বেতার তরঙ্গের কথা

দৃশ্যমান আলাে এক ধরনের তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ। তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ আরো আছে। শূন্য মাধ্যমে
তাদের সকলের বেগ একই। পার্থক্য কেবল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে তথা কম্পাঙ্কে। তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ পরিবারের এক প্রান্তে রয়েছে দীর্ঘ বেতার তরঙ্গ (Raidio Wave)। তারপর ক্রমশ কম তরঙ্গ দৈর্ঘের শর্ট ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ, ইনফ্রারেড, দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনী রশ্মি, এক্স-রে এবং গামা-রে।

রেডিও ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ এবং ...

স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (১৮৩১ -১৮ ৭ ৯) ১ ৮ ৬ ৪ সালে  তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের সূত্রগুলি প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি দেখলেন, আলাের বেগ আলাের উৎসের বেগের উপর নির্ভর করে না
এমনকি পর্যবেক্ষকের অবস্থা। তার স্থিতি বা গতির উপরও নির্ভর করে না। ম্যাক্সওয়েল ছিলেন তার সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। বেতার তরঙ্গ প্রস্তুত বা আবিষ্কৃত হওয়ার আগেই তিনি এমন কতকগুলি সূত্র প্রতিষ্ঠ করেছিলেন যেগুলি বেতার তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সে সময় অনেক প্রথিতযশা বিজ্ঞানীও তাঁর সূত্র গুলি মানতে চাননি।

ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলির গুরুত্ব বােঝা গেল তখন যখন জার্মান বিজ্ঞানী হেরিখ রুল হাস
(১৮৫৭-১৮৯৪) ১৮৮৮ সালে বেতার তরঙ্গ ট্রান্সমিট করলেন এবং রিসিভ করলেন। হাস সবচেয়ে ছােট যে বেতার তরঙ্গ উৎপন্ন করতে পেরেছিলেন তার দৈর্ঘ্য ছিল ৬৬ সেন্টিমিটার। হাসের পরীক্ষাটি যুগান্তকারী।

তরঙ্গের কম্পাঙ্কের একক হার্তজ (Hertz) যা বিজ্ঞানী হার্তজ-এর নাম থেকেই নেওয়া। বিজ্ঞানী অলিভার যােশেজ (১৮৫১- ১৯৪০) হার্তজ (Hertz) পরীক্ষাটি আবার করলেন। ১৮৭১ সালে অক্সফোর্ডে তিনি ৯০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত বেতার সংকেত (Wireless Signal) পাঠাতে সমর্থ হলেন। বেতার তরঙ্গ ধরবার জন্য তিনি একটি ট্রান্সমিটার, একটি রিসিভার এবং কোহেরার নামে একটি নল ব্যবহার করলেন।এই কোহেরার-এর আবিষ্কারক ফরাসী পদার্থবিদ এডাউয়ার্ড ব্রানলি (১৮৪৪-১৯৪০)। তিনি দেখিয়েছিলেন ২৫ মিটার দূরত্বে তৈরী বেতার তরঙ্গ, তার কোহেরারের মধ্যে লােহা বা রূপার কণাগুলিকে একত্রিত করে রাখে এবং তড়িৎপ্রবাহ পাঠায়।

১৮৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭) আবিষ্কার করলেন বিশ্বের সর্বপ্রথম সলিড-স্টেট ডায়ােড ডিটেক্টর অফ ওয়্যারলেস ওয়েভ। বিকিরকের সাহায্যে তিনি ৫ মিলিমিটার থেকে ২৫ মিলিমিটার বেতার তরঙ্গ তৈরী করতে সমর্থ হলেন। ইতিমধ্যে
সেন্ট পিটাসবার্গে প্রথম রেডিও রিসিভার তৈরী হলাে। তৈরী করলেন এ.এস. পােপফ (১৮৫৯-১৯০৬)। ‘Heinrich Hertz’ কথাটিকে ৫কিলােমিটার দূরত্বে পাঠিয়ে সকলকে চমকে দিলেন পােপ ।
গুগলিয়েলমাে মার্কনী (১৮৭৪-১৯৩৭) বুঝতে পেরেছিলেন হাসের তৈরী তরঙ্গকে যােগাযােগের কাজে ব্যবহার করা যাবে।

মার্কনী রেডিও ব্যবস্থার মাধ্যমে ৩ কিলােমিটার দূরত্বে টেলিগ্রাম পাঠাতে সমর্থ হলেন। পরবর্তীকালে ৩২ কিলােমিটার দূরত্ব পর্যন্ত বেতার তরঙ্গ পাঠাতে সক্ষম হন। মার্কনী দেখলেন এরিয়ালের উচ্চতা আরাে বাড়ালে।ওয়্যারলেস সিগনালকে আরাে দূরে পাঠানাে যাবে। মার্কনী আটলান্টিক অতিক্রম করে নিউফাউন্ডল্যান্ডে পৌঁছলেন। সেখানে একটি এরিয়াল স্থাপন করে ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল থেকে পাঠানাে বেতার তরঙ্গ ধরতেসক্ষম হলেন।

১৯০১ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে ‘S’ বর্ণ নির্দেশক তিনটি টেলিগ্রাফি ডট গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন। এই টেলিগ্রাফি বার্তা প্রেরণের মধ্য দিয়ে বেতারের সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক প্রয়ােগ ঘটল। ১৯০৬ সালে কানাডার রেজিল্যান্ড ফেসেনডন (১৮৬৬-১৯৩২) এবং তার বন্ধু আলেকজান্ডারসন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে ৩২০ কিলােমিটার দূরত্বে কথা এবং মিউজিক পাঠাতে সক্ষম হন। এর জন্য উচ্চ কম্পাঙ্কের তালটারনেটর ব্যবহার করা হয়েছিল। অল্পকালের মধ্যেই বিভিন্ন মেরে বেতার তরঙ্গের ব্যবহার শুরু হলাে। বেতার সম্প্রচারের প্রথম দিকে লো-স্পিড টেলিগ্রাফির জন্য ৩-৩০ কিলাে হাস কম্পাঙ্ক ব্যবহার করা হতাে। দূরবর্তী স্থানে বেতার তরঙ্গ প্রেরণের জন্য পরবর্তীকালে ১৫০০, কিলাে হাস কম্পাঙ্ক ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন উদ্দেশে। ব্যবহৃত বিভিন্ন রেডিও ব্যান্ডের কথায় আসি। খুব বেশি দূরত্বে যােগাযােগের জন্য ৩০০-৩০০০ হাসের ভয়েস ফ্রিকোয়েন্সি ব্যাঙ ব্যবহার করা হয়। সম্রচার ও রেডিও নেভিগেশনের কাজে ৩-৩০ কিলাে হাস কম্পাঙ্কের ভেরি লাে ফ্রিকোয়েন্সি (VLF) ব্যান্ড ব্যবহার
করা হয়। FM সচার, মােবাইল, রেডিও, টিভি সম্প্রচারের জন্য ৩০- ৩০০ মেগা হাস কম্পাঙ্কের ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি (VHF) ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়। মাল্টিচ্যানেল টেলিফোনি, র্যাডার, উপগ্রহ যােগাযোগের
কাজে ৩-৩০ গিগা হাস কম্পাঙ্কের সুপার হাই ফ্রিকোয়েন্সি (SHF) ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়।

 

গােবিন্দ দাস

Leave a Reply

%d bloggers like this: