বাঁধানাে পুকুর একটা মৃত চৌবাচ্চা

poribes news
5
(1)

বর্তমানে খাল, বিল, পুকুরের মত ছােট-বড় জলাশয় গুলি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা খুব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলি এলাকাগুলােতে বেশি হচ্ছে। পুকুরের চারিধারের মাটি ঝুর ঝুরি করে খসে পড়ে পাড় ভেঙে দেয়। ফলে পাড় সরে গিয়ে জলাশয়ের আয়তন বাড়তে থাকে। পাড়ের রাস্তা ভেঙে চলাফেরার বাধা সৃষ্টি করে। এই যুক্তিতে পুকুরের মালিকেরা পুকুর রক্ষণাবেক্ষণের নামে সিমেন্ট দিয়ে পাড়টা বাঁধিয়ে দেন । এর ফলে পাড় আর ভাঙবে না; আর দেখতেও ভাল।
লাগবে। পুকুরের সীমানা নির্দিষ্ট হবে।

পুকুর বােজানােরও ভয় থাকবে না। সাধারণ মানুষের এতে সায় থাকে। কিন্তু তলে তলে যে সর্বনাশটি হচ্ছেতা পুকুরের মালিক আর সাধারণ লােকেও বুঝছেন। পুকুর সংরক্ষণের নামে এটা হল পরিবেশ
ধ্বংসের খেলা। পাড় বাঁধানোর সাথে সাথে যদি ক্ষতির প্রভাবটা বােঝা যেত, তাহলে জনসাধারণ তক্ষুনি রুখে দাঁড়াত। কিন্তু প্রভাবটা পড়ে ধীরলয়ে।

মালিকের স্বার্থসিদ্ধিতে তার দিক দিয়ে পাড় বাঁধানাে ব্যাপারটা খুবই ক্ষুদ্র ঘটনা কিন্তু পরিবেশের কাছে এর প্রভাব ব্যাপক। সেটা কি রকম? পুকুরের পাড় ভেঙে যাওয়ার কারণ, আজকের দিনে বেশির ভাগ জলাশয়ের চারপাশে জলে নুয়ে পড়া গাছের সারি আর দেখা যায় না। থাকলেও অনিয়মিত ভাবে দু’একটা; যেগুলাে না থাকার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে পুকুরের পাড়ে। বড় বড় গাছ মাটি শক্ত করে ধরে রাখে। পুকুরের পাড়ে গাছপালা থাকলে মাটি ধসে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে। গাছ কেটে যেমন বায়ু দূষণ ঘটাচ্ছি, তেমন পুকুর পাড়ের মাটি ধসে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়াচ্ছি।

জলাশয়ের পাড় জলেরই একটা অংশ। এই পাড়কেবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইকোটোনিক জোন’। এই পাড় ধীরে ধীরে গিয়ে জলে মেশে। পাড় ও জলের মিলন অংশটি জলাশয়ের অত্যন্ত সজীব অংশ। এইখানে জীব-বৈচিত্র্য বেশি। এখানে দেখা মিলবে ছােট ছােট গাছগাছালি। পাট শ্যাওলা, এজোলা, ছােট পান, টোপা পনা, হিংচা, নল খাগড়া, মােথা ঘাস ও অন্যান্য গুল্মলতার ভিড় এখানে।

এখানে বসবাস করে ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, গেঁড়ি, শামুক, ঝিনুক, কঁকড়া, কাদা কচ্ছপ, ফড়িং, কেঁচো, বিছা, গয়াল পােকা, খট্টাশ, বেজি ও অনেক অন্যান্য ছােট পােকা-মাকড়। ছােট পােকা-মাকড়, ফড়িং, ঘাস, লতাপাতার উপর ডিম পাড়ে। আবার এই ঘাস, লতাপাতার ভেতর ঘাপটি মেরে খাবারের জন্য বসে থাকে
মাছরাঙা, বক, সারস, ডাহুক, গাং চিল, হাঁস, বুনাে হাঁস আরাে কত পাখি।

পুকুরের বাস্তুতন্ত্র
পুকুরের বাস্তুতন্ত্র

পাড়ের গর্তে বাসা বাঁধে সাপ, গােসাপ, কচ্ছপ। কই, মাগুর, গুলে মাছ পাড় সংলগ্ন অংশে প্রজনন করে। পাড়ে বেড়ে ওঠা বড় গাছে অনেক ধরনের পাখি বাসা বাঁধে আর সেখান থেকেই খাবার পেয়ে যায়। ছােট গাছপালাতে বাসা বাঁধে মাছরাঙা, ডাহুক, পানকৌরী, সারস, বুনাে হাঁস। বড় গাছ লম্বায় বেশি হওয়ায় বেশিরভাগ সূর্যরশ্মিকেই গ্রহণ করতে পারে।

কিন্তু জলের মুখে নিম্নস্তরে যেসব লাইকেন, মস, ঘাস, বিরুশ্রেনির অন্যান্য উদ্ভিদ জন্মায় সেগুলাে অল্প আলো ও তাপেই খাদ্য তৈরি করে নিতে পারে। এতে সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় যে অক্সিজেন তৈরি
হয়, তাতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীরা বেঁচে থাকতে পারে। ঘাস ফড়িং থেকে শুরু করে কিছু কীট পতঙ্গ বেঁচে থাকে এইসব সবুজ শ্যাওলা ও ছােট লতাপাতা খেয়ে। কিছু পাখি আবার মাছ, গেড়ি, মাকড়সা, ছােট কাকড়া খেয়ে জীবনধারণ করে।

ব্যাঙ মশার লার্ভা খেয়ে আমাদের খুব উপকার করে। এতে ম্যালেরিয়া রােগের প্রবণতা কমে। খট্টাশ, বেজি, সাপ, বনবিড়াল খাদ্য হিসেবে পায় পুকুরের মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। পাড় ধােয়া জল যখন পুকুরের জলে মেশে তাতেও থাকে খাদ্য হিসাবে জলজ প্রাণীর জন্য কিছু পুষ্টিকর উপাদান।

এইসব পুষ্টিকর উপাদানের জন্য ছােট, মাঝারী ধরনের মাছের পুরো ধারে এসে ঘােরাফেরা করে। ছোট ছােট জৈব পাদার্থ সমুহের মৃত্যুত ঘটলে জলের অভ্যন্তরের মৃতজীবী ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া সেগুলোকে
বিয়ােজন ঘটিয়ে সরলিকৃত করে। এইসব রাসায়নিক অজৈব পদার্থকে ফের জলজ সবুজ গাছপালারা গ্রহণ করে। অর্থাৎ এই ইকোটোনিক জোন থেকে একটি সুন্দর বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) পাচ্ছি। পাড় থেকে
যত জলের গভীরের দিকে যাবে, ততই আলো, অক্সিজেনের মাত্র। কমতে থাকবে। ফলে গভীরের দিকে ইকোসিস্টেমের এত বৈচিত্র্য থাকে না। তাই জলাশয়ের পাড়েই ইকোসিস্টেমে উল্লিখিত প্রাণী, উদ্ভিদ ও
অজৈব উপাদান নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।

এখন পাড় বাঁধালে পাড়ের সমস্ত জীবকূল ধ্বংস হয়ে যাবে। জন্মাবে না কোনও জলজ গাছপালা। জলজ প্রাণীরা পাবে না তাদের বাঁচার রসদ খাবার আর অক্সিজেন। কংক্রিটে চাপা পড়ে যাবে ব্যাঙ, সাপ,গোসাপ,
কচ্ছপ ইত্যাদির বাসা। এরা সিমেন্টের খাড়া দেওয়াল বেড়ে উঠতে পারবে না; নিচেও নামতে পারবে না।

গাছপালা ও খাবার না পেয়ে মাছরাঙা, হাঁস, মেছাে বক, পানকৌরী, ডাহুক ইত্যাদি পাখি অসহায়ভাবে চিরতরে হারিয়ে যাবে। আশ্রয় থাকবে না শামুক, গুগলি, ঝিনুক, কেঁচো, বিছা কারােরই। পাড়ের ছােট-বড় গাছের দোলায় জলে যে মৃদুমন্দ ছােট ছােট ঢেউ ওঠে তাতে অক্সিজেন জলে ভালভাবে মিশে যেতে পারে।

পুকুর বাঁধালে, গাছপালা না থাকায় হাওয়ার সেই স্নিগ্ধ ঢেউয়ের পরিবেশ পাবাে না। সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানাে মানেই জলচর প্রাণী স্থলে আসতে পারবে না, আবার স্থলচর প্রাণীরাও জলের নাগাল পাবে না। অল্প তাপেই জল গরম হয়ে যাবে। এককথায় পুকুরটা তখন বড়সড় চৌবাচ্চা ছাড়া কিছুই নয়। ইট কংক্রিটে বাঁধানাে পাড়ে আরও অসুবিধা আছে। যেমন বর্ষাকালে রাস্তাঘাটের জল পাড় বেয়ে জলাশয়ের জলে মিশতে পারে না। এই জল রাস্তায় জমে গিয়ে থৈ থৈ করে। এর ফলে পুকুরের জল ধারন ও সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমে যায়।

পাড়ের বাইরে জল জমে গিয়ে মশার আঁতুড় ঘর হয়ে ওঠে। পুকুর পাড়ে যে শামুক, গেড়ি, গুগলি, কেঁচোর মত জল পরিশােধক প্রাণী বসবাস করে, পাড়ে এরা না থাকলে প্রাকৃতৃিক পরিশােধন বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় বাঁধানাে পাড় বরাবর বৈদ্যুতিক বাতি লাগিয়ে জায়গাটা ঝকঝকে করে তােলা হয়। এতে আরও বেশি ক্ষতি হয়। জলাভূমিতে আলাে পড়লে পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বায়ােলজিক্যাল ক্লক বিঘ্নিত হয়। তাই পাড় যেমন বাঁধানো যাবে না, জলে আলাে ফেলাও যাবে না।

জলাশয় রক্ষণাবেক্ষন করতে হলে জলাশয়ের ঢালে শক্ত কাঠের খুঁটি একটু ছাড়া ছাড়া করে টিনের পাত সহযােগে পুঁতে দিতে হবে। ইট পাথরের টুকরাে খােলাম কুচি যাতে পুকুরের জলে ঢুকে না যায়। তার জন্য তারের জালি ব্যবহার করতে হবে। বাঁশ ও তার জালির ফাঁকটুকু মাটি ফেলে পূরণ করতে হবে এতে খরচা কম।

স্বাভাবিক ঢাল বজায় রেখে খুঁটি পুঁতে পাড় বাঁধালে ইকোসিস্টেমে উল্লেখিত প্রতিটি উপাদান নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে। কংক্রিটের বাঁধে ভবিষ্যতে যে প্রকৃতিতে অঘটন ঘটবে ফলশ্রুতি
হিসেবে পুরােটা ইকোলজিক্যাল বুমেরাং (Ecological Boomerag) হয়ে যাবে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে এতে যে লােকসান হবে তাতে সমস্ত টাকাটাই পুকুরের জলে যাবে।

তুষারকান্তি গলুই

বিজ্ঞান অন্বেষক এর জুলাই- আগষ্ট 2011 থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

অশ্বত্থ

5 (1) অশ্বত্থ গাছের বৈজ্ঞানিক নাম – Focu sreligiosa সংস্কৃত নাম অশ্বত্থ,  ইংরাজী নাম Sacred fig         হিন্দী—পিপল, পিপলি।অশ্বথ গাছ সাধারণত জীর্ণ বৃক্ষকোটরে চারাগাছ জন্মগ্রহণ করবার পর প্রথমতঃ শাখা বা পত্রপল্লব বিস্তার না করে শিকড় ও তার শাখা প্রশাখা গুলিতে ক্রমশঃ নীচের দিকে প্রসারিত করতে থাকে এবং […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: