জলের হাজারাে খুচরাে বিষয়

poribes news
5
(1)

সূচনা :  জল (প্রাচীন ইংরাজী Water, জার্মান ভাষায় Wasser থেকে বর্তমানের Water’ শব্দটি এসেছে) বিশুদ্ধ তাবস্থায় স্বাদহীন, গন্ধহীন অজৈব পদার্থ, যা জীবনের ধারক ও বাহক, অপরদিকে সার্বজনীন একটি দ্রাবক। বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় বা খুব বেশি পরিমাণে জল নিলে (নদী/সমুদ্র/হদ ইত্যাদি) দেখা যাবে এর রং হালকা নীল।

পৃথিবীতে জলের ভান্ডার তা পর্যাপ্তভাবে বিশাল। সমুদ্র, মেরুপ্রদেশের বরফ, মেঘ, বৃষ্টি, নদী, মিষ্টি
জলের ভূগর্ভস্থ ভান্ডার, সমুদ্রে ভাসমান বরফ ইত্যাদি নানা অবস্থায় জল পাওয়া যায়। বাষ্পীভবন, বৃষ্টির আকারে ঝরে পড়া, সমুদ্রের জলে মিশে যাওয়া— এই তিন প্রক্রিয়া অহরহ ঘটছে।
‘পানীয় জল’ যা মানুষের জন্য ব্যবহার্য তাকে বলে ‘Potable Water’. এছাড়া, নানারকম প্রয়ােজনে ব্যবহৃত হয় নিরাপদ জল (Safe Water)। পৃথিবীর নানা প্রান্তে জলের সংকট দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত কৃষি,মানুষ ও প্রাণীর জীবন, শিল্পকাজ ইত্যাদি।

পানীয় জল সঙ্কট : বর্তমানে গড়ে ১০০ কোটি লােক প্রতিদিন অস্বাস্থ্যকর জল পান করে। G8 Evian Summit আলােচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২০০৩ সালে যে সংখ্যক মানুষ অস্বাস্থ্যকর জলপান করে, ২০১৫ সালের মধ্যে তার অর্ধেক মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি সম্মত জল পানের আওতায় আনা হবে।

যদি এই কঠিন কাজ সাফল্যও পায়, তাহলেও সারা পৃথিবীতে ৫০ কোটি মানুষ এর বাইরে থেকে যাবে। এছাড়াও ১০০ কোটি মানুষ পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার (Sanitation) বাইরে থেকে যাবে। নিম্নমানের পানীয় জল ও দূষিত পরিবেশ বছরে ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটায়।

পানি - উইকিপিডিয়া

উন্নয়নশীল দেশের শতকরা ৯০ ভাগ ময়লা জল সরাসরি নদীতে পড়ে। পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা (কমবেশি ৫০টি দেশ) জলকষ্টের শিকার। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশ যে পরিমাণ ভূগর্ভের জল উত্তোলন করে, তার অনেকটাই পূরণ হয় না ভূগর্ভে। এই ঘটনা ভূপৃষ্ঠের জলাধারকে (নদী, হ্রদ, বিল, বাওড় ইত্যাদি) সঙ্কটায়িত করে এবং ভূগর্ভস্থ জলের বিশুদ্ধতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জলীয় বাষ্প (গ্রীন হাউস গ্যাস) : পৃথিবীতে রয়েছে জলচক্র। বাতাসে ভাসমান জলীয় বাষ্প গ্রীনহাউস গ্যাসের কাজ করে। এতে সূর্য থেকে আগত অবলােহিত রশ্মি (তাপ তরঙ্গ)।শােষিত হয়, যা রাতে সবটা বিকিরিত হয় না, অর্থাৎ কিছু তাপ ধরে রাখে। এর ফলে বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জলের অণু স্থায়ী ও পােলার গু্ন সম্পন্ন হওয়ায় এই ক্ষমতার অধিকারী।

যদি জলীয় বাষ্প সৌর তাপ ধরে না রাখত, তাহলে পৃথিবী পৃষ্ঠের উষ্ণতা হত -১৮ সেন্টিগ্রেড। জলের আপেক্ষিক তাপ খুব উচ্চ ১। এর প্রভাব আছে পৃথিবীর আবহাওয়ার নিয়ন্ত্রণে। যেহেতু জলের অণুর অবলােহিত রশ্মি শােষণ করার ক্ষমতা খুব বেশি, ফলে দৃশ্য আলাের লাল অংশও অল্প পরিমাণে শােষিত হয়। সেজন্য সমুদ্র, হ্রদ প্রভৃতি বিশাল জলরাশিকে দেখলে নীলাভ দেখায়।

জলের গুণাবলী :(১) জল যেমন ভাল দ্রাবক তেমনি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও বেশি।শারীর বৃত্তিয় বিপাক ক্রিয়ায় (metabolism), রক্ত সঞ্চালনে, জীবদেহে, উদ্ভিদ দেহে জলের উল্লেখযােগ্য ভূমিকা আছে। কথায় বলে, তেলে-জলে মেশে না। লিপিড, প্রােটিন (কিছু) ইত্যাদি জলে  দ্রবীভূত হয় না। জলের আছে পৃষ্ঠ শক্তি। এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে ও কোষ পর্দার গুণাবলী ব্যবহার করে জীবনের বহু জটিল ক্রিয়ায় জল সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

(২) জলের আছে প্রবল সংশক্তি (Cohesive) বল। এই বলের কারণেই জলবিন্দু বা জলকণা গঠিত হয়। তেলের মধ্যে এক ফোটা জল দিলে জল ফোটা হিসেবেই থেকে যায়, ছড়িয়ে পড়ে না। আবার বিশুদ্ধ কাচের প্লেটের উপর একটু জল দিলে জল সমস্ত কাচের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে একটা পাতলা স্তর তৈরি করে। জলের তাণুর সঙ্গে কাচের অণুর আকর্ষণ, যাকে আসঞ্জন বল বলে (adhesive)। এক্ষেত্রে,
সংশক্তি কলের থেকে আসঞ্জন বল বেশি।

(৩) ৪ সেন্টিগ্রেড উষ্ণতায় তরল থাকে। এর জন্য শীতল সমুদ্রের প্রাণীরা জীবনধারণে সক্ষম হয়।
জলের হাইড্রোজেন পরমাণুর বন্ধন ক্ষমতার জন্য (নিম্ন উষ্ণতায়) বিশেষ জ্যামিতিক গঠন বৈশিষ্ট্যে বরফ জলে ভাসে। পৃথিবীতে এধরনের কোন দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। যেকোন পদার্থের কঠিন রূপ তার নিজস্ব তলে ভাসছে!

(৪) বিশুদ্ধ জল তড়িৎ পরিবহনে অক্ষম। অনেক সময় জলের মাধ্যমে তড়িতাহত হবার ঘটনা ঘটে। এর কারণ জলে দ্রবীভূত কার্বন ডাই অক্সাইড ও বিভিন্ন খনিজ লবণ। জলের অণু ভেঙে OH ও H:
আয়নে বিশ্লিষ্ট থাকে কথাটা ঠিক, কিন্তু অতি অল্প পরিমাণে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিশুদ্ধ জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ করে অতি সামান্য পরিমাণে H এবং O গ্যাস উৎপন্ন হয়।

জল সভ্যতার জন্মদাতাঃ সভ্যতার আদি মাতৃভূমি হােল নদীর কাছ বরাবর। পরিবহনের ক্ষেত্রে নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা- বাণিজ্যের প্রসারে নদীর ভূমিকা অপরিহার্য। প্রাচীন মেসােপটেমিয়া সভ্যতা গড়ে উঠেছিল দুটি নদীর মাঝখানে। আমাদের গঙ্গা একাধিক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে আজকের ভারতীয় সভ্যতার অনেকটাই নদীমাতৃক। পৃথিবীর বর্তমান বড় শহর গুলির বেশিরভাগই নদী বা সমুদ্রের উপকূলে বেড়ে উঠেছে।

জল এল কীভাবে ? বিজ্ঞানীদের অনুমান, জলের উৎপত্তি ঘটেছে তারার জন্মের সাথে সাথে। হাভার্ড স্মিথসােনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানী গ্যারি মেলনিক ব্যাখ্যা করেছেন। নক্ষত্রের জন্মের সময় একটা প্রবল বহির্মুখী বায়ু ঝড় (গ্যাস ও ধূলিকণা) ওঠে। এই গ্যাস ধুলি ঝড় যখন চারপাশের গ্যাসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ঘটায়, তাতে সৃষ্ট ধাক্কা (শক ওয়েভ) এই গ্যাসীয় ধূলিকণাকে সংকুচিত ও উত্তপ্ত করে। এই ঘন উত্তপ্ত গ্যাসীয় পরিমণ্ডলে অতি দ্রুত জল সৃষ্টি হয়।

পৃথিবী গ্রহে জল : (১) জলের যে তিনটি রূপ আমরা জানি– কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়; পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টিতে এর সবকটিরই বিশেষ ভূমিকা আছে।

(২) পৃথিবী যদি আর সামান্য পরিমাণে সূর্যের কাছাকাছি থাকত (ধরা যাক, দশ লক্ষ মাইল; মহাকাশে এই দূরত্ব অতি নগণ্য) অথবা সামান্য দূরে, তাহলে জলের এই তিনটি অবস্থা পৃথিবীতে দেখা যেত না। আর একটু দূরে থাকলে, পৃথিবীর সব জল বরফ অবস্থায় জমে থাকত; কাছে থাকলে উষ্ণতার কারণে সব জল বাষ্প হয়ে ভেসে বেড়াত।

(৩) পৃথিবীর অভিকর্ষ বল বায়ুমণ্ডল ও জলীয় বাষ্পকে টেনে রেখেছে। জলীয় বাষ্প ও কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে (গ্রীন হাউস গ্যাস) পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ১৫ সেন্টিগ্রেড প্রায়। না গরম, না ঠাণ্ডা। উষ্ণতার হেরফের বেশি নয়। পৃথিবীর ভর,যদি আর একটু কম হােত, তাহলে বায়ুমণ্ডল অনেক হালকা হয়ে যেত। সেক্ষেত্রে মেরু প্রদেশে অল্প জলের দেখা মিললেও মিলতে পারত, যেমনটি ঘটেছে মঙ্গলে।

(৪) ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে, পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ও জীবন-পরিবেশ কমবেশি একই আছে বলা যায়। হতে পারে, যে কারণে পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভব ঘটেছে, সেই কারণটিই এর জন্য ক্রিয়াশীল বা সক্রিয়।

(৫) জানা গেছে, সূর্য থেকে আগত তেজরশ্মির আসা কখনাে বাড়ে, কখনাে কমে। কিন্তু পৃথিবী পৃষ্ঠে
তার প্রভাব তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয় না। এই প্রস্তাবনাকে Gaia Hypothesis বলা হয়।

(৬) সবরকম জীবনের অস্তিত্ব জলের উপর নির্ভরশীল। দেখা গেছে, কিছু জীবাণু এবং উদ্ভিদের বীজ দীর্ঘকাল শুষ্ক অবস্থায় সজীব (Cryptobiotic state) থাকতে পারে এবং জীবনের লক্ষণ ফুটে.ওঠে যদি তাকে ভিজা অবস্থায় কিছুক্ষণ রাখা হয়।
মানুষ ও জল : চর্বিবর্জিত মানব দেহের ওজনের ৭২ শতাংশজল। মানব শরীরে জলের ভারসাম্য ঠিক রাখতে ন্যূনতম ১ লিটার থেকে ৭ লিটার পর্যন্ত জল দৈনিক প্রয়ােজন। এটার সঠিক মাত্রা নির্ভর করে শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়ার উষ্ণতা, আদ্রর্তা ও অন্যান্য কিছু বিষয়ের উপর।

মরুভূমির লােকেরা গরম চা পান করেন শরীরে জলের ঘাটতি মেটাতে। খুব অল্প জল পান করা নানা কারণে বিপজ্জনক হতে পারে। খুব বেশি জল খেলে ‘Water intoxication’ -এর মত মারাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে।

দাকোপে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে দুই ...

কম জল খেলে শরীরের ওজন হ্রাস পাওয়া ও কোষ্ঠবদ্ধতার সমস্যা দেখাদিতে পারে। আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণা কাউন্সিল জানিয়েছেন, মহিলাদের জন্য ২.৭ লিটার (খাদ্য সহ) এবং পুরুষদের জন্য ৩.৭ লিটার জল প্রয়ােজন। শরীর থেকে মলমূত্র ত্যাগের মাধ্যমে, ঘাম, নিঃশ্বাসের মাধ্যমে জল/জলীয় বাষ্পরূপে বেরিয়ে যায়।

জলের ব্যবহার :মাথাপিছু জলের সঞ্চয়ের নিরিখে কানাডা সবার থেকে এগিয়ে। আবার, বার্ষিক মাথা পিছু জলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আমেরিকায় ২০০০ ঘনমিটার। কানাড়া দ্বিতীয় ১৬০০ ঘনমিটার।
ফ্রান্স – ৮০০ ঘনমিটার, জার্মান–৫৩০ ঘনমিটার। বিগত ২৫ বছরে কানাডায় জলের ব্যবহার বেড়েছে ২৫.৭ শতাংশ। সুইডেন, নেদারল্যান্ড আমেরিকা, ব্রিটেন, চেক প্রজাতন্ত্রী, লুক্সেমবার্গ, পােল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এরা মাথা পিছু জলের ব্যবহার কমাতে সক্ষম হয়েছে (১৯৮০-র পর থেকে)।

আমেরিকায় ব্যবহৃত জলের ৯৫ শতাংশ আসে ভূগর্ভ থেকে। ৮০০ তার পর মাইল দীর্ঘ (১৩০০ কিমি প্রায়) ওগালালা ভূগর্ভের জলাধার (aquifer), যা টেক্সাস থেকে দক্ষিণে ডাকোটা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই জল ভাণ্ডার। বিলিয়ন কিউবিক মিটার হারে এখান থেকে জল তােলা হচ্ছে। এই জলের থেকে আমেরিকার ১/৫ অংশ কৃষিজমির সেচ কাজ নির্বাহ হয়। ভূগর্ভের এই প্রকৃতিক জলাধার তৈরিতে বহু লক্ষ বছর সময় লেগেছে। বছরে ১২ পরিমাণ সারা বছর ১৮টি কলােরাডাে অঞ্চলের নদীর সারা বছরের প্রবাহিত জলের সমান। প্রাথমিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে এই বিশাল জল ভাণ্ডার আগামী ২৫ বছরের মধ্যে শুকিয়ে যাবে। কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে জল ব্যতীত বা কম জল লাগে এইরকম অন্য চাষের কাজে যুক্ত হবার
জন্য।
দেখা গেছে, মেক্সিকো শহরে সরবরাহ করা জলের ৪০ শতাংশ পাইপের ছিদ্র (leaky) পথে নষ্ট হয়।
মধ্য এশিয়া অঞ্চলে (Middle East region) পৃথিবীর মিষ্টি জলের ভাণ্ডারের মাত্র ১ শতাংশ আছে। এখানে জনবসতি রয়েছে পৃথিবীর মােট লােকসংখ্যার ৫ শতাংশ। ২০২৫ নাগাদ আরব উপমহাদেশ অঞ্চলে জলের সঙ্কট তীব্র হবে। ২/৩ অংশ দেশ ১০০০ ঘন মিটার মাথাপিছু / বছরে এই জল পাবে না।
জল পুনরাবর্তন : জল একটি পুনর্নবীকরণ যােগ্য উৎস। অর্থাৎ জল বাষ্প হচ্ছে; ঠান্ডা হয়ে জল হচ্ছে। আরও ঠান্ডা হয়ে বরফ হচ্ছে। বরফ গলে ফের জল হচ্ছে ইত্যাদি। পৃথিবীতে আদিতে যে পরিমাণ জল ছিল, আজও তা অপরিবর্তিত আছে। জলের এই পুনরাবর্তনকে Hydrological Cycle বলা হয়। এটা একটি আবদ্ধ প্রক্রিয়া।

58027 জল চক্র ছবি_জল চক্র ...

(ক) বাম্পায়ন এবং বাষ্পমােচন,
(খ) বৃষ্টি,
(গ) ভূপৃষ্ঠে ও ভূগর্ভে জলের সঞ্চয়,
(ঘ) বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ও ঘনীভবন।

প্রতি বছর ৫,০৫,০০০ ঘন কিমি জল সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভূত হয়। এর থেকে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ে ১,১০,০০০ ঘন কিমি, যা নদী, হ্রদ, লেক, পুকুরে জমা হয়; সমুদ্রে মেশে। বাস্তুতন্ত্রের ধারক ও বাহক
হচ্ছে জল।

জল বিভাজিকা, তা মিনি, মাইক্রো, মেসাে ম্যাক্রো – যাই হােক না কেন, তা অববাহিকায় মৃত্তিকা ৬ নদীগর্ভে প্রবেশ করে। নদীর জন্মও এভাবে। এই বিষয়টি দুভাবে কাজ করে। প্রথমটিকে বলা হয়
Green Water flow (সবুজ জল প্রবাহ)। অর্থাৎ, গাছ নিজের প্রয়ােজনে যে জলকে টেনে নেয়, যা দিয়ে খাদ্য প্রস্তুত ও বাপমােচন ক্রিয়া ঘটে ।
দ্বিতীয়টি হল ‘Blue Water flow (নীল জলপ্রবাহ), যার অর্থ ভূগর্ভে ও নদীতে যে জল সঞ্চিত হয়, যা মানুষ ও প্রাণীর জীবনধারণের অপরিহার্য।

জলসঙ্কট : বাড়তি জনসংখ্যা (৬৩০ কোটি) আজ স্বাদু জলের সরবরাহের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। এর থেকে উদ্ভূত সমস্যা গুলি হল-
(ক) ক্রমবর্ধমান চাহিদা, (খ) ব্যবহার্য জলের অসম বন্টন, (গ) জলের উৎস সমূহের ক্রমবর্ধমান দূষণ।
এর কারণগুলি।

(ক) জল ব্যবহারের তীব্র প্রতিযােগিতা, (খ) গােচারণ, (ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি), (গ) অতিরিক্ত পরিমাণে ভূগর্ভের জল উত্তোলন, (ঘ) অপরিকল্পিত কৃষিকাজ, (ঙ) নর্দমার ময়লা জল পানীয় জলের উৎসের সঙ্গে মিশে দূষণ ঘটানাে ইত্যাদি।

মানুষের বিবেচনাহীন ভাবনার প্রতিফলন জলের ভাণ্ডারকে নিঃশেষিত করছে, এর জন্য বিশ্বের জলচক্ৰ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং জলবিভাজিকার সঙ্কটে স্থানীয়ভাবে জলের ভারসাম্য (Water balance) নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশের খামখেয়ালীপনায় কখনও বন্যা, কখনও খরা দেখা যাচ্ছে। কমবেশি পৃথিবীর সর্বত্রই বর্ষাকালের (বার্ষিক বৃষ্টিপাতের সময়কাল) সময়সীমা বেশ কম। মাত্র ২/৩ মাস। ভারতের ৮০ শতাংশ
বার্ষিক বৃষ্টি ঘটে জুন-জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর আসে। ভারতের পশ্চিমাঞ্চল খরা-মরুভূমি প্রবণ। ভুল নগর সভ্যতার কারণে মনুষ্যসৃষ্ট হঠকারিতায় জলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে নানা জায়গায়। হাজার হাজার ট্যাঙ্কারে দূর থেকে জল এনে শহরের নাগরিকদের তৃষ্ণা নিবারণ করতে হচ্ছে। জল বিক্রি বা জল কেনা বেশ গা সওয়া হয়ে গেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে মানুষকে বাস করতে হবে মানুষ আজও এই শিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ।

      একনজরে জেনে রাখা

পৃথিবীর মােট আয়তনের ৭১ ভাগ জল (Hydrosphere)। এর পরিমাণ হল ১.৪১ বিলিয়ন ঘন কিমি। এই জল যদি সমানভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে জলতলের উচ্চতা হবে ৩ কিমি। পৃথিবী পৃষ্ঠের নদী-নালা-খাল-বিল-হ্রদে যে জল আছে, তার ৫০০০ গুণ বেশি জল রয়েছে ভূগর্ভে। ভূগর্ভে এই জল সঞ্চয় হতে বহু কোটি বছর সময় লেগেছে।
প্রতি ৩০০০ বছরে সমুদ্রের সব জল একবার বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশেছে কথাটার অর্থ হল, সমুদ্রের সব জল বাষ্প হতে ঐ সময়কাল প্রয়ােজন।

বাতাসে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে, তার পরিমাণ পৃথিবীতে এক সপ্তাহে মােট যে বৃষ্টিপাত হয়, তার সমান। নিরক্ষরেখার উপরিস্থিত বাতাসে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে তার পরিমাণ মেরু প্রদেশীয় বাতাসে উপস্থিত জলীয় বাষ্পের ১০০ গুণ বেশি। একটি বনের প্রতি হেক্টর প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ টন অবধি জলীয় বাষ্প বাতাসে ছাড়তে সক্ষম।

প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে ১,৫০,০০০ বর্গ কিমি বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। এর কারণে বাতাস শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে।আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠছে! বৃষ্টি কমছে।

         পৃথিবীর জলভাণ্ডার

জলের উৎস জলের আয়তন(ঘনমাইল)   শতাংশ ভাগ
সমুদ্র                ৩১৭,০০০,০০০        ৯৭.২৪
বরফ, গ্লেসিয়ার                 ৭,০০০,০০০ ২.১৪
ভূগর্ভের জল                      ২,০০০,০০০             ০.৬১
মিষ্টি জলের হ্রদ                       ৩০,০০০         ০.০০৯
অন্তর্দেশীয় সমুদ্র                       ২৫,০০০ ০.০০৮
মাটির আর্দ্রতা                        ১৬,০০০         ০.০০৫
বাতাসে জলীয় বাষ্প                          ৩,১০০           ০.০০১
নদী                            ৩০০           ০.০০০১
মোট জল           ৩২৬,০০০,০০০    ১০০.০০

 

সূত্র :NACE, W.S. Geological Survey, 1967

দীপক কুমার দাঁ

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি ২০০৭ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিজ্ঞানের অগ্রগতিতেও কুসংস্কার সচল

5 (1) শুরু থেকেই শুরু করছি। খ্রীস্টপূর্ব ৫৮৫, আজ থেকে বহু বছর আগে। ‘বিজ্ঞানের জন্মদিনের’ কথা দিয়ে শুরু করছি। ওই বছরের আঠাশে মে তারিখে তুর্কি দেশের মিলেটাস শহরে দারুণ সােরগোল পড়ে গেল। ছেলেবুড়াে সবাই রাস্তায়, ফাঁকা মাঠে ভিড় করতে লাগল, সবাই হা করে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে, কারণটা কি? আসলে, […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: