের সম্মিলিত আক্রমণে তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এক ধরণের ক্ষুদে কালােপিঁপড়ে আছে যারা কামড়ায় না। তবে গায়ে উঠলে ভীষণ সুড়সুড়ি লাগে। তাই অনেক সময় একে সুড়সুড়ি পিঁপড়ে বলা হয়।

পিঁপড়েরা সামাজিক জীব

পিঁপড়েরা একা একা থাকতে ভালােবাসে না। এরা সব সময় দল বেঁধে থাকে। প্রতিটি দলে থাকে সাধারণত একটি রানি পিঁপড়ে কয়েকটি পুরুষ পিঁপড়ে এবং বাকি সব শ্রমিক পিঁপড়ে। শ্রমিক পিঁপড়েরা সকলেই
বন্ধ্যা স্ত্রী পিপড়ে।তাইবলা যায় পিঁপড়ে সমাজে স্ত্রী পিঁপড়েদের সংখ্যাই বেশি এবং সমাজ পরিচালনার দায়িত্বেও থাকে এরাই। রানি পিঁপড়ে চেহারায় সব চেয়ে বড় হয়। পুরুষ পিঁপড়েরা তুলনায় ছােট হয়। শ্রমিক পিঁপড়েদের মধ্যে দুধরনের পিপড়ে থাকে- সৈনিক পিঁপড়ে, কর্মী পিঁপড়ে। সৈনিক পিঁপড়েরা পুরুষ পিঁপড়েদের থেকে কিছুটা বড় চেহারার হয়। আর সব থেকে ছােট হয় কর্মী পিঁপড়েরা। প্রতিটি বাসার দেখভাল আইন কানুন কৃতি সবই এই কম পিঁপড়ে দের দায়িত্বে থাকে।

পিঁপড়েরা খুব বেশি হলে মাস দুই বাঁচে। তবে পুরুষ পিঁপড়ের বেশির ভাগ সময়ই মিলনের পর মারা যায়। রানি পিঁপড়েদের কাজ শুধু মাত্র ডিম পাড়া।

পিপিলিকার পাখা

রানি ও পুরুষ পিঁপড়েদের মিলনের আগে পাখনা গজাতেদেখা যায়। তখন এরা উড়তে পারে। তবে এর ব্যতিক্রম ও আছে। প্রতিদিনের যাবতীয় কাজকর্ম সামলায় কর্মী পিপড়া। বাসা এবং অন্য পিঁপড়েদের রক্ষা করার দরকার হলে সৈনিক পিপড়েদের ডাক পড়ে। পতঙ্গ জগতের মধ্যে পিঁপড়েরাই সবচেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। প্রতিদিনই এরা ঘরদোর পরিষ্কার করে। এদের অসুখ বিসুখ হয় না বললেই চলে।

পিঁপড়েরা কি দেখতে পায় ?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা পিঁপড়ের চোখ থাকলেও দৃষ্টিশক্তি এতই ক্ষীন যে এরা দেখতে পায় না বললেই চলে। তাহলে এরা বােঝে কিভাবে যে কোথায় খাবার আছে, কোথায় তাদের বাসার দরজা, বাসার ভিতরে
কোথায় তাদের খাবার রাখার জায়গা, কোথায় তাদের বাচ্চারা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি ? ফেরােমােন নামে এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ এদের শরীরে তৈরি হয়। মাঝে মাঝেই এরা সামনের দুটি পা দিয়ে মুখ থেকে
ফেরােমােন নিয়ে মাথার উপরের লম্বা শুঁড় দুটিতে মাখিয়ে নেয়। এই রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যেই এরা সব কিছু বুঝতে পারে এবং ভাবের আদান প্রদান করে। তাই এরা দিনে রাতে সব সময়েই কাজ করতে
পারে।

পিপড়ের আয়ু

ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ পিঁপড়ে হতে প্রায় দু’সপ্তাহ সময় লেগে যায়। এরপর খুব বেশী হলে এরা দু’মাসের মত বাঁচে। পিঁপড়ের মত কিছু পিঁপড়ের আয়ু অবশ্য একমাসের মত। গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলে পিঁপড়েদের বেশি দেখা গেলেও শুষ্ক অঞ্চল এরা পছন্দ করে না। কারণ এদের বেঁচে থাকার জন্য জলীয় বাষ্পের প্রয়ােজন হয়। তাই গরম অথচ আর্দ্রভাব বেশি এমন জায়গাতেই এরা বাড়ি ঘর বানায়।বাসার ভিতরে যাতে যথেষ্ট আদ্রভাব থাকে সেদিকে খেয়াল রেখে এরা বাসা বানায়।

পিঁপড়ের শিকার ধরা

পিঁপড়েরা দেখতে ক্ষুদে। আঙুল দিয়ে টিপে দিলেই অক্কা। কিন্তু দল বেঁধে যখন আক্রমণ করে তখন মানুষের কাছে ও এ রীতিমত আতঙ্ক। এদের ভয় পায় না এমন প্রাণী পৃথিবীতে খুব কম আছে। মাকড়শা, আরশােলা, কেঁচো, কেন্নো ইত্যাদির মত বড় দেহের প্রাণীদের শিকার করার সময় এরা দল বেঁধে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে। তারপর প্রাণীটির দেহে বাঁকানাে চোয়াল দিয়ে মারাত্মক কামড় বসায়। কামড়ে কামড়ে গা থেকে মাসে ছিড়ে নেয়। ফলে প্রাণীটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখন সকলে মিলে কামড়ে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিজেদের বাসার দিকে নিয়ে যায়। এরপর শিকারের দেহটাকে টুকবাে টুকরাে করে বাসার ভিতরে নিয়ে গিয়ে যতটা খাওয়ার খেয়ে বাকী ভাড়ারে তুলে রাখে। পিঁপড়েরা দল বেঁধে কাজ করে বলে নিজেদের তুলনায় অনেক বড় প্রাণীদের ঘায়েল করতে কোনও অসুবিধা হয় না।

পিঁপড়েরা যখন শিকার ধরতে বা খাবারের খোঁজে বের হয় তখন সৈন্য সামন্ত নিয়ে বের হয়। শিকার বা খাবার নিয়ে এক দল পিঁপড়ে যখন সার বেঁধে বাসায় ফিরতে থাকে তখন সৈনিক পিঁপড়েরা এদের পাহারা দেবার জন্য চোয়াল উচু করে পাশে পাশে চলতে থাকে। এই সময় কেউ খাবার কেড়ে নিতে এলে তাকে আর দেখতে হবে না। ক্ষুদে ক্ষুদে সৈনিক পিঁপড়ে গুলাে হৈ হৈ করে ছুটে এসে শত্রু কে দফারফা করে
ছাড়বে। তারপর মৃত শত্রুর দেহটা চলার পথের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করবে।

পিঁপড়ের বুদ্ধি

ছােট্ট দেহ। মাথাটা আরও ছােট্ট। কতটুকুই বা বুদ্ধি থাকতে পারে ঐটুকু মাথায় ? কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী ক্ষুদে পিঁপড়ের ক্ষুদে মাথার বুদ্ধি দেখে অবাক হতে হয়। একটি বড়সড় কেঁচোকে ঘায়েল করার পর
তাকে বাসার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। হাজার হাজার পিঁপড়ে মিলেও ওটাকে টানতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। তাই কেঁচোর দেহের ওজন কমানাের জন্য এরা শুকনাে মাটির ঢেলা কেঁচোটির দেহে ছড়িয়ে দেয়। মাটির ঢেলা কেঁচোটির দেহের অতিরিক্ত জলীয় পদার্থ শুষে নিয়ে ওজন কমিয়ে দেয়। ফলে কেঁচোটিকে টেনে নিয়ে যেতে অনেক সুবিধা হয়।

পিঁপড়ে কি খায়?

পৃথিবীতে পিপড়ে এসেছে আট কোটি বছরেরও আগে। তখন মানুষ কোথায়? বরং বলা যায় সময়ের হিসেবে মানুষ ওদের কাছে শিশু অতএব ধরে নেওয়া যায় পৃথিবী তখন ছিল জলা জঙ্গলে ঠাসা। পিঁপড়ের দল ঘুরে বেড়াতাে ওইসব জঙ্গলে, পাহাড়ের খাদে এবং জলাভূমির আশেপাশে। উদ্দেশ্য শিকার ধরা। ছােট বড় কীট পতঙ্গ ওদের লক্ষ্য বস্তু। শিকার আকারে বড় হলেও এই ক্ষুদে প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধে কিছুতেই এঁটে
উঠতে পারে না। দল বেঁধে চারদিক ঘিরে ফেলে শিকারের দফারফা করে ছাড়ে। এইসব ছােট্ট ছােট্ট প্রাণীদের মাংস এদের প্রিয় খাদ্য। কোনও কোনও জাতের পিঁপড়ে ছােট ছােট গাছের বীজ ও খায়। এরা নিজেরা ছত্রাক চাষ করে সেই ছত্রাক খেয়ে থাকে।

মানুষ আসার পর পৃথিবীর পরিবেশ অনেকটাই পাল্টে যায়। বন-বাদাড় সাফসুফো হয়ে ইট বালি পাথরের বড়বড় ইমারৎ তৈরি হতে থাকে। পত্তন হয় বড় বড় শহরের। ক্রমশ জঙ্গল ছােট হতে থাকে। জলাভূমির আয়তন কমতে থাকে,শহরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পিঁপড়েরা পড়ল মহা সমস্যায়। বনে জঙ্গলে হা করে এত দিনের অভ্যাস পাল্টে শহরবাসী হবে কী ভাবে? মানুষও ভাবল এবার ব্যাটাদের জব্দ করা গেছে। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানাের সময় হাত-পা কামড়ে ফুলিয়ে দিত। উঃ সে যে কী সাংঘাতিক জ্বালা?

কয়েকদিন যেতে না যেতেই মানুষ বিস্ময়ে হতবাক। তাদের সমস্ত হিসেব নিকেশ ওলট পালট করে দিয়ে কাতারে কাতারে পিপড়ে শহরে ঢুকে পড়ল। নতুন পরিবেশে দিব্বি মানিয়ে নিয়ে বাড়ির আনাচে কানাচে
দেওয়ালের ফাটলে ইত্যাদি নানা জায়গায় নিজেদের নতুন আস্তানা তৈরি করে নিল।

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর বর্ষ ৯, সংখ্যা -২, মে-জুন ২০১২ থেকে সংগৃহীত।

WhatsApp Image 2020-07-08 at 11.07.33 PM

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

পান্ডা এক সংকটময় জীব

0 (0) পান্ডা পৃথিবীর একটি বিচিত্রতম প্রাণী। রেকুন (Racoon- Procyonidae) পরিবারের সদস্য হিসেবেই ইদানিংকালে মর্যাদা লাভ করেছে পান্ডারা। ইতি পূর্বে পান্ডাকে ‘Teddy Beat’ নামে ভালুক পরিবার (Ursidae) এর সদস্য হিসেবেই ধরা হত। পৃথিবীতে পান্ডার মূলত দুটি প্রজাতিই এই মুহুর্তে বেঁচে রয়েছে—একটি ‘Giant Panda (Aiutopada melanoleuca)’ ও অপরটি ‘Smaller Panda’ বা”Red […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: