জাতীয় অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু

অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু

       (1  January 1894 – 4 February 1974)
এ এমন এক মানুষের কথা যার পরামর্শক্রমে প্রখ্যাত ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিপুলায়তন গ্রন্থ ‘The Origin and Development of Bengali Language’ ছাপানাের পূর্বে প্রয়ােজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন করেন। এ এমন এক মানুষের কথা, অধ্যাপক ধূর্জটি প্রসাদ মুখােপাধ্যায় ভারতীয় সঙ্গীত বিষয়ে গ্রন্থটি লেখার সময়ে যার সদুপদেশ মেনে চলার চেষ্টা করেন। এ এমন এক উদাসীন বাঙালীর কথা যাঁর নামে চিহ্নিত হয়েছে বিশ্বের তাবৎ মৌলিক কণার বৃহদাংশ, যার মূল কাজের উপর নির্ভর করে নােবেল পুরস্কার লাভ করেছেন একাধিক বিজ্ঞানী অথচ তাঁর নিজেরই প্রথাগত পিএইচ ডি করে ওঠা হয়নি। সামান্য এফ আর এস হতে লেগেগেছে জীবনের চৌষট্টিটা বছর।

বাঙালির গর্ব বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু - মতামত - দৈনিকশিক্ষা
PADMA VIBHUSHAN
Satyendra Nath Bose
India’s Great Physicist

১৯২৫-২৬ সাল নাগাদ খ্যাতির মধ্য গগনে থাকা বিশ্বকবি পৌঁছেছেন জার্মানী। সাক্ষাৎ নির্দিষ্ট হয়েছে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে। দেখা হতে প্রাথমিক কুশল বিনময়ের পরে বিজ্ঞানী কবির কাছে জানতে চেয়েছেন বােস এর খবরাখবর। রবীন্দ্রনাথ হতবাক কে এই ‘বােস’। এক শহরে বাস করেও তিনি যাঁকে চেনেন না, আর দূর দেশের বিশ্ববন্দিত মহান বিজ্ঞানী তাঁর সংবাদ পেতে ইচ্ছে করেন।

হ্যাঁ, আমরা আলােচনা করছি শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ বােস এর কথা; সংক্ষেপে অধ্যাপক এস এন বােস। বহুগুনের অধিকারী এই মানুষটির জন্ম হয়েছিল উত্তর কোলকাতার গােয়াবাগানে, ১৮৯৪ সালের ১লা জানুয়ারী। পিতা সুরেন্দ্রনাথ বসু এবং মাতা আমােদিনী দেবী। বাবা ছিলেন গ্রেট ইষ্টার্ন রেলের হিসাবরক্ষক। পাঁচ বছর বয়সে সত্যেনকে ভর্তি করা হয় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি ধন্য নর্মাল স্কুলে। এরপর বাড়ির কাছে নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে পড়াশােনা চলতে থাকে। একেবারে ছােটবেলা থেকে সত্যেন্দ্রনাথের অসাধারনত্ব প্রকাশ পেতে শুরু করে। শিশু সত্যেনকে তার বাবা চক দিয়ে ঘরের মেঝেয় কিছুঅঙ্কের প্রশ্নদিয়ে যেতেন। আর সমস্ত মেঝে জুড়ে তার সমাধান করে চলত সে।

বালক সত্যেনের স্মৃতিশক্তি ছিল অতুলনীয়।পাঠ্য বইয়ের যে পাতাগুলি তার পড়া হয়ে যেত,অপ্রয়ােজনীয় জ্ঞানে সেগুলি ছিড়ে ফেলে দিত সে। পরবর্তী কালে মা বাবার প্রশ্নের উত্তরে সে জানাত যে ঐ পাতাগুলি তার পড়া হয়ে গেছে এবং বাস্তবিকই সেই পড়া সে মনে করতে পারত অবিকল।

সাত সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র সত্যেন্দ্রনাথের প্রতি তার বাবার ছিল বিশেষ নজর। ভাল পড়াশুনার জন্যে তাকে ভর্তি করা হল হিন্দু স্কুলে। বিশিষ্ট শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পড়াশুনাে চলতে লাগল। টেনিসনের ‘ইন মেমােরিয়াম’ কিংবা কালিদাসের মেঘদূত’ ছিল তাঁর কণ্ঠস্থ। হিন্দু স্কুলে এন্ট্রান্স এর টেস্ট পরীক্ষা। শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সির কাছে অঙ্কে ১০০র মধ্যে ১১০ পেল সত্যেন। অন্যান্য শিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তরে উপেন্দ্রনাথ বাবু বলেছিলেন যে, মােট ১১টি প্রশ্নের মধ্যে ১০টির উত্তর করতে হত, সত্যেন শুধু যে ১১টি প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিয়েছে তাই নয়, জ্যামিতির একস্ট্রা গুলির সমাধান বিভিন্ন ভাবে করে দেখিয়েছে। কিন্তু এন্ট্রান্স দেওয়া হল না সত্যেনের।

পরীক্ষার ঠিক দুদিন আগে চিকেন পক্স হওয়াতে সে পরীক্ষায় বসতে পারল না। ১৯০৯ সালে অর্থাৎ
পরের বছর পঞ্চম স্থান লাভ করে এন্ট্রান্স পাস করল সে। ভর্তি হল প্রেসিডেন্সি কলেজে। এরপরে আর কোন পরীক্ষাতেই সে প্রথম ব্যতীত অন্য কোন স্থান লাভ করেনি। ১৯১৩ সালে গণিত অনার্স বিষয়ে বি এস সি পরীক্ষার ফল বেরুল। প্রথম সত্যেন্দ্রনাথ, দ্বিতীয় মেঘনাদ। ১৯১৫ সালে এম এস সি পরীক্ষা সম্পূর্ণ হল। মিশ্র গণিত বিভাগে প্রথম সত্যেন্দ্রনাথ এবং ফলিত বিভাগে প্রথম মেঘনাদ।

সেই সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ যেন এক চাঁদের হাট। শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশ চন্দ্র বােস, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, ডি এন মল্লিক, শ্যামাদাস মুখার্জী, সি ই কালিস, মনমােহন ঘােষ, মি পার্শিভাল, পি সি ঘােষ প্রমুখ দিকপাল ব্যক্তিরা।

আর ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞান চন্দ্র ঘােষ, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখার্জী, নিখিলরঞ্জন সেন, পুলিন বিহারী সরকার, মানিকলাল দে, শৈলেন্দ্রনাথ ঘােষ এবং উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সত্যেন্দ্রনাথ বােস। পি সি মহালা নবিশ, নীলরতন ধর ও এস কে মিত্র এই দলের থেকে কয়েক বছরের বড়। আর সুভাষ বােস সামান্য ছােট। এই মানুষগুলির উপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনে ভারত বর্যের গতি প্রকৃতি।

বঙ্গভঙ্গ,বয়কট,স্বদেশী একের পর এক ইংরাজ বিরােধী আন্দোলন আছড়ে পড়ছে চারপাশে। এর ছোঁয়া লাগছে সত্যেন ও তার সহপাঠীদের জীবনে। রাতের স্কুলে কাস নিতে যাচ্ছে সত্যেন। সহপাঠীদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করছে সে। দূর্বল চোখের জন্য খেলাধুলার প্রতি মনােযােগ দেখাতে পারেনি কোন দিন। তবু চশমা চোখে এই বিস্ময় যুবকের বন্ধু বাৎসল্য তাকে করে তুলেছে নয়নের মনি।

ইতিমধ্যে ১৯১৪ সালে ডা. যােগিন্দ্রনাথ ঘােষের একমাত্র কন্যা ঊষাবতীর সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে সত্যেনের। বাবা-মা এর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে দুটি শর্ত দিয়েছিল সত্যেন। প্রথমত বিবাহে কোনরূপ পন নেওয়া যাবে না এবং দ্বিতীয়ত তার নৈতিক চরিত্রের যেমন পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি টের পাওয়া যায় তার বন্ধু বান্ধব পরিচিতি।

১৯১৪ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায় তৈরি করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স। সেখানে পদার্থ বিদ্যা পড়ানাের ডাক পেলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা। কিন্তু সেখানে আধুনিক বই, ম্যাগাজিন কিংবা ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতির বড় অভাব। সেই সময়ে শিবপুরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক ড. ব্রুলের কাছে হদিস পাওয়া গেল সাম্প্রতিক বই পত্রের। কিন্তু তার ভাষা জার্মান।

স্বল্প সময়ে জার্মান ভাষা আয়ত্ত করে ফেললেন সত্যেন্দ্রনাথ। তিনি ও মেঘনাদ মিলে স্থির করলেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ইংরেজি অনুবাদ করবেন। আইনস্টাইনের অনুমতি সাপেক্ষে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ পেল সেই অনুবাদ গ্রন্থ।

১৯১৮ সালে লন্ডনের ‘Philosophical Magazine’ থেকে মেঘনাদের সাথে যৌথভাবে প্রকাশ পেল সত্যেন্দ্রনাথের প্রথম গবেষণাপত্র ‘The Influence of the Finite Volume of Molecules on the Equation of State’,১৯১৯– ১৯২০ সালে ;Bulletin of the Calcutta Mathematical Society’ থেকে প্রকাশ পেল অঙ্কের জটিল সমস্যাঘটিত দুটি গবেষণাপত্র।

১৯২০ সালে লন্ডনের Philosophical Magazine থেকে প্রকাশ পেল “The deduction of Rydberg’s Law from the Quantum Theory of Spectral Emission” শীর্ষক গবেষণাপত্র। এই গবেষণাপত্রগুলি সত্যেন্দ্রনাথের অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ও দক্ষতাকে প্রমাণ করল। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যা বিভাগের পুরানাে পাঠ্যসূচীর পরিমার্জন করে সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ আধুনিক পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয় তার অন্তর্ভুক্ত করলেন।

১৯১৯ সালে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি নিয়ে মেঘনাদ ইউরােপ যাত্রা করলেন। এদিকে আশুতােষের সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের সম্পর্ক কিছুটা শীতল। আশুতােষ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালিত অধ্যাপক রূপেতুলে এনেছেন পদার্থবিদ্যার আর এক নক্ষত্র সি ভি রমনকে। এমন সময়ে ১৯২১ সালে কাজ শুরু করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তার উপাচার্য ড. ফিলিপ হার্টগ পদার্থবিদ্যা বিভাগের দায়িত্ব নিতে ডাক পাঠালেন সত্যেন্দ্রনাথকে। খবর পেয়ে আশুতােষ সত্যেন্দ্রনাথকে অধিক বেতনের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু ঢাকায় পাকা কথা দিয়ে ফেলেছেন সত্যেন্দ্রনাথ, তিনি যােগ দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই প্রসঙ্গে ড: ডি এম বােসকে অনুসরণ করে বলা যায় ১৯২০ সাল নাগাদ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে একদিকে একাধিক উপযুক্ত শিক্ষকদের সমাহার এবং অপর দিকে তাদের উপযুক্ত গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির অভাবে উত্তাপ কিছুটা বৃদ্ধি পেল। তার ফলশ্রুতি হল একাধিক শিক্ষকের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিব্রাজন। আর সেই কাজ শুরু হল সত্যেন্দ্রনাথের ঢাকা গমনের মধ্য দিয়ে।

গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নব উদ্যমে কর্ম সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়লেন সত্যেন্দ্রনাথ। এমন সময়ে বিলাত ফেরত ড: ডি এম বােস তাঁর হাতে তুলে দিলেন Max Planck এর লেখা ‘Thermo dynamic and Warme strahlung” এই বইতে প্ল্যাঙ্ক তাঁর কোয়ান্টাম তত্ত্বে বলেছেন যে কোন কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ জলের স্রোতের মত একটানা হয় না, এক্ষেত্রে ঝলকে ঝলকে শক্তির এক একটা প্যাকেট বেরিয়ে আসে।

এই প্যাকেট গুলির নাম দেওয়া হয় ফোটন। প্ল্যাঙ্ক এই বিকিরনকে একটি সূত্রের আকারে প্রকাশ করেন। তীক্ষ্মধী সত্যেন্দ্রনাথ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি ফোটনকে ভরযুক্ত কনা রূপে ধারনা করে নতুন ব্যাখ্যা ও পদ্ধতির মাধ্যমে প্ল্যাঙ্ক এর সমীকরণে পৌঁছান। তাঁর এই গবেষণাপত্রটি তিনি লন্ডনের ফিলােজফিক্যাল ম্যাগাজিন ও অন্যান্য কিছু পত্রপত্রিকায় পাঠালে তারা প্ল্যাঙ্ক এর ভ্রম সংশােধন রূপেএই তরুন গবেষককে মেনে নিতে না পেরে ছাপাতে অস্বীকার করল।

৪ঠা জুন ১৯২৪, দিশেহারা সত্যেন্দ্রনাথ চিঠি লিখলেন মহান বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে। অনুরােধ
করলেন যে গবেষণাপত্রটি উপযুক্ত মনে হলে তিনি যেন সেটি ছাপানাের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি লিখলেন যে আপনার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এই অনুরােধ করতে আমি কোনরূপ দ্বিধা বােধ করছি না কারণ আপনার লেখা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে আপনি যে শিখা আমাদের দিয়েছেন তার জোরে আমরা সবাই আপনার ছাত্র।

জহুরী চিনতে পারলেন এই মূল্যবান রত্নটিকে সত্যেন্দ্রনাথের গবেষণাপত্র “Planck’ Law and Light Quantum Hypothesis’ প্রকাশ পেল জার্মান বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘Zetischrist fur Physik’ এ। জহুরি চিনতে পারলেন এই মূল্যবান রত্নটিকে, সত্যেন্দ্রনাথের গবেষনাপত্র জার্মান বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশ পেল।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এক্ষেত্রে তিনি শুধুমাত্র একটি নতুন সমীকরণ আবিষ্কার করেননি বরং পদার্থ বিদ্যায় যােগ করলেন একটি নতুন ধারণা, একক পরমাণু সম্পন্ন গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব। পৃথিবীর অর্ধেক মৌলিক কণা ‘বােসন নামে পরিচিত হল। যার শেষ তম কনাটির অস্তিত্ব প্রমাণিত হল ২০১২ সালে সার্ন গবেষণাগারে। যার নাম ‘ঈশ্বরকণা’।

সেই মুহুর্তে অন্যেরা বুঝতে না পারলেও আইনস্টাইন বুঝেছিলেন এই তরুন গবেষকের ভাবনার গুরুত্ব। তিনি অবিলম্বে এই ধারনাকে প্রয়ােগ করলেন আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে এবং যে নতুন সম্পর্ক তিনি পেলেন তাই পরিচিত হল ‘বােস- আইনস্টাইন’ সংখ্যায়ন নামে।

১৯২৬ সালে দেশে ফিরে এলেন সত্যেন্দ্রনাথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটানা ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্ৰতী থাকলেন নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানের পথে দীক্ষিত করার কাজে। ১৯৪৫ সালেই কোলকাতায় ফিরে যােগ দিলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্সে।

আইনস্টাইনের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হল একক ক্ষেত্র তত্ত্ব। তিনি মহাকর্ষীয়,তড়িৎ চুম্বকীয় ও মৌলকণা সমুহের ক্ষেত্রেও ঐ তত্ত্ব প্রসারিত করেন। এর প্রথম ধাপে রয়েছে ৬৪টি সমীকরণ, যেগুলির সমাধান সেই সময়ে করা যাচ্ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ ১৯৫২ সালে সেই জটিল সমীকরণগুলিকে দুটি ভাগে যথাক্রমে ৪০টিও ২৪টি করে ভাগ করে সহজেই সমাধান করেদিলেন। বিশ্ব বিস্মিত হল সত্যেন্দ্রনাথের কর্মকুশলতায়। এছাড়াও পদার্থের চৌম্বকত্ব, বেতারতরঙ্গের বিস্তার, কেলাসের গঠন প্রণালী, স্ক্যানিং স্পেকট্রাফোটোমিটার আবিষ্কার প্রভৃতি ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তাঁর তৈরী একটি রাসায়নিক আজও চোখের ওষুধ রূপে ব্যবহার হয়।

১৯৫১ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের শাখা ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে পুনরায় গেলেন ইউরােপে। প্যারিস ও ইংল্যান্ড হয়ে দেশে ফিরলেন। ১৯৫২ সালে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থার ডাকে আবার গেলেন ইউরােপ। হাইডেলবার্গে দেখা হল বিজ্ঞানী বােরের সাথে। দেখা হল পরমাণু বিভাজনে সফল নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী অটোহানের সাথে। সাক্ষাৎ হল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গের সঙ্গে।

১৯৫৫ সালে আপেক্ষিকতাবাদের সুবর্ণ জয়ন্তী পূর্তি উপলক্ষ্যে,সত্যেন্দ্রনাথ গেলেন সুইজারল্যান্ডের বার্ণ শহরে। ১৯৫৮ সালে পুনরায় লন্ডন যেতে হল। রয়াল সােসাইটির আমন্ত্রণে। FRS উপাধিতে ভূষিত হলেন তিনি। যাটের দশকে হিরােসিমা ও নাগাসাকি দিবস উপলক্ষ্যে যােগ দিলেন জাপানের ‘বিজ্ঞান ও দর্শণ’ সম্মেলনে। বিজ্ঞানচর্চায় জাপানি ভাষার ব্যবহার তাঁকেউদ্বুদ্ধ করল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে।

আধুনিক পদার্থবিদ্যার ভিত্তি নির্মাণে অসীম কৃতিত্বের অধিকারী সত্যেন্দ্রনাথ নােবল পুরষ্কার পাননি, কিন্তু মানুষের আন্তরিক ভালােবাসা, শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একমাত্র বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ উৎসর্গ করেছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে।

১৯৪৪ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস সত্যেন্দ্রনাথকে সভাপতি নির্বাচিত করে। ১৯৫৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথকে ভারত সরকার ‘পদ্ম বিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৫৯ সালে তাঁকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ রূপে সম্মানিত করা হয়।
শিহ্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এই সম্মানের জয় আমৃত্যু তাঁকে গৌরবান্বিত করে। পরবর্তীকালে ১৯৮৬ সালে পার্লামেন্টে আইন বলে ভারত সরকার কোলকাতা সল্টলেকে তাঁর নামাঙ্কিত ‘সত্যন্দ্রনাথ বােস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠা করে।

জওহরলাল নেহেরুর ঐকান্তিক ইচ্ছায় ১৯৫২-১৯৫৮ পর্যন্ত সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন ভারতের রাজ্যসভার সদস্য। ১৯৫৬-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে
‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট এর সভাপতি হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে সত্যেন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল বিশেষ উল্লেখযােগ্য। এই বিষয়ে তিনি রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীকে অনুসরণ করেছিলেন।ঢাকায় থাকাকালীন ‘বিজ্ঞান পরিচয়’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন তিনি। কোলকাতায় ফিরে চালুকলেন নতুন বিজ্ঞান পত্রিকা জ্ঞান ও বিজ্ঞান।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রসারের উদ্দেশ্যেই ১৯৪৮ সালে সত্যেন্দ্রনাথ স্থাপন করলেন ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’। অনেক উল্লেখযােগ্য বিজ্ঞানী যুক্ত হলেন এর সাথে। এর লক্ষ্য ছিল একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মনে বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ঘটানাে, তেমনি স্কুল কলেজে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক
পুস্তক সরবরাহ করা। বহু ব্যঙ্গবিদ্রুপের মধ্য দিয়েও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রসারের কাজ দৃঢ়তেতা সত্যেন্দ্রনাথ চালিয়ে গিয়েছিলেন।

প্ল্যাঙ্ক বাজাতেন পিয়ানাে, আইনস্টাইন বেহালা আর আমাদের সত্যেন্দ্রনাথ বাজাতেন এসরাজ। সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ ভালােবাসা ছিল সত্যেন্দ্রনাথের। ঢাকা কিংবা কোলকাতায় অবসর সময়ে এসরাজ বাজাতেন তিনি। ছাত্র জীবনে কোলকাতায় ময়রা স্ত্রীটে পশুপতি ও গিরিজা ভট্টাচার্যের বাড়ী ছিল সত্যেন্দ্রনাথের অবসরযাপনের প্রধান আশ্রয়।এই বাড়িটির সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সত্যেন্দ্রনাথের মনে সঙ্গীত সম্পর্কে প্রাথমিক ভালােবাসা গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা নেয়।

১৯৭৪ সালের ১লা জানুয়ারী সত্যেন্দ্রনাথ জীবনের আশি বছর সম্পূর্ণ করেন। একই সাথে ১৯২৪ সালে তাঁর আবিষ্কৃত বােস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়। সেই উপলক্ষে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৪ সালে জানুয়ারি মাসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়ােজিত করে। পৃথিবীর বহু গুনী বিজ্ঞানীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে অসুস্থ সত্যেন্দ্রনাথ বলেন ‘অনেক বছর সংগ্রামের পরে জীবনের প্রান্তে এসে যদি কেউ দেখে যেতার কাজ বহু প্রসংসিত হয়েছে তবে তার মনে হয় যে আর দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার প্রয়ােজন নেই’।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে বলা যায় সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর অসীম কর্মকান্ড দিয়ে তৈরী করে গেলেন এক যােগসূত্র, যার একদিকে প্রাচীন কোয়ান্টাম তত্ত্ব নিয়ে রয়ে গেলেন প্ল্যাঙ্ক, আইনস্টাইন, বাের প্রমুখরা; আর অপরদিকে নব্যকোয়ান্টম তত্ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শশারডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ, ডিরাক
প্রমুখ বিজ্ঞানীর দল।

পদার্থবিদ্যার পরবর্তী ইতিহাস রচিত হল দরিদ্র ভারতবর্ষের এই উপস্থিত আত্মভােলা বিজ্ঞানীর তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের ধূসর কোষের ছত্রছায়ায়। ১৯৭৪ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী সংখ্যা তত্ত্বের একটি সমস্যা টেবিলের
উপর অসমাপ্ত রেখে এই মহান বিজ্ঞানী মারা যান।

মৃত্যুর ৪০ বছর পরে এই মানুষটি সম্পর্কে লিখতে বসে বিস্ময় জাগে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে বিশ্বের বিজ্ঞান দরবারের প্রথমসারিতে স্থান করে নিলেন যে মানুষটি পরবর্তী ৫০ বছরে তার যথাযথ ক্রমবিকাশ হল কই ? সেউদ্যম জীবনের প্রথম পর্যায়ে তার কাছে আমরা পাই তা যেন কিছুটা থিতিয়ে গেল কোলকাতা থেকে দূরে ঢাকার নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনে।

পুনরায় কোলকাতায় ফেরার পরে আলােড়ন হল,তাই একদিক থেকে ঢাকার বিচ্ছিন্ন জীবনে বাঙালী
বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান চর্চায় কী লােকসান ডেকে আনল। আবার অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাবলে মনে হয় নবনব গবেষণা, গবেষণাপত্র প্রকাশ, তার প্রচার – বিজ্ঞানের এই রুটিন কর্মপদ্ধতির মধ্যে তাে আটকে থাকে একজন আত্মপ্রচারে মগ্ন মানুষ।

সত্যেন্দ্রনাথ এই ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গীর উপরে উঠে অনেক উদার দৃষ্টিতে বড় করে জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। তাই সারা জীবনে প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ২৫টি গবেষণাপত্র। পরিবর্তে তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের কাছে। নিজের গবেষণার বদলে সময় দিয়েছেন অন্যের সমস্যা নিরসনে। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রয়ােজনে অপ্রয়ােজনে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাই একজন বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী এবং একজন মনের মানুষ রূপে তিনি রয়ে যাবেন বাঙালীর হৃদয়ে।

 রাজদীপ ভট্টাচার্য্য

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর নভেম্বর- ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: