দুধে বিষ!

poribes news
5
(1)

শৈশবকাল থেকে আমরা, ভারতীয়রা দুধের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। বাড়ির বাচ্চারা মায়ের দুধ ছাড়াও গরু, মােষ, ছাগলের ফোটানাে দুধ পান করে থাকে। মধ্যবয়স্ক ও বয়স্করা এইসব প্রাণীর দুধ
ছাড়াও প্যাকেটের দুধও খেয়ে থাকে। এই দুধকে আমরা সুষম খাদ্যের পর্যায়ে ফেলেছি।

কারণ, পুষ্টির জন্য আমাদের শরীরে যা কিছু খাদ্য উপাদান দরকার তা মােটামুটি দুধের মধ্যেই পেয়ে যাই। কিন্তু দুধে খাদ্যগুণের চেয়ে ‘খাদ্য দোষ’ কতটা ভয়ানকভাবে ছড়িয়ে আছে, তা আমাদের শিক্ষিত সমাজ কতটা জানে? আমরা ভারতীয়রা দুধ পান  করলেও, বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ কিন্তু দুধ পান করেন না। কারণ, আমাদের শরীরের ল্যাকটেজ উৎসেচক দুধের ল্যাকটোজকে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ ভেঙে দেওয়ার পরে তা ক্ষুদ্রন্ত্রে শােষিত হয়ে রক্তের মাধ্যমে দেহের কোষে কোষে পৌছােয়।

দুধ খেলে অনেককে কেন পেটের গণ্ডগােলে ভুগতে হয় ?

শৈশবকালে শরীরে ল্যাকটোজের পরিমাণ বেশি থাকায় মায়ের দুধ সহজে হজম হয়ে যায়। ছােট থেকে
যত বড় হই, দুধ খাওয়ার পরিমাণটা কমে যায় আর স্বাভাবিকভাবে ল্যাকটোজ বেশি করে না ভাঙায় উৎসেচকের পরিমাণটা কমে যায়। ফলে শরীরে এই ল্যাকটেজ কম-বেশি পরিমাণের ওপরেই নির্ভর করে
বিভিন্ন দেশের দুধও দুধজাত খাদ্যের হজম করার ব্যাপারটি।

প্রকৃতির বিধানে যারা বরাবরই দুধ ও দুধজাত খাবার খাওয়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত, তাদের উৎসেচকের মাত্রা বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবে দুধ খেয়ে কোনও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না। তাইতাে ইউরােপের রাশিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশের মানুষ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খেতে বেশি অভ্যস্ত। অথচ আফ্রিকা মহাদেশের লােকেরা অত দুধ পানে অভ্যস্ত নয়। অন্যদিকে এশিয়ার ইরান, ইরাক, বাংলাদেশে,
পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আমাদের দেশ এব্যাপারে প্রায় মাঝামাঝি। অর্থাৎ ল্যাকটেজ কম থাকার জন্যই দুধ হজম করতে না পেরে আমাদের অনেককে পেটের গণ্ডগােলে ভুগতে হয়।

দুধ কিভাবে বিষাক্ত হচ্ছে ?

এখন প্রত্যেকেই জানেন, দুধ বিশুদ্ধ খাদ্য আর তাতে পুষ্টিগুণ ভরপুর। কিন্তু বহুল ব্যবহৃত দুগ্ধ সরবরাহ কেন্দ্র থেকে যে দুধ আমরা পেয়ে থাকি তা আসলে মােটেই বিশুদ্ধ নয়। আমরা যে টোনড দুধ খাই, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জলের সঙ্গে গুঁড়াে দুধের মিশ্রণ। কাজেই পুরাে দুধের উপাদান এখানে আশা করা বৃথা। আবার যেসব অঞ্চলে গরমােষের দুধ যথেষ্ট পরিমাণে মেলে, সেখানেও দুধে টাটকা উপাদান আশা করা সমীচীন নয়। কারণ গবাদি পশুর খাদের মধ্যেই পড়ে ঘাস, খড়, খইল, ভুষি ইত্যাদি। আর এগুলাের মধ্যেই লেগে আছে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও ভারী ধাতুর কণা। এইসব পদার্থ সহজে গরুর শরীরে প্রবেশ করছে। তার ওপর নােংরা জল মেশানােয় স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকছেই। কারণ, জলেও আছে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ছোঁয়া। এই দূষিত পদার্থ আমাদের শরীরে (এমনকি পশু-পাখির শরীরেও) ক্রমাগত জমতে জমতে একসময় জটিল সব রােগে আক্রান্ত হতে হয়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাদ্য মারফত শুধু মাত্রর দেহে সারা দিনে ডি.ডি.টি, এবং বি.এইচ.সি.-ই যাচ্ছে ০.৫
মিলিগ্রাম। যদিও এটা কিছুটা বিপদসীমার নিচে। কিন্তু গড়পড়তা মার্কিন ও ইংরেজদের চেয়ে এটি চল্লিশ গুণ বেশি। এবং ভারতবাসীরাই এখন পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক মাত্রায় দূষিত খাবার গ্রহণ করছে। বিষাক্ত
কণাগুলি প্রথমে ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে ফ্যাটি টিস্যুতে জমতে থাকে এবং সেখান থেকে হৃদপিণ্ড, যকৃত, বৃক্ক, স্তনগ্রন্থিতে ছড়িয়ে গিয়ে ক্রমশ স্নায়ুগ্রন্থির রক্তে মিশে ভুণে যায়। পরে স্তনদুগ্ধ পানকারী শিশুদের দেহে
যায়।

এই সব পদার্থ দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে নষ্ট হয় না ফলে হৃদবৈকল্য, ডায়ারিয়া, লিভার সিরােসিস, ক্যানসার ইত্যাদি আরও জটিল সব রােগ মানুষের সঙ্গী হয়। শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতেও ব্যাঘাত ঘটে।
তাই বলা যায়, এখন শিশুরা যেদিন থেকে মায়ের দুধ পান করতে শুরু করে সেদিন থেকেই তারা কীটনাশক ওষুধের অবশেষের শিকার হয়।

গরু-মােষের দুধ আরও বাড়ানোর জন্য ‘অক্সিটোসিন’ হরমােন ইনজেক্ট করার ফলে ?

সমীক্ষা অনুযায়ী ভারত ও চীন-এর শিশুদের দেহে জার্মান, মার্কিন, ইংল্যান্ডের মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুদের চেয়ে ৮ গুণ বেশি ডি.ডি.টি-র অবশেষ পাওয়া গেছে (সূত্র – জ্ঞান ও বিজ্ঞান ১৯৯৪)। গরু-
মােষের দুধ আরও ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে ‘অক্সিটোসিন’ হরমােন ইনজেক্ট করার ফলে। শুধুমাত্র গােপালক বা দুগ্ধব্যবসায়ীরাই নয়, এখন সরকারি- বেসরকারি ডেয়ারিগুলিতে দোহনকালে অবাধে প্রয়ােগ হচ্ছে এই ক্ষতিকর হরমােনটি। দুধের পরিমাণ বাড়ানাের জন্যে এটি দিনে অন্তত দুবার গাভীর শরীরে প্রয়ােগ করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই হরমােন প্রয়ােগে দুধের পরিমাণ কখনােই বাড়ে না। এটি দুগ্ধাশয়কে উত্তেজিত করে দুধ বেরিয়ে আসাকে ত্বরান্বিত করে মাত্র।

কিন্তু প্রতিদিন এর প্রভাবে জীবটি প্রসববেদনায় আক্রান্ত হয়, জরায়ুর ক্ষতি হয় বেশি। তিন-চার বছরেই এদের গর্ভধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। আবার এর প্রভাবে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট উত্তেজনা সহ্য করতে না পারার ফলে দুগ্ধাশয়ের চারপাশে রক্তবাহী উপশিরাগুলি ফেটে যায় এবং রক্ত দুধে মিশে যাওয়ার ফলে হরমােন শরীরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।

‘অক্সিটোসিন’ মিশ্রিত দুধ খাওয়ার ফলে আমাদের ক্ষতি

অক্সিটোসিন মিশ্রিত দুধ খাওয়ার ফলে শরীরে ঢুকে হরমােনটি ভেঙে গেলেও ক্ষতিকর প্রভাব কিন্তু থেকে যায়। এর প্রভাবে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। রজস্বলা নারীর ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়, রজঃনিবৃত্তি দ্রুত হয়। মেয়েদের স্তনগ্রন্থির অকালস্ফীতি ঘটতে পারে। মুখের লােম বেড়ে যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীনতা ও বহুমুত্র রােগের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া পেটের অসুখ বাড়ে। প্রসঙ্গতঃ, ফোটানাে হলেও দুধ এই হরমােনের প্রভাবমুক্ত হয়।

ফ্যাটহীন দুধের লাভ ও ক্ষতি

ভারতের প্রায় সমস্ত ডেয়ারিতেই এখন হরমােনের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে, কম ফ্যাটযুক্ত বা ফ্যাটহীন দুধের চাহিদা আজকাল যথেষ্ট বেড়েছে। সম্প্রতি জাপান ও নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা পৃথক
গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, ফ্যাটহীন দুধে হৃদরােগের আশঙ্কা বেশি। তারা দেখেছেন, দুধের ৮০ ভাগ প্রােটিন ক্যাপটিন জাতীয়। এই প্রােটিন চার রকমের। দুধে ফ্যাটের মাত্রা যত কমবে, প্রােটিনের সংযুক্তিতে
তত তফাৎ আসবে। ফলে অন্যতম প্রােটিন ‘বিটা ক্যাপটিন’ ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অথচ এই ক্যাপটিন হৃদরােগের আশঙ্কা কমায়।

মাতৃদুগ্ধই শিশুর সেরা খাদ্য

তবুও মনে রাখবেন মাতৃদুগ্ধই শিশুর সেরা খাদ্য। দুধ গুঁড়াে দুধ বা গরু-মােষেৰ দুধের থেকে বেশি উপকারী। দাস্ত বমি ও ঠান্ডা লাগা জ্বরে শিশু মৃত্যুর হার খুব বেশি। প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ শিশু এভাবে
অকালে মারা যায়। তাই মায়েদের সচেতন হতে হবে। ইউনিসেফের রিপাের্ট অনুযায়ী, শিশু জন্মানাের পর চার মাস থেকে ছয় বছর অবধি মায়ের দুধ খাওয়ানাে হলে শিশুরা শরীরের চাহিদা মত সবরকমের পুষ্টির যােগান পায়। ফলে শিশুর হজম শক্তি বাড়ে, শরীরে প্রয়ােজনীয় রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। শ্বাস- শ্বাস ও ভাইরাসঘটিত রােগ থেকে অব্যাহতি পায়। এটি মা-শিশুর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। নিয়মিত স্তন্য দুগ্ধ পান করালে স্তন কিংবা ডিম্বাশয়ের কর্কট রােগের সম্ভাবনাও কম থাকে। গরুর দুধ বা গুঁড়াে দুধে কেসিন বেশি থাকায় অনেক শিশুর অ্যালার্জি হয়; পাতলা পায়খানা, সর্দিকাশি,বমি লেগেই থাকে। এইসব চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথা ছাড়াও স্তনের দুধের পানের ব্যাপারে কিছু মানবিক দিকও আছে। যারা পরিবার ছােট রাখতে চান স্তনের দুধ পান করালে তাঁরাও উপকৃত হতে পারবেন,ইউনিসেফের রিপাের্ট তাই বলছে। তবুও মাতৃ দুগ্ধে কীটনাশকের বা দূষণের আশঙ্কা যে থেকে যায়, তার জন্য তাে মানুষই দায়ী। শুধুমাত্র কিছু মানুষের সচেতনতার অভাবেই গােটা মনুষ্য সমাজ আজ শারীরিক,
মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাই পরিবেশ দূষণের মূল কারণটা যখন মানুষ, দূষণমুক্ত করার দায়টাও মানুষের থাকা উচিত। তাই নয় কি?

তুষারকান্তি গলুই

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষকের জুলাই আগস্ট ২০০৯ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

স্যাকারিন কতটা নিরাপদ

5 (1) বিনােদন জগতের মানুষেরা যেমনজিরাে ফিগার নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ঠিক তেমনি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা জিরাে ক্যালােরি নিয়েও অনেকটা সচেতন। আজ মানুষের গ্যাস-অ্যাসিডিটি জ্বর মাথা ব্যথার মতাে সুগারের সমস্যা এক অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সচেতন মানুষ তার খাদ্যাভাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রাহকের চাহিদা বুঝে বাজারে চলে এসেছে সুগার […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: