যে বাঙালী বিজ্ঞানীর আবিষ্কারে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মাছ খাচ্ছে।

4.6
(5)

মৎস ধরিবো খাইবো সুখে,কিন্তু মাছ ধরবো কোথায় ?খাল বিল পুকুর নদী সব শেষ ! কিন্তু কথায় বলে “মাছে ভাতে বাঙালি”! আজ আমাদের পাতে যে রুই-কাতলা পড়ছে দু-বেলা তার সম্পূর্ণ কৃতিত্বই এই বাঙালি বিজ্ঞান সাধকের, ডঃ হীরালাল চৌধুরী । বাংলার এই বিজ্ঞান সাধক হলেন “প্রনোদিত প্রজননের জনক”,তাঁর ঊর্ধ্বতন গবেষক একবার বলেছিলেন ডঃ চৌধুরী গবেষণায় সফল হলে নিশ্চিত নোবেল পাবেন, কিন্তু নোবেল তো দূরের কথা নিদেন পক্ষে পদ্মশ্রীও জোটে নি তাঁর ।

NATIONAL_FISH_FARMERS_DAY on 10th_JULY... - Tripura Graduate ...

তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রাণিবিজ্ঞান তথা মৎস্যবিজ্ঞানের উন্নতিসাধনের ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগে তাঁর অবদান অসামান্য । হীরালাল চক্রবর্তীর জন্ম ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের সিলেটের (তৎকালীন শ্রীহট্টের) সুরমা ভ্যালি সংলগ্ন কুবজপুর গ্রামে। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন হীরালাল। তিনি সিলেটের গোমস্‌ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন ১৯৩৭ সালে । মেধাবী ছাত্র হওয়ার সুবাদে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যক্ষের মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তিতে আই.এসসিতে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে অনার্স সহ বি.এসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্গত বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় এমএসসি পাশ করেন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তীতে তিনি ১৯৫৫ সালে ফিশারি পরিচালনে দক্ষতাস্বরূপ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অলাবামাস্থিত অবার্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এস ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মৎস্য প্রজননে পিটুইটারি ইনজেকশনের প্রভাব। ২০১০ সালে সেন্ট্রাল ফিশারিজ ইনস্টিটিউট ( ডিমড ইউনিভার্সিটি) ডি.এসসি ডিগ্রী প্রদান করে।

এম.এসসি পাশের পর সিলেটের মুরারীচাঁদ কলেজে জীববিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে ওই অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর পাঁচজন সহকর্মীর সাথে কাজ হারালেন। এরপর তিনি চলে আসেন ভারতে। ব্যারাকপুরে কাছে মণিরামপুর সেন্ট্রাল ফিসারিজ ইনস্টিটিউশনে ১ লা জুন ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে গবেষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অধিকর্তা হিসাবে অবসরের আগে পর্যন্ত বিভিন্ন পদে তিনি আসীন ছিলেন। কটকে গবেষক(১৯৫০-৫৫), ফিশারি সম্প্রসারণ আধিকারিক(১৯৫৯-৬০), বৈজ্ঞানিক আধিকারিক (১৯৬০-৬৩) সহ মৎস্য গবেষণা প্রধান হিসাবে দায়িত্ব সামলেছেন ।

ব্যারাকপুরে কর্মরত থাকার সময়ই তিনি লক্ষ্য করেন – গঙ্গার ধারে ইটভাটায় জোয়ারের জলে ভেসে আসা পেটফোলা মাছ ধরে চাপ দিতেই স্বচ্ছ ডিম বেরিয়ে আসছে এবং কয়েক ঘণ্টা এক পাত্রে রাখার পর জীবনের সঞ্চার প্রত্যক্ষ হচ্ছে – এই লক্ষ্যটিই – হীরালালকে ‘প্রণোদিত প্রজনন প্রক্রিয়া’ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার দিকে আকৃষ্ট করে। কটকের মৎস্য গবেষণাগারে সিনিয়ার রিসার্চ অ্যাসিস্টান্ট হিসাবে মাছের এন্ডোক্রাইনোলজি ও ফিজিওলজির উপর দীর্ঘ নয় বৎসর গবেষণা করার পর ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ই জুলাই কার্প প্রজাতির মাছের প্রণোদিত প্রজনন পদ্ধতিতে সাফল্য লাভ করেন যা প্রাণীবিজ্ঞানে প্রথম সারির এক অন্যতম যুগান্তরকারী মৌলিক আবিষ্কার ।
এই ঘটনার আগে পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এই প্রক্রিয়ায় মৎস্য প্রজনন সম্ভব হয় নি। আজ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, ও গ্রাসকাপ প্রজাতির মাছের প্রজনন সম্ভব হয়েছে, তেমনই কই,পাবদা,মাগর সহ বহু মাছের প্রণোদিত প্রজননও করা সম্ভব হয়েছে। আজ বাজারে গেলেই চোখে পড়বে,পিটুইটারি সংগ্রহ করছেন কিছু মানুষ !

মাছের হরমোন রপ্তানি হচ্ছে
মাছের পিটুইটারি সংগ্রহ

বদ্ধ পুকুরে কার্প প্রজাতির মাছ ডিম পাড়ে না। এটাই বাস্তব কথা কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা না থাকাটাই স্বাভাবিক। রুই-কাতলা-মৃগেল-বাটা-খয়রা ও গ্রাসকার্প প্রজাতির মাছ বর্ষার মরশুমে স্রোতযুক্ত জলে ডিম পাড়ে। কার্প প্রজাতির মাছ নিজের হরমোন ঘটিত সীমাবদ্ধতার কারণে বদ্ধ জলাশয়ে এরা শারীরিক মিলনে অক্ষম, তাই রুই-কাতলা প্রজাতির মাছচাষে ডিমপোনা পেতে চাষিদের বর্ষাকালে নদী-খাল-বিল-বাওড় ও নয়ানজুলি থেকে সংগৃহীত অসম-বয়সি মাছের চারার উপর নির্ভর করতে হত।

Rupali Fish & Prawn Hatchery Ltd. - Home | Facebook
মাছের হ্যাচারী

কটকের মৎস্য গবেষণাগারে তিনি মাছের অন্তক্ষরা তন্ত্র ও শরীরবিদ্যার বিষয়ক অনুসন্ধান চালাতে থাকেন । ‘প্রনোদিত প্রজনন’-এর ফলে মাছচাষি বর্তমানে এক সঙ্গে সমবয়সি সুস্থ ডিমপোনা তার প্রয়োজন যে কোনো সময়ে চাষের জন্য চাইলেই পাবেন। প্রথমে ‘কড়কেবাটা মাছ’-এর ওপর অ্যাকোয়ারিয়ামের মধ্যে ‘প্রনোদিত প্রজনন’ সফল হয়। এর পর কার্প প্রজাতির মাছের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সংগ্রহ করে,বর্তমানে বাজারে রুই-কাতলা মাছের মাথা থেকে সংগ্রহ করার দৃশ্য অনেকেই দেখে    থাকবেন ।সেটাকে অ্যালকোহলে সংরক্ষণ করে নিয়ে স্ত্রী-মাছকে দু’ বার এবং পুরুষ মাছকে এক বার ইনজেকশন দিয়ে হাপায় (ব্রিডিং পুলে) ছেড়ে দিলে তারা প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে । কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্ত্রী-মাছটি ডিম এবং পুরুষ-মাছটি শুক্রাণু নিঃসরণ করে এবং 17থেকে 18 ঘন্টা পর দু’ তিন লক্ষ ডিমপোনা পাওয়া যায় – এই আবিষ্কার, বিশ্বের মৎস্য গবেষণায় নতুন পথ প্রদর্শন করেন হীরালাল চৌধুরী। এর হাত ধরে বর্তমানে রুই-কাতলা-কই-পাবদা-মাগুর সহ বহু মাছের প্রনোদিত প্রজনন করা সম্ভব হয়েছে।

01710690992 সিলবার মাছের পেট থেকে ডিম বের ...

তাঁর এই গবেষণার ফলস্বরূপ আজকে মাছচাষিরা একই সঙ্গে সমবয়সী সুস্থ ডিমপোনা তার প্রয়োজন মতো যে কোনো সময়ে চাষের জন্য পেয়ে যাচ্ছেন। জাপানের খ্যাতনামা মৎস্যবিজ্ঞানী ডাঃ কে. কুরোনুমা,ডঃ হীরালাল চৌধুরীকে ‘প্রণোদিত প্রজননের জনক’ (father of induced breeding) বলে অভিহিত করেন।

তিনি কেবল প্রণোদিত প্রজননেরই জনক নন, পরবর্তীতে তিনি পুকুরে মৎস্যোৎপাদন বৃদ্ধিতে (পলি কালচার) নিবিড় মিশ্রচাষের অর্থাৎ একই পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির পৃথক পৃথক জলস্তরে পৃথক পৃথক খাদ্যাভ্যাসে ( ট্রপিক লেভেলে ) থাকা মাছের বহুগুণ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার প্রবর্তক।
শুধু প্রনোদিত প্রজনন নয়, তিনি কার্প প্রজাতির মাছেদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের নতুন নতুন সঙ্করীকরণ,ফলে উপযোগী ও কাঙ্খিত মাছ সৃষ্টি l

আঁতুড় পুকুরের প্রথম ধারণা এবং ডিমপোনার পরিচর্চা সংরক্ষণ,কোনো পরজীবী বা সংক্রমণের দ্বারা আক্রান্ত ও তার প্রতিকার এবং বিজ্ঞানসম্মত ভাবে আঁতুড় পুকুরে মাছের পালনের পদ্ধতির বিশদ বিবরণ তিনি দেখিয়েছেন। ‘প্রনোদিত প্রজনন’ উদ্ভাবনের ফলে উওর 24  পরগনার নৈহাটিতে মাছের বীজের (চারা মাছের)যে বাজার, তা মৎস্যশিল্পের প্রাণ কেন্দ্র হতে পেরেছিল।  নৈহাটিই এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম ডিমপোনা বাজারে পরিনত হয়েছিল। এখান থেকেই  সারা ভারতবর্ষে তথা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডিমপোনা যেত চাষের জন্য। এখন বিভিন্ন জায়গায় হ্যাচারি হওয়ার কারণে হয়তো কম পরিমানে ডিমপোনা সরবরাহ করা হয় । নৈহাটির মৎস চাষের দক্ষ শ্রমিকরা অন্য প্রদেশের হ্যাচারিতে গিয়ে প্রনোদিত প্রজননের কাজ করে আসেন।

অন্ধ্রপ্রদেশের বড় রুই-কাতলা ইত্যাদি মাছ যে আমরা খাই, তার চারামাছ আমাদের রাজ্যের নৈহাটি থেকেই যায়। অথচ এই চারামাছেদের আমরা পরিণত করতে অক্ষম।আমাদের তৈরী জিনিসই আমরা ঘুরে অধিক মূল্য দিয়ে কিনে, অন্য রাজ্যের বাণিজ্য কে সুদৃঢ় করে তুলছি ।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অবসর পর জাতিসংঘের এফএও (Food and Agricultural Organisation)এর উপদেষ্টা হয়ে সুদান, নাইজেরিয়া, ফিজি, লাওস, ফিলিপাইনস, মায়ানমার সহ বহু বিশ্বের দেশে কাজ করেছেন, তাঁর তিন দশকের অভিন্নতা ও প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তা মৎস্য উৎপাদনে ও জলজ পালন বিষয়ে সম্যক জ্ঞান সেদেশের মানুষদের সামনে পরিস্ফুট করেছেন। হীরালাল চৌধুরী ফিলিপিনসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিশারিজ উন্নয়ন কেন্দ্রের বা এসইএফডিইসি(SEAFDEC) র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী (রিজিওনাল কোঅর্ডিনেটর) ও সহকারী অধিকর্তা ছিলেন ১৯৭৬-৭৯ সাল পর্যন্ত । ফিলিপিনসের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাকোয়াকালচারের ১৯৮৫ থেকে৮৮ পর্যন্ত পরিদর্শক বিজ্ঞানী হিসেবেও কাজ করেছে l হীরালাল চৌধুরীর অবদান সারা

পৃথিবীতে আজকের দিনে অপরিসীম। শুধুমাত্র প্রাণীবিজ্ঞানের গবেষণার জন্যই নয়, খাদ্য সংকট,
অপুষ্টি এবং সামুদ্রিক মাছের সীমাহীন উত্তোলনের পরিমানের নিয়ন্ত্রণে,( পরিমান হ্রাসে ) এই বিজ্ঞানীর অবদান কম নয়। ১৯৫০-৫১ সালে ভারতে অন্তর্দেশীয় মৎস্যোৎপাদন ছিল ২৯%, সামুদ্রিক মৎস্য উত্তোলন ছিল ৭১%।সেখানে ২০১৩-১৪ সালে অন্তর্দেশীয় মৎস্যোৎপাদন ৬৪% বৃদ্ধি পায়। আর সামুদ্রিক মাছ ধরা কমে ৩৬% হয়েছে। সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রয়োজন মতে মাছের চাহিদা অনুযায়ী জোগান সম্ভব হয়েছে,’প্রনোদিত প্রজনন’ উদ্ভাবনের দ্বারাই।

এই অনন্য অবদানের জন্য হীরালাল চৌধুরী,১৯৬১ সালে চন্দ্রকলা হোরাস্মৃতি স্বর্ণপদক,আমেরিকার অবার্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ‘গামা-সিগমা-ডেল্টা গোল্ডেন কি পুরস্কার , ‘রফি আহমেদ কিদওয়াই’ পুরস্কার লাভ করেন।তিনি দেশের কোনো রকম অসামরিক পুরস্কার পাননি, ভারত সরকার তাঁর যুগান্তকারী ‘প্রণোদিত প্রজনন পদ্ধতি’ উদ্ভাবনের দিনটি স্মরণে রেখে ১০ জুলাই তারিখ ‘জাতীয় মৎস্যচাষী দিবস’বা ‘ন্যাশনাল ফিস্ ফার্মার্স ডে’ হিসাবে ঘোষণা করেছেন। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর মৎস্যবিজ্ঞানে সারাজীবনের অবদানের জন্য তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে।
ডঃহীরালাল চৌধুরী ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় ৯৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন।

সৌভিক রায়

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

সবুজ কবি বিভাস রায়চৌধুরী

4.6 (5) গাছকে জড়িয়ে ধরে যারা কাঁদে, তারা টের পায়— মানুষ অনেক পরে, উদ্ভিদ প্রথম প্রাণ… উদ্ভিদ প্রথম প্রাণ… হে মানুষ! মাফিয়া মানুষ! তুমি তো নিশ্চিহ্ন হবে হাতে মাত্র কিছুকাল আছে সূর্যাস্তে দাঁড়াও! দ্যাখো পাখিরা ঠোটের রক্ত মুছে দিচ্ছে যেন যশোর রোডের গাছে গাছে… – কবি বিভাস রায়চৌধুরী   আজকের […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: