জীবন্ত জীবাশ্ম টুয়াটারা

poribes news
3
(2)

পৃথিবীর আদিম যুগের বহু প্রাণী আজ অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে নানা কারণে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তাদের অনেকেরই অস্তিত্বের কথা নানাভাবে জানতে পেরেছেন। এদের জীবাশ্ম (Fossil) পাওয়া গিয়েছে পৃথিবীর নানা জায়গায়।

 জীবাশ্ম অথচ জীবন্ত এই ব্যাপারটা কিরকম?

বিস্ময়কর হলেও, ব্যাপারটি সত্য। কয়েক কোটি বছর আগে আবির্ভূত এক প্রাণী, নাম টুয়াটারা, আজও পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে। এই প্রাণিটি ছিল সরীসৃপ শ্রেণির এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘স্ফেনােড়ন পাঙটেটাস’ (Sphenodon punctatus)। এই বর্গের সমস্ত প্রাণী আজ বিরল, শুধু টুয়াটারাই আজও বেঁচে আছে এই পৃথিবীতে। এত দীর্ঘ দিনেও, এই প্রাণিটির দেহে অথবা জীবনযাত্রায় কোন পরিবর্তনই ঘটেনি। এ যেন পুরাকালের এক জীবন্ত সাক্ষী আর সেজন্যই এদের বলা হয় জীবন্ত জীবাশ্ম’।

Not a lizard nor a dinosaur, tuatara is the sole survivor of a  once-widespread reptile group
জীবন্ত জীবাশ্ম টুয়াটারা

টুয়াটারাকে প্রথম দেখা যায় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এবং তখন এদের টিকটিকি বা গিরগিটি (lizard) জাতের প্রাণী বলে ভাবা হত। পরে ১৮৬৭ সালে বিজ্ঞানীরা এই প্রাণিটিকে Rhynchocepliulla
বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেন।এদের দেখতে অনেকটা টিকটিকি জাতীয় প্রাণীর মত। টুয়ার্টার শব্দটির অর্থ হল ‘কন্টকধারা’।

প্রায় দুই ফুট লম্বা এই প্রাণিটির পিঠের মাঝখানে মাথার কাছ থেকে লেজ পর্যন্ত এক সারি কাটা দেখা যায়।
শরীরের উপরের দিকে থাকে ছােট ছোট তাঁশ আর ছোট ছোট হদ বিন্দু বিন্দু দাগ। গায়ের রং কালচে-বাদামী, লেজ চ্যাপ্টা ও মােটা। দাঁতগুলি ঠিক পেরেকের মত আর চার পায়ে থাকে ধারালো নখযুক্ত পাঁচটি করে আঙ্গুল।

আশ্চর্য যে, এদের কপালে একটি তৃতীয় নয়ন আছে, যা অবশ্য দৃষ্টিশক্তির কাজে আসে না। এরা যথেষ্ট ঠান্ডা ও অলস প্রকৃতির, অবশ্য আত্মরক্ষার সময়ে এরা যথেষ্ট হিস্ত্রে হয়ে উঠতে পারে। খুব মন্থর এদের গতিবিধি এবং প্রায় প্রতি সাত সেকেন্ড অন্তর এরা একবার শ্বাস নেয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত খাস না নিয়ে এরা বেঁচে থাকতে পারে।

টুয়াটারা খুব ঠান্ডা সহ্য করতে পারে। এদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মাত্র ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেজন্য খুব ঠান্ডার দেশে এদের বাসস্থান। কানাডা বা নিউজিল্যান্ডে এদের আদি বাসস্থান ছিল। খাদক
হিসাবে এরা মাংসাশী এবং মাকড়সা, কীটপতঙ্গ বা পাখীর ডিম এদের প্রধান খাদ্য। এরা মূলতঃ নিশাচর প্রাণী আর থাকে মাটিতে গর্ত করে।

যেখানে থাকে পাখীর বাসা, সেখানেও থাকতে এরা পছন্দ করে। যে দ্বীপে পাখী নেই, সেখানে এদের অস্তিত্বও নেই। আজও এই রহস্যের কারণ রয়ে গিয়েছে,অজানা। স্ত্রী-টুয়াটারা ডিম পাড়ে একসঙ্গে ১০-
১২টি একটি গভীর গর্তের মধ্যে, যেগুলিকে লতাপাতা দিয়ে চাপা দিয়ে রাখে।

ডিমগুলি লম্বায় প্রায় এক ইঞ্চির মত এবং প্রায় ১৫ মাস পরে, সেগুলি ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চাগুলি বড় হতে বেশ সময় নেয় এবং এদের গড় আয়ু প্রায় ১০০ বছর।

এসবই টুয়াটারার জীবনকথা। প্রাচীনকালে এদের এক বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এদেরকে তখন ‘দুর্ভাগ্যের’ এক চরম প্রতীক হিসাবে। চিহ্নিত করা হত। নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখন্ডেই এদের প্রধানত বসবাস। কিন্তু কালস্রোতে তাদের সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় অবলুপ্তির পথে ‘এসে এরা পৌঁছে গিয়েছে। তবে এদের বংশপরম্পরা এখনাে শেষ হয়ে যায়নি। এখনও সেখানে মাত্র কয়েকটি দ্বীপে এদের দেখতে পাওয়া যায়। আশ্চর্যের কথা এই যে, একমাত্র নিউজিল্যান্ড ছাড়া পৃথিবীর আর অন্য কোনও দেশে টুয়াটারার দেখা পাওয়া যায় না। আর সেখানেও মাত্র কয়েকটি দ্বীপে।

এজন্যই সেখানে টুয়াটারা এক সংরক্ষিত প্রাণি হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। আর সেই কারণেই টুয়াটারা আজ সম্পূর্ণ অবলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে আছে। আমাদের আশা যে, এই প্রায় অবলুপ্ত বিচিত্র প্রাণিটি বেঁচে থেকে পুরাকালের এক সাক্ষী হিসাবে জীবন্ত-জীবাশ্ম’ হয়েই আমাদের মধ্যে বিরাজ করবে।

ডঃ সমীর কুমার ঘোষ

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জুলাই আগষ্ট ২০১০ সঙ্ঘ্যা থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 3 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

মাতৃদুগ্ধ অমৃত সমান

3 (2) Breast feeding (স্তন্যদুগ্ধ পান) ঃ স্তন্যদান ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে একটি চিরাচরিত প্রথা তবুও স্তন্যদান সম্পর্কে কিছু বার্তা আসন্ন সন্তান সম্ভবা মহিলাকে পৌছে দেওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে প্রসবােত্তর কালে মা বাচ্চাকে সঠিক ভাবে ও সঠিক সময়ে স্তন্যদান করিতে পারে।এই উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর  ১-৭ ই আগষ্ট  স্তন্যদুগ্ধ পান সপ্তাহ পালিত হয়। • […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: