ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণ কতক্ষণ ?

0
(0)

আধুনিক বিজ্ঞান সভ্যতার একেবারে গােড়ার দিকে। খ্যাতনামা মার্কিন বিজ্ঞানী জ্যাকব পারকিন্স আবিষ্কার করেছিলেন রেফ্রিজারেটার, যা লােকমুখে আজ ‘ফ্রিজ। এর ব্যবহারিক সুবিধা হল, ঘরের উষ্ণতা যতই বেশি হােক না।

কেন, ফ্রিজের ভেতর খাবার- দাবার ও কাচা সজি অনেকটা অবিকৃত অবস্থায় রাখা যায়। এছাড়া ওষুধ, ইঞ্জেকশন, রাসায়নিক দ্রব্য ও রক্ত ফ্রিজে কিছুদিন সংরক্ষিত রাখা যায়। উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে বরফ ও বরফ-শীতলতা সৃষ্টি করা যায় বলেই এটা সম্ভব হয়।

সংরক্ষিত করা খাদ্যের ব্যবহারে নিয়মটা হল, তা ফ্রিজ থেকে বের করে, ঘরের উষ্ণতায় এনে ফুটিয়ে
নেওয়া। এখন আমাদের জানা দরকার ফ্রিজে রাখা বেশ কিছুদিনের খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা উপকারী। এই ধরনের প্রশ্ন অনেকের মুখে আমরা হামেশাই শুনতে পাই।

সাধারণত ‘হাইরিস্ক ফুড’ (যেমন,রান্না করা মাংস ও মাংসের বিভিন্ন পদ, দুধ ও দুধজাত খাবার, ডিম ও ডিম থেকে তৈরি অন্যান্য খাবার, ভাত ও চাল থেকে তৈরি হরেকরকম খাদ্য) ফ্রিজে সংরক্ষিত হলেও ফ্রিজের ভেতর সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

জীবাণুদের বাড়বৃদ্ধি উষ্ণতার ওপর নির্ভরশীল। যারা থার্মোফিলিক, তারা পরিবেশের ৪০ ডিগ্রি
থেকে ৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে চটপট বেড়ে ওঠে। মেলােফিলিক ব্যাকটেরিয়া বাড়ে ১০ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। শূন্যের উষ্ণতায় বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। এদের হিমপ্রিয় বা সাইক্রোফিলিক ব্যাকটেরিয়া বলে।

১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উষ্ণতার নিচে দুধ রাখলে প্রােটিওলাইটিক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ বেশি হয় এবং এরা দুধের প্রােটিন অংশকে ভেঙে ক্ষারীয় গন্ধযুক্ত করে তােলে। সাধারণত দু- দিনের যেকোনও হাইরিস্ক খাদ্য ফ্রিজে থাকলে তাতে লিস্টোরিয়া ব্যাকটেরিয়ার দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। এর প্রভাবে লিস্টোরিওসিস
নামক রােগ হয়।

এই রােগ গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিকর। এমনকি জন্মের সময় থেকে শিশুও আক্রান্ত হয়। অপর্যাপ্ত হিমায়িত খাবারে স্ট্রেপটোকক্কাস ফেকালিসের ক্রিয়ায় গ্যাস্ট্রো-এন্টোরিসিস নামক একধরনের রােগ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ক্লসট্রিডিয়াম পারফ্রিজেনস নামের অবাতশ্বসজীবী ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়ায় একধরনের টক্সিন নির্গত হয় এবং এর প্রভাবে বিষক্রিয়া ঘটে।

এই টক্সিনের মৃদু প্রতিক্রিয়ায় পেট ব্যথা ও পাতলা পায়খানা হয়। দূষিত মাংস, পােলট্রিজাত খাবার
থেকে এই বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এই জীবাণুর রেণু রান্নার তাপমাত্রায় মরে না কিন্তু খাদ্যদ্রব্য ফ্রিজে ঠান্ডা করলে জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটে দ্রুত।

মানুষের পাকস্থলীতে এর টক্সিনের ক্রিয়া ঘটে থাকে। এছাড়া অর্ধেক সেদ্ধ করে মাংস, ডিম কখনাে ফ্রিজে রাখা খাবারে শুধু জীবাণুই নয়, নানা প্রজাতির ছত্রাক, ইস্ট দ্বারাও সংক্রামিত হতে পারে। ডায়াট্রিক
কম্পিউটারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ফ্রিজের মধ্যে দুধ ও দুধজাত দ্রব্যে।

অ্যামিকাস ফুজিকুরি এবং রান্না করা মাছ-মাংসে পিসিয়াস নােটেটাম নামের দু’ধরনের ছত্রাক গজায়। এদের সংক্রমণে যে খাদ্যগুণ নষ্ট হয় তা-ই নয়, মানবদেহে বিষক্রিয়াও হয়। তাই ডাক্তাররা বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ফ্রিজের খাবার খেতে মানা করেন। ছত্রাক ফিউসারিয়ামজাত ‘জিয়ারলিনােন’ বিয়ে খাবার হয় বিকৃত।

এই ছত্রাক বিষে পেটে আলসার হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেটের রােগ, গা বমি-বমিভাব, জ্বর হয়ে থাকে। জল জাতীয় খাবার, রুটি, জ্যাম এসব ছত্রাক ও ঈস্টের দ্বারা বেশি ক্ষতি হয়। রান্না করা খাবার ফ্রিজে উৎসেচকের (enzyme) দ্বারাও নষ্ট হয়। এগুলাে জীব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটকের কাজ করে।

অনেকে রান্নার আগের দিন সজি কেটে ফ্রিজে ভরে রাখেন। এইসব কাটা সবজি ফেনােলেজ উৎসেচক দ্বারা নষ্ট হয়। ওইসব খাদ্যে অ্যামিনাে অ্যাসিড, টাইরােসিনকে অল্প বায়ুর সংস্পর্শে অক্সিডাইজডের মাধ্যমে বিকৃত করে। মনে রাখতে হবে, ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধির জন্যে উষ্ণতা বায়ু ও আর্দ্রতা- উল্লেখযােগ্য শর্ত। বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ উষ্ণতায় বংশবৃদ্ধি ঘটে। তাই খাদ্যটা বাড়ির যে জায়গা ঠান্ডা ও কম স্যাতস্যাতে, সেখানে রাখতে পারলে এদের বৃদ্ধি খুব কম হয়-যেটা ফ্রিজ কিছুটা দিতে পারে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এও দেখেছেন, তপ্ত গনগনে লােহা ও অন্য কোনও পদার্থের ভেতর ব্যাকটেরিয়া যেমন জন্মাতে পারে, তেমন হীম শীতল বরফের ভেতরও ক্ষতিকর অনেক ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। তাছাড়া ছত্রাক ক্রিয়ার জন্য অল্প আর্দ্রতা এবং অক্সিজেন অপরিহার্য বলে খাদ্যের উপরিস্তরে জন্মাতে পারে কিন্তু ব্যাকটেরিয়া সুযােগ সন্ধানী, তাই তারা খাদ্যের গভীরেও বংশবৃদ্ধি করে যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা
কম থাকে।

ফ্রিজের ভেতর বায়ু, আর্দ্রতা বেশ ভালই থাকে। এছাড়া খাবারে জীবাণু প্রবেশের মূল পথ হল বাতাসে বয়ে আনা ধুলাে, পােকামাকড়, নােংরা মােড়ক ও নােংরা হাতের স্পর্শ। খাদ্যে জীবাণু ঢুকে বংশবৃদ্ধি করলে খাদ্যের রাসায়নিক পরিবর্তন হয় ফলে খাদ্যের আসল স্বাদ, বর্ণ, গন্ধের বিকৃতিপ্রাপ্ত হয়ে খাবার বিষাক্ত করে তােলে।
খাদ্যকে সম্পূর্ণ জাবাণুমুক্ত করতে হলে উপরিউক্ত অবস্থাগুলিকে (আর্দ্রতা, বায়ু, উষ্ণতা ইত্যাদি) সম্পূর্ণ অপসারণ করতে হবে। যেটি ফ্রিজে পুরােপুরি সম্ভব নয়। যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষতিকর জীবাণু হিমাঙ্কে
স্তব্ধ হয়ে যায়, তাই কিছুটা হলেও ফ্রিজে খাবার কয়েক ঘণ্টা রেখে দেওয়া যেতে পারে। আর রান্না করা খাবার খাওয়ার আগে কিছুক্ষণ ফ্রিজের বাইরে রেখে তারপর গরম করা বিশেষ সতর্কতার ইঙ্গিত।

দৈনন্দিন জীবনে খাদ্য ফ্রিজে সংরক্ষিত হলেও সেটি ফ্রিজে দুই-এক দিনের বেশি রেখে দেওয়া একদম উচিত নয়। খাদ্যের পুষ্টিমূল্যেরও এতে অবনতি হয়। পুষ্টির অবনতিতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যভান্ডার কতটা পবিত্র কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে শুদ্ধ, তা বিজ্ঞান-সচেতনতা দিয়ে সর্বদা গ্রহণ করতে হবে। কারণ, বাঁচার জন্যই কিন্তু খাওয়া খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়।

 

তুষারকান্তি গলুই

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর মে – জুন ২০১০ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

আন্তর্জাতিক নদী রায়ডাক

0 (0) ভুটান ভারত ও বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক নদী রায়ডাক। নদীটির উৎস হিমালয় পর্বতমালা ভুটানের চুমালা রহি শৃঙ্গ থেকে (7314 মিটার) খরস্রোতা এই নদীটি পাহাড়ি ঢালে অত্যন্ত তীব্র বেগে ছুটে চলেছে। নদীটি উৎস মুখ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে তুলনামূলক মুক্ত উপত্যকায় পড়েছে,এবং কাছাকাছি পার্বত্য অঞ্চল থেকে একাধিক ছোট নদী […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: