জলাভূমির জীবিকা

poribes news
5
(2)

কোলকাতা থেকে প্রধানত মুম্বাইগামী জাতীয় সড়কের (NH-6) দু’পাশে প্রচুর হােগলা বন আছে। কোলকাতা থেকে কোলাঘাট পর্যন্ত রাস্তার পাশে জন্মানাে এই হােগলা বনে জন্মানাে হােগলা, জলের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০-২৫ ফুট পর্যন্ত হতে দেখা যায়। প্রায় ২০,০০০ এরও বেশী মানুষ পশ্চিম বাংলায় হােগলা নির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

ছই, মাদুর, চাটাই, টোকা, সারসি ইত্যাদি তৈরি হয় হােগলা পাতা থেকে মাদুর বােনাই কঠিন তম কাজ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বন সুন্দরিয়া, তসরালা, জলধাপার মত গ্রামে প্রায় ৭৫% মানুষ হােগলা চাষের সঙ্গে যুক্ত। লাভ নেই বেশি। সাধারণত দু’জন সারাদিনে ৬ ফুট x ৩ ফুট দৈর্ঘ্যের ১টি মাদুর বুনতে পারেন।

বেশী খাটলে ছােট একটা মাদুর-ও উঠে যেতে পারে। একটা মাদুর কিনে বিক্রি করতে পারলে ৩০-৪০ টাকা লাভ থাকে । এসব ক্ষেত্রে নিজের শ্রমটুকুই লাভের পুঁজিতে যােগ হয়। এখানে মেয়েরা হাঁটু মুড়ে বসে মাদুর বােনেন। ভারি পাটা চালিয়ে মাদুর বুনতে গিয়ে অনেকে কোমরের বাত, গ্যাস, অম্বল ও বুকের ব্যথায় ভােগেন।

ভাল না লাগলে উপায় কী? গ্রামের সবিতাদিদের কথায় ‘মাদুর বুনে দু’পয়সা আসে বলে এ গ্রামের মেয়েদের কলকাতায় বাবুর বাড়ি কাজ করতে ছুটতে হয় না। ওঁদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে কখন যে ওঁদের ভাল লেগে গিয়েছিল জানি না। ওঁদের সমস্যার কথা মাথায় রেখে বিকল্প উপার্জনের ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ওঁদের অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ব্যবস্থা হয়েছে। শােলার কাজ শেখানাে হয়েছে এই সব গ্রামের অনেক ছেলেমেয়েকে। তারা এগিয়ে চলেছেন। জলধাপার স্থানীয় স্কুলের হেড মাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় চিত্তরঞ্জন চক্রবর্তীর আন্তরিক সহযােগিতায় এ গ্রামে জীববৈচিত্র প্রীণ শিবির হয়েছে। ঐ কর্মশালা পরিচালনা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম তারই কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে হাতের কাজ শিখিয়ে হােগলার মাদুর বােনার বিকল্প ব্যবস্থা করার মাধ্যমে।

আরও প্রশিক্ষণের প্রয়ােজন। মায়েদের আত্মসম্মানবােধ ও হতদরিদ্রের মধ্যে দিয়ে সংসারকে ধরে রাখার এ শিক্ষা বােধ হয় ভারতের গৌরব। হাইটেক সােসাইটি থেকে এ মাদক দূরে। শােলার কাজকর্ম শেখার মধ্যে দিয়ে এ গ্রামের বেশ কিছু মানুষ আজবিকল্প রুজির সন্ধান পেয়েছেন।

শােলা চাষ : শােলা গাছ ধানজমি থেকে শুরু করে পুরানাে খাল,বিল ডােবাসহ বড় বড় জলাভূমিতে জন্মায়। শােলা গাছেরও দুটি প্রজাতি আছে। একটি declryronment aspera ফুলশােলা। আর একটি aclyriormerle india কাঠশােলা। এর মধ্যে ফুলশােলার কাণ্ড থেকেই শােলার কাজ হয়।

Badarganj Reporters Club: শোলার খোঁজে মালিরা

শােলা আসলে শােলার কাণ্ডের মধ্যেকার সাদা মজ্জা। হাতের কায়দায় ছুরি চালিয়ে গােল নরম শােলা থেকে কাগজের মত রােল বার করেন শােলা শিল্পীরা। মােটেই সহজ কাজ নয়। যথেষ্ট মুন্সিয়ানার প্রয়ােজনও বটে। ঐ বিশেষ ধরনের ছুরিগুলিকে বলে ‘কাত’ বা কাতি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মথুরাপুর থানার মহেশপুর গ্রামের শােলার কাজ প্রায় ৩০০ বছরের পুরানাে; ঐ গ্রামে গেলেই দেখা যাবে ছােট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বড়ােরা অক্লেশে ‘কাতি’ চালিয়ে যাচ্ছে হাতের চাপে তৈরি হচ্ছে নানান শৌখিন জিনিস।

আগে শােলা থেকে তৈরী হত চাঁদমালা, মালা, কদম, বিভিন্ন রকমের পাখি ও ঠাকুরের ডাকের সাজ (ডাকে
হাল্কা শােলার সাজ আসত বলে ডাকের সাজ’ নাম হয়েছে)। এখন রুচি পাল্টিয়েছে। শােলার ওপর নানান চারুকলার কাজ শুরু হয়েছে বছর চল্লিশ/পঞ্চাশ আগে থেকে। শােলার কাজকে পৃথিবীর মানচিত্রে নিয়ে
এসেছেন বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের প্রবাদপ্রতিম অনন্ত মালাকার।

প্রায় সত্তরাের্ধ সদাহাস্য মালাকার মশাই নিজেই যেন শােলা শিল্পের উৎকর্ষের আকর। তারাশঙ্করের উপন্যাস থেকে প্রেরণা পেয়ে ভিন্ন সাদের শােলার কাজের ধারার তিনিই পথ প্রদর্শক। আজ দেশে-বিদেশে অনন্ত মালাকারের কাজ স্বীকৃত।

শোলা শিল্প ও বনকাপাসি গ্রাম » কৌলাল
 শােলা শিল্পী

সারা পশ্চিমবাংলায় এখনও পর্যন্ত ১৫০০০ এর বেশি স্বীকৃত শােলা শিল্পী আছেন। এদের অনেকেই রাষ্ট্রপতির স্বীকৃতি পেয়েছেন। বর্ধমানের আদিত্য মালাকার, দিনাজপুরের মধুমঙ্গল (বহুবার বিদেশে গেছেন),

বাঁকুড়ার মাস্টারমশাই রনজিত কর্মকার (ইনি আবার আকাশবাণীর গীতিকারও), কৃষ্ণনগরের গৌতম বাগ প্রমুখদের হাতের কাজ ও শিল্পী মানসিকতা নজর কাড়ার মত। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে, বিভিন্ন লােকাচার,
পূজা অর্চনা, আনন্দানুষ্ঠানে শােলার কাজের ব্যবহার সব জেলাতেই আছে।

তবে জেলা ভেদে শােলার কাজের বৈচিত্রের ফারাকও আছে। সে অনেক কথা। আছে শােলা শিল্পীদের কাজের মানের ভেদ। গ্রাম বাংলার মালাকার বলে এঁদের খ্যাতি। খ্যাতির বিড়ম্বনা! প্রায় প্রতি জেলায় অধিকাংশ উল্লেখযােগ্য শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলার সুবাদে এটা স্পষ্ট যে এদের প্রচুর ক্ষোভ আছে। শােলা শিল্পের প্রধান সমস্যা বাজার।

অসম্ভব সুন্দর সমস্ত কাজ যথার্থ বাজারের অভাবে বিকোয় না। সংসার জোড়াতালি দিয়ে চলে
প্রায় অনেকেরই। কিন্তু মনের দিক থেকে বাসকলেই অনেক খােলামেলা। সরলতা এঁদের ভূষণ। তারই সুযােগ নেয় বেশ কিছু শহুরে অসাধু-সংস্থা। এদের প্রলােভন দেখিয়ে অনেক বেশি টাকায় শােলারকাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সমস্ত অসাধু ব্যবসায়ী এদের কবজা করেন। টাকার লােভে গাড়ি করে জিনিস নিয়ে যখন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে এঁরা আসেন তখন কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এরপর ঐ অসাধু ব্যবসায়ীরা (এরা আসলে জার্মপ্লাজম স্মাগলারও বটে)নানা অছিলায় শােলা শিল্পীদের কাজের খুত বার করেন ও না নেবার ভান করেন। উদ্দেশ্য চরণতলে আত্মবলি দাও। ঘটেও তাই। বলিদান পর্ব চলে দিন পানের কুড়ি ধরে।

এরপর যা হবার তাই হয়। তিন মাসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে তৈরী  লক্ষ টাকার জিনিস কয়েক হাজার টাকায় দিয়ে আগসমর্পণ করে প্রাণে বাঁচেন অনেক শিল্পী। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মহেশপুর গ্রামের অনেক শােলা শিল্পী। এভাবে প্রতারিত হয়েছেন। ভালো দিক কিছু আছে। এই গ্রামের যেসব মেয়েরা শোলার কাজ জানে বিয়ের বাজারে তাদের কদর আছে। মহেশপুরের মেয়েরা পশ্চিমবাংলার শােলার কাজের প্রসারে অনেকটাই ভূমিকা নিয়েছেন। শশুরবাড়ি গিয়ে নতুন বউ  শিখিযেছেন দেওর-ননদদের। খোঁট খেতে হয়নি। মান বেড়েছে। একশ টাকার শোলা দিয়ে তার আনুষঙ্গিক (আঠা, জরি, রাত্য ইত্যাদি) বড়জোর পঞ্চাশ) টাকা খরচ করে একমাসে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জনের সুযােগ আছে।
যা নেই তা হল বাজার। বিদেশে চাহিদা আছে। ঈদের সময় আরব দুনিয়ায় ‘চাদ-তারার’ বাজার খুব ভাল। শােলা শিল্পীরা এমন Indoor decoration  এর কাজ করেন। দোকানপাট সাজিয়ে দেন। মডেল তৈরি করেন। এইসব মডেল যথেষ্ট হালকা হওয়ায় বিদেশে পাঠাতে সুবিধা হয়।

পানিফল চাষ: পশ্চিমবাংলায় প্রায় হাজারের বেশি পরিবার পানি চাষের সঙ্গে যুক্ত। পানিফল (Trapa natans var.. bispinosa)সাধারণত রেল লাইন বা বাস রাস্তার দু’পাশের সরকারী খাস জমিতে পানিফলের চাষ হয়। উত্তর চব্বিশ পরগণায় কোথাও কোথাও নাঁচু ধান জমিতে জল ধরে রেখেও পানিফলের চাষ হয়। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টর প্রতি ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা পর্যপ্ত পানি বিক্রি হয়। খরচ ও পরিশ্রম
আছে। আছে জীবনহানির আশঙ্কা। তবে চ্যষীরা অভিজ্ঞ। পানিফলের নানান রােগ হয়। পােকামাকড় নষ্ট করে ফেলে। বিষ (pesticide) ছড়ান চাষীরা। দুর্গাপুজোর সময় যে পানিফল ওঠে ত্যর দামই বেশি।

৭৫০ হেক্টর বিল–জলাশয়ে পানিফলের চাষ ...
পানিফল চাষ

মাদুর কাঠি চাষ: পশ্চিমবাংলায় মাদুর কাঠি চান প্রধানত মেদিনীপুরেই বেশি হয়। এছাড়া উত্তর চব্বিশ পরগণার মসলন্দপুর, মুর্শিদাবাদের চরঘাট, দক্ষিণ দিনাজপুর, হাওড়ার কোন কোন অঞ্চল মাদুর কাঠির চাষ হয়। নাদুর কাঠি মুথা জাতীয় গাছ। এর তৃণকাণ্ড কাচা অবস্থায় চিরে শুকিয়ে নিয়ে কাঠি তৈরি করা হয়। ঐ কাঠি দিয়েই তৈরি হয় মাদুর।

হােগলার মত মাদুর-কাঠি থেকে মাদুর বােনার পদ্ধতিও একইরকম। নিজেদের শ্রমের টাকা বাইরে দিতে হল এরা লাভের মুখ দেখাতেন কিনা সন্দেহ। মেদিনীপুর জেলার সবং,পটাশপুর, কলপাই, এগরা, রাম নগরের মাদুরের খ্যাতি আছে।

Trska (Phragmites australis)
মাদুর কাঠি

রাম নগরের মাদুরের খ্যাতি বিদেশেও আছে। অসাধারণ দক্ষতায় তৈরি এই মাদুর সতরঞ্চীর মত নরম। এর ওপর সিনি প্রিন্টিং পর্যন্ত হয়। এক একটি মাদুর তেমন কাজ হালে প্রায় তিন-চার হাজার টাকা বিক্রি হয়। মাদুরের কাজেও রাষ্ট্রপতির স্বীকৃতি পেয়েছেন পশ্চিম বাংলার কয়েকজন শিল্পী। রাম নগরের পুষ্পরানি জানার নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য সদাহাস্যময় পুস্পদির বাড়িতে গিয়ে দেখেছি সারাদিন পরিশ্রম করে চলেছেন।

এভাবে বসে নিঁখুত দক্ষতায় মসলন্দ মাদুর তৈরি করলেন সদামিতহস্যময়ী। অভাবের সংসারের পূষ্পলির স্বলজ্জ হাসি ফোন সব কিছুকে জয় করে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প নিগমের আর্থিক অনুকুল্যে এ পর্যন্ত অন্তত পঞ্চাশ জনকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পুষ্পরানি জানা।মাদুর চাষ করলে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ১১০০০  টাকার মাদুর বিক্রি হতে পারে।তাই মোটের ওপর পাঁচ শতক জমি থাকলে মাদুর চাষ করে পাঁচজনের সংসারের মােটা ভাত-কাপড়ের সংস্থান হয়।

জলাভূমি নির্ভর জীবিকায় পশ্চিমবাংলার অন্যান্য জেলার থেকে মেদিনীপুর অনেকটাই নির্ভরশীল আর মাদুর কাঠির চাষ ও ঐ কাঠি থেকে মাদুর বােনার উপর অন্তত ১-৩% মানুষ সারা পশ্চিমবাংলায় নির্ভরশীল।যদিও এখন চিনা প্লাস্টিক মাদুর কমদামে বিক্রি হচ্ছে,ফলে দেশী মাদুরের কদর কমছে।
মাখানা চাষ :মাখানা বা কাঁটাপদ্ম (Ewcylele ferox) বিংশ শতাব্দীর গােড়ার দিকেও পশ্চিমবাংলার কলকাতা সহ হাওড়া, হুগলী, মেদিনীপুর, বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের খাল বিলে দেখা যেত। মূল ও কাণ্ড ছাড়া সারা দেহে কাটাযুক্ত এই গাছটির খাদ্যগুণ ও ভেষজমূল্য সারা পৃথিবীর যে কোন জলজ উদ্ভিদের থেকে বেশি। যদিও এই গাছের প্রথম ফসিল কোলকাতার আশপাশ থেকেই পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু আজ কলকাতার আশেপাশেতাে নয়ই, এমনকি পশ্চিমবাংলার অন্যান্য জায়গাও এর খোজ মেলা ভার।

১৯৯৯ সালের শেষ দিক থেকে মালদহ জেলার হরিশচন্দ্রপুর ব্লকে এর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। এরপর জলপাইগুড়ি জেলার কিছু অংশেও মাখানা চাষ ছড়িয়ে পড়ে। লাভের অঙ্ক উল্লেখযােগ্য বলেই ঐ অঞ্চলে
সম্ভাবনা থাকলে যেকোন জলাতে মাখানা চাষে ব্যবহার হচ্ছে। শােনা যাচ্ছে কেউ কেউ মাখানার পেটেন্ট পেতে উদ্যোগী হয়েছেন বা পেয়েও গেছেন।

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবাংলার মালদহ জেলায় অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ মাখানা চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। উত্তর বিহারে প্রায় ৮৬,০০০ হেক্টর জলাভূমিতে মাখানা নিয়মিত ভাবে
চাষ হয়।

দ্বারভাঙ্গা, মধুবনীর মাখানার সারা পৃথিবীতে ভাল বাজার আছে। উত্তর বিহারে অন্তত ১,৫০,০০০ মানুষ মাখানা চাষের উপর নির্ভরশীল। মাখানার বীজ থেকে তৈরি ভাজা মাখানা কলকাতার বাজারে ১৫০- ১৮০ কিলাে দরে পাওয়া যায়। দ্বারভাঙ্গা বাজারে এর দাম অনেক কম। মাখানা বীজের খাদ্যগুণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এর মধ্যে প্রায় ৭৭%, স্টার্চ। এই স্টার্চ সহজপাট্য হওয়ায় চীনদেশে মাখানার বীজ থেকে শিশুখাদ্য তৈরির ভাল বাজার আছে। মাখানার বীজের অ্যামাইনাে অ্যাসিড ইণ্ডেকন ডিমের সঙ্গে তুলনীয়। ১০০ গ্রাম ভাজা মাখানা (Makhana puff) খাদ্যগুণে ১০০ গ্রাম মাছের কাছাকাছি। নানান রােগের নিরাময়ে মাখানার কাঁচা বীজের বিশ্বব্যাপী ব্যবহার আছে। বিদেশে ঔষধ শিল্পের জন্য প্রতি কিলােগ্রাম মাখানা বীজ প্রায় ২০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

জলাভূমির শাকসবজি চাষ : পশ্চিমবাংলার সমতল থেকে শুরু করে পাহাড়ি উপত্যকা পর্যন্ত সর্বত্রই জলাভূমিতে নানা ধরনের শাক’ জন্মায়। এর মধ্যে কোনাে কোনটি আবার বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। এই প্রসঙ্গে সমতলের কলমি শাক (Ipomoea aquatica) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাতে গােনা কয়েকটি জেলা ছাড়া সমতলে প্রায় সব জায়গাতেই কলমি জন্মায়। এখন অনেক জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে চাষও হয়। চব্বিশ পরগণা (উত্তর ও দক্ষিণ), হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, নদীয়া, বাঁকুড়া জেলায় কমি চাষ হাজার হাজার মানুষের দু-মুঠো অন্নের সংস্থান করেছে।

বাড়ির আঙ্গিনায় শাপলা চাষ
শালুক

হিংচে, ব্রাহ্মী, শুষনি, কুলেখাড়া শুধু শাক হিসাবে নয় ভেষজ গুণের জন্যও সারা পশ্চিমবাংলায় অল্পবিস্তর বিক্রি হয়। গ্রামের হত দরিদ্র মেয়েরা খাল-বিল-নালা, জলা-জমি থেকে শালুক-কল্মি-হিংচে এ ধরণের নানান শাক তুলে এনে হাটে বাজারে বিক্রি করে তেল-নুনের খরচ জোগাড় করেন। বর্ষার পরে খাল, বিল, পুকুর, ধানজমি থেকে শালুকফুল তুলে বাজারে বিক্রি করে অনেকেই জীবন চালান।

কোথাও কোথাও শালুক চাষও হয়। শালুক তুলতে গিয়ে সাপের কামড়ে জীবন গেছে এমনও শােনা যায়। জীবন হাতে নিয়ে রুটি-রুজির সংস্থানে নামতে বাধ্য হয়েছেন এমন মেয়েদের সংখ্যা এ বাংলায় কম নয়।
কচু জলাভূমির গাছ। কচু চাষ যথেষ্ট লাভজনক। বীরভূমের কচু চাষ সারা পশ্চিমবাংলার মধ্যে উল্লেখযােগ্য। বালু দোঁয়াশ মাটিতে গাঁঠিকচু চাষ ভাল হয়। আবার কাদামাটিতেও কচু চাষ হয়। কাদা মাটিতে শােলা কচুর চাষ হয়। এখন প্রায় জেলাতেই মাটির প্রকৃতি বুঝে কচু চাষ হয়। বাজারে
গাঁঠিকচু, শােলাকচু, কচুর ডাটি আর কচুর লতির যথেষ্ট চাহিদা আছে।

পুকুর পাড়ে বা খালের ধার বরাবর অযত্নে বেড়ে ওঠা কচু গাছও অনেক মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই প্রসঙ্গে একটা ছােট্ট ঘটনা উল্লেখ করার লােভ সামলাতে পারছিনা। ট্রেন সিগন্যালে আটকে আছে বেশ কিছুক্ষণ স্বভাববশত আমার চোখ পাশের জলাগুলােতে চলে যায়। হঠাৎ দেখি এক মহিলা একটা বঁটি আর থালা হাতে বেরিয়ে এলেন। মুহূর্তে বটি দিয়ে পুকুর পাড় থেকে কেটে ফেললেন বেশ কিছু কচু গাছ। অনেকটা গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমায় রবি ঘােষের স্টাইলে কচুর উঁটিগুলাে কেটে ধুয়ে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকে গেলেন। হয়ত সেদ্ধ খেয়েই চলে যাবে সকালটা। এই হল জলাভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এটা কোনাে নতুন ঘটনা নয়। জলা সর্বদাই জীবনমুখী।

জলাভূমির ভেষজ : বচ, থানকুনি, কুলেখাড়া, শুষনি, শালুক, মাখান-এ সব গাছের ভেষজ গুণের জন্য আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যায় এসব গাছের ব্যবহার আছে। হােমিওপ্যাথির ক্ষেত্রেও জলাভূমির গাছপালার গুরুত্ব উল্লেখযােগ্য। বচ, কুলেখাড়া, শুনি, স্পাইরানথিস ইত্যাদি আরও অনেক গাছপালার হােমিওপ্যাথ ঔষধ প্রস্তুতিতে ব্যবহার আছে।

জলাভূমির সম্পদ দিনের পর দিন মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে এটাই শেষ কথা নয়। জলাভূমির পরিবেশগত দিক গুলিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাই জলাভূমির সুষ্ঠ বিবেচনা প্রসূত ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে জলাভূমির সংরক্ষণ আশু কর্তব্য। বড় বড় জলাভূমির সংরক্ষণ করার জন্য গুরুত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইন আছে। সমস্যা ছােট ও মাঝারি জলাভূমি।

এদের জন্য পশ্চিমবাংলার মৎস দপ্তরের সুনির্দিষ্ট আইন আছে। পাঁচকাঠা পর্যন্ত জলাভূমি Pisciculture’ -এ ব্যবহৃত হলে তা ভরাট করলে।দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান খাতায়-কলমে আছে। জলাভূমি ভরাট হয়ে
যাওয়া শুধু উন্নতশীল দেশের সমস্যা নয়। সবদেশেই এ সমস্যা আছে। ইউনাইটেড স্টেটস-এর মত দেশেই প্রায় ৫৪% জলাভূমি ধ্বংস হয়েছে। ইউরােপিয়ানদের বসতি স্থাপনের জন্য। অন্তত ৪০% জলাভূমি ভরাট
হয়েছে ভারতে। কোলকাতার আশপাশে জলাভূমি ভরাট নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা আছে।

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জুলাই আগস্ট ২০০৭ থেকে সংগৃহীত।

 

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ধূমকেতু NEOWISE

5 (2) আজ একটা অন্য বিষয় নিয়ে লিখছি। একটি নুতন ধূমকেতু। যদিও ফেসবুক হওয়াটস এপের বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাপারে কোন কথা সেভাবে বলেননি তবুও এক দুটি পোস্ট পেয়েছি ধূমকেতুটি সম্পর্কে। তাই আমার বন্ধুদের জন্য কিছু তথ্য দিচ্ছি। ধূমকেতু কি ও কেন সেই বিষয়ে বলছিনা। তবে ধূমকেতু প্রধানত দুই ধরনের হয়। পিরিয়ডিক […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: