নাম দেখে ধূমকেতু চেনা

@
4
(12)

প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম গোত্রহীন,
ফুটিয়াছে ফুল অতিশয় দীন ।

না বিজ্ঞানের অভিধানে কোন কিছু নাম-গোত্রহীন নয়, সবারই একটা সুন্দর নাম আছে, তা যতই ক্ষুব্ধ হোক না কেন। এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের আকাশ প্রেমীদের কাছে সবচেয়ে যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তা হল ধূমকেতু বা কমেট। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Dirty snow ball। ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গেছি 14 জুলাই থেকে 22 জুলাই সূর্যাস্তের একটু পরেই উত্তর পশ্চিম আকাশে দেখা যাচ্ছে একটি ধূমকেতু। নিওওয়াইজ, যার পোশাকি নাম C/2020 F3। আজকের আলোচনা এই পোশাকি নাম নিয়ে। এই চুল ওয়ালা তারা কে নিয়ে মানুষের কৌতুহল বহু পূর্ব থেকেই । বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আমরা জেনেছি ধুমকেতু আসলে ময়লা বরফ পিন্ড । তবে এই বরফ শুধুমাত্র জলের নয় সেই সাথে কার্বন ডাই অক্সাইড, অ্যামোনিয়া ও মিথেনের। আর আছে ধুলো ।আমাদের চেনা জানা ঝাটা মত রূপ নেয় সূর্যের কাছাকাছি এলে।কোমা ,নিউক্লিয়াস ছাড়া গ্যাস ও ধুলোর লেজ তৈরি হয়।আমরা এও জেনেছি এদের বাড়ি উর্ট ক্লাউড এবং কুইপার বেল্ট নামক শীতল অন্ধকারময় অঞ্চল।বলা হচ্ছে এটি আমাদের সৌর মন্ডলের গ্রহদের প্রদক্ষিন বাইরে এক লক্ষ থেকে দেড় লক্ষ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরে এক ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রজুড়ে এর অবস্থান। ওই অঞ্চলে একের পিঠে বারো টি শূন্য লাগালে যত সংখ্যা হয় তত সংখ্যক ধুমকেতু আছে।নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট পথে পরিক্রমণ করতে বেরিয়ে কখনো-সখনো আমাদের দৃশ্যমানতা কাছে এসে পৌঁছায়। আর সেই সময় আমরা আনন্দে মেতে উঠি। কোনো ধূমকেতু কখনো বারবার ফিরে আসে কেও একবার দেখা দিয়েই ফিরে যায়। কেমন হবে ধূমকেতুর গতিপ্রকৃতি তা লুকিয়ে আছে তার পোশাকি নামেই।

 

প্রথমদিকে ধূমকেতুর নামকরণ করা হতো যিনি প্রথম ধূমকেতুটিকে লক্ষ্য করবেন অর্থাৎ আবিষ্কার করবেন অথবা তার সম্পর্কে যিনি প্রথম তথ্য দেবেন। এই নিয়ম চিরাচরিত।বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বা আবিষ্কার কে তার নামের সাথে অক্ষয় অমর করে রাখার প্রয়াস সর্বত্রই । যেমন হ্যালির ধুমকেতু ,হেল-বব ধুমকেতু ।পরবর্তীতে প্রযুক্তির উন্নতি হলে দিন দিন ধূমকেতু আবিষ্কারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পাল্টে যায় নামকরনের প্রক্রিয়া ।নামের সাথে সাথে শুরু হয় সংখ্যার ব্যবহার। ধুমকেতু আবিষ্কারের সাল ও সংখ্যা উল্লেখিত হয়। আবিষ্কারের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পায় তাই তাদের প্রত্যেকটি ধূমকেতুকে আলাদা আলাদা করে নাম দেওয়ার জন্য 1994 সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন তারা একটি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করে ,যা আজ অবধি চলছে ।দেখা যাক কি সেই পদ্ধতি।

 

প্রথমেই আসি অবশ্যই ধূমকেতুর নামের ক্ষেত্রে শুধু তার আবিষ্কারকের নাম অনুসারে হবে এমনটি নয় ,অনেক ক্ষেত্রে যে বীক্ষণ কেন্দ্র থেকে ধুমকেতু আবিষ্কৃত হয়েছে তার নাম অনুসারে হয়ে থাকে যেমন আইসন যা 2012 সালে রাশিয়ার থেকে ইন্টারন্যাশনাল সাইন্টিফিক অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক(ISON) থেকে আবিষ্কৃত হয় ।আবার কখনও কখনও যন্ত্রের নাম অনুসারে নাম হয়ে থাকে । আমাদের বর্তমান সময়ে আলোচিত নিওওয়াইজ ধূমকেতুটির নাম এসেছে সেভাবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ধূমকেতুটির নামের পরে একটি ইংরেজি বর্ণমালা থাকে ।যেমন আইসন বা নিউওয়াইজ ক্ষেত্রে রয়েছে C । এর অর্থ হলো এটি দীর্ঘ পর্যায় কালের ধূমকেতু যেমন নিও ওয়াইজ ধূমকেতুটি 6766 বছর পর আবার দেখা যাবে বলে অনুমান করা গেছে। যদি দেখা যায় কোন ধুমকেতু 200 বছর বা তার কম সময়ে পুনরায় দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেটি সামনে P অক্ষর দিয়ে অর্থাৎ লেখা হয় periodic। যেমন হ্যালির ধূমকেতু।X থাকলে বুঝতে হবে ধূমকেতুটির পরিক্রমণ পথ গণনা করা সম্ভব হয়নি। যেমন The Great comet of 1106 (X/1106 C1)।D থাকার অর্থ হলো এটি একটি পর্যায় বৃত্ত ধুমকেতু অদৃশ্য হয়ে গেছে অথবা ভেঙে পড়েছে। যেমন শুমেকার লেভি 9 (D/1993 F2)।A অর্থ হল এটি একটি বামন গ্রহ ধুমকেতু ভেবে ভুল হয়েছিল। এটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয় 2017 সালে,Oumuamua(A/2007 U1)।সর্বশেষ সেটি হলো যদি I থাকার অর্থ হলো এটি একটি ইন্টারস্টেলার অবজেক্ট। এই ইংরেজী বর্ণমালার পরে আবিষ্কারের সাল উল্লেখ করা থাকে। সেই সাথে একটি সাফিক্স যোগ করা থাকে যার অর্থ আবিষ্কারের মাসের কোন অর্ধে কততম আবিষ্কার সেটি বোঝানো হয়ে থাকে। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে নিওওয়াইজ আবিষ্কার হয়েছে মার্চ 27, 2020 তৃতীয় আবিষ্কৃত ধূমকেতু।তাই লেখা হয়েছে C/2020 F 3।তাহলে ধূমকেতুর নাম দেখেই বুঝে যাবো সে আবার দেখা দেবে কি দেবে না।

 
এতো গেল ধূমকেতু দের নাম দেওয়ার কৌশল। শেষ করবো যে কথা দিয়ে অতীতে ধুমকেতু আকাশে দৃশ্যমান মানেই মানুষের মধ্যে ধারণা ছিল মহামারী বন্যা খরা বা যেকোন খারাপ দিনের পূর্বাভাস। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ধূমকেতু সম্পর্কে মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা এসেছে,যদিও কুসংস্কার মুক্ত বিশ্ব গড়ে ওঠে নি।লক্ষণীয় বিষয় বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্ব covid -19 মত মহামারীর প্রার্দুভাব।আর সেই সময়েই আবার হাজির নিওওয়াইজ।তবে ওসব অবৈজ্ঞানিক চিন্তায় মন না দিয়ে চলুন নিওওয়াইজের সৌন্দর্য উপভোগ করি।

https _specials-images.forbesimg.com_imageserve_dc57d174c32a49909074bcad4eba0cda_0x0.jpg cropX1=0&cropX2=3000&cropY1=107&cropY2=1796

 

 

 

লেখক

শুভাশিস গড়াই

লেখক শিক্ষাবিদ, দীর্ঘদিনের বিজ্ঞানকর্মী; লেখক যেমন বাস্তব জীবনে তার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানের আলোকে পরিবেশ রক্ষায় উজ্জীবিত করে চলেছেন , তেমনি সবসময় তার লেখনীও তার কাজ করে চলেছে । তিনি পরিবেশ ডট কমের একজন নিয়মিত লেখক ।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 12

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

দেশের কোথাও বন্যা আর কোথাও বৃষ্টিপাত কম কেন ?

4 (12) আমাদের এখানে অর্থাৎ দক্ষিণ বঙ্গে গত কয়েকদিন থেকে বৃষ্টির পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। গতকাল পর্যন্ত হিসেব ১লা জুন থেকে ১৭ই জুলাই পর্যন্ত যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তা স্বাভাবিকের চেয়ে চার শতাংশ কম। তুলনায় উত্তর বঙ্গে বৃষ্টি হয়েছে ৪৯ শতাংশ বেশি। গত দুসপ্তাহ ধরে আসামের প্রায় সর্বত্র এবং বিহারের […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: