ল্যাভয়সিয়েরঃ আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক

poribes news
5
(1)

শােনা যায় বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস নাকি মৃত্যুর মুখােমুখি দাঁড়িয়ে তার হত্যাকারীদের বলেছিলেন— ‘আমাকে মেরে ফেলাে কিন্তু আমার অঙ্ককে মেরােনা”। আধুনিক রসায়ন বিদ্যার জনক ল্যাভয়সিয়ে কিন্তু একইরকমভাবে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে এতােটা উদাসীন থাকতে পারনে নি। তিনি বরং বিচারকদের কাছে কিছুটা সময় চেয়েছিলেন যাতে নিজের অসমাপ্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা গুলি তিনি শেষ করতে পারেন। বিচারক অবশ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতাে তুচ্ছ কাজের জন্য তার বেঁচে থাকার কোনাে প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেননি।
অ্যান্থনি ল্যরেন্ট দ্য ল্যাভয়সিয়ের (Antoine-Laurent de Lavoisier) জন্ম ১৭৪৩ সালের ২৬শে আগষ্ট ফ্রান্সের এক অভিজাত পরিবারে। ইউরােপে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার নিরিখে সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যেই স্যার আইজাক নিউটনের জন্মের শতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে।

অর্থাৎ মহাকর্ষ সূত্র, ক্যালকুলাস প্রভৃতি সহযােগে পদার্থ বিজ্ঞানে ইতিমধ্যেই সনাতন বলবিদ্যার স্বচ্ছ ধারণা ইউরােপের বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সময়ে প্যারিসের মাজারিন কলেজে অধ্যয়নরত ল্যাভয়সিয়ে যে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হবেন সেটাই স্বাভাবিক। অংক, দর্শণ, উদ্ভিদবিদ্যা, মহাকাশবিদ্যা
প্রভৃতি বিষয়ে পড়াশুনা করে স্নাতক হওয়ার পাশাপাশি তিনি আইনের ডিগ্রী লাভ করেন, যদিও ওকালতি তিনি কোনাে দিনই করেননি। ফ্রান্স সহ সমগ্র ইউরােপে তখন আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার যেন জোয়ার চলছে।

সেই সময় তার হাতে এলাে পিয়ের ম্যাকুইরির রসায়ন অভিধান। ইতিমধ্যেই অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত ফরাসী রসায়নবিদ ইটিনি কনডিল্যাক এর একাধিক বক্তৃতা দ্বারা  প্রভাবিত হয়ে রসায়নচর্চা করে জীবন কাটাবেন বলে একরকম ঠিক করে ফেলেছেন তরুন ল্যাভয়সিয়ে।

১৭৬৪ সালে ফরাসী বিজ্ঞান পর্ষদে জিপসাম (সােদক ক্যালসিয়াম সালফেট) এর ভৌত ধর্ম সম্পর্কিত গবেষণা প্রবন্ধ পাঠের মধ্য দিয়ে রসায়ন গবেষণায় তার যাত্রা শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই সহযােগী হিসেবে পেলেন স্ত্রী মারিকে। ইংরাজী না জানা ল্যাভয়সিয়ের দোভাষী হিসেবে এবং বিভিন্ন সমসাময়িক বিজ্ঞান প্রবন্ধের ফরাসী অনুবাদ করে তিনি স্বামীকে সাহায্য করতেন।

বিজ্ঞান গবেষক হিসেবে ল্যাভয়সিয়ের বুৎপত্তি দেখলে সত্যিই অবাক হয়ে যেতে হয়। কোনাে বস্তুর দহনের জন্য বায়ুর একটি বিশেষ উপাদানের প্রয়ােজনীয়তার কথা তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন। এমনকি জীবদেহে শ্বসন পক্রিয়াও সে এক প্রকার দহন তাও অত্যন্ত সরল পরীক্ষা দ্বারা ল্যাভয়সিয়ের সিদ্ধান্তে এসেছিলেন।

Antoine Laurent Lavoisier At experimenting to determine the composition of  water | sherlycnd
ল্যাভয়সিয়ের ঃ আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক

হেনরি ক্যাভেন্ডিস আবিস্কৃত দাহ্য বায়ু (যা প্রকৃত পক্ষে হাইড্রোজেন) ল্যাভয়সিয়ের পরীক্ষায় ব্যবহৃত দহন বায়ু (যা পরবর্তীতে অক্সিজেন নামে পরিচিত হয়; হাইড্রোজেনের মতাে এই নামটিও ল্যাভয়সিয়েরই দেওয়া) এর সাথে যুক্ত হয়ে যে জল উৎপন্ন করে সমসাময়িক গণিতবিদ ল্যাপলাস এর সহযােগিতায় ল্যাভয়সিয়ে তা প্রমাণ করেন।

তার এই পরীক্ষা থেকে প্রায় ২০০০ বছরের পুরােনাে ধারণা যে ‘জল একটি মৌল’ সেটা বিজ্ঞানী মহল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। দহন সম্পর্কিত একাধিক মূল্যবান গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ফ্রান্সের একাডেমি অফ সায়েন্স এর সুপারিশে গান পাউডার কমিশন এর কমিশনার নিযুক্ত হন। দক্ষ সংগঠক ও
গবেষক ল্যাভয়সিয়ের উপস্থিতিতে সেই সময় এই কমিশন অত্যন্ত সফল ভাবে কাজ করে এবং সরকারের আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা নেয়।

রসায়ন বিজ্ঞানে যেকোন বিক্রিয়ায় নির্দিষ্ট পরিমান বিক্রিয়কের দ্বারা নির্দিষ্ট পরিমান বিক্রিয়াজাত পদার্থ উৎপন্ন হওয়ার বিষয়টিও ল্যাভয়সিয়ে সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ফ্রান্সের স্কুলগুলিতে ল্যাভয়সিয়ের সূত্র হিসেবে যা পড়ানাে হয় তার ইংরাজী তর্জমা করলে দাঁড়ায়।
‘Nothing is lost, nothing is created, everything is transformed’ ১৭৮৭ সালে সমসাময়িক কয়েকজন বিজ্ঞানীর সাথে তিনি ফরাসী একাডেমি অফ সায়েন্স এ রাসায়নিক নামকরণের প্রথা প্রবর্তন করেন।

বিভিন্ন মৌল, অ্যাসিড ও অক্সাইড সহ মূলত অজৈব পদার্থের নামকরণের ব্যাপারে তারা সচেষ্ট হয়েছিলেন। এমনকি যােজ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন যৌগের নামের শেষে ‘আস’ অথবা ‘ই’ শব্দের যে বর্তমান ব্যবহার তাও সেই বিজ্ঞানী দলের প্রস্তাবনা থেকেই গৃহীত।

একাধিক দিক নিদের্শক গবেষণা সহ ল্যাভয়সিয়ে যখন ব্যস্ততম জীবন কাটাচ্ছেন ঠিক সেই সময় অর্থাৎ ১৭৮৯ সাল থেকে ফরাসী বিপ্লবের সূচনা। যেকোন বিপ্লবেরই উহৎসামাজিক উদ্দেশ্য থাকলেও তার জন্য সমাজকে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক বেশী মূল্য দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই মূল্যের একটি রূপ অসংখ্য প্রাণ, সামাজিক সম্পত্তি ও ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস।

১৭৯১ সালে বিপ্লবীরা ফ্রান্সের একাধিক সরকারী সংস্থার কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়। ঠিক তার পরের বছর ল্যাভয়সিয়েকে বাধ্য করা হয় গানপাউডার কমিশন থেকে ইস্তফা দিতে। ১৭৯৩ সালের ৮ইঅক্টোবর ফরাসী একাডেমি অফ সায়েন্স সহ প্রায় সমস্ত শিক্ষিত সমাজের কাজকর্ম নিষিদ্ধ ঘােষণা করা
হয়। যদিও বিপ্লব সম্পর্কে ল্যাভয়সিয়ের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গীর সঠিক ধারণা জানা যায় না, তবে সেই সময়কার অধিকাংশ বিদগ্ধ ফরাসী পন্ডিতের মতাে  তিনিও বিশ্বাসতেন যে কোনাে ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়ােজন আভ্যন্তরীন পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিকীকরণ। জীবদ্দশায় তার শেষ বড় কাজ ছিল
জাতীয় অধিবেশনের মাধ্যমে ফরাসী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকিকরণের প্রচেষ্টা। এটা মনে করা যেতেই পারে যে সমসাময়িক রাজনৈতিক হিংসা এবং ভয়াবহতাই হয়ত রাজনৈতিক সংস্রব থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে বাধ্য করেছিল।

তা সত্ত্বেও ১৭৯৩ এর ২৪শে নভেম্বর আরাে অনেক সরকারী আধিকারিকের মতাে তিনিও গ্রেপ্তার হন। ফরাসী রাজনৈতিক এবংআইনজীবী ম্যাক্সিমিলিয়ন দ্য রােবেসফিয়ার পরের বছর অর্থাৎ ১৭৯৪ সালের প্রথম দিকে এক জাতীয় অধিবেশনে ল্যাভয়সিয়েকেবিশ্বাসঘাতক এবং দেশদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করেন।

ঘটনাক্রমে গণিতবিদ ল্যাগবেঞ্জ সহ আরো কয়েকজন জন্মগত ভাবে বিদেশী বিজ্ঞানীকে সাহায্য এবং বিভিন্ন সুযােগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযােগও ল্যাভয়সিয়ের বিরুদ্ধে করা হয়। অন্যান্য কর সংগ্রাহক
অধিকারিকদের সাথে ল্যাভয়সিয়েকেও ১৭৯৪ সালের ৮ই মে বিচারের জন্য হাজির করা হয়। শােনা যায় বিচার চলার সময় তিনি একবার তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম শেষ করার জন্য কিছুটা সময় চাইতে গেলে বিচারক তার কথার মাঝেই তাকে থামিয়ে দিয়ে যা বলেন তার মর্মার্থ এই যে ‘প্রজাতন্ত্রের কোনাে বিজ্ঞানী রসায়নবিদের প্রয়ােজন নেই; আর এই বিচার পদ্ধতি কোনাে ভাবেই দীর্ঘায়িত করাযাবে না। বিচারে তাকে ফরাসী কোষাগার তছরূপ, শহরে সরবাহিত পানীয় জলকে ইচ্ছাকৃত ভাবে তামাকজাত দ্রব্য দিয়ে দূষিত করা, বিদেশী শত্রুদের অর্থ সাহায্য করে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে দূর্বল করে দেওয়া সহ আরাে অনেক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচারের দিনই আরাে ২৭ জন সহকর্মীর সাথে ল্যাভয়সিয়েকেও গিলেটিনে হত্যা করা হয়।

তার এই বিচর সম্পর্কে বন্ধু গণিতবিদ ল্যাগঞ্জে পরবর্তীতে মন্তব্য করেছিলেন। ‘আসলে এই মস্তক ছেদনের জন্য বিচারকদের কেবল একটি অজুহাতের দরকার ছিল, এবং পরবর্তী একশ বছরও হয়ত এইরকম একটি মস্তিষ্ক তৈরী করার জন্য যথেষ্ট হবে না।
মৃত্যুর এক বছর পর ফরাসী সরকার ল্যাভয়সিয়েকে সবরকম অভিযােগ থেকে মুক্ত ঘােষণা করে এবং তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তার বিধবা স্ত্রী মারিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় উল্লেখ করা হয়— ‘To the widow of Lavoisier, who was falsely convicted’

মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর ফরাসী সরকার প্যারিস শহরে ল্যাভয়সিয়ের মূর্তি স্থাপন করে। যদিও পরবর্তীতে জানা যায় মূর্তির মুখবয়ব ল্যাভয়সিয়ের পরিবর্তে বরংকনডােরসেট এর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত, যিনি ল্যাভয়সিয়ের জীবনের শেষ বছর গুলিতে ফরাসী বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সম্পাদক ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই মূর্তিটি গলিয়ে ফেলা হলেও আজ অবধি সেখানে পুনরয় স্থাপিত হয়নি। তবে প্যারিসে একটি প্রধান হাইস্কুল এবং একটি রাস্তার নাম ল্যাভয়সিয়ের নামে করা হয়। তাছাড়া পরবর্তীকালে লুভর মিউজিয়ামের কাছে হােটেল দ্য ভিলেতে তার মূর্তি স্থাপিত হয়। আইকেল টাওয়ার যে বিখ্যাত        ৭২ জন ফরাসী স্থপতি, বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদের নাম খােদিত আছে সেখানে ল্যাভয়সিয়ের নামও দেখা যায়।

রসায়ন গবেষণায় তিনি নতুন যৌগ, মৌল বা কোনাে বিখ্যাত যন্ত্র আবিষ্কার করলেও রসায়ন গবেষণায় পরিমানগত এবং গুনগত পরিমাপের গুরুত্ব উপলব্ধির মাধ্যমে আধুনিক রসায়নকে প্রায় সমউচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। যেখানে অষ্টাগশ শতকে পদার্থবিদ্যা ও গণিত গবেষণা পোঁছেছিল। ১৯৯৯
সালে ল্যাভয়সিয়ের কাজকে আমেরিকান কেমিক্যাল সােসাইটি (American Chemical Society), ফরাসী কেমিক্যাল সােসাইটি এবং ফরাসী বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি ‘International Historic Chemical Land Mark’ বলে স্বীকৃতি দেয়। তবে ইউরােপ, আমেরিকা এমনকি খােদালেও ল্যাভয়সিয়ের নামে আজ পর্যন্ত কোনাে জার্নালের নামকরণ হয়নি।

এমনকি একওয়ার্ড গ্রিমক্স ছাড়া কোনাে বিজ্ঞান ঐতিহাসিকও তার সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেনি। দেশের রাজনৈতিক সংকট এবং হিংসায় বলি প্রদত্ত আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক ল্যাভয়সিয়ে প্রকৃত অর্থেই মানব সভ্যতার বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া একটি নাম।

লেখকঃ ড. অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

লেখাটি বিজ্ঞান অন্বেষক ,জানুয়ারী- ফেব্রুয়ারী ২০১৪ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

ডাব-নারিকেল সমাচার

5 (1) জল-সংকট। শুদ্ধ পানীয় জল আশাই করা যায়না। কী আকাশের, কী ভূগর্ভস্থ জল সবই। সবই কম বেশি দূষিত। তাই তাে রাস্তার ধারে, দোকানে দোকানে, ভ্যান রিক্সায় ডাব। মানুষজনও তাই পান করছেন। অনেকে হয়ত বিশুদ্ধ জল বলে পান, করেন আবার কেউ শরীর, মানে পেট ঠান্ডা রাখার জন্য পান করেন।সাধারণরা তলিয়ে […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: