মাছের ছালের তিন গুণ

0
(0)

 

অনেককাল আগের কথা — কালো ড্রাগন নদীর ধারে বাস করত মৎসকন্যারা। তারা মাছের ছাল দিয়ে এমন চমৎকার সব জামা-জুতো বানাত যে লোকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকত। সেলাই করত বাঘের হাড়ের সূচ আর হরিণের স্নায়ুর সুতো দিয়ে। যে যত ভালো পোশাক বানাত তার জন্য বর জুটত ততই ভালো।
এ কোন রূপকথা নয়। আমুর নদীকে চীনে বলে কালো ড্রাগন নদী। এই নদীর ধারে বসবাস করত অনেক উপজাতি। কেউ কেউ আজও আছে, কেউ বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমুর যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরে মিশেছে সেখানে থাকত নিভ্খি আদিবাসীরা। এখানকার স্যাতস্যাতে আর বৃষ্টিবহুল আবহাওয়ায় রেইনকোট না হলে চলে না। নিভ্খিরা তাই মাছের ছাল দিয়ে পার্কা মানে রেইনকোট তৈরি করত। আর হাজান উপজাতির মানুষরা থাকত চীন আর রাশিয়ার সীমানায় আমুরের তীরে। এই হাজানদেরই মারমেইড ট্রাইব বা মৎসকন্যা উপজাতি বলে। আবার আলাস্কার ইউপিকদের পার্কা শুধুই রেইনকোট নয় তাবুও বটে! এই পার্কা গুলোকে বলে কাসপারলুক (qasperrluk)। কাসপারলুক কিভাবে তাবুর মত খাটায়? রেইনকোটের মাথায় দেওয়ার হুডটা একটা বরফের চাঙরের সঙ্গে টাঙিয়ে, গায়ে দেওয়ার অংশটাকে মাটিতে পিন করে আটকে দিলেই ছোট্ট একটা তাঁবু , বিপদে-আপদে ব্যবহার করার জন্য তৈরি।

The Unique Fish-skin Clothing | Skins clothing, Clothes, Fishing ...
মাছের চামরার তৈরী পোষাক

এই সবকিছু মাছের ছাল দিয়ে তৈরি করা যায় কারণ মাছের ছাল তুলনামূলকভাবে পশুচামড়ার চেয়ে ন’গুণ বেশি শক্তপোক্ত।
তবে উপজাতিদের ব্যবহার করা কৌলিন্যহীন মাছের চামড়ার এখন বেশ চড়া দাম। সৌজন্যে বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডস যেমন নাইকি, প্রাডা ইত্যাদি।

চামড়া তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের মাছ ব্যবহার করা হয়। যেমন আর্কটিক সার্কেলের আইসল্যান্ডে কড, হ্যালিবাট, শার্ক,স্যামন ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমন নিরক্ষরেখায় আফ্রিকার কেনিয়াতে ছ’ ফুট লম্বা মাছ নাইল পার্চ (nile perch) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কিনা আমাদের ভেটকি মাছের তুতো ভাই। তৈরি হচ্ছে জুতো, জামা, ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, হিপ ফ্লাস্ক থেকে ছোরার খাপ সবকিছুই।

পরিবেশের দিকে খেয়াল রেখে ব্যবসা শুরু করা অন্ট্রাপ্রেনরদেরও বেশ পছন্দ মাছের ছাল। মাছের ছালকে চামড়ায় পরিণত করতে ক্রোমিয়াম সল্টের মত ক্ষতিকর কেমিক্যাল দরকার হয়না, ভেষজ ট্যানিন যথেষ্ট। ভেষজ ট্যানিন ব্যবহার করা হয় বলে ট্যানারীর ব্যবহৃত জল যখন কাছের জলাশয়ে মেশে তখন সেই জলাশয়ের জল দূষিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না। আরেকটা পরিবেশ বান্ধব বিষয় হল মাছের ছাল আসে মূলত ফিশফুড শিল্পের বাই প্রোডাক্ট বা বাড়তি ফেলনা দ্রব্য হিসেবে, সুতরাং নতুন করে মাছ মেরে জীব বৈচিত্র ধ্বংসের কোন ব্যাপার থাকছে না।

একটা ফোসকা পড়লে আমরা আহা উঁহু করি। গরম তেল ছিটে গায়ে লাগলে কত জ্বালা করে মোটামুটি সকলেরই সেই অভিজ্ঞতা আছে। কল্পনা করতে কষ্ট হয় না সেকেন্ড ডিগ্রি বা থার্ড ডিগ্ৰি বার্ণ পেশেন্টদের কতটা যন্ত্রনা হয়! সেই যন্ত্রণার উপর আরো যন্ত্রণা যখন ব্যান্ডেজ বদলাতে হয়। পোড়া জায়গায় অন্য প্রাণীর চামড়া ব্যবহার করা কমন প্র্যাকটিস। এখন দেখা যাচ্ছে তেলাপিয়া মাছের ছাল অনেক বেশি উপকারী। তেলাপিয়ার ছালে আছে প্রচুর টাইপ ওয়ান কোলাজেন প্রোটিন।

মানুষের শরীরে বসানো হচ্ছে ...

কোলাজেন প্রোটিনের অণু তৈরি হয় তিনটি আলফা চেইন দিয়ে যারা প্রত্যেকে বামহাতি হেলিক্স তৈরি করেছে। তারপর এই তিনটি হেলিক্স একসাথে মিলে ডানহাতি সুপারহেলিক্স তৈরি করেছে যা রডের মত দেখতে। কোলাজেন প্রোটিন আমাদের চামড়ার মূল গঠনগত প্রোটিন। সঠিক পরিমাণ কোলাজেন থাকলে চামড়া টানটান দেখায় নইলে কোলাজেন তৈরীর পরিমাণ কমে গেলে রিংকল বা ভাঁজ ফুটে ওঠে। দেখা গেছে যাদের পোড়া জায়গার উপর তেলাপিয়ার ছাল দিয়ে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে তাদের পোড়া ত্বক তাড়াতাড়ি সেরে উঠেছে এবং স্কার মার্কস অনেক কম তৈরি হয়েছে। আর তাদের ব্যক্তিগত অনুভুতি হল তেলাপিয়া ছাল পোড়া জায়গায় অ্যাপ্লাই করার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণার উপশম হয়েছে। আবার এদিকে তেলাপিয়ার ছাল সস্তা হওয়ায় চিকিৎসার খরচ কমে গেছে। তাছাড়া স্টেরিলাইজড তেলাপিয়ার ছাল বহুদিন, প্রায় দু’বছর পর্যন্ত রেফ্রিজারেট করে রাখা যায়।

তবে মাছের ছালের সবচেয়ে মজার ব্যবহার হল ফুগু চোচিন। জাপানীদের কাছে ফুগু মানে পাফার ফিশ ভীষণ টেস্টি। এতই টেস্টি যে এটার শরীরের বিভিন্ন অংশ বিষাক্ত হওয়া সত্ত্বেও, খেয়ে মানুষ মারা যাওয়া সত্ত্বেও, খাওয়া বন্ধ হয়নি। সব থেকে বিষাক্ত লিভার। একটা ফুগুতে এত নিউরোটক্সিন থাকে যে ত্রিশটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মারা যেতে পারে। এই ফুগুর চামড়া দিয়ে তৈরি হয় জাপানি লন্ঠন। পাফার ফিশ নিজেকে বেলুনের মতো ফোলাতে পারে। লন্ঠন বানাতে তাই এদের জুড়ি মেলা ভার। চামড়া যতটা সম্ভব অক্ষত রেখে মাংস এবং মাথার খুলি অংশটা বের করে নেওয়া হল লন্ঠন বানানোর প্রথম ধাপ। তারপরের কাজ ছালটা ভালো করে পরিষ্কার করা। শেষে স্টাফিং মেটেরিয়াল ভরে ছালটা যথাসম্ভব ফুলিয়ে শুকিয়ে নিলেই লন্ঠনের খোল তৈরি। ঝোলানোর ব্যবস্থা করে, রঙিন লাইট ফিট করলেই তৈরি আস্ত একটা ফুগু চোচিন। বলা হয়নি, চোচিন মানে জাপানি লন্ঠন।

মৌমিতা সরকার
(Moumita Sarcar)

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বেতার তরঙ্গের কথা

0 (0) দৃশ্যমান আলাে এক ধরনের তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ। তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ আরো আছে। শূন্য মাধ্যমে তাদের সকলের বেগ একই। পার্থক্য কেবল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে তথা কম্পাঙ্কে। তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ পরিবারের এক প্রান্তে রয়েছে দীর্ঘ বেতার তরঙ্গ (Raidio Wave)। তারপর ক্রমশ কম তরঙ্গ দৈর্ঘের শর্ট ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ, ইনফ্রারেড, দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনী রশ্মি, এক্স-রে এবং […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: