উত্তরবঙ্গের সমস্ত অরণ্য সম্পদ

@
2
(2)

উত্তরবঙ্গ বলতে বাংলার প্রধান নদী গঙ্গার উত্তরের অংশকে বােঝায়। এই উত্তরবঙ্গ ছটি জেলার সমষ্টি (দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা) যার মধ্যে একদিকে যেমন পাহাড়ের ছোঁয়া আছে তেমনি আছে বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল। এদের বুক চিরে গেছে
তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাক, কালজানি, মুজনাই, সংকোশ, মহানন্দা প্রভৃতি বড় নদী। এছাড়া রয়েছে অংসখ্য ছােট ছােট নদী (যেমন-নেওড়া,চেল, লিস, ঘি, আত্রেয়ী, কুলীক, করতােয়া প্রভৃতি) এবং ঝোড়ার সমষ্টি যার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের অরণ্য সম্পদ।

উত্তরবঙ্গের অরণ্যসম্পদ প্রধানত দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে সারা উত্তরবঙ্গে আনুমানিক মােট ৩১০৬ বর্গ কি.মি. বনভূমি আছে, যার অধিকাংশ (প্রায় ৩০৭৪ বর্গ কি.মি.) দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের অধীনে।

বিশ্বের বর্তমান ২৫টি মেগাডাইভারসিটি অঞ্চলের ২টি রয়েছে ভারতে। যার একটির কিছু অংশ রয়েছে এই উত্তরবঙ্গের সুদূর উত্তর পূর্ব অংশে। জৈব বৈচিত্র্যে ভরপুর এই উত্তরবঙ্গ।

উত্তরবঙ্গের অরণ্য এলাকায় মোটামুটি ৫-৬টি প্রধান বাস্তুতন্ত্র পাওয়া যায় যথা উচ্চ পার্বত্য এলাকায়     ওক, গডােডেনড্রন, জুনিপার,হেমলকের দূর্ভেদ্য অরণ্য, মধ্য পার্বত্য এলাকায় উপাক্রান্তী আদ্রপর্ণমােচী সহ নাতিশীতােষ্ণ৷ অ্ররন্য নিমপার্বত্য এলাকা ও পাদদেশে মিশ্রশাল জঙ্গল এবং নদীচরে বা প্লাবনভূমিতে খয়ের শিৱিষ শিমুলের জঙ্গল উল্লেখযােগ্য।

সমতলের প্রায় ৩৫ ভাগ এবং পাহাড়ী অঞ্চলের প্রায় ৭০ ভাগ জঙ্গল এখন রোপিত (Planted) অরণ্য যার অধিকাংশ তৈরি হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৮৯ এর মধ্যে।

ভৌগলিক অঞ্চল অনুযায়ী রোপিত (Planted)  ও প্রাকৃতিক অরণ্যকে মােটামুটি চারভাগে ভাগ করা যায় যথা—তরাই (মেচি ও তিস্তা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল); পশ্চিম ডুয়ার্স (তিস্তা ও তাের্ষা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল); পূর্বডুয়ার্স (তাের্ষা ও সংকোশ নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল) এবং পার্বত্য অঞ্চল (কার্শিয়াং, কালিম্পং ও দার্জিলিং এর পাহাড়ী অঞ্চল)।

 উত্তরবঙ্গের প্রধান বনাঞ্চল

উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলকে প্রধান ৬টি ভাগে ভাগ করা যায় যথা-

১) সমতল শাল অরণ্য – তরাই এর লালট, শালুগাড়া,বাগডােগরা, শুকনা;

পশ্চিম ডুয়ার্সের-মােরাঘাট, টুডু, আপালচাদ;

পূর্বডুয়ার্সের-চিলাপাতা, রাজাভাত খাওয়া, দমনপুর প্রভৃতি অঞ্চল এর মধ্যে পরে যা যথাক্রমে কার্শিয়াং বন্য প্রাণী-১, বৈকুণ্ঠপুর, জলপাইগুড়ি বন্য প্রাণী-২, কোচবিহার এবং বক্সা ব্যাঘবন বনবিভাগের অন্তর্গত।

2) খয়ের-শিশু বা চর বনাঞ্চল (Riverine Forest) ঃ- তরাই এর সেভক; পশ্চিমডুয়ার্সের-ডায়না, মূর্তি, জলদাপাড়া; পূর্বডুয়ার্সের-পানা, রাঘড়াক, জয়ন্তী প্রভৃতি অঞ্চলে এর মধ্যে পড়ে যা জলপাইগুড়ি বন্য প্রাণী-১, কোচবিহার ও বক্সা বিভাগের অন্তর্গত।

৩)ভেজা মিশ্র শাল এবং আর্দ্র পর্ণমােচী অরণ্য(Wet Mixed Sal & Moist Deciduous forests:-
তরাই এর – শুকনা, সেভক, বাগডােগরা, পশ্চিম ডুয়ার্সের আপালচাঁদ, মােরঘাট, গরুমারা, চাপড়ামারি; পূর্ব ডুয়ার্সের-চিলাপাতা, রাজাভাত খাওয়া, জয়ন্তী, বক্সা, নিমতি প্রভৃতি অঞ্চল পড়ে যা কার্শিয়াং, জলপাইগুড়ি বন্য প্রাণী বিভাগ—১৩২, কোচবিহার ও বক্স বিভাগের অধীনে।

৪) মধ্য ও নিন্ন পার্বত্য অরণ্য (Sub Himalayari Forest) তরাই এর কালিঝােৱা-লাট পাঞ্চার, পানিঘাটা; পশ্চিমডুয়ার্সের- চেল, নােয়াম, জলঢাকা, সামানিং, নেওড়াভ্যালী, পূর্ব ডুয়ার্সের রায়মাটাং, বক্সা, ভূটানঘাট প্রভৃতি অঞ্চল এন মধ্যে পড়ে যা কার্শিয়া বনপ্রাণী-১ কালিম্পং, বন্যা ও জলপাইগুড়ি বন্যপ্রাণী-২ বনবিভাগের অধীনে।

৫) ভেজা পার্বত্য অরণ্য-নাতিশীতােষ্ণ (Wet Temperate mountain Forest) –

পার্বত্য অঞ্চলে—সিংগালীলা জাতীয় উদ্যান (সান্দাকফু এলাকা), নেওড়াভ্যালী জাতীয় উদ্যান (আলুবাড়ি,
রেনক এলাকা), লাভা, বিম্বিক, সেঞ্চল প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত যা কালিম্পং বন্যপ্রাণী-১ ও ২ এবং দার্জিলিং বনবিভাগের আওতায়।

৬) রডােডেনড্রন অরণ্য – পার্বত্য অঞ্চলের সিংগালীলা জাতীয় উদ্যান নেওড়াভ্যালী জাতীয় উদ্যানের জোর পােৱী, টাং, ঘুম প্রভৃতি অঞ্চল এর মধ্যে পড়ে যা দার্জিলিং বন্যপ্রাণী-১ ও ২ বনবিভাগের অধীনে।
তবে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার উত্তরের তিনটি জেলা বাদে বাকি দক্ষিণের তিনটি জেলার ভূ-প্রকৃতি গাঙ্গেয় সমভূমি। কৃতজ্ঞতাঃ বিপন্ন পরিবেশ; নাগরিক মঞ্চ, ২০০০

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বন্য প্রাণী

অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান

স্বাধীন ভারতে ১৯৮০ সালের পর উত্তরবঙ্গের ৫০ শতাংশ বনভূমিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষিত এলাকা (Protected Area) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে উত্তরবঙ্গে ৩টি জাতীয় উদ্যান ১টি ব্যাঘ্র প্রকল্প এলাকা(Tiger Project) এবং ৬টি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

 

    রায়গঞ্জ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

উত্তর দিনাজপুর জেলার সদর শহর রায়গঞ্জ প্রথমে একটি পাখিরালয়হিসেবেই পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে এটিকে অভয়ারণ্য হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় ১৯৮৫ সালে। এই অভয়ারণ্যের বর্তমান ব্যাপ্তি
১.৩ বর্গ কি.মি.। এই অভয়ারণ্য পরিযায়ী পাখির জন্য বিখ্যাত। এটিকে কুলিক পক্ষী নিবাস নামেও অভিহিত করা হয়।

কুলিক পক্ষী নিবাস ,রায়গঞ্জ
কুলিক পক্ষী নিবাস

বনাঞ্চলটি ১৯৬০ সালে বনসৃজনের মধ্য দিয়ে পুনরায় তৈরি করা হয়। এখানে কদম, জারুল, শিশু, সেগুন, খয়ের গাছ বেশি করে দেখা যায়। জায়গাটি অনেকটা উঁচু জায়গার উপর যার নীচের দিকে
ঘন উলু ও কাশবন রয়েছে।

অভয়ারণ্য সৃষ্টির ফলে স্থানীয় কিছু প্রাণী যথা, শেয়াল, খেঁকশেয়াল, খরগােশ, বনবিড়াল প্রভৃতি আশ্রয় পেয়েছে। এখানে বিভিন্ন রকমের মাছ ও কাঁকড়া পাওয়া যায়—সেকারণে জায়গাটি পাখিদের আদর্শস্থান। কুলিক নদী ও তৎসলগ্ন জলাভূমি পাখিদের আকর্ষণের মূল জায়গা।

জুনমাস নাগাদ প্রতি বছর এই অভয়ারণ্যটিতে বিভিন্ন প্রকার পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে। স্থানীয় পরিযায়ীরাও এখানে ভিড় জমায়। এরা সাধারণভাবে পুঁটি, গুগলি, জলজ বিভিন্ন পােকামাকড়, ব্যাঙ, কেঁচো প্রভৃতির উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে জলাভূমিটি লতাগুল্মে, গাছগাছড়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়ায় পশুপাখিদের কাছে আদর্শস্থান।

এখানে সাইবেরিয়া সমেত উত্তরের কিছু পরিযায়ী পাখি ছাড়াও শামুকখােল, বক, পানকৌড়ি, বাজকা, সারস প্রভৃতি পাখিদের দেখা যায়। এরা এখানে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, বাচ্চা বড় করে এবং বর্ষা শেষে চলে যায়।

স্থানীয় পাখিদের মধ্যে ঘুঘু, চিল,পেঁচা, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা, ফিঙে প্রভৃতি দেখা যায়। এই অভয়ারণ্যটি তত্ত্বাবধান করেন বিভাগীয় বনাধিকারিক, পশ্চিমদিনাজপুর বিভাগ। শিলিগুড়ি থেকে জাতীয় সড়ক ধরে চোপড়া-কিশনগঞ্জ-ডালখোলা পেরিয়ে এসে কুলিক নামক একটি ছােট নদীর ধারেই এই অভয়ারণ্যটি সংলগ্ন বনবিভাগের নিয়ন্ত্রাধীন।

       মহানন্দা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

১৯৪৯ সালে প্রথম সরকারী ভাবে মহানন্দা বন্য প্রাণী সংরক্ষিত বনকে ‘অভয়ারণ্যের’ মর্যাদা দেওয়া হয়। সেই সময় বনাঞ্চলটিকে মােট আয়তন ছিল ১২৭ বর্গ কি.মি.। বর্তমানে প্রায় ২১০ বর্গ কিমি, জায়গা জুড়ে এক ব্যাপ্তি। ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী এটিকে পুনরায় ১৯৭৬ সালে পূনর্ঘোষিত করা হয় ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে।’ তিস্তা’ ও ‘মহানন্দা’ এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অভয়ারণ্যটি অবস্থিত।

মহানন্দা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য
এই অঞ্চলের শতকরা ৬০ ভাগই প্রায় পার্বত্যভূমি ও বাকি অংশ সমতল। হিমালয়ের ১৫০ মিটার থেকে ১৩০০ মিটার উচ্চতাযুক্ত পাহাড়ী ঢালে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যটির প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দৰ্য্য অপরূপ।

এই অভয়ারণ্যটির অভ্যন্তরে একটি কৃত্রিম জলাধার আছে। এই অঞ্চলের শতকরা ৬০ ভাগই প্রায় পার্বত্যভূমি ও বাকি অংশ সমতল। হিমালয়ের ১৫০ মিটার থেকে ১৩০০ মিটার উচ্চতাযুক্ত পাহাড়ী ঢালে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যটির প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দৰ্য্য অপরূপ।

এই অভয়ারণ্যটি বন ও বন্য প্রাণীর প্রাচুর্যে ও বৈচিত্রে উল্লেখযােগ্য স্থান দখল করে আছে। শাল, খয়ের, শিল্ড, শিমুল, শিরিষ,লালি, চিলৌনি, চিকরাশি, উদানি, পিটালি, বহেরা, আমন, টুন, চাপ, মিঠা প্রভৃতির সারি সারি গাছ অভয়ারণ্যটিকে অন্যমাত্রা যোগ করে।

পাহাড়ী এই অভয়ারণ্যের নীচের দিকে প্রায় ৪০০ মিটার উচ্চতাযুক্ত জমিতে শাল গাছ পাওয়া যায়। এখানকার সমতল অঞ্চলে, শাল,সেগুন, চাপ, জারুন, শিল্ড, গামারী, চিকাশী প্রভৃতি বৃক্ষজাতীয় গাছের দেখা মেলে। ৮০০ মিটারের উপর দিকটা আঙ্গাৱে, উটিশ,যান ও এপিফাইট জাতীয় উল্লেখযােগ্য উদ্ভিদের দেখা মেলে।

প্রাণীদের মধ্যে মেরু (পাহাড়ী ছাগল জাতীয় প্রাণী), হিমালয়ের কালাে ভালুক, গাউর বা ভারতীয় বাইসন, চিতাবাঘ, বুনেশুয়োর, সম্বর হরিণ, কাকর হরিণ, চিতল হরিণ, অসমীয়া বানর, সজারু, গােসাপ, গিবন জাতীয় বানর, হাতি এবং ডােরাকাটা বাঘ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। পাখির বৈচিত্র্যেও এই অভয়ারণ্যটি উল্লেখযােগ্য স্থান দখলকরে আছে।

বর্ষা ও শীতের বহু পরিযায়ী পাখির আনাগােনা হয় এখানে। ছাইরঙের ভারতীয় কোশরাজ বড় ভারতীয় ধনেশ, ভীমরাজ ,মদনা, ফুলটুলি, লাল মাথা বাঁশপাতি, কালো বুলবুল, মেরুন রঙের ওরিও, গোল্ডেন ওরিওল, মালকোহা প্রভৃতি পাখি এখানকার উল্লেখযােগ্য।

কাছাকাছি বাগডোগরা নিমানবন্দর থেকে মাত্র ২২ কিমি দুরত্বে রয়েছে এই অভয়ারণ্যটির প্রবেশ পথ। অভয়ারণ্যটির মাঝখান দিয়ে ৩১ নং জাতীয় সড়কঅভয়ারণ্যটির বুক চিরে গেছে—অভয়ারণ্যটিকে
দ্বিখন্ডিত করে।

অভয়ারণ্যটি মাত্র ৮-১০ কিমি দুরত্বে নিউজল্পাইগুড়ি বা এন. জে.পি. (N.J P.) রেল স্টেশন অভয়ারণ্যটি।পশ্চিম সীমানা ধরে দার্জিলিং ও পূর্ব সীমানা ধরে কালিম্পং শহর পর্যন্ত দুটি পাহাড়ী এই রাস্তা চলে গেছে। অভয়ারণ্যটির শুকনা নামক স্থানে বনবিভাগে বাংলো রয়েছে। নিকটবর্তী শহর শিলিগুড়িতেও পর্যটন আবাস ও বহু হােটেল রয়েছে।

     স্যালামান্ডার অভয়ারণ্য জোরপােখরি 

স্যালামান্ডার গিরগিটির মত লেজযুক্ত উভচর। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রাণীটির কিছু প্রজাতি আজও বেঁচে রয়েছে সারা পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি অঞ্চলে। সারা এশিয়া মহাদেশে এর একটি মাত্র প্রজাতি।
হিমালয়ান নিউট (Tylototriton verucosus) পাওয়া যায় দার্জিলিং জেলার জোর পোখরি স্যালামান্ডার অভয়ারণ্যে।

Introducing Bandana Adhikari from Nepal – SAVE THE FROGS!
     স্যালামান্ডার

এখানে ‘জোর পােখরি’ নামক জোড়া হ্রদে এদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে যা ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসের সরকারীভাবে অভয়ারণ্যের মর্যাদা পায়। এই হ্রদটি সমেত পুরাে জোরপােখরি অভয়ারণ্যের মােট আয়তন ৪ হেক্টর যা পশ্চিমবঙ্গের ‘সবচেয়ে ক্ষুদ্র অভয়ারণ্য’ এর মর্যাদা প্রাপ্ত।

পুরানে কথিত আছে এই জাতীয় প্রাণীটি আগুনে বাস করার ক্ষমতা রাখত। এই উভচরের নরম ও ভিজে চামড়া অগ্নিনিরােধক বলে বিশ্বাস করা হত। ইউরােপে লক্ষ লক্ষ বছর আগেই এই জাতীয় প্রাণীটির বিলুপ্তি ঘটেছে।

বিরল প্রজাতির এই প্রাণীটি দার্জিলিং এর পর্বতাঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ভাবে পাওয়া যায়। স্থানীয় ভাষায় এদের ‘সােরা’ নামে ডাকা হয়। এই অভয়ারণ্যটিতে প্রাণীটিকে নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের বিষয়। ভারতের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী এরা সংরক্ষিত প্রাণী।

অভয়ারণ্যটির নিকটবর্তী শহর ‘সুখিয়াপােখরি’ যা সড়কপথে দার্জিলিং ও মিরিকের সাথে যুক্ত। দার্জিলিং শহর থেকে মাত্র ২০কিমি দূরে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যটি পর্যটকদের কাছে সহজলভ্য।’লেপচাজগৎ’-এ বনবিভাগের বন বাংলােয় রাত্রিকালের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া প্রচুর বেসরকারী হােটেল আছে।

  সেঞ্চল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

সেঞ্চল প্রাকৃতিক ও রােপিত—এই দু’রকম অরণ্যের সমষ্টি। ১৮৯২ সালে ইংরেজরা প্রথম এই অঞ্চলে বৃক্ষরােপন শুরু করে। দার্জিলিং শহর থেকে মাত্র ১১ কিমি দূরে জোড়বাংলাের কাছেই এই অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। বর্তমানে এই অভয়ারণ্যটির মােট আয়তন ৩৮.৬০ বর্গ কিমি। ১৯১৫ সালে প্রথম এটিকে সংরক্ষিত বনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৬ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

হিমালয়ের পাহাড়ের কোলে ৮,০০০ ফুট উচ্চতায় ‘টাইগার হিল’ পর্যন্ত এই অরণ্যের বিস্তৃতি।

এই অভয়ারণ্যের ২০০০-২৪০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে ঘন ওক গাছ, কাপাসী, কাটুস, কাতলা, চাপা, বাঁশ ও বিভিন্ন প্রকারে ও ডি এবং ফার্ন প্রভৃতি পাওয়া যায়। ২৪০০ মিটারের অধিক উচ্চতায় পিপলিং, উটিশ, ধুপি, চাপ এবং সর্বপরি রভােডেনড্রন জাতীয় বৃক্ষ দেখা যায়।

Durga Puja Kolkata 2019 ↑↑ Beliaghata 33 Pally ↑↑ বেলেঘাটা ৩৩ পল্লীর থিম ↑↑এক কিন্তু একা নই - YouTube
  সেঞ্চল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

রডােডেনড্রনের ফুলে পাহাড়ী অঞ্চল সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে থাকে। এখানে সীমিত স্থানে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা যথেষ্ট। এখানে কাকর হরিণ, বুনোয়াের, গেরাল, মেরু, পাহাড়ী কালাে ভালুক, চিতা বাঘ, বনবিড়াল, চিতাবিড়াল, অসমীয়া বানর, শেয়াল প্রভৃতি বন্যপ্রাণী দেখা যায়। পাখিদের মধ্যে কালাে কাঠঠোক্রা,
চোরপাখি প্রভৃতি উল্লেখযােগ্য। অভয়ারণ্যটি দার্জিলিং বনবিভাগের অধীনে।

এই অরণ্য সংরক্ষিত বনহিসেবে চিহ্নিত ছিল ১৯৪১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭৬ সালে মােট প্রায় ১১৬ বর্গ কি.মি. জায়গা জুড়ে এই অরণ্যকে অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে এর আয়তন ২১৬.৫ বর্গ কি.মি.। এই বনাঞ্চলের গঠন অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘V’ আকৃতির। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দুটি বড় নদী যথা—তাের্ষা’ ও ‘মালঙ্গী’ আছে।

তাের্ষায় অবশ্য বর্ষাকাল ছাড়া তেমন জল থাকে না বললেই চলে। সেই অর্থে এখানকার প্রধান নদী মালঙ্গী। অরণ্য অঞ্চলই শুকনাে ঝোড়া বা ঝর্ণা ও পরিত্যক্ত ছােট বড় নদীর সমষ্টি।

এখানে শুষ্কমিশ্র; আমি ও শালবনের উপস্থিতি এই অভয়ারণ্যকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে। নদীর মাঝের চরে ঘন ঘাসের বন আছে। এখানে মূলতঃ শিশু, খয়ের শিবি, ছাতিম, পিটানি, জাম প্রভৃতি বৃক্ষ জাতীয় গাছপালা দেখতে পাওয়া যায়।

এই অঞ্চলের শতকরা ৩০ ভাগই ঘাসবন, অনেক সময় এই ঘাসগুলাের উচ্চতা ১৫ ফুট পর্যন্ত হয়।

এক শৃঙ্গ গন্ডারের জন্য বিশেষ খ্যাত এই অভয়ারণ্যটি। এছাড়া অন্যানা বন্যপ্রাণী সম্পদেও ভরপুর এই অভয়ারণ্য। এখানে একশৃঙ্গ গন্ডার ছাড়া বাঘ, ভারতীয় বাইসন বা গাউর, চিতা বাঘ, সাম্বার, হাতি, বারকিং হরিণ, কাকহরিণ, চিতল হরিণ, শ্লথ ভালুক ও বিলুপ্ত প্রায় পাখি বেঙ্গল ফোরিকেন প্রভৃতি পাওয়া যায়।

সরীসৃপ হিসেবে ময়াল বা অজগর, কেউটে বা গাে-সাপ প্রভৃতি দেখা যায়। পাখির জগতেও খুবই আদর্শ এই অভয়ারণ্যটি। এ

খানকার ছােট ছােট নদী যেমন—হলং, চিরা খাওয়া, কালিঝোৰা, সিসামারা
ভালুকা এবং বুড়ি তাের্ষা প্রভৃতি দেখা যায়।

এখানে ১২টি স্থানে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা নুনমাটির ব্যবস্থা আছে। এই নুনমাটির মাঠগুলি বন্য প্রাণীদের কাছে খুবই প্রিয়। এসব জায়গা থেকে গাছে বা উঁচু ভাবে
তৈরি মিনার থেকে এই মাটি খেতে আসা বন্য প্রাণীদের সহজে দেখা মেলে।

অভয়ারণ্যটি বিভাগীয় বনাধিকারিক কোচবিহার এর নিয়ন্ত্রণাধীন। যদিও অঞ্চলটি জলপাইগুড়ি জেলায়। বাসে বা ট্রেনে সহজেই অভয়ারণ্যের নিকটবর্তী মাদারীহাটে (দূরত্ব মাত্র ৬ কিমি.) পৌছানো যায় শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ি থেকে।

মাদারিহাটে মিটার গেজের একটি রেলস্টেশন আছে। শিলিগুড়ি থেকে সড়ক পথে ৩১নং জাতীয় সড়কের পাশেই অবস্থিত (শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব ১৫০ কি.মি.)। ব্রডগেজ রেলস্টেশন ফালাকাটা যা অভয়ারণ্যের দক্ষিণ দিকে ১৬ কি.মি. দূরে অবস্থিত।

নিকটবতী বিমানবন্দর বাগডােগরা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের ৩টি টুরিষ্ট লজ অভয়ারণ্যের নিকটবর্তী মাদারীহাট, হলং ও বরদারিতে আছে। এছাড়া মাদারীহাট, নীলপাড়া ও কোলবন্তীতে বনবিভাগের ৩টি বাংলাে রয়েছে। ভ্রমণের আদর্শ সময় এপ্রিল-নভেম্বর।

  চাপড়ামারি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

১৯৪০-৪১ সাল নাগাদ এই অরণ্যকে সংরক্ষিত বন এর মর্যাদা দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত হয়। বর্তমানে এর আয়তন মাত্র ৯.৬০ বর্গ কি.মি.। মুতী নদীর ধারে
এই অভয়ারণ্যটি অবস্থিত।

চাপড়ামারি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
চাপড়ামারি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি মুলতঃ শুষ্ক মিশ্রজাতীয় বন

এই অভয়ারণ্যটি মুলতঃ শুষ্ক মিশ্রজাতীয় বন। কখনও কখনও ক্ষুদ্র অমিশ্র ও পরিণত শালের বনের দেখা মেলে। এখানে লালি,চিলৌনি, কাঞ্চন, বহেড়া, পারারী, কাওলা প্রভৃতি বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়। পাখির জন্য খুবই উল্লেখযােগ্য স্থান দখল করে আছে এই অভয়ারণ্যটি। ৩১নং জাতীয় সড়ক অভয়ারণ্যটির পাশ
দিয়ে চলে গেছে।

এছাড়া নিকটবর্তী রেলস্টেশন হল চাপড়ামারি (মাত্র ২ কিমি. দূরত্বে)। জলপাইগুড়ি বন্যপ্রাণ বিভাগ-২ এর নিয়ন্ত্রণাধীন বনবাংলো বনের ভেতরেই আছে।

ডঃ রাজা রাউত

জলপাইগুড়ি নেচার এন্ড সায়েন্স ক্লাব

তথ্যসূত্রঃ
১) The book of Indian Animals-S.H.Prater
২) ভারতের বন্যপ্রাণী ও অভয়ারণ্য—বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর মার্চ – এপ্রিল ২০১১ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 2 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিজ্ঞান শিক্ষা

2 (2) আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। সাধারণ বিজ্ঞানের ক্লাসে স্যার এলেন। আমরা যাথারীতি উঠে দাঁড়ালাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন তােমরা উঠে দাঁড়ালে কেন? যাঃ বাবা। এটা কোনাে প্রশ্ন হল? আমাদের প্রাইমারী সেকশনে এটাইতাে শিখিয়েছেন স্যারেরা, ম্যাডামেরা। স্যার, ম্যাডাম ক্লাসে এলে উঠে দাঁড়াতে হয়। যাই হােক। স্যার বললেন শুধু প্রথা হিসাবে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: