বিকল্প শক্তি হিসাবে দেহের তাপ

আজ পৃথিবীর সর্বত্রই বিকল্প শক্তির সন্ধানে মানুষ চারিদিকে সন্ধান করে চলেছে। যান্ত্রিক শক্তি,
বিদ্যুৎ শক্তি, তাপশক্তি প্রভৃতি নানা প্রকার শক্তির চাহিদা উত্তরােত্তর ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। বিদ্যুৎ শক্তির আজ চরম অভাব। আর এই বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনে তাপশক্তির একান্তই প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ওলিতে, তাপশক্তি উৎপাদনের জন্য জ্বালানীর চাহিদা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এই তাপের সদ্ব্যবহার ও সার্থক প্রয়ােগ সম্বন্ধে সকলেই সচেতন কিন্তু কীভাবে এই অফুরন্ত তাপশক্তি পাওয়া যাবে – এ প্রশ্ন সকলেরই মনে।

তাপশক্তি পাওয়ার বিকল্প উৎস  হিসাবে বিজ্ঞানীরা এক সূত্র উদ্ভাবনে প্রয়াসী হয়েছেন। কী সেই পদ্ধতি? উত্তর হল, দেহের তাপের সদ্ব্যবহার ।

দেহের তাপ ?
সে জিনিসটা আবার কীরকম?
প্রশ্নটা মনে আসাই স্বাভাবিক এবং ব্যাপারটি কী?
দেহের তাপ প্রায় সব প্রাণীরই
থাকে – কয়েকটি বিশিষ্ট প্রানীদের ক্ষেত্র ছাড়া।মানুষের দেহের কথাই ধরা যাক। সুস্থ ও জীবিত মানুষ মাত্রই তার দেহে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখে। জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বাইরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট মানে স্থির থাকে। আর এই মানের হেরফের ঘটলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।

দেহের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট মানে তাপমাত্রা বজায় থাকার জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের দেহ থেকে এক বিরাট পরিমাণ তাপ বাইরে বিকিরিত হয়ে যায়, যার সবটাই প্রায় অপচয়িত হয় এবং কোন কাজে লাগে না। এই অপচয়িত তাপকে কোনাে কাজে লাগানাে যায় কিনা, এই প্রশ্ন বহুদিন যাবৎ বিজ্ঞানীদের মনে উদয় হয়েছে।

আমেরিকার পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অধ্যাপকদের এক সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, এই বিষয়ে যথেষ্ট সাফল্য লাভ করা সম্ভব হয়েছে। অভিনব এক উপায়ে, তাদের দেহ নিঃসৃত তাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের দশটি ভবনের শীতলতা দূর করা ও উষ্ণ রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যবস্থায় শুধুমাত্র দেহের তাপই নয়,
বৈদ্যুতিক বাতির তাপ, রান্নাঘরের তাপ, ঘরের ভিতরকার সূর্যরশ্মির তাপ ইত্যাদির কাজে লাগাবার ব্যবস্থা হয়েছে। এইসব তাপ একটি কেন্দ্রে এসে জমা হয় এবং মাটির নীচে নলের সাহায্যে বিভিন্ন স্থানে সেই তাপ পাঠানাে হয়।

এই ব্যাপারে প্রথম ও অগ্রণী ব্যক্তির নাম Warren Kanter। তার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াতে, যেখানে বহুলােকের বাস, সেখানে তাদের দেহের তাপ বাতাসে বিকিরিত হয়। সেই তাপকে বাড়ীর ছাদের উপর দিয়ে ছােট ছােট ছিদ্রের মাধ্যমে গ্রহণ করে, কতকগুলি ঠাণ্ডা জলভর্তি নলের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। এইভাবে ঐ তাপ এসে জমা হয় এক কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে এবং সংক্রামিত হয়ে জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। এরপরে এক পাম্পের সাহায্যে ঐ গরম জল জলবাহী নলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় স্থানে সরবরাহ করা হয় ।
সঞ্চিত তাপের যাতে কোন অপচয় না ঘটে, সেজন্য প্রয়ােজনীয়।

তাপকে কাজে লাগাবার পরে যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, তাকে সঞ্চয় করে রাখার জন্য ‘হট ওয়াটার ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। এই ট্যাঙ্কটি অন্তরিত (insulated) থাকার জন্য জলের তাপমাত্রা বিকিরিত হয় না। ছুটির
দিন বা রাত্রে যখন লােকসংখ্যা কম থাকে, তখন ঐ প্রক্রিয়ায় তাপ কম সংগৃহীত হয় আর তখন ঐ সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে তাপগ্রহণ করে কাজ চালানাে হয়। ঘরে ক্লাস চলাকালীন ছাত্রছাত্রীদের দেহের তাপও এই
প্রক্রিয়াতে সংগৃহীত হয়।যদি কোনও কারণে জলবাহী তাপের আধিক্য ঘটে, তখন একটি কনডেনসারের সাহায্যে ঐ অধিক তাপকে শোষণ করে জলকে ঠাণ্ডা করে সমগ্র পদ্ধতিটির পুনরাবৃত্তি ঘটানাে হয়।

বহুযুগ আগে জল, মাটি ও বাতাস থেকে তাপ সংগ্রহের ব্যবস্থা ছিল, কম খরচে তাপ সংগ্রহের ব্যবস্থা প্রথম হয় ১৯৫৮ সালে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রচলন হয়, কোন ঘরের তাপ বাইরে বার করে দেওয়ার জন্য। এই ব্যবস্থার যিনি রূপকার, তিনি স্থির করেন যে, ঐ তাপকে কাজে লাগানাে যেতে পারে। নিষ্কাশন ব্যবস্থার সংস্কার করে, একস্থানের তাপকে অন্যত্র পাঠানাে যায় কিনা, সে সম্বন্ধে তিনি ভাবনাচিন্তা করেন।

এইভাবে বিশাল একটি প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে তাপ আদানপ্রদানের ব্যবস্থা চালু হল। কিন্তু মানুষের শরীরের তাপকে সঞ্চালিত করে, ঠাণ্ডা জায়গাকে উষ্ণ করার পদ্ধতি খুবই অভিনব ও আধুনিক। এই পদ্ধতিতে তাপ আদান প্রদানের ব্যয়ভার অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় যথেষ্ট কম এবং প্রাথমিক ব্যয়ের পরে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও যথেষ্ট কম। সেজন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার সকলেরই কাম্য। মানুষের দেহের তাপ যা নিঃসৃত হয়, তা সংশ্লিষ্ট মানুষের তাৎক্ষণিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল। কায়িক পরিশ্রম বা ছাত্রছাত্রীদের শরীর থেকে নিঃসৃত তাপের পরিমাণ যথেষ্ট বেশি। সেক্ষেত্রে সুবিধামত পরিস্থিতি ও অবস্থান থেকে এই পদ্ধতিতে তাপ সংগ্রহণ করতে পারলে, যন্ত্রের কার্যক্ষমতা ও প্রাপ্ত সুবিধা অনেক বেশি হবে। অবশ্য ভারতে এই পদ্ধতির প্রচলন এখনাে সম্ভব হয়নি। আশা করা যায় যে, অদূর ভবিষ্যতে হয়ত আমরাও এই ব্যবস্থার অংশীদার হতে সমর্থ হব।

ড. সমীর কুমার ঘোষ

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি /২০১৪ থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: