পেঁয়াজ সেদিন ত্যাজ্য আজ অপরিহার্য

আধুনিক যুগে বাজারের থলিতে পেঁয়াজ থাকবে না, ভাবাই যায় না। অথচ একদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কছে ‘পলান্ডু’ অর্থাৎ ‘পেঁয়াজ’ ছিল ত্যাজ্য। এখনও আমাদের দেশে যে কোনাে ধর্মীয় অনুষ্ঠনে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ।
কিছু কিছু পরিবারের রন্ধনশালাতে এখনও এর প্রবেশাধিকার নেই। মানুষের মন জয় করতে এই সজিটিকে বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পেয়াজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে যখন তারা জানতে পারল ‘ পেঁয়াজ’ শরীরের কোন অপকার তাে করেই না বরং উপকারই করে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় চিনে। এর পরেই ভারতের স্থান। অথচ এই দুটি দেশের কোনােটাই পেঁয়াজের জন্মভূমি নয়। প্রায় ৪০০০ হাজার  বছর আগে পেয়াজ চাষ হত মূলত আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান-এ। এর ব্যবহারও এই তিনটি দেশের সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। এর বাইরে সেসময় এর ব্যবহার নিয়ে কারও তেমন কোনাে আগ্রহ ছিল না।

তাই বলা যায় ঐ তিনটি দেশই হচ্ছে পেঁয়াজের জন্মস্থান। প্রাচীন ভারতীয়দের কাছে পেঁয়াজ ছিল অনিষ্টকর। তাঁরা মনে করতেন যে পেঁয়াজ খেলে মানুষের মনে ক্রোধ, হিংস্রতা, একগুয়েমি, অনিষ্টকারক চিন্তা বেড়ে যাবে।

তাই সেই সময়ে পেয়াজ ছিল ব্রাত্য। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে এসেছিলেন। তিনি এদেশে ছিলেন ৬৪৫খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।তিনি সে সময়কার বিভিন্ন রাজ্যও প্রদেশের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে যে বিবরণ লিখে রেখে গেছেন তা থেকে জানা যায় যে সেসময় ভূলবশত কেউ পেয়াজ
খেয়ে ফেললে তাকে শহরের বাইরে বের করে দেওয়া হত। আর কোনােদিনই তাকে শহরের মানুষের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হত না।

ভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্র অতি প্রাচীন। বিশ্বজোড়া এর খ্যাতি ছিল। চরক,ভগবত, শুশ্রত-এর মত চিকিৎসকগণ এদেশে জন্মেছিলেন। তাঁরা কিন্তু পেঁয়াজ সম্পর্কে ভিন্নমত পােষণ করতেন। তাঁরা পলান্ডু ওষধি গুণ খুঁজে পেয়েছিলেন।

তাদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে ঔষধ হিসাবে পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল। এরপর ভারতীয়দের মধ্যে পেয়াজের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

উৎকট গন্ধের জন্য ইউরােপের বহু দেশের খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ বহুদিন অনুপস্থিত ছিল। ১৩৫০ সালে ব্রিটেনে প্লেগ মহামারির আকার ধারণ করে। সেই সময় ইংল্যান্ডে বহু মানুষ মারা যায়। দেখা গেল যারা পেয়াজের ব্যাপারী ছিল তাদের কাউকেই প্লেগ রোগ স্পর্শ করেনি।

এই ঘটনার পর থেকেই ইংল্যাভে পেঁয়াজ খাওয়ার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এর পরেই সারা ইউরােপে
পেঁয়াজ আদরনীয় হয়ে ওঠে। পেঁয়াজের ভিতরে অনেকগুলি স্তর থাকে। এই কারণে রােমানরা এর নাম দিয়েছিল “ইউনিও’। এটা একটা ল্যাটিন শব্দ,যার অর্থ হল ‘অদ্বিতীয়’।

সেদিনের ত্যাজ্য পেঁয়াজ আজ প্রায় সকলের কাছেই অপরিহার্য। পেঁয়াজ
ছাড়া এখন রান্নার যেন স্বাদই আসে না।

 কমলবিকাশ ভট্টাচার্য্য

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর মার্চ – এপ্রিল ২০১৫ থেকে সংগৃহীত।

One thought on “পেঁয়াজ সেদিন ত্যাজ্য আজ অপরিহার্য

Leave a Reply

%d bloggers like this: