পরিবেশ কর্মী আশীষ ঘোষ

@
4
(30)

বসিরহাটের “গাছ পাগল” মানুষ হলেন শ্রী আশীষ ঘোষ । একই সঙ্গে তিনি গাছ লাগান আবার অন্য দিকে গাছ বাঁচানোর আন্দোলন করেন । গাছ প্রেমী আশীষ ঘোষের আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি একজন পরিবেশ কর্মী । প্রায় একদশকের বেশি সময় ধরে,তিনি বৃহত্তর বসিরহাটকে সবুজ করে তুলছেন । গাছ আমাদের প্রকৃত বন্ধু আর সেই বন্ধুর শুভাকাঙ্খী মিত্র হলেন, আশীষ ঘোষ ।

 

তাঁর জন্ম ২০শে জানুয়ারী ,১৯৮০; বসিরহাট শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা এবং স্কুল জীবন অতিবাহিত হয় । তাঁর পিতা ছিলেন স্বর্গীয় সুনীল কুমার ঘোষ,শিশু কালেই তিনি পিতৃহারা হন । মা হলেন শ্রীমতি শিবানী ঘোষ,একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী । তাঁর শিক্ষা জীবনের দ্বিতীয় ভাগ সম্পন্ন হয়,ব্যাঙ্গালুরু তে, তিনি বি.বি.এ পাশ করেন । ২০২০ সালে আন্না মালাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষন বিভাগে,তিনি মনোবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠরত । পেশাগত ভাবে তিনি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ।

 

পরিবেশ প্রেমী এই মানুষটির নেশা হলো বৃক্ষ রোপন এবং গাছের পরিচর্চা । চাকুরীজীবি হওয়ার পাশাপাশি তার বাবা ছিলেন একজন সমাজকর্মী, তাই বাবার আদর্শ এবং জীবন দর্শন তাঁকে অনুপ্রাণিত করে,এই সবুজ প্রকৃতির কর্মকান্ডে । পারিবারিক ঐতিহ্যকে তিনি বহন করছেন,এছাড়াও বিভিন্ন পরিবেশ আন্দোলন এবং পরিবেশের জন্য পরিবেশ কর্মীদের অদম্য সংগ্রাম তাঁকে প্রতিনিয়ত মানসিক রসদ যোগায় ।  ২০০৯-২০১০ সাল থেকে তিনি শুরু করেন তাঁর এই কর্মসূচি । সংকল্প নেন,বসিরহাট ও সংলগ্ন অঞ্চলকে করে তুলবেন বৃক্ষ সমৃদ্ধ ।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরুও করে দেন । ২০১১ সালে তৈরী করেন “বিগ ব্যাং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি” , যার সম্পাদক পদে তিনি আসীন রয়েছেন । এই সংগঠনটি মূলত পরিবেশ সচেতনতা এবং পরিবেশ সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও সেগুলির বাস্তবিক রূপায়ণ করে থাকে । বিগত এক দশকে তিনি প্রায় ১০০০- এর অধিক বৃক্ষ রোপন করেছেন । তিনি মূলত স্কুল,কলেজ সংলগ্ন মাঠ,রাস্তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জায়গায় সরকারি অনুমতি নিয়েই বৃক্ষ রোপন করেন । বৃক্ষ প্রেমী মানুষটি শুধু গাছ লাগিয়েই ক্ষান্ত হন না,নিয়মিত সেই সব গাছের পরিচর্চা করেন । গাছ গুলো উচ্চতায় ৮ থেকে ১০ ফুট না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর সজাগ ও সদা জাগ্রত দৃষ্টি রাখেন গাছ গুলির উপর ।  এই বৃক্ষ রোপনের খরচও তিনিই বহন করেন । তাঁর রোপন করা অধিকাংশ গাছই আজও অক্ষত, বিগত এক দশকে রোপন করা যে সকল গাছ আজকের বসিরহাটে দেখতে পাওয়া যায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠ গাছ তাঁর নিজের হাতেই লাগানো ।

 

শুধু বৃক্ষ রোপন আর তার পরিচর্চাতেই থেমে থাকেন নি গাছ প্রেমী আশীষ ঘোষ, সরব হয়েছেন নির্বিচারে বৃক্ষ ছেদনের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়েছেন লড়াই করছেন নিয়মিত । ২০১৮ সালে ঐতিহাসিক টাকি রোড গাছ বাঁচাও আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভাবে অংশ গ্রহণ করেন । এছাড়াও তিনি তথ্যের অধিকার আইনের সচেতনাতা এবংবিভিন্ন স্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে একাধিক সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন । বসিরহাট শহর অঞ্চলে প্লাষ্টিক বিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন বেশ কিছু কাল ধরেই, প্লাস্টিকের বিকল্প জিনিস গুলির সরবরাহ করেছেন,পৌঁছে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে । সার্বিক সচেতনা তৈরী করেছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে, তাঁর অদম্য নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি মানুষের মধ্যে প্লাস্টিকের বিকল্প জিনিসের প্রয়োজনীয়তার সারমর্ম উপলব্ধি করিয়েছেন । থার্মোকলের প্লেটের বিকল্প হিসেবে তিনি শালপাতার থালার পুনঃপ্রচলন করেছেন,নিজের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এই শালপাতার থালা, যা পরিবেশ বান্ধব এবং এর ব্যবহারে কোনো রূপ দূষণ হয় না । প্লাষ্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে তিনি জুট অর্থাৎ পাটের তৈরী ব্যাগের প্রচলনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন । ব্যাক্তিগত উদ্যোগে জৈব সার ( ভার্মিকম্পোস্ট ) তৈরী করেছেন ।

 

২০১৮ সালে দ্য গ্রিন ওয়াক  (The Green walk) পন্থী ভাবধারার পরিবেশ কর্মীরা এক অসাধ্য সাধন করেন –  পরিবেশের জন্য মানুষের পদযাত্রা , যা ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসের বিরলতম ঘটনা ,তাঁরা পরিবেশের জন্য ১০৭৫ কিলো মিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন ।  টাইগার হিল থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত এই পদযাত্রার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন গাছ পাগল আশীষ ঘোষ ।  পরবর্তীতে The Green Walk আয়োজিত একাধিক পদযাত্রায় তিনি অংশ নেন ।

 

২০২০সালের COVID-19 এবং লকডাউন আবহে তিনি কাজ করে চলেছেন, এই অনন্ত অবসরে তিনি বেরিয়ে পড়েন সাইকেল নিয়ে আর সাথে থাকে ব্যাগ । সকাল থেকেই শুরু হয় গাছের দেখা শুনা,পরিচর্চা ।  আসলে গাছ ভালো থাকলেই পরিবেশ ভালো থাকবো এবং আমরা সকলে ভালো থাকবো এই সত্য উপলব্ধি করতে দ্বিধা করেন নি গাছ প্রেমী মানুষটি, আর তাঁর এই আত্ম উপলদ্ধি তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন সর্বস্তরে ।  বৃক্ষ রোপন তাঁকে মানসিক তৃপ্তি ও শান্তি দেয় । ২০২০ সালে তিনি প্রস্তুতি শুরু করেছেন এক কর্ম যজ্ঞের, পালন করছেন অরণ্য সপ্তাহ এবং পশু পাখিদের খাওয়ার জন্য ফলের গাছ রোপন করছেন, সতত এ এক অভিনব ভাবনা ।

 

সবুজ পৃথিবীর জন্য তাঁর এই লড়াই মনে রাখবে মানুষ,মনে রাখবে প্রকৃতি । আশীষ ঘোষের এই কর্মকান্ডের সুফল ভোগ করবেন আগামী প্রজন্ম, যাঁদের জন্য তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন সবুজ বসিরহাট ।

gggggg

 

লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক
পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আপনার আরো তথ্য দেওয়ার থাকলে আমাদের জানান । Mail – poribesnews@gmail.com

পরিবেশ আন্দোলন গবেষণা পরিষদ

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 30

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

হাসির উপকারিতা

4 (30) ফুল যদি হয় গাছের হাসি, মানুষের হাসি তবে ফুল। মুখ পল্লবের ফুল হচ্ছে হাসি। এ এক অনুপম অনুভূতির অভিব্যক্তি। আবেগের আবিরে রাঙা অজস্র ভাঙা জীবন জোড়া লাগানাের অব্যর্থ এক আঠা যা শরীরী হয়েও অশরীরী। সামান্য এক স্ফুলিঙ্গ যেমন দূর করে দেয় অন্ধকার, অসামান্য এক চিলতে হাসিও পারে মােড় […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: