কোস্টাল পলিউশন ও ইরোশন

দূষণ, দূষণ সর্বত্র দূষণ। বিশাল সমুদ্র, সেখানেও দূষণ। দূষণ নিয়ে ভাবনাচিন্তা। কোস্টাল দূষণ সাধারণ ভাবে মানুষের নজরে কমই পড়ে। আধুনিক সভ্যতার ডানায় ভর করেই মানব সমাজ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। সমুদ্র তীর বা তটভূমি ও মােহনা দিন দিন মানব সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে ঐ সকল অঞ্চলে দূষণ এবং তার সংঘাত ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।

তটভূমিতেও মােহনার জলে জৈব পুষ্টি পদার্থ দূষণ, রাসায়নিক পদার্থ, থিতিয়ে যাওয়া বস্তু গুলি ও
সমুদ্র উপকূলবর্তী ক্রিয়া কলাপের ফলে, সমুদ্র সারা পৃথিবী ব্যাপী পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রতল উঁচু হচ্ছে।
এর উপরে প্রায় ৮০ শতাংশ দূষণ ঘটে প্রাথমিক ভাবে শিল্প, কৃষি ও শহরে অঞ্চল থেকে আসা বর্জ্য পদার্থদ্বারা। এছাড়া তটভূমি থেকে তেল, গ্যাস ও সামুদ্রিক তেল পরিবহনের মাধ্যমেও ভয়াবহ দূষণ ঘটে।

স্থল ভাগের নানান অবস্থা থেকে জটিল জৈব রাসায়নিকপদার্থ চক্র মাধ্যমে সামুদ্রিক বাস্তুরীতি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। স্থলভাগ থেকে গড়িয়ে পড়া জল পরীক্ষা করলেই তা বােঝা যায়। এই দুষণ প্রক্রিয়ায় নানা পদার্থ ঐ অঞ্চলের সমুদ্রের জলে, তলদেশে তলানিতেও পাওয়া যায়।

কৃষিঃকৃষি বিষয়ক নানা প্রকার পদার্থ নদীবাহিত হয়ে তটভূমিকে দূষণ ঘটায় ও জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্রের উপর আঘাত হানে। ঐ জৈব-ভূ- রাসায়নিক চক্রে নির্গত বস্তু, মিথেন, অ্যামােনিয়া ‘Greenhouse’ সৃষ্টিতে সাহায্য করে। কৃষি ক্ষেত্রে কীট পতঙ্গ মারার জন্য কীটনাশক নানা প্রজাতির প্রাণীদের ক্ষতিকর। এমনকী চাষ-আবাদ না হলেও। তেল জাতীয় পদার্থ ও ব্যবহারের জন্য দূষণ ঘটে। সবুজ পদার্থ ও পশুখাদ্য (Silage) ইত্যাদি সিমেন্ট, কাদা (Slurry) সার জৈব পুষ্টি পদর্থ ও তার সঙ্গে নানা প্রকার খনিজ পুষ্টি পদার্থ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, সিলিকন ও স্বল্পমাত্রিক উপাদান ও জৈব কার্বন প্রভৃতিও নদী মাধ্যমে মােহনা ও তটভূমির জলে আসে।অতিরিক্ত পরিমাণমুদ্র ক্ষুদ্র ভাসমান উদ্ভিদ (Phytoplankton)-সমুদ্রে বা তলদেশে থাকে।

মানুষের দ্বারা পরিত্যক্ত ও বিষাক্ত শৈবাল জৈব বস্তুর সমুদ্র তটে গাছকাটা অতিরিক্ত মাত্রা বাড়ায় এবং অবশেষে অক্সিজেন ঘাটতির জন্য (Anoxic Condition) মৎস্য মারা পড়ে। কিছু কিছু ক্ষতিকর শৈবাল বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করে।শিল্পকারখানার দিকেঅকালে দূষণআরও বেশি দেখা যায়।

শিল্প কারখানাঃশিল্পকারখানা থেকে বহু দূষিত পদার্থ সমুদ্রে প্রবেশ করে নদী মাধ্যমে পাশ্ববর্তী স্থল ভাগ থেকে। এই কারণে মােহনা ও তটভূমিতে বেশি দেখা যায়। ফলে ঐ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র-এর পরিবর্তন সাধিত করে।
এছাড়া জাহাজও কোন কোন তটভূমি থেকে দুষিত পদার্থ আসে বা খুবই বিষাক্ত ও খুবই ক্ষতিকর। সমুদ্রের নিকটবর্তী বালিয়াড়ি ঘেরা লবনাক্ত জলের ক্ষেত্রে কতকগুলি রাসায়নিক পদার্থঅন্য পদার্থের সঙ্গে মিশে বিক্রিয়া ঘটায়।জীব জগতের ক্ষতিসাধন করে। পরিবেশনানা ভাবে গ্যাস,তরল এমনকী
কঠিন পদার্থ পাওয়া যায় এবং উদ্বায়ী ধর্ম অনুযায়ী ছড়িয়ে পড়ে। লিপিড (এক ধরণের ফ্যাট) এর রাসায়নিক বস্তু বিভিন্ন প্রকার জীবদেহে জমা হয়। সব কিছু নির্ভর করে সমুদ্রে বায়ু, জোয়ার ভাটা, স্রোত, জীবের গমনা গমনের উপর এবং ডাঙার জল ও নদীর মাধ্যমে। আরাে কিছু কিছু কারণে রাসায়নিক
বক্রিয়া ঘটায় যেমন আলােক রাসায়নিক বিক্রিয়া,ফলে নানা প্রকার জীবতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটে।

Pollution | Coastal Care
কোস্টাল পলিউশন

জীবের দেহকোষ কলা পরীক্ষা করে দূষিত পদার্থর পরিমাপ করা যায়। কতটা দূষিত পদার্থ দেহে জমা হয়েছে তার অনুপাতও। এই দূষিত পদার্থ সমস্ত জীবসহ মানব দেহে ক্ষতিসাধন করে। তথ্য সূত্রে জানা যায় জীব যা খায় তার চাইতে তাদের দেহে অনেক বেশি দূষিত পদার্থ পাওয়া যায়। এগুলি বিপাক ও রেচনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত।

জৈব কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ প্রায় ৭০ লক্ষ (Persistant Organic Compound – POCS)|এবং এগুলির
কিছু কিছু অন্য বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বস্তু তৈরী করে সামুদ্রিক পরিবেশের মেরুদন্ড ও অমেরুদন্ড প্রাণীর বিপাক ও শারীরবৃত্তির ক্রিয়ায় ক্ষতি করে।

সাধারণত সব POCS বিষাক্তও স্থায়ী ৷ যথা Halogenated Hydrocarbons সমুদ্রে প্রভূত ক্ষতিকর। Chlorine, Iodine, Fluorine, Bromine তে Halogen আছে। এগুলি স্বল্প মেরুত্ব (Polarity) ও জলে স্বল্প দ্রবীভূত। গন্ধযুক্ত পদার্থগুলি (Aromatic Compounds) বেশি বিক্রিয়া করে এবং রাসায়নিক ও জৈব রাসায়নিক পরিবর্তন Transformation এর সম্ভাবনা দেখা দেয় এবং এগুলি কীটপতঙ্গ ধ্বংসকারী
DDT-DDE ও Polycyclic এবং Aromatic Hydrocarbons যদিও PCBs ব্যবহার নিষিদ্ধ তবুও অজানা কোন দিক থেকে এই PCBs (Poly Chlorinated Bi Phenyl )ব্যবহার হচ্ছে যেমন কগজ শিল্পে পূর্ণব্যবহার উপযােগী কাগজ তৈরীতে কাগজ মন্ডে (Pulp) যা নদীর স্রোতের অভিমুখে পড়ে সমুদ্রে আসে ও সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করে কিন্তু (PCBs) পাখির ডিমও মানুষের মেদের ক্ষতিকরে।

অ্যানথ্রোপােজেনিক রাসায়নিক পদার্থ বন্য প্রাণীদের ক্ষতি করে। জনন হরমােন প্রস্তুত প্রনালী সুরক্ষিত থাকেনা।

ধাতুঃভারী ধাতু প্রকৃতিজাত এবং কখনও ভঙ্গুর নয়, সেগুলি বিষাক্ত নয় কারণ ঘনীভূত, কিন্তু খুবই ক্ষতিকর Cation রূপে। সালফার ও ক্যাটায়ন এর মধ্যে আকর্ষণ বেশি। এগুলি সামুদ্রিক জীবদেহে জমা হয় এবং দূষণ ঘটায়।
জাপানে ১৯৫৩ সালে মিনামাতা উপসাগর ও ১৯৬৫ সালে নিগাতা দ্বীপে পারদ-দূষণ তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের (মৎস্যজীবিদের) মধ্যে মারাত্মকভাবে স্নায়ুরােগ সৃষ্টি করেছিল যার পরিণতি মৃত্যু। এই জলই সমুদ্রের জলে এসে পড়ে ও মােহনা অঞ্চল দূষিত করে তােলে।

তেজস্ক্রিয় পদার্থঃ বর্তমানে কোস্টাল ওয়াটারে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দেখা যায়। যা প্রাকৃতিক ও মানুষের মধ্যে নানা প্রকার কার্য পদ্ধতির ফলে। যেমন তেল পুড়িয়ে যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে। স্থল ভাগে কলিয়ারি,নিউকিয়ার শক্তি পুনঃউৎপাদনের জন্য নির্গমন মাধ্যমে এবং পারমানবিক বােমা বিস্ফোরণের জন্য বায়ুবাহিত তেজস্ক্রিয় কণা সমূহ ও দুর্ঘটনা হেতু, চিকিৎসার জন্য পরীক্ষা, থেরাপিখাদ্য সংরক্ষণের জন্য প্রভৃতি।

সমগ্র পৃথিবীর সমুদ্রে নিউক্লিয়ার যুদ্ধাস্ত্র ও ইলেকট্রিক শক্তির উৎপাদনের জন্য বর্জ্য পদার্থ পড়ে ১৯৪৪ সাল থেকে। নিউকিয়ার যুদ্ধাস্ত্র পরীক্ষার জন্য পরিত্যক্ত বর্জ্য পদার্থ বা জমা হওয়ায় পরিবেশ নষ্ট হয়ও ১৯৮৫সালে চেরনােবিলে নিউক্লিয়ার দূর্ঘটনা ঘটে।

কোস্টাল ভূমিক্ষয়ঃ—ভূমিও তটভূমি স্থানান্তরণ বিছিয়ে থাকা বালিয়াড়ি ক্ষয় হয় হঠাৎবড় ঢেউ, জোয়ার ভাটার স্রোত, তরঙ্গ প্রবাহ, ড্রেনেজ ও উচ্চগতি সম্পন্ন বায়ু প্রবাহ প্রভৃতি দ্বারা কোস্টাল ইরােসন হয়ে থাকে। প্রচন্ড প্রাকৃতিক দূর্যোগ, তীব্র বায়ুপ্রবাহ ও তীব্রগতি সম্পন্ন মােটরযান ভূমি ও তটভূমিক্ষয় করে। কিন্তু তলানি ও শিলা ক্ষয়ে সময় বেশি লাগে ক্ষয় করতে।

সেগুলি ক্ষয় হওয়ার পর কাছাকাছি অস্থায়ী ভাবে জমা হয়, একে Coastal Morpho dynamics চর্চা বলে। ভূমিক্ষয় হয় জল ক্রিয়া Hydrauticaction, ঘষে ছড়ে যাওয়া Abration ও উপরি ভাগে রাসায়নিক ক্ষয় Corrotion দ্বারা। কোমল অঞ্চল কঠিন অঞ্চল অপেক্ষা দ্রুত ক্ষয় হয়। যার ফলশ্রুতি বিশেষ ভূমি গঠন, টানেল, ব্রীজ, কলাম ও পিলার গঠন করে।

আরাে ক্ষয় দৃষ্ট হয় ক্রমাগত ঘষায়, আলগা বালি ও নমনীয় শিলা হওয়ায়। অসংখ্য ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র বালুকণা বায়ুপ্রবাহে অপসারিত হয়ে বালুঝড় সৃষ্টিকরে। ফলে মসৃণ ও চকচকে শিলার গঠন নষ্ট করে।
দক্ষিণবঙ্গে বঙ্গোপসাগর সমুদ্রতীরে (দীঘা, মান্দারমনি,শংকরপুর, জুনপুট প্রভৃতি) পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় ঐ সব স্থানের ঝাউ প্রভৃতি গাছ কেটে ঘর বাড়ি ইত্যাদি তৈরী হয়েছে এবং শহরও গড়ে উঠেছে। ফলে সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, যাড়াবাড়িবান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জলস্ফীতি তীর ছাপিয়ে পর্যটন কেন্দ্রের
দিকে ধাবিত হয় এবং জল সমুদ্রে ফিরবার সময় স্থলভাগ থেকে বলি ও মাটি টেনে নিয়ে যায়।

ঝাউজঙ্গল থাকলে তা বেশ প্রতিহত হত, এত ক্ষয় হতাে না। পর্যটকদের গাড়ি চলাচলের ফলে বালি আলগা হয়। সমুদ্রধারে বােল্ডার ইত্যাদি ফেলে সেই ভয়াবহ জলস্ফীতি থেকে ক্ষয়কে যথেষ্ট রােধ করার চেষ্টা হচ্ছে।
তটভূমির বালি শুকনাে হয়ে তীব্র বাতাসে যাতে উড়ে না যায় সেজন্য প্রকৃতির সুন্দর ব্যবস্থা লাল কাঁকড়া তটভূমি সংলগ্ন ডাঙাতে গর্ত করে দলে দলে বাসকরে। জোয়ারের সময় বা জল যখন নানা কারণে বাড়ে সেইসময় ঐ গর্তেজল বেশ ভেতরের দিকে চলে যায় ও বালি ভিজিয়ে দেয়।

জলকণা ও বালুকণার অসম সংযােগে Adhesive Force এর জন্য বালুকণা জমাট হয় ও উড়ে যায় না। এ পারম্পরিক উপকারের দৃষ্টান্ত।জুনপুট ও শংকরপুরে ট্রলার ও নৌকো নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরা হয়। মাছের
সঙ্গে নানাপ্রকার সামুদ্রিক প্রাণীরা পড়ে। মাছগুলিকে শুটকি হিসাবে ব্যবহার করে ও অন্যান্য প্রাণী গুলিকে তটভূমিতে ফেলে দেয়। ঐ শুটকির জন্য মাছগুলিকে তট ভূমিতে শুকোতে দেয় যা জুনপুটে দেখা যায় ও শংকরপুরে দড়ি টাঙ্গিয়ে ঝুলিয়ে দেয়। ঐ শুটকি থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে তটভূমির বায়ু বিষাক্ত করে তােলে। তার উপর তাে ফেলে দেওয়া অন্য প্রাণীর দুর্গন্ধ আছেই।

তটভূমির পাশাপাশি ফিসারীতে (চিংড়ি চাষ) মাছের ওজন দ্রুত বাড়াবার জন্য তাদের খাবারের সঙ্গে সীসার মত ধাতু মিশ্রিত করা হয়। যখন কোন কারণে চিংড়ির মড়ক হয় সে সময় জল দূষণ ঘটে ও সেই জল নদীনালার মাধ্যমে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। তাই সুপ্রিম কোর্ট সব চিংড়ি প্রকল্পের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় বেশ কয়েক বছর পূর্বে জাপানের মিনমাটাতে চিংড়ির মাথা খেয়ে ১৪,০০০ জীবন অকালে গেল। দুঃখের বিষয় তথাপি এই রাজ্যের বেশকিছুফিসারি ১৯৭৪ সালের জল আইন ভঙ্গ করে দূষণ ছড়িয়ে বিপদ ডেকে আনছে।

প্রকৃতির ক্ষয়-ক্ষতি অনিবার্য। তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।তবুও নিজেরা সচেতন হলে কিছুটা সুরাহা সম্ভব। মানুষ সেদিকেই তাকিয়ে। আমরা চাই দূষণমুক্ত পৃথিবী।

 কাননকুমার প্রামাণিক

Leave a Reply

%d bloggers like this: