পরিবেশ কর্মী রুপালী চাকলাদার

@ 1
4.6
(281)

রুপালী চাকলাদার , তিনি প্রকৃতিপ্রেমী পরিবেশপ্রেমী একজন মানুষ যাঁর হৃদয়ের গাছেদের বসবাস । সেই গাছেদের সাথে তাঁর আত্মার সম্পর্ক, আত্মিক এই সম্পর্কে তিনি মা আর তাঁর গাছেরা হলেন তাঁর সন্তানতুল্য প্রিয়জন । তিনি তাঁদের বকেন,শাসন করেন যত্ন করেন । গাছের দুঃখে তাঁর প্রাণ কাঁদে । তিনি একাধারে বৃক্ষ রোপন,তাদের পরিচর্চা করেন, আবার তাদের রক্ষার জন্যেও সরব হন ।  মানুষদের কে প্রকৃতির কাছে ফিরাতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । পশ্চিম বাংলার মহিলা পরিবেশ কর্মীদের মধ্যে তিনি অন্যতম । তিনি বিশ্বাস করেন পরিবেশ আন্দোলন যতটা বাইরের তার থেকে বেশি নিজের ভিতরের – ভিতরটা সবুজ হলে,  তবে পৃথিবীকে সবুজ করার লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নিরলস ভাবে ।

 

তাঁর জন্ম ২৬শে জুলাই,১৯৭১ সালে উত্তর ২৪পরগনার,কাঁচরাপাড়ায় । তাঁর পিতার নাম শ্রী গোপাল চন্দ্র সাধুখাঁ এবং তাঁর মা হলেন শ্রীমতি সুধা সাধুখাঁ । প্রকৃতির কোলে, সবুজে ঘেরা এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা । স্বভাবতই তৈরী হয় এক প্রকৃতি প্রেম, এ পরিবেশের সঙ্গে গড়ে ওঠে নিবিড় বন্ধুত্ব । শৈশবে তিনি অংশগ্রহণ করতেন মনি মেলার আসরে( গুরু সদয় দত্তের ব্রতচারীর আসর ) । তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় কাঁচরাপাড়া জোনপুর বালিকা বিদ্যালয়ে, তারপর নৈহাটির ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে,তিনি চলে আসেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে । শিক্ষা জীবনের এই পর্যায়ে তিনি শারীরশিক্ষা নিয়ে পড়াশুনা করেন । কল্যাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ছোটোবেলার স্মৃতিতে, মনমুগ্ধকর সেই পরিবেশ, তাঁকে ভাবতে শুরু করায় প্রকৃতির জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর ও সবুজ একটি পৃথিবী তৈরী করার পরিকল্পনার সূত্রপাত এই সময় থেকেই ! তদুপরি তাঁর পরিবেশের প্রতি ভালোলাগা তাঁর এই কাজের অনুপ্রেরণা যোগায় ।

 

কর্মসূত্রে তিনি চলে আসেন ব্যারাকপুরের, সেখানে স্বামী মহাদেবানন্দ বালিকা বিদ্যায়তনে তিনি শিক্ষকতা করেন । তাঁর নেশা বলতে আবৃত্তি,নাটক এবং নাচ । তাঁর স্বামী শ্রীযুক্ত প্রবীর কুমার চাকলাদার ইন্দিরা গান্ধী ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট-এর দায়িত্বশীল পদে কর্মরত । তিনি আদ্যপ্রান্ত পরিবেশ প্রেমী মানুষ । রুপালি চাকলাদারের আরেকটি পরিচয় তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী । তারাও অংশ নেন মায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে, তাঁর পরিবার এক প্রকৃত পরিবেশ প্রেমী পরিবার অর্থাৎ সবুজ পরিবারের এক দৃষ্টান্ত । এখানেই তাঁর কৃতিত্ব তিনি তাঁর পরিবেশ সচেতনতা তাঁর পরিবারের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন । পরিবারের সাহায্য এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁর অন্যতম প্রেরণা ।
২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ বন্যার ত্রানে সংগ্রহের জন্যে প্রথম তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন । সেই সময় থেকেই তাঁর পরিবেশ নিয়ে ভাবনা শুরু । তারও আগে ২০১০-১১ সাল নাগাদ বিটি রোডের দু-ধারের নির্বিচারে বৃক্ষ ছেদনের ঘটনা তাঁকে ব্যাথিত করেছিলো, এই সব ভাবনা থেকেই তিনি ও তাঁর মতো পরিবেশ সচেতন কিছু মানুষদের কে নিয়ে তৈরী করেন পরিবেশ বান্ধব মঞ্চ ব্যারাকপুর, ২০‍১৬ সালের ৩০ শে জানুয়ারী থেকে তাঁদের পথ চলা শুরু । এই সংগঠন থেকে তাঁরা বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন,সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষ কে পরিবেশের কাছে নিয়ে আসা তাঁদের মুখ্য উদ্দেশ্য ।

 

একাধিক বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি তাঁরা করেছেন, প্লাষ্টিক ও থার্মোকল বিরোধী আন্দোলন করেছেন , এখনও করে চলেছেন । প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক প্রভাব সর্বদা তাঁর কণ্ঠ গর্জে ওঠে, সর্বস্তরে এর সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি লক্ষ্যে অবিচল ।  তাঁদের একটি দেওয়াল পত্রিকা রয়েছে, যার নাম পরিবেশ বার্তা ব্যারাকপুর স্টেশনের  প্লাটফর্মে গেলে দেখা মেলে এই পত্রিকার । তাঁরা ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তৈরী করেছেন গ্রীন কর্নার –  এটি একটি মুক্ত মঞ্চ যা পরিবেশের কথা বলে, ব্যারাকপুর স্টেশনের টিকিট কউন্টারের সামনে প্রতি মাসের চতুর্থ শনিবার তাঁদের সভা অনুষ্ঠিত হয় । তাঁরা তাঁদের সংগঠনের মাধ্যমে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, শান্তিপুরের শব্দ আন্দোলনে তিনি নিজে ছুঁটে গিয়েছিলেন, যশোর রোডের গাছ বাঁচাও আন্দোলনের ৫৩কিলো মিটার পদযাত্রা তেও তিনি সক্রিয় ভাবে যোগ দেন ।

 

তাঁর স্কুল এবং তাঁর ফ্ল্যাট অর্থাৎ তাঁর কর্মস্থল এবং বাসস্থানকে তিনি নিজ উদ্যোগে উত্তর উত্তর সবুজ করে তুলছেন । তিনি নিজে বীজ থেকে টবে চারা গাছ তৈরী করেন । বিভিন্ন জায়গায় পদযাত্রার সময়ে ছড়িয়ে দেন বীজ । স্কুলে ও বাড়িতে তাঁর রোপিত গাছ গুলির নিয়মিত পরিচর্চা করেন । সবুজ বাহিনীর হয়ে কাজের একাধিক পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার তিনি ও তাঁর সংগঠন ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশ চেতনা বৃদ্ধির জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছেন । তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য তাদের জন্য বিভিন্ন প্রবন্ধ, বিজ্ঞান ভিত্তিক মডেল প্রতিযোগিতা, সেমিনার এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ । এই পর্যবেক্ষণে তাদের প্রকৃতি, গাছ ও পাখি চেনানো হয় । এই সবুজ পরিবারের গৃহকর্তীর আরেক অনবদ্য কৃতিত্ব হলো উপহার হিসেবে গাছ বিতরণ । তিনি তাঁর বাড়িতে আসা অতিথিদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে গাছ বিতরণ করেন এবং সেই সব গাছের সাথে প্রাপকের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, ফলতই সেগুলি সযত্নে বেড়ে ওঠে । এই অভিনব উদ্যোগ তিনি স্কুলেও প্রচলন করেছেন l সেখানেও তাঁর প্রাক্তন ছাত্রীরা এসে যখন তাদের গাছের খোঁজ করেন এবং তাদের পাওয়া সেই ছোটো গাছ কে যখন বড়ো আকারে দেখেন,তখন তাদের ওই আনন্দটুকুই তাঁর প্রাপ্তি হয়ে থাকে ।

 

এছাড়াও তিনি সমর্পিতা নামক একটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত যারা পাথর প্রতিমা, মেদিনীপুর প্রভৃতি প্রান্তিক জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য আশ্রম পরিচালনা সহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে থাকেন । ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফান বিধস্ত মথুরাপুরে তাঁরা একাধিক সেবা মূলক কাজ পরিচালনা করেছেন এবং স্থানীয় একটি স্কুলে বৃক্ষ রোপন কর্মসুচিও পালন করেছেন । নদী বাঁচাও আন্দোলনেও তিনি যুক্ত থেকেছেন ।  ২০১৮ সালে The Green walk পন্থী ভাবধারার পরিবেশকর্মীরা অসাধ্য সাধন করেন – পরিবেশের জন্য মানুষের পদযাত্রা –  যা পৃথিবীর ইতিহাসের বিরলতম ঘটনা , তাঁরা পরিবেশের জন্য ৩৫ দিনে ১০৭৫ কিলো মিটার পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন । টাইগার হিল থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত এই পদযাত্রার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি । পরবর্তীতে দ্য গ্রিন ওয়াক (The green walk) আয়োজিত একাধিক পদযাত্রায় অংশ গ্রহণ করেন  – যাদের মধ্যে  পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের পদযাত্রা , লাটাগুড়ি জঙ্গল বাঁচাও পদযাত্রা , শান্তিনিকেতন কোপাই নদী বাঁচাও পদযাত্রা ,  মেদিনীপুর অরণ্যের অধিকার পদযাত্রা উল্লেখযোগ্য । তিনি বাঁকুড়ার আরণ্যক সমাজেরও সদস্যা ।

 

সকলের জন্য , তাঁর আহ্বান পরিবেশের নিকটে আসার,সেই নিবিড় প্রকৃতিই তাঁকে এক অদ্ভুত মানসিক তৃপ্তি ও শান্তি দেয় । তিনি উপলব্ধি করতে পারেন গাছেদের কে,তাদের শব্দ কে,এই উপলব্ধি ও চেতনা মানুষের মধ্যে ক্রমশ ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য । গাছ ও পরিবেশ কে তাঁর মতো করে উপলব্ধি করে ভালোবাসতে পারলেই মিটবে পরিবেশের সংকট, পরিবেশের জন্যই যে মানুষ এই সহজ সরল সত্যিটা তিনি সকলকে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক বৃক্ষ প্রেমের মাধ্যমে জানিয়ে চলেছেন ।

 

ছবি গ্যালারি

This slideshow requires JavaScript.

 

লেখক

সৌভিক রায়

ভারতীয় উপ মহাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের গবেষক ও লেখক
পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে আপনার আরো তথ্য দেওয়ার থাকলে আমাদের জানান । Mail – poribesnews@gmail.com

পরিবেশ আন্দোলন গবেষণা পরিষদ

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 281

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “পরিবেশ কর্মী রুপালী চাকলাদার

  1. আমার সব থেকে আদরের দিদি ৷ আমার কাজের প্রেরনা ৷ আমাদের পথ প্রদর্শক ৷

Leave a Reply

Next Post

মশা মারার ধূপ

4.6 (281) মানব জীবনে নানা সমস্যার মধ্যে খুব পরিচিত মশা এক চিরন্তন সমস্যা। মশার প্রাদুর্ভাব একেবারে নির্মূল করা এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এদের ধংস করার জান্য কত নিরন্তন চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।দেশ বিদেশের সব গ্রামগঞ্জ শহর এলাকম মশা বাড়ছে। সংখ্যাটা কোথাও বেশি কথাও কম। আমাদের দেশে খুব গরম […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: