জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর দিক

poribes news 1
3.8
(5)

জাঙ্ক ফুড কোনগুলো

বর্তমান প্রজন্মের আধুনিকতম খাদ্য তালিকায় যে খাবারগুলির দ্রুত অনুপ্রবেশ ঘটছে সেগুলিই ফাস্টফুড জাঙ্কফুড। ফাস্টফুড কর্ণারে যেসব খাবার আকর্ষনীয় বা প্রলােভিত করে সেসবই জাঙ্ক ফুড।

এছাড়াও যেগুলি এর তালিকাভুক্ত তা হল বিভিন্ন লবন ও মশলা যুক্ত চিপস্, কোলা বা ঐ জাতীয় নরম পানীয়, রােল, চাউ, পেস্ট্রি, প্যাটিস, চকোলেট বা যা চটজলদি খাবার তাই এর আওতায় পড়ে।

জাঙ্ক ফুডে কোন দ্রব্যের আধিক্য থাকে

এই খাবারগুলির ক্যালরী শক্তিমূল্য যথেষ্ট, কোন কোনটিতে প্রােটিনের পরিমা যথাযথ। তবে এইসব খাবারে বি-কমপ্লেক্স ও সি ভিটামিন, ক্যালসিয়াম না লৌহের অভাব দেখা যায়। কোনকোনটিতে রিফাইড বা পরিমঞ্জিত কার্বহাইড্রেট বা চিনি বা স্নেহ পদাথের আধিক্য দেখা যায়।

জাঙ্ক ফুড মানে কি ?

‘জঙ্ক’ এই ইংরাজী শব্দটির আভিধানিক অর্থমূল্যহীন স্বল্পমূল্যের বস্তু অর্থাৎ ‘অফ লিটিল অর নাে ভ্যালু’। আর ফাস্ট ফুড বা চটজলদী খাবার তাকেও এই গােত্রেই ফেলা হয়। পৃথিবীতে ফাস্ট ফুড ইনডাষ্ট্রি আজ এত হারে বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাসও বদলে যাচ্ছে।

পাঁচ থেকে পঞ্চান্ন সকলকেই এই খাবার আকৃষ্ট করছে। আরও ছােট ছেলেমেয়েরাও এই সব লবন যুক্ত নানান রকমের চিপস্, আইসক্রীম, চকোলেট ও নরম পানীয়ের ভক্ত হয়ে পড়ছে এবং এতে আসক্তিও বাড়ছে।

জাঙ্ক ফুড-এ কেন আসক্তি তৈরী হয় ?

নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গেছে অতিরিক্ত চিনি স্নেহ পদার্থ যুক্ত খাবার এক ধরণের আসক্তি তৈরী করে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডঃ এইচ.জি হােবেল গবেষণাগারে দেখেছেন অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাবার দীর্ঘদিন ইদুরদের খাওয়ালে আসক্তি তৈরী হয়।পরে ঐ খাবার প্রত্যাহার করে নিয়ে স্বাভাবিক খাবার দিলে তাদের মধ্যে অস্থিরতা দেয়। ঠিক এই একই ভাবে উইজকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ু রােগ বিশেষজ্ঞ ডঃ অ্যানিকেলী ইদুরদের বেশ কিছুদিন অতিরিক্ত স্নেহ পদার্থ যুক্ত খাবার খাইয়ে দেখেছেন এদের মস্তিষ্কে এক ধরণের রাসায়নিক পরিবর্তন হয়।

এদের মস্তিষ্কের ওপিঅয়েড, লেপটিননামক একটি যৌগের নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়। লেপটিন মস্তিষ্কের সন্তুষ্টি কেন্দ্র থেকে নিঃসৃত হয়ে খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু লেপটিনের অভাবে খাদ্য গ্রহণ চলতেই থাকে ক্ষুধার প্রশমন হয় না। ফলে স্থূলত্ব দেখা দেয়।

অতিরিক্ত ভাজাভুজি, তেল সম্পৃক্ত খাবার শুধু মস্তিষ্কের নেপটিন নিঃসরণ বন্ধই করে না, উল্টে মস্তিষ্ক কোষ থেকে গ্যালেনিন নামক একটি পলিপেপটাইডের নিঃসরণ, ক্ষুধাকে আরও বাড়িয়ে তােলে। তার উপর শক্তি খরচ করার প্রবণতাকে কমিয়ে দেয়। ফলে স্থূলত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সম্প্রতি ইউরােপীয়ান এ্যাসােসিয়েশন ফর দি স্টাডি অফ ওবেসিটি নামক সংস্থার মুখপাত্র ডঃ পিটার কোপেনম্যান বলেছেন ‘উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অতিভােজন আর অতি ওজনের প্রবনতা দেখা দিয়েছে। যা হয়ত মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে’। আর এই অতি ওজন ডেকে আনতে পারে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃৎপিন্ড ও রক্তাবহানালীর অসুখ, মেয়েদের স্তনের ক্যানসার ইত্যাদি।

ইদানিং শিশুদের জন্য প্রস্তুত আহারে ও কৃত্রিম গন্ধ,বর্ণ, খাদ্য সংরক্ষক ও খাদ্য সংযােজক দেওয়ার প্রবনতা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞাপনের চটকে স্বাভাবিক আহারের পরিবর্তে সম্পূর্ণ রূপে এই খাবার গুলির উপর নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিশেষজ্ঞ ডঃ ফেনগােন্ড লক্ষ্য করেছেন এর ফলে শিশুদের মধ্যে মনােযােগের অভাব ও অতিরিক্ত উত্তেজনা প্রবনতা দেখা দেয়। যেটিকে Attention Deficit Hyperactivity Disorder Syndrome নামে অভিহিত করেছেন।

জাঙ্ক ফুড-এ স্বাস্থের ক্ষতিকর দিক

জাঙ্ক ফুড গুলিতে তন্তু বা ফাইবারের একান্ত অভাব। বেশীর ভাগই হল রিফাইন্ড বা পরিমার্জিত খাদ্য উপাদান দিয়ে তৈরী। যা অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পরবর্তী কালে রক্তে কোলেস্টরলের
আধিক্য, অ্যাপেনডিসাইটিস, গলস্টোন, কোলনে ডাইভার্টিকুলােসিস ও কোলন ক্যানসারের সম্ভবনাকে বাড়িতে তুলতে পারে।

চিপসএর ক্ষতি

সল্টে চিপস্, বাদাম, সস ইত্যাদি খাওয়ার প্রবনতা থাকলে প্রয়ােজনের তুলনায় অতিরিক্ত লবন গ্রহণের কুফল দেখা দেয়। আবহাওয়া জনিত কারণে ভারতের অনেক অঞ্চলের মানুষই বেশীলবন খান। লবন যা সােডিয়াম ক্লোরাইড় দেহের পক্ষে একটি প্রয়ােজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতব পদার্থ।

কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে পাকস্থলীর প্রদাহ, অস্থি থেকে অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামে মােক্ষন হতে থাকে ফলে অস্থি নরম ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এছাড়া পাকস্থলীর প্রদাহ ও ক্যানসার ঘটাতে পারে। তাই লবন যুক্ত
আলু বা অন্যান্য ভাজা বাবিস্কুট পাঁপড়, চাটনী সস বা আচার নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় খাওয়া উচিত।

হৃৎপিন্ড ও রক্তনালীর অসুখঃ

জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিজ্ঞানীর অধ্যাপক ডাঃ সিডি বার্জানিয়ার জন সমীক্ষা পর্যালােচনা করে ও গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে খাদ্যে স্নেহ পদার্থের অনুপাত বাড়লে অথবা জটিল শর্করার বদলে সরল শর্করার পরিমাণের বৃদ্ধি ঘটলে হৃৎপিন্ড ও রক্তনালীর অসুখে মৃত্যুর হারও আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়।

যাইহােক, জাঙ্ক ফুড বা ফাস্টফুড এদের যে নামেই ডাকা হােক না কেন এগুলি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাগালের মধ্যে। ছােট বড় কেউই এর আকর্ষণ এড়াতে পারছেনা। তাই এগুলির মধ্যে টাটকা সজী, ফল
দুধ বা দই সংযােজিত হলে, তেল, চিনি ও লবনের মাত্রা কমিয়ে সার্বিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে তা সুষম খাবারের কাছাকাছি হয়ে উঠবে নয়ত আজকের আনন্দ ভবিষ্যতের নিরানন্দের কারণ হবে। আর আমাদের জীবনে জাঙ্ক ফুডের অবশ্যম্ভাবিতা ও জাঙ্ক ফুড সাবধানতার কথা মনে করিয়ে দিতে ও সচেতন করতেই ২১শে জুলাই জাতীয় জাঙ্ক ফুড দিবস পালন করা হয়।

ডঃ ইরা ঘােষ

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ২০১২ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3.8 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

One thought on “জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর দিক

Leave a Reply

Next Post

মিষ্টি খেলে কৃমি হয় ?

3.8 (5) বিশ্বাস : মিষ্টি খেলে কৃমির সংক্রমণ ঘটে অথবা বৃদ্ধি হয়।    ঃবিজ্ঞান : মিষ্টি খাওয়া বা না খাওয়ার সঙ্গে কৃমির সংক্রমণ বা বৃদ্ধির কোনাে সম্পর্ক নেই। এই বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে কৃমির জীবনচক্র এবং তার পরিণতি। কৃমি একটি পরজীবী জীব। অর্থাৎ কৃমি অন্যের নির্ভরতায় বেঁচে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: