বাঁশ গাছে ফুল

বিশ্বাস : বাঁশগাছে ফুল ফুটলে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে।
বিজ্ঞান : বাঁশ একটি ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। সারা পৃথিবীতে প্রায় ১২০০টি প্রজাতি আছে এবং শুধু ভারতেই রয়েছে প্রায় ১৩৮টি প্রজাতি। অধিকাংশ প্রজাতিরই জীবদ্দশায় মাত্র একবার ফুল ফোটে, তা থেকে বীজ হয় এবং তারপর বাঁশগাছটি মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশগাছে বিভিন্ন ওই বয়সে ফুল ফোটে। ব্যাম্বুসা ভালগারিস প্রজাতির বাঁশগাছে ফুল হয় ১৫০ বছরে। চীনের এক প্রজাতির বাঁশগাছে ফুল হয় ১২০ বছরে। আবার কোনও কোনও প্রজাতির বাঁশগাছে ফুল ফোটে ৪০-৫০ বছরে। অর্থাৎ বাঁশগাছে ফুল ফোটা কোনও বিরল ঘটনা নয়, একটি নিয়মিত ঘটনা।

তবে সময়কাল সুদীর্ঘ বলেই অস্বাভাবিক লাগে এবং মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তাই বাঁশগাছে ফুল ফোটার সাথে বন্যা জাতীয় দুর্যোগের কোনও সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য, বাংলা ১৩৪৯ সালে (১৯৪২) মেদিনীপুরে (বর্তমানে পূর্ব বঙ্গোপসাগরের উপকূলে বাঁশগাছে ফুল ফুটেছিল এবং ওই বছরই ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক বন্যা আছড়ে পড়েছিল।

বছর কয়েক আগেও মেদিনীপুরের (পূর্ব) কিছু এলাকায় বাঁশগাছে ফুল দেখা গিয়েছিল কিন্তু এবছর ওইরকম বন্যা হয়নি।

বাঁশ সমাচার : শক্তিশালী এই উদ্ভিদটিই ...
ছবি : বাঁশগাছে ফুল

তবে বাঁশগাছে ফুল ফুটলে বিপদ হয় অন্য দিক থেকে। বাঁশগাছে যে ফুল হয় তা থেকে প্রচুর পরিমাণে বীজ হয়। এমন পরিসংখ্যান আছে যে বাঁশগাছের ফুল থেকে প্রতি বর্গ গজে হওয়া গাছ থেকে গড়ে ৮০ পাউন্ড পর্যন্ত বীজ পাওয়া যেতে পারে। এই বীজ প্রােটিন খুবই সমৃদ্ধ।

বাঁশগাছে ফুল ও দুর্ভিক্ষ !

এই বীজ খাওয়ার জন্য ইঁদুরের দল বিভিন্ন দিক থেকে ছুটে আসে। পুষ্টিকর এই বীজ খেয়ে তাদের প্রজননও বাড়ে।এবং ইঁদুরের সংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধি পায়। বীজ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। সমস্যা তৈরী হয় এখানেই। এই প্রচুর সংখ্যক ইঁদুর খাবারের সন্ধানে ছুটে যায় শষ্যক্ষেতে এবং শষ্য সঞ্চিত রাখা খামারে।
এরফলেই দেখা দেয় শস্যাভাব,যারই ফলশ্রুতি দুর্ভিক্ষ।

মিজোরামে ১৯৭৬ সালে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাঁশগাছে ফুল ফোটার পর সরকারপক্ষ অর্থের
বিনিময়ে স্থানীয় মানুষদের ইঁদুর মারার উৎসাহ দিয়েছিল, তখন প্রায় ৫ লক্ষ ইঁদুরের লেজ জমা পড়েছিল অর্থাৎ ৫ লক্ষ ইঁদুর মারা হয়েছিল তখন।

তারপর ১৯৭৮ সালে ইঁদুরের লেজ জমা পড়েছিল ২৬ লক্ষ। এছাড়া পাহাড়ী অঞ্চলে বিপদ সৃষ্টি হয় অন্যভাবে। পাহাড়ী অঞ্চলে যেখানে বাঁশের বন, সেখানকার মাটি বাঁশগাছের গুচ্ছমূল আঁকড়ে ধরে
রাখে। কিন্তু বাঁশগাছে ফুল ফোটার পর গাছগুলি মারা যায়, ফলে ওই অঞ্চলের মাটি আলগা হয়ে যায়। বৃষ্টির সময় ধস নামা শুরু হয়।

১৯৯২ সালে আইজলে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ব্যাপক ধস নামে এবং ধসে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়। ওই অঞ্চলে কয়েক মাস আগে বাঁশ গাছে ফুল ফুটেছিল এবং বাঁশ গাছগুলির মৃত্যুর ফলেই ওই ধস নেমেছিল বলে মনে করা হয়।

অর্থাৎবাঁশগাছে ফুল ফুটলেই বন্যা থেকে দুর্ভিক্ষ যেকোনও ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে তা নয়। তবে শস্য ভাড়ারে টান পড়ার সম্ভাবনা থাকে সেজন্য ওই এলাকায় ইঁদুর মারার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।

এমনকি ইঁদুর খাবে না এমন শস্য যেমন আদা, রসুন, হলুদ ইত্যাদি চাষ করার জন্য স্থানীয় চাষীদের পরামর্শ দেওয়া প্রয়ােজন। এইসব কর্মসূচী, গ্রহণ করে ঘটনাটির মােকাবিলা করা সম্ভব। ব্যপারটিকে অলৌকিক ঘটনা বলে বিবেচনা না করে, ভবিষ্যতের উপর ছেড়ে না দিয়ে, বাস্তব প্রয়ােগমূলক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সাহায্যে মােকাবিলা করা প্রয়ােজন।

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর বর্ষ ৩, প্রথম সংখ্যা ,জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে সংগৃহীত।

 

Leave a Reply

%d bloggers like this: