শ্যাওলা বৈচিত্র্য

0
(0)

শ্যাওলা কিঃ

বদ্ধ জলাশয়ে বা খাল-বিলে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানা ধরনের উদ্ভিদ জন্মায়। এই উদ্ভিদগুলিকে বলা হয় ‘শ্যাওলা বা শৈবাল’।অন্যান্য উদ্ভিদের মত এই শ্যাওলার কিন্তু ফুল হয় না। সাধারণতঃ আমাদের চোখে যে
শ্যাওলা জলাশয়ে দেখা যায়, সেগুলি ছাড়া আর এক বিশেষ ধরনের শ্যাওলা আছে, যেগুলিকে সমুদ্রের মধ্যে দেখা যায়। এদেরকে বলা হয় সামুদ্রিক শ্যাওলা’।

সামুদ্রিক শ্যাওলা ঃ

সাধারণত শ্যাওলা আকারে খুব ছােট কিন্তু সামুদ্রিক শ্যাওলা বেশ বড় আকারের হতে পারে ।দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট পর্যন্তও শ্যাওলা সমুদ্রে দেখা যায়।বিরাট আকৃতির শ্যাওলাগুলির মধ্যে সমুদ্রে সাধারণতঃ দেখতে পাওয়া যায় মাইক্রোসিসটি’ বা নিরিও সিসটিস নামক শ্যাওলাকে। এরা জলে ভেসে থাকতে পারে একটি
বাতাস ভর্তি থলির সাহায্যে। যার নাম ‘সারগাসুম’।

শ্যাওলার রাসায়নিক বিশ্লেষণঃ

সাধারণতঃ জলের উপরে শ্যাওলা দেখতে পাওয়া গেলেও, সমুদ্রের ৬০০ ফুট গভীরেও শ্যাওলা দেখতে পাওয়া যায়। শ্যাওলার রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে যে, তার মধ্যে থাকে ফসফেট, পটাস, লবণ ও
নাইট্রোজেন। এই কারণে শ্যাওলা, বিশেষ করে সামুদ্রিক শ্যাওলার ব্যাপক প্রয়ােগ ও ব্যবহার লক্ষ্য
করা গিয়েছে।

জৈব সার হিসাবে শ্যাওলা 

ইউরােপের সমুদ্র উপকূলে জার্ণাল, ১২-০১-২০০৯)। শ্যাওলা সংগ্রহ করে জৈব সার হিসাবে প্রয়ােগ করা হয়ে থাকে। গােলাপ গাছের জন্য ‘ল্যামিনারিয়া ও ফুকাস নামক শ্যাওলার যথেষ্ট কদর আছে। এরা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে বিশেষ সহায়ক। শ্যাওলা পুড়িয়ে ছাইকে সার হিসাবে ব্যবহার করার রীতি বহু দেশে
আছে। শ্যাওলার সঙ্গে সুপার ফসফেট ও অ্যামানিয়া সালফেট মিশিয়ে খুব উঁচু মানের সার পাওয়া যায়।

পশু খাদ্য হিসাবে শ্যাওলাঃ

পশু খাদ্য হিসাবেও শ্যাওলার ব্যবহার আছে। ‘রেডিমেনিয়া’ নামক এক শ্রেণির শ্যাওলা মেয জাতীয় প্রাণীর প্রিয় খাদ্য। পােলট্রির মুরগীর জন্যও শ্যাওলা খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আয়োডিন স্বল্পতার ক্ষেত্রে
শ্যাওলা এক উৎকৃষ্ট আহার্য হিসাবে গণ্য হয়।

খাদ্য হিসাবে শ্যাওলা

নরওয়েতে ১৯১৭সালে প্রথম শ্যাওলাকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। চিকিৎসাশাস্ত্রেও শ্যাওলার ব্যাপক প্রয়ােগ রয়েছে। গ্ল্যাণ্ডের অসুখে ‘ডাইজেনিয়া সিমপ্লেকস’ নামক একটি শ্যাওলা প্রয়ােগ করা হয়ে থাকে।

অসুখ বিসুখে শ্যাওলাঃ

পেটের অসুখে ফুকাস ও ইউএরা শ্যাওলা বিশেষ উপকারী। কিডনীর অসুখে ‘অ্যাসিটেনিরিয়া মেজর নামে একপ্রকার শ্যাওলা ব্যবহার হয়। নানারকম ঔষধ তৈরির কাজেও শ্যাওলা ব্যবহৃত হয়, কারণ শ্যাওলা থেকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও পটাসিয়াম ক্লোরাইড পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে শ্যাওলার ব্যবহার ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিল্পক্ষেত্রে শ্যাওলাঃ

শিল্পক্ষেত্রেও শ্যাওলার ব্যরহার রয়েছে। ‘ল্যামিলারিন ও ‘ম্যানিটল নামক যৌগ উৎপাদনে শ্যাওলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নানাধরনের ঔষধ,রেসিন, দেশলাই প্রভৃতি উৎপাদনের কাজে ম্যানিটল’- এর বিশেষ প্রয়ােজন হয়। আবার, অ্যালাজিন প্রভৃতি উৎপাদনে শ্যাওলার ভূমিকা অনস্বীকার্য।’জেলিডিয়াম’ নামক এক প্রকার শ্যাওলা থেকে ‘আগর’ (agar ) তৈয়ারি হয়। এটি একপ্রকার জেলজাতীয় কলয়েড পদার্থ।

শ্যাওলা থেকে ‘আগর’ (agar )ঃ

আইসক্রীম, জেলী, রুটি প্রভৃতি তৈরির কাজে এই আগরের ব্যাপক প্রয়োজন থাকে। একসময়ে
জাপান ছিল আগর উৎপাদনে অগ্রণী। পরে অবশ্য, ডেনমার্ক, ইংল্যাণ্ড, আমেরিকা, নিউজিল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশও আগর উৎপাদনের ক্ষেত্রে সফল হয়। এছাড়াও, সাবান, জুতার পালিশ, প্রসাধন সামগ্রী, শ্যাম্পু ইত্যাদি উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্যাওলার ব্যবহার আছে। শ্যাওলা থেকে খাদ্যও প্রস্তুত হয়। কথাটা আশ্চর্যের মনে হলেও, ঘটনাটি সত্যি। বহু প্রাচীন কালে চীনদেশে শ্যাওলা ছিল একরকম উপাদেয় খাদ্য। এই ঘটনা অবশ্য খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগেকার কথা। আমেরিকাতে পপ্কর্ণ এক অতি জনপ্রিয় মুখরােচক খাদ্য। আমাদের দেশেও এখন এটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এই পপ্কর্ণ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় রােডিমেনিয়া নামক এক প্রকার শ্যাওলার।

এইভাবে শ্যাওলার বিশেষভাবে সামুদ্রিক শ্যাওলার নানারকম ব্যবহার আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হচ্ছে। সুতরাং শ্যাওলা যে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়ােজনীয় উদ্ভিদ, সেই বিষয়ে কোনো সংশয় থাকতে
পারে না। ভবিষ্যতে হয়ত এই শ্যাওলাকে আরো ব্যাপকভাবে মানুষের প্রয়ােজন লাগানাে সম্ভব হবে, সেই আশা করাটা অসমীচীন নয়।

ডঃ সমীর কুমার ঘােষ

 

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জুলাই- আগষ্ট ২০০৯ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু ও সূর্য

0 (0) ২০০৯ ছিল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বর্ষ। সারা বিশ্বের পেশাদার ও সখের জ্যোতি- বিজ্ঞানীগণ দূরবীক্ষণে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে তৎপর হয়েছিলেন, যেমনটি চারশাে বছর পূর্বে গ্যালিলিও প্রথম দূরবীন উদ্ভাবন করে মহাকাশে সুদূর দৃষ্টি প্রেরণ করেছিলেন। বিশ্বের প্রাচীনতম বিজ্ঞান হল জ্যোতির্বিজ্ঞান। মানুষ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম পাঠ নেয় সূর্য ও চাদের কাছে। শুরু হয় সময় […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: