বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

poribes news
0
(0)

শক্তির দেওয়া নেওয়া ও বিকিরণ অবিরত ও অবিচ্ছিন্নভাবে হয় না, হয় ঝাকে ঝাকে (By jerks),
অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, খন্ড খন্ডভাবে (Discontinuously) sports কণাভাবে। কোন তরঙ্গের শক্তি
কখনও ন্যূনতম একটি সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে না। কথাগুলি বলতে পেরেছিলেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক
(Max Planck) এবং এই কথাগুলিই প্ল্যাঙ্কের(max planck theory ) কোয়ান্টাম তত্ত্ব(Quantum Theory)-এর মূল কথা।

বর্তমান পদার্থ বিদ্যা যে দুটি মূল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার একটি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ (Theory of Relativity), অপরটি কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)। এই কোয়ান্টাম
বলবিজ্ঞানের বিশাল ইমারতটি গড়ে উঠেছে প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক জন্মেছিলেন ১৮৫৮ সালের ২৩ এপ্রিল। জার্মানীর কিয়েল শহরে এক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারে। তার পুরাে নাম ম্যাক্স কার্ল আর্নস্ট লুডউইগ প্ল্যাঙ্ক (Max Karl Ernst Ludwing Planck) পিতা জুলিয়াস
ভিলহেলম ফন প্ল্যাঙ্ক, মাতা এমা প্যাৎজিগ। এ ছিলেন জুলিয়াসের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। জুলিয়াসের প্রথম পত্নী ছিলেন ম্যাথিলডে ভাইগৎ।

ম্যাক্সের মােট ছয় জন ভাই বােন এক সঙ্গে থাকতেন। পরিবারটি ছিল বড়, একান্নবর্তী পরিবারটিতে ছিল পান্ডিত্য, সততা ও সহৃদয়তার ঐতিহ্য। ম্যাক্স এসব গুণাবলী লাভ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার কর্মজীবনে এসবের প্রতিফলন ঘটেছে।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ছাত্রজীবন শুরু হয় কিয়েলের স্কুলে। ১৮৬৭ সালের মে মাসে ম্যাক্স ভর্তি হন বিখ্যাত ম্যাকসিমিলিয়ান জিমনাসিয়ামে। এই জিমনাসিয়ামটি ছিল ম্যাক্সের প্রিয় মাধ্যমিক স্কুল। পরীক্ষার ফল ভালােই করতেন ম্যাক্স কিন্তু অসাধারণ হতাে না। অন্ধ ও পদার্থ বিজ্ঞানে ম্যাক্স মেধাবী ছাত্র ছিলেন না।

স্কুলে তৃতীয় থেকে অষ্টম স্থানের মধ্যে থাকতাে তার অবস্থান। কিন্তু সঙ্গীতে ম্যাক্স খুব ভালাে ফল করতেন। তিনি খুব ভালাে পিয়ানাে ও অর্গান বাজাতে পারতেন। ১৮৭৪ সালের জুলাই মাসে তিনি স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করলেন। ঐ বছরের অক্টোবরে তিনি মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন।

কলেজ জীবনের শুরুতে ম্যাক্স খুব আগ্রহের সঙ্গে আঙ্কের ক্লাসগুলিতে হাজির থাকতেন। সে সময় নিউনিখের অধ্যাপক ফিলিপ ফন জোলি ম্যাক্সকে বলেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞান একটি পূর্ণবিজ্ঞান, এর আর খুব একটা অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই। অবশ্য কেবল অধ্যাপক ফিলিপ নন, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই ধারণাই ছিল যে, পদার্থ বিজ্ঞানের যুগ শেষ হয়ে গেছে। পদার্থ বিজ্ঞানে নতুন করে কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। সুতরাং পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশােনা কিংবা গবেষণা করা অর্থহীন। কিন্তু অধ্যাপক ফিলিপের কথা ম্যাক্সকে নিরুৎসাহিত করতে পারে নি।

ম্যাক্স পদার্থবিজ্ঞান নিয়েই পড়াশােনা শুরু করলেন। ১৮৭৭ সালে ম্যাক্স কিছুদিনের জন্য বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। এখানে তিনি ভিয়েরস্টাস, হেলমহােলৎজ এবং কিরকফ-এর মতাে
বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানীদের অধ্যাপক হিসাবে পান। এঁরা ম্যাক্সকে পদার্থ বিজ্ঞানে গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উৎসাহিত করেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্স মিউনিখে ফিরে আসেন। ঐ বছর জুলাই মাসে ২১ বছর বয়সে
মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাক্স ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ম্যাক্সের গবেষণাপত্রের শিরােনাম ছিল ‘On the second law of mechanical theory of heat’

১৮৮৫ সালের ২ মে প্ল্যাঙ্ক কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৮৮৭ সালে প্ল্যাঙ্ক তাপগতিবিদ্যার উপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ১৮৮৮ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর প্ল্যাঙ্ক বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন এবং একই সময়ে তিনি’ ইনস্টিটিউট তাফ থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’-এর ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। ১৯২৭ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্ল্যাঙ্ক বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে আসীন ছিলেন। বার্লিনে থাকাকালীন পদার্থ বিজ্ঞানে তার সেরা গবেষণাপত্র গুলি প্রকাশিত হয়।

Max Planck and Albert Einstein
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও আইন্সটাইন

প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব নিতে ভালােবাসতেন প্ল্যাঙ্ক। গবেষণার পাশাপাশি তিনি প্রশাসনিক কাজকর্ম সামলাতেন। ১৯১২ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল অবধি প্রায় ৩২ বছর ধরে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ‘প্রশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’। এর অঙ্ক ও প্রকৃতি বিজ্ঞান বিভাগের সচিব ছিলেন। তিনি জার্মান ফিজিকাল সােসাইটি’-এর কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। দু’বারের জন্য তিনি সােসাইটির চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীকালে এই সােসাইটির নামকরণ হয় মাঝ প্লাষ্ট সােসাইটি’। ১৯৩৭ সালে তিনি সােসাইটির প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দেন।

১৯২৬ সালে প্ল্যাঙ্ক রয়েল সােসাইটির সদস্য (FRS) নির্বাচিত হন। ১৯২৯ সালে রয়েল সােসাইটি প্ল্যাঙ্ককে কপলে পদকে ভূষিত করে। ন্যান্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথা আগেই বলেছি। প্ল্যাঙ্ক-ই প্রথম শক্তির প্যাকেট বা কোয়ান্টাম কণাধর্মী স্পন্দকের ধারণা দেন। শক্তির প্যাকেট বা কোয়ান্টাম শক্তি তার কম্পাঙ্ক ও প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের গুণফল।

প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে আইনস্টাইন আলােক তড়িৎক্রিয়ার (Photo electric effect) ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা দেন। এর মধ্য দিয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিকিরণের কণা ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মােচন করে। ১৯০৫ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পদার্থ বিজ্ঞানে নােবেল পুরস্কার পান। ১৯৩১ সালে আমেরিকার পদার্থবিদ আরডব্লুউড প্ল্যাঙ্ককে জিজ্ঞাসা করেন যে,কোয়ান্টাম তত্ত্বের মতো একটি অবিশ্বাস্য জিনিস আবিষ্কার করলেন কি করে। প্ল্যাঙ্কের উত্তর  – -It was an act of desperation For six years i had struggled with the black body theory. I knew the problem was fundamental and I knew the answer I had to find a theoretical explanation at any cost, except for the inviolability of the two laws of thermodynamics’।

প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকেই তৈরি হল কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান। আইনস্টাইন, নীলস্ বাের, ব্ৰগলি, এস,এন,বােস, স্লোয়েডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ, ডিরাক, ফের্মি প্রমুখ।বিজ্ঞানীদের হাতে বিকশিত হয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে তৈরি হয়েছে।কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের বিশাল ইমারৎ।

শেষের দিন গুলাে ভালাে যায় নি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের। সারাজীবন নিঃসঙ্গ বেদনার মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। ১৯০৯ সালে প্ল্যাঙ্ক তার প্রথম স্ত্রী মেরী মার্ক (Marie Merck) কে হারান। প্ল্যাঙ্কর প্রথম চার সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান কার্ল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান। দুই কন্যার মৃত্যু হয় প্রসুতিগারে।

১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বােমার আঘাতে প্ল্যাঙ্কের বার্লিনের বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। সব হারিয়ে প্ল্যাঙ্ক নিদারুণ দুর্দশায় পড়েন। বােমার আগুনে শেষ হয়ে যায় প্ল্যাঙ্কের গবেষণার যাবতীয় কাগজ পত্র। বিজ্ঞান জগতের কাছে এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এখানেই শেষ নয়, ১৯৪৪ সালের ২০ জুলাই হিটলারকে গুপ্ত হত্যা করার একটি চক্রান্ত ফাস হয়ে যায়। চক্রান্তের সাথে যুক্ত আছে এই সন্দেহে প্ল্যাঙ্কের পূত্র আইউইনকে হিটলারের গেস্টাপাে বাহিনী হত্যা করে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক এই পদার্থবিজ্ঞানীর শেষ জীবন এমনি দুঃখ কষ্টে কাটে।১৯৪৭ সালের ৪ অক্টোবর ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের জীবনাবসান ঘটে।

গোবিন্দ দাস

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর  সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ২০০৮ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

বিষধর পাখি

0 (0) বিষধর পাখি (POISONOUS BIRDS) বিষধর পাখি সম্পর্কে আমরা কিছু হলেও জানি। তারা কিন্তু নিজেরা বিষ তৈরি করে না, খাদ্য (Choresine beetle) থেকে তারা বিষ তৈরি করে নেয়। মানুষ, শিকারী প্রাণী ও পরজীবীর হাত থেকে বাঁচতে এই বিষ তাদের কাছে রাসায়নিক প্রতিরােধক হিসাবে কাজ করে। Pitohui গণের Pachycephalide পরিবারভুক্ত […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: