মহাবিশ্বে বিপন্ন তারাজগত

0
(0)

পৃথিবীর কি কোনাে ঠিকানা আছে? এমন একটা প্রশ্ন হঠাৎ করা হলে প্রথমে অনেকেই থতমত খেয়ে
যাবে। একটু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে আমাদের মত পৃথিবীরও একটা ঠিকানা আছে। মহাবিশ্বের নিরিখে
এই ঠিকানা ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গা। আর ছায়া পথের নিরিখে সৌরজগত। নিশ্চয়ই তােমাদের জানতে ইচ্ছে করছে কেমন এই ছায়াপথ ? মহাবিশ্বে যে কোটি কোটি তারাজগত (গ্যালাক্সি) রয়েছে তার
একটি হল এই ছায়াপথ। আকৃতি কুণ্ডলিত। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর মধ্যে আছে দশ হাজার কোটি থেকে পনেরাে হাজার কোটি নক্ষত্র। ছায়াপথের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য হল একলক্ষ
আলােকবর্ষ, আর প্রস্থ হল ত্রিশ হাজার আলােকবর্ষ (আলাের গতিবেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলােমিটর। এক আলােকবর্ষ মানে এক বৎসরে আলাে যতটা পথ অতিক্রম করে)।

আশ্বিন-কার্তিক মাসে কৃষ্ণপক্ষে রাতের আকাশে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বিস্তৃত যে আবছা আলাের সুবিশাল পথ দেখতে পাওয়া যায় তা ছায়াপথের একটি অংশ মাত্র। আমাদের সৌরজগত এই ছায়াপথের
প্রান্তের দিকে অবস্থিত। অর্থাৎ বলা যায় আমরা হলাম ছায়াপথের এক শহরতলীর বাসিন্দা।

এই সুবিশাল ছায়াপথকে সম্পূর্ণভাবে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমন কোনাে প্রযুক্তি আমরা এখনও তৈরি করতে পারিনি যার সাহায্যে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ছায়াপথকে দেখা যায়। বাড়ির ভিতর থেকে সম্পূর্ণ বাড়িটাকে যেমন দেখা যায় না, এটাও অনেকটা সেরকম। বাড়িটাকে দেখতে হলে বাড়ির বাইরে আসতে হবে। তেমনি ছায়াপথকে দেখতে হলে আমাদের ছায়াপথের বাইরে যেতে হবে অথবা অন্য কোনাে পড়শী তারাজগতে বসে দেখতে হবে।

যেমন আমাদের অন্যতম প্রতিবেশীর জগত ‘অ্যানড্রোমিডা’-কে আমরা ছায়াপথ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে দেখতে পাই। আকাশের দিকে তাকালে খালি চোখে একে একটু আলাের পিণ্ডের মত দেখতে লাগে। ছায়াপথ থেকে এর দূরত্ব প্রায় কুড়িলক্ষ আলােকবর্ষ। এছাড়াও আমাদের আরও দুটি প্রতিবেশী তারাজগত আছে। এরা হল ‘ম্যাগেলানিক’ (বৃহৎ ও ক্ষুদ্র) মেঘপুঞ্জ দক্ষিণ গােলার্ধে সান্ধ্য আকাশে এদের দেখতে পাওয়া যায়। ছায়াপথ থেকে এদের দূরত্ব দু’লক্ষ আলােকবর্ষের মত। দূরত্বের বিচারে এই দুটি তারাজগতকে ছায়াপথের নিকটতম পড়শী বলা যেতে পারে।

১৯৯৪ সালের আগে পর্যন্ত এমনই ধারণা ছিল। তিন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এম আরউইন, জিগিলামাের এবং আর ইবাতা ঐ বছরেই একটি নতুন ছােট তারাজগতের সন্ধান দেন। ‘ম্যগ ডেগ’ নামের এই ছােট্ট তারাজগতটি ছায়াপথ
থেকে মাত্র আশি হাজার আলােকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই আবিষ্কারের ফলে ছায়াপথের নিকটতম প্রতিবেশীর আসনটি ম্যাগনিক মেঘপুঞ্জের কাছ থেকে সরে ম্যাগ ডেগ-এর কাছে চলে এল। ধনু রাশির আড়ালে থাকা বামন তারা জগতটির এই সৌভাগ্য বেশিদিন রইল না। একবিংশ শতাব্দীর গােড়াতেই
ম্যাগ ডেগের আসন টলমল করে উঠল। মিথুন রাশিতে পাওয়া গেল আর একটি নতুন রাজগত।

মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান সাইমন্স স্নিকার্স’ নামের এই তারাজগতটিকে খুঁজে পান। ছায়াপথ, থেকে মাত্র পঞ্চান্ন হাজার আলােকবর্ষ দূরে থাকা এই তারাজগতটির কপালেও জুটল না নিকটতম পড়শীর সম্মান। ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বিয়াল্লিশ হাজার আলােকবর্ষ দূরে সন্ধান পাওয়া গেল আরও একটি তারাজগতের। ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে এই নতুন পড়শীর খোঁজ পাওয়া যায়। ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের জ্যোতির্বিদদের একটি আন্তর্জাতিক দল এই তারাজগতটির আবিষ্কারক।

এখানেই কি শেষ? যেভাবে একের পর এক নতুন নতুন তারাজগতের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তাতে এই নতুন আবিষ্কৃত তারাজগতটিও নিকটতম পড়শী হওয়ার দৌড় প্রতিযােগিতায় বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে কিনা এ নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তারাজগত গুলি কিন্তু ছন্নছাড়া ভাবে মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে না। এরা রয়েছে দল বেঁধে। যেমন ছায়াপথও আরও পঁচিশটি তারাজগত মিলে গড়ে উঠেছে একটি আঞ্চলিক বা মহা তারাজগত। এই মহা তারাজগত গুলি আবার একটি সুবৃহৎ তারাজগত গুচ্ছের এক একটি প্রতিনিধি। এরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেমহাবিশ্বেঘুরে বেড়াচ্ছে।

এই বন্ধনের মূলে রয়েছে নিউটনের মহাকর্ষ বল। এই বলের মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে চলেছে। তারাজগত গুলিও এই নিয়মের বাইরে নয়। প্রতিটি তারাজগত পরস্পর পরস্পরকে আকর্যণ করে চলেছে।

সৃষ্টির লগ্ন থেকে মহাবিশ্ব স্ফীত হয়ে চলেছে। এ ঘটনা আজ সকলের জানা। কারও কারও মতে অবশ্য এটি একটি সাময়িক ঘটনা মাত্র। মহাকর্ষের টানে এই স্ফীতিশীলতা একদিন থেমে যাবে তারপর শুরু হবে বিপরীতমুখী। দৌড়। অর্থাৎ মহাবিশ্বের সব বস্তুই ছুটে যাবে পরস্পরের দিকে। আবার এক মহাবিস্ফোরণ। সব কিছু শুরু হবে আবার নতুন করে। শুরু হবে নতুন ব্রহ্মান্ডের পথ চলা। এই মহাবিশ্ব হবে স্পন্দমান মহাবিশ্ব (Pulsating Universe)।

পৃথিবীতে বিপন্ন জীব জগেতর কথা অনেক দিন ধরেই শুনে আসছি। মহাবিশ্বে যে বিপন্ন তারাজগত আছে একথা আমাদের কাছে অনেকটাই নতুন। আমাদের ছায়াপথের থেকেও বড় অনেক তারাজগত মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে। তাদের মহাকর্ষীয় টানে তাদের নিকটবর্তী ছােট তারাজগত গুলিও যে
বিপন্ন একথা অনুমান করা যায়। পৃথিবীতে বিপন্ন প্রজাতিকে আমরা রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু মহাবিশ্বের বিপন্ন তারাজগত গুলির জন্য আমাদের কিছুই করার নেই। বিজ্ঞানকে যতই আমরা আয়ত্ব করি না কেন এখানে আমরা একেবারেই অসহায়। শুধু জানা ছাড়া কিছুই কারর নেই।

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

লেখটি বিজ্ঞান অন্বেষক এর জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে সংগৃহীত।

লেখাটিকে কতগুলি ট্রফি দেবেন ?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •  

Leave a Reply

Next Post

প্যান্ডেমিক ও কুসংস্কার

0 (0) প্যান্ডেমিক আর প্যানিক আজ সমার্থক ! আমরা এগোচ্ছি, মঙ্গলে পৌঁছেছে আমাদের দেশ । বিশ্বজয় করছে আমাদের মেয়েরা,ক্যাব চালাচ্ছে, সমকামিতা হয়েছে আইন সম্মত কিন্তু বন্ধু একটু যে ভাবতে হবে এক সপ্তাহ আগের ঘটনায়, বনগাঁ মারা গেলেন রোগী ; কেউ এগিয়ে এলেন না ! ধীরে ধীরে একটা মানুষ চলে গেলেন […]
error: কপি নয় সৃষ্টি করুন
%d bloggers like this: