বিজ্ঞান সাধক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

জন্ম ও পরিচয়ঃ প্রয়াত গােপালচন্দ্র ভট্টাচার্য জন্মেছিলেন অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার লােনসিংহগ্রামে ১ আগষ্ট ১৮৭৫ সালে। বাবা অম্বিকাচরণ, মা শশীমুখী দেবী। বাবা ছিলেন গ্রামের দরিদ্র পুরােহিত।

প্রাথমিক জীবনঃ মাত্র ৫ বছর বয়সে তাঁর বাবার অকাল মৃত্যু ঘটে। ফলে জ্যেষ্ঠ গােপালচন্দ্রকে ঐ বয়সেই পরিবারের ভার গ্রহণ করতে হয়। মেধাবী গােপালচন্দ্রের শৈশবতাইসুখেরছিলনা। খেলাধুলাতেও মন ছিলনা। একমাত্র পুকুরে স্নান ছাড়াতাঁর সংগ্রামময় জীবনে খুব একা হয়ে যেতেন। প্রকৃতির বুকে
নিজেকে সঁপে দিয়ে বিরাট জগতের মুখোমুখি দাঁড়াতেন। প্রকৃতির সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সখ্যতা। প্রকৃতির কাছ থেকেই তিনি পেয়েছিলেন আসল শিক্ষা। অনুসন্ধিৎসু হওয়ার শিক্ষা, ভয় ও কুসংস্কারের উর্জে ওঠার শিক্ষা, প্রকৃতির মতাে মূক হওয়ার শিক্ষ।

শিক্ষা ও শিক্ষাকতা (১৯১৩-১৯)ঃতবে সুখের বিষয় লােনসিংহ হাইস্কুলের কর্তৃপক্ষ তাকে বিনা বেতনে পড়বার সুযোগ দিয়েছিলেন। পরে তিনি ময়মন সিংহের আনন্দমােহন কলেজে আই এ তে ভর্তি হন। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় জেলার মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার সত্ত্বেও তার পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখেই
গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯১৫ সালে। এই সময় তাঁর বৈবাহিক কার্য সুসম্পন্ন হয়।

কর্মজীবনঃ অত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পুরোহিতের সন্তান গােপালচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয় যজমানীতে। পরে লোনসিংহ হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্কুলের বাগানে ছাত্রদের নিয়ে গিয়ে সাধ্যমতাে পরীক্ষাদি করতেন। এক বর্ষার রাত্রে ভৌতিকআলাের রহস্য খুঁজতেগিয়েতিনিআবিষ্কারকরে ফেললেন এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক আলাে।১৩২৬ বঙ্গাব্দে তা প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুও এই অজ্ঞাত, অখ্যাত লােকটির প্রতি কৌতুহলী হয়ে পড়েন। সেই সময়ের হিন্দু সমাজের তথাকথিত অস্পৃশ্যদের মধ্যে শিল্প প্রসারের জন্য কমলকুটির নামে সংস্থা স্থাপন করেন। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত কাশীপুরের এক অফিসে টেলিফোন অপারেটরের চাকরি নেন তিনি।

ঘটনাক্রমে বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাসের সাহায্যে জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁকে খুঁজে বের করেন এবং ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসেই ‘বসুবিজ্ঞান মন্দির’ এ সাদরে ডেকে নেন। গবেষকের বৃত্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেও পরে বেছে নিলেন কীট পতঙ্গ, জৈবদ্যুতি এবং শেষ পর্বে ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙ এ রূপান্তরে পেনিসিলিন এর ভূমিকা।

১৯৩৬ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে তাঁর ১৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গোপালচন্দ্রের প্রমাণিত খাদ্য
নির্ভর বা ট্রাফিক থিয়রী Transaction of Bose Institute পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সজ্জত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পিপড়ে নিয়ে গবেষণা ইংল্যান্ড, জার্মান ও আমেরিকায় প্রচারিত হয়নি। ফলে বিশ্বের দরবারে তাঁর এই কীর্তি অজানাই রয়ে গেলাে।

আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ এর মুখপত্র হিসেবে প্রচারিত ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকাটির পরিচালনভার প্রথম থেকেই তাঁর উপর ন্যস্ত হয়। বড়োদের জন্য বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখার পাশাপাশি ছােটোদের জন্যও ‘ছােটদের পাতা গ্রন্থটি আকর্ষনীয় ভাবে পূরণ করেন। পশ্চিমবঙ্গ পরিভাষা কমিটির সদস্য হিসেবে পরিভাষা প্রণয়ন করেন তিনি।

স্বীকৃতি ও সম্পাদনাঃ ১৯৫১ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সামাজিক কীটপতঙ্গ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলােচনা চক্রে ভারতীয় শাখা পরিচালনার জন্য আমন্ত্রণ পান। ১৯৬৮ সালে আনন্দ পুরষ্কার, ১৯৭৫ সালে রবীন্দ্রস্মৃতি পুরষ্কার পান। ১৯৮০ সালে আনন্দমােহন কলেজ থেকে ডি এস সি প্রদান করা হয় তাঁকে।

গ্রন্থপঞ্জিঃ বিজ্ঞান অমনিবাস’, ‘মহাশূন্যের রহস্য’, ‘আণবিক বােমা’, ‘স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু’, করে দেখাে (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড), বাংলার মাকড়সা’, বাংলার কীটপতঙ্গ প্রভৃতি গ্রন্থ এবং লেখা পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষাপর্ষদের সঙ্গে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ছাত্রপাঠ্য ‘জীববিজ্ঞান’ গ্রন্থটি তাঁর লেখা।

মৃত্যুঃ এই মহান ব্যক্তির মৃত্যু হয় ৪ এপ্রিল ১৯৮১ সালে। উপসংহার ও বিজ্ঞান যে একটা শুষ্ক বিষয় নয় তার মধ্যেও যে আনন্দ আর রসআছে সেই রসবােধের প্রকাশতাঁর প্রতিটি লেখায় ছত্রে ছত্রে লিপিবদ্ধ।
পরিশেষে জানাই যে তাঁর জীবনদর্শণকে পাথেয় করে প্রতিটি শিশু কিশাের ও মানুষকে যদি আমরা উদ্দীপিত করতে পারি এবং আমৃত্যু বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি তা যদি সত্যি করতে পারি তবেই তাঁকে যথার্থ সম্মান দেখনাে হবে।

লেখিকাঃ প্রাপ্তি কর

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর সেপ্টেম্বর – অক্টোবর ২০১৪ থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: