মুড়িতে ইউরিয়া বিষ

মুড়ি প্রিয় বাঙালী ঃআমরা বাঙালিরা ভাতের মত মুড়িতেও বেশ ভক্ত। জল খাবারের সময় মুড়ি একটি উপাদেয় খাবার বলেই বিবেচিত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে তাে বটেই। শহরের মানুষ পরিমাণে সামান্য কম মুড়ি খান।

মুড়ি বানানোর পদ্ধতিঃ

মুড়ি বানাতে বিশেষ ধরনের ‘সিদ্ধ চাল’ (যাকে মুড়ির চাল বলে) ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায়
এই চাল ভিজিয়ে, শুকিয়ে, গরমে ভেজে মুড়ি তৈরি হয়। ভেজানাের সময় নুন আর সামান্য খাবার সোডা ব্যবহার হয়। নুন খাবারটিকে সামান্য নােনতা বানায়।আর খাবার সােডা কিছুটা ফোলায়।এই পদ্ধতিতে তৈরি মুড়ি সাইজে কিছুটা ছােট ও লালচে হয়।

মুড়িতে ইউরিয়াঃ মুড়ি তৈরির এই সনাতন পদ্ধতি চলছিল বহুকাল ধরেই। এখন মুড়ি প্রস্তুতকারকেরা বাদ সেধেছেন এই সাবেকি ঘরানার মুড়িতে। ব্যবসায় লাভের অঙ্ক বাড়ানাের খাতিরে তারা কুদৃষ্টি ফেলছেন এই মুড়ির ওপরে। ধবধবে সাদা, বড় ও ফুলকো মুড়ি বানাতে মুড়ির চালকে এখন শুধুমাত্র নুন নয়, মেশাচ্ছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যহানিকার ইউরিয়া দ্রবণে।

MURI MAKING MACHINE IN BURDWAN - PH- 8001771047- SHANKAR ENGINEERING  CORPORATION - YouTube

মুড়ি বানানোর মেশিন

অন্যান্য খাবারেও ইউরিয়াঃ

এই ফাকে জানিয়ে রাখি, শুধু মুড়িতে নয়, বড় বড় পুকুর, ভেড়িতে, ফসলের মাঠে পেল্লাই সাইজের মাছ, বড় বড় পুষ্ট কলা, ফল পেতেও হরদম ব্যবহার চলছে এই ইউরিয়া। ইউরিয়া ব্যবহার করলে কম দিনের মধ্যে মাছ বেড়ে ওঠে। কলা, অন্যান্য ফল পুষ্ট হয় বেশি,পাকেও তাড়াতাড়ি।

খাবারে ইউরিয়ার ক্ষতি ঃ

তাহলে দেখা যাচ্ছে দিনে ২০০ গ্রাম মুড়ি খেলেই ১৪০০ মিলিগ্রাম ইউরিয়া শরীরে ঢুকছে। এমনিতেই বিপাকীয় বর্জ হিসেবে শরীরে কিছুটা ইউরিয়া তৈরি হয়। এই ইউরিয়াকে কিডনি ছাকনির মতাে ছেঁকে মূত্রের সাহায্যে বাইরে বের করে দেয়।

ইউরিয়া পুরুষের অণ্ডকোষের সেমিনিফেরাস টিবিটলকে প্রভাবিত করে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাকে ব্যাহত করে বলে বৃক্কই রক্ত থেকে এই ইউরিয়াকে প্রস্রাবের সঙ্গে শরীরের বাইরে বের করে দেয়। কিডনি জখম হলেই তা রক্ত থেকে ইউরিয়া বের করতে না পারার জন্য রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা বেড়ে গিয়ে শরীরের সর্বনাশ করে দেয়।

ইউরিয়া-সমৃদ্ধ মুড়ি পেটে গেলে অতিরিক্ত ইউরিয়া শরীরে এই বিপত্তিটাই ঘটায়। অর্থাৎ এই অতিরিক্ত ইউরিয়া শরীর থেকে বের হওয়ার সুযােগ না পেয়ে বৃক্কের।স্বাভাবিক কাজের বিঘ্ন ঘটায়। এর সাথে সাথে লিভর বা যকৃতেরও সমস্যা বাড়ায়। সুতরাং ধবধবে সাদা বড় মুড়ি খেয়ে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

শহরে মুড়ির চেয়ে গ্রামে ভাজা মুড়ির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় এখনকার দিনে গ্রামে
ভেজালের মাত্রা আরও বেশি। সুতরাং সাবধান।

মুড়িতে ভেজাল (ইউরিয়া) ধরার পদ্ধতিঃ পঃ বঙ্গ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর বেশ কয়েকবছর আগে ইউরিয়া সমৃদ্ধ মুড়ি সনাক্ত করণের একটি উপায় বের করেছেন। পাঠকদের স্বার্থে উপায়টি জানাচ্ছি – দুই মঠো মুড়ি পরিষ্কার পাত্রে নিয়ে ৫০ মিলি লিটার ফুটন্ত জলে তা মিনিট পাঁচেক ক্রমাগত নাড়তে হবে। তারপর সেই জল ছেকে অন্য পাত্রে নিয়ে দুই চামচ অড়হড় ডালের গুঁড়াে তাতে যোগ করতে হবে। ৫ মিনিট পর একটি লাল লিটমাস ঐ মিশ্রণে ডােবালে যদি নীল। রঙের হয় তবে বুঝতে হবে মুড়িতে ইউরিয়া আছে। এতকিছু ঝামেলার
মধ্যে যারা যেতে না চান, তারা ফুলকো সাদা মুড়ি পরিত্যাগ করে সাবেকি লালচে, ছােট মুড়ি কিনে খান। সব ক্রেতারা এই ধরনের মুড়ির ওপর ভরসা রাখলে দেখবেন বাজারে ধরধবে সাদা মুড়ি একদিন ভ্যানিশ।

মুড়ির পুষ্টি গুনঃ

শেষ করার আগে মুড়ি সংক্রান্ত দু-একটি তথ্য দিতে চাই। মুড়ি একধরনের সিদ্ধ চালে তৈরি হয়। সেদ্ধ চাল দুবার সেদ্ধ করা হয়। প্রথমবার ধান ১ বা ২ দিন জলে ভিজিয়ে সিদ্ধ করার পর, ফের একদিন জলে ভিজিয়ে সেদ্ধ করে রােদে শুকিয়ে ভেনে নেওয়া হয়। এটাই মুড়ির চাল হিসেবে সমধিক প্রচলিত। ধান ভানা হয় কলে অথবা ঢেঁকি ছেঁটে। কলে ছাঁটা চালের চেয়ে ঢেঁকিতে ছাঁটা চালে শস্যের বহিঃস্তরটি
কম অপসারিত হয়। ঢেঁকিতে ছাঁটা ও কলে ছাঁটা চালে যথাক্রমে কার্বোহাইড্রেট প্রায় ৭৮ শতাংশ ও ৭৯.৪ শতাংশ; স্নেহ পদার্থ ১.৭ শতাংশ ও ০.৩ শতাংশ; অজৈব লবণ (ক্যালসিয়াম, সােডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি) ১.১ শতাংশ ও ০.৪ শতাংশ; দুষ্পচ্য তন্তু ০.২ শতাংশ ও ০.৬ শতাংশ; অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনাে অ্যাসিড ও জলীয় অংশ থাকে। চালে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স প্রচুর থাকলেও চাল যখন ভাজা হয় তখন চালের জলীয় অংশের পুরােটা উবে যায়, ভিটামিনের পরিমাণ (ভিটামিন-সি’ পুরােটাই) অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়, কার্বনের পরিমাণ কিছুটা বাড়ে আর স্টার্চ ফুলে মুড়িতে পরিণত হয়।

মুড়ি ও ভাতের পুষ্টিগুনের পার্থক্যঃ

এইজন্য মুড়িতে ভিটামিন, খনিজ দ্রব্যের যে অভাব হয়, ভাতের ক্ষেত্রে ততটানয়। যেহেতু কলে ছাঁটা চালের ভুণস্তরটি চাল হতে বেশি পৃথক হয়, তাই এই চালে ভিটামিন কেঁকিতে ছাঁটা চালের তুলনায় কম থাকে (অজৈব লবণ ও ভিটামিন প্রধানত বহিঃস্তর ও ভুণে থাকে) আর মুড়ির চাল বা যেকোন সিদ্ধ চাল দুইবার সেদ্ধ করায় অনেক কমে যায়।

মুড়ি কি সুষম খাবার ঃ

ভাজার ফলে ভিটামিন ও জলীয় অংশ একদমই থাকে না। আমাদের সুষম খাদ্যের দরকার। সুষম খাদ্যের প্রয়ােজন মেটাতে দৈনন্দিন যতটা শ্বেতসার, প্রােটিন, স্নেহপদার্থ, খনিজ লবণ, ভিটামিন ও জল প্রয়ােজন হয় তা মুড়িতে একদমই পাওয়া যায় না।

তাই পূর্ণবয়স্ক, মানুষকে বাঁচতে হলে শুধুমাত্র মুড়িতে চলবে না। অনেককে বলতে শােনা যায় শুধুমাত্র মুড়ি খেয়ে দিন কাটাবাে, তাদের ক্ষেত্রে এই সাবধানতা জরুরি। তার ওপর মুড়িতে ইউরিয়া থাকলে শরীরের তাবস্থাটা কী হবে বুঝতেই পারছেন। অন্যদিকে হৃদযন্ত্রের সমস্যা, ব্লাড প্রেসারে যারা
ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে বেশি নুনের মুড়ি ক্ষতিকারক। তাদের ক্ষেত্রে বাজারের চলতি মুড়ির মধ্যে থেকে খুব কম নুনের (বা নুন ছাড়া) মুড়ি খাওয়াইতাে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ডায়রিয়া হলেও অনেকে মুড়ি
ভেজানাে জল খেয়ে তৃপ্ত হন। তাদের ধারণা এতে নুন-সােডা মেশানো। আছে তাই এই জল অল্প নাশক। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল। এই সােডা পাকস্থলির হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডকে খুব সামান্য প্রশমিত করলেও,
তা সাময়িক এবং তা পুরােপুরিভাবে পারে না। এর চেয়ে বেশি উপকারী সামান্য নুন চিনি মেশানাে জল বা ও.আর.এস। তাই যারা ভাবেন মুড়ি ভেজানাে জল অম্বল সারায়, সেই ধারণার পেছনে বিজ্ঞান নেই
ছিটেফোটাও।

—তুষারকান্তি গলুই

Leave a Reply

%d bloggers like this: