হিরােশিমা-নাগাসাকি দিবসের আহ্বান

পরমাণু চুক্তি নয়, পরমাণু বােমা নয়, চাই নির্মল ও দূষণমুক্ত পরিবেশ ও

নবীকরণযােগ্য শক্তি

১৯৮০ সালে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ডঃরাজা রামান্না ঘােষণা করেছিলেন ২০০০ সালের মধ্যে সারা ভারতে ২০,০০০ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে। ভারতবর্ষের সমস্ত বড় বড় দৈনিক
ও সাময়িক পত্রপত্রিকায় পরমাণু ‘বিদ্যুৎ এবং আমরা’ শীর্ষক বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছিল সস্তা ও নিরাপদ হল পরমাণু বিদ্যুৎ। ১৯৮০-এর সম্প্রতি সংসদে  ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি অনুমােদিত হয়েছে।
পরমাণু বিদ্যুতের চালচিত্র প্রশ্নটা অনেকদিন ধরেই মাথায় ঘােরাফেরা করছিল।

সম্প্রতি পরমাণু শক্তি সম্পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র-র কয়েকটি সংখ্যা খুব সম্প্রতি International Journal of Nuclear Power Vol (২০) 2006, Vol (21) 2007 & Vol (22)-2008 হাতে এসেছে। “Nu-power শিরােনামের এই জার্নালটি প্রকাশ করে থাকে Nuclear Power Corporation of India (NPC)। এই জার্নালের কয়েকটি তথ্য প্রথমেই জানিয়ে রাখছি-

(১) বর্তমানে সারা ভারতে মােট ১৭টি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রয়েছে যাদের মােট উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৪১২০ মেগাওয়াট। আরও ৫টি কেন্দ্র চাল হলে ২৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। অনুমান করা হচ্ছে
২০২০ সালের মধ্যে ২০,০০০ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

(২) কুদনকুলাম নিউক্লিয়র পাওয়ার প্রােজেক্ট উল্লেখযােগ্যভাবে বায়ু বিদ্যুৎ’ তৈরি পার্শ্ববর্তী কুন্দনকুলাম গ্রামে সরবরাহ করা হচ্ছে। যদিও নিউক্লিয়র পাওয়ার কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষর পক্ষ থেকে পরমাণু শক্তি এবং বায়ুশক্তির সহ অবস্থানের কথা বলা হয়েছে তবে বাস্তব হল কুদনকুলাম নিউক্লিয়র পাওয়ার প্রােজেক্ট এখনাে চালুই NPC-এর ঘােষণা অনুযায়ী ২০০০ সালের মধ্যেই ২০,০০০ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা।অথচ ২০০৮ সালে মাত্র ৪১২০ মেগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ৪১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে তথ্য  নিউক্লিয়র পাওয়ার কর্পোরেশন বা পরমাণু বিদ্যুৎ কর্পোরেশন পেশ
করছেন তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

২০০৮ সালের ২৫ জুলাই খড়গপুর আই আই টি-এর সমাবর্তন উৎসবে বর্তমান পরমাণু কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা হু হু করে বাড়ছে, তাই শক্তি সমস্যার এক বড় সমাধান হল পরমাণু শক্তি। চেয়ারম্যান অনিল কাকোদার আরও জানিয়েছেন পরমাণু চুক্তির ফলে প্রয়ােজনীয়
ইউরেনিয়াম পাওয়া যাবে। এবারে পরমাণু চুল্লি বা বিদ্যুৎ নিয়ে কি ঘটছে সেই তথ্যগুলি জেনে নেওয়া যাক।

(১) গত ২৮ বছর ধরে ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে মােট চাহিদার মাত্র ২.৬ শতাংশ পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।

(২) ১৯৮৬ সালে রাশিয়ার চেরনােবিল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত বিশ্বে নতুন করে কোনও দেশ পরমাণু চুল্লি চুল্লি স্থাপন করেনি। শুধুমাত্র ভারত ও চীন পরমাণু চুল্লি স্থাপনে আগ্রহী দেখাচ্ছে।

Cernobyl pripyat photography Image by morelove
চেরনােবিল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনা

(৩) সারা বিশ্বে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনা নিয়মিত ভাবে ঘটেইচলেছে ; ১৯৫২ সালে কানাডার
চক রিভার অঞ্চলে, ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডের উইন্ডস্কেলে, সালে আমেরিকার ইজাহাের চুল্লিতে।

পৃথিবীতে বর্তমানে কমবেশি ৫০০টি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এইসবগুলােতে বড় রকমের উল্লেখযােগ্য ১০০-র মত দুর্ঘটনা ঘটেছে। ছােটখাটো দুর্ঘটনার সংখ্যা কয়েক হাজার। পরমাণু শিল্পের দুর্ঘটনা অন্যান্য যেকোনও শিল্পের দুর্ঘটনার থেকে গুণগত ভাবে পৃথক। অন্যান্য শিল্পে দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয়।

কিন্তু পরমাণু শিল্পে দুর্ঘটনা ঘটলে তার কুফল (ক্যানসার, লিউকোমিয়া সহ বিকলাঙ্গ শিশু, তেজস্ক্রিয়তার বিষ হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকে) সাধারণ মানুষকে হাজার হাজার বছর ধরে

(৪) পরমাণু চুল্লির বিপদগুলি (কুফলগুলি) পরিবেশে নানাভাবে বিপর্যয় ডেকে আনছে যথা-

(ক) তেজস্ক্রিয়তার বিষঃ পরমাণু চুল্লির ৯টি পর্যায়-এর প্রত্যেকটি থেকেই নিয়মিতভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বেরিয়ে পরিবেশে মিশছে। ফলে ক্যানসার, লিউকোমিয়া সহ দুরারােগ্য ব্যাধি এবং বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

(খ) পরমাণু চুল্লির উৎপাদন খরচঃ পরমাণু চুল্লির স্থাপনের খরচ নিয়ে ভারত সরকার বা  NPC সংসদে কোনও হিসাব আদৌ পেশ করেন না, শুধুমাত্র গবেষণা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তথ্য থেকে জানা যায় একই পরিমাণু বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এমন পরমাণু চুল্লি কেন্দ্র স্থাপনের খরচ  তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের খরচের থেকে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। এছাড়া ৫০/৬০ বছর পরমাণু চুল্লিগুলির আয়ু শেষ হয়ে গেলে কবরস্থ
করতে যা খরচ হয় তা প্রায় পরমাণু চুল্লি স্থাপনের খরচের সমান।

(গ) উৎপাদন ক্ষমতাঃ বার্ষিক ‘নির্দিষ্ট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ উৎপাদনে পৌঁছায়। এছাড়া উৎপাদনের সময়ের হার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের থেকে অনেক কম।

(ঘ) তাপ দুষণ ও জৈব বিবর্তনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণঃ পরমাণু চুন্নি স্থাপনের পরিবেশের তাপমাত্রা
তেজস্ক্রিয়তা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাপমাত্রা ও তেজস্ক্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকলে জীবজগতের
অস্তিত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে সমস্যা তৈরি করবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। ইউরেনিয়াম
মৌলকে যখন নিউট্রন কণিকা দিয়ে আঘাত করা হয় তখন প্রতিটি ইউরেনিয়াম ভেঙে দুটি পৃথক মৌলে পরিণত হয়, ব্যাপক তাপ, পার্শ্ববর্তী বায়ু, জলাশয়, নদী বা সাগরের জলে মিশে সামগ্রিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে
তুলছে।

সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫০০-র মত পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিনিয়তই পরিবেশের তাপমাত্রা ও তেজস্ক্রিয় দূষণ বেড়ে চলেছে। এই তেজস্ক্রিয় আবর্জনা পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

(সারা বিশ্বে) শক্তি সমস্যার সমাধান কোন পথে?

তাপবিদ্যুৎ-এর উৎস কয়লা (খনি থেকে পাওয়া যায়) এবং পরমাণু বিদ্যুৎ-এর ইউরেনিয়াম (খনি থেকে পাওয়া যায়)—এই উৎসগুলি কোনও না কোনওদিন শেষ হয়ে যাবে। অথচ পুনর্নবীকরণযােগ্য শক্তির উৎসগুলি ভবিষ্যতে কোনদিনই শেষ হবে অর্থাৎ নবীকরণযােগ্য শক্তির উৎসগুলি

যথা—বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি, জৈবগ্যাস, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ইত্যাদি – শক্তিগুলিকে সঠিকভাবে
কাজে লাগানাে দরকার। পাশাপাশি কলাভিত্তিক (জীবাশ্ম জ্বালানি) জ্বালানির ব্যবহার সারা ভারতে মােট বিদ্যুৎ চাহিদার ২.৬ শতাংশ মাত্র পাওয়া যায় পরমাণু চুল্লি থেকে (৪১২০ মা মেঃওয়াট)। উল্লেখ করা দরকার রাজস্থান অ্যাটমিক পাওয়ার প্রােজেক্ট ১ নং এবং ২ নং  চুল্লি তৈরি করতে সময় লেগেছিল
যথাক্রমে ৮ এবং ১০ বছর, চেন্নাই-এর কালপ্ককমে সময় লেগেছিল  আরও বেশি, যথাক্রমে ১৪ এবং
১১ বছর।

অথচ সারা ভারতে সূর্য (৫,৭০,০০০মেঃওয়াট), বায়ু (৩০,০০০ মেঃওয়াট), জৈবগ্যাস (৪০,০০০-৬০,০০০ মেঃ ওয়ার্ট)

সমুদ্রেরর তাপ (৫০,০০০–৭০,০০০ মেঃওয়াট), সমুদ্রের ঢেউ (২০,০০০-৩০,০০০ মেঃওয়াট) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ৭০,০০০ মেঃওয়াট। বিকল্প (নবীকরণযােগ্য শক্তি) শক্তির ব্যবহার ও সম্ভাবনা বাড়ছে।

(১) বাঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়া-২০০৭’ শীর্ষক শীর্ষক জাতীয় পুর্ননবিকরণযােগ্য শক্তিমন্ত্রী  জানিয়েছেন আগামী ৫ বছরে আরও ১২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পুনর্ব্যবহারযােগ্য শক্তির সংস্থায় (ওয়েব রেডা) অধিকর্তা শান্তিপদ গনচেীধুরী জানিয়েছেন
বছরের মধ্যে ৮৭ শতাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌছবে, বহু ক্ষেত্রেই (প্রায় ৫০ শতাংশ) বিদুৎ পাওয়া যাবে
অপ্রচলিত শক্তি থেকে।

(২) ওয়েবরেডা ফ্রেজারগঞ্জ ও সাগরদ্বীপে ২.৫ মেঃওয়াট (হাওয়া কল থেকে) বায়ু বিদ্যুৎ তৈরি করছে। পূর্ব মেদিনীপুরের কাথিতে ৬০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য জায়গায় সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

(৩) জোয়ার ভাটা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুন্দরবনে ৩.৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করার চলছে।
বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ছােট ছােট বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্ভাবনা যথেষ্ট রয়েছে। উত্তরবঙ্গে বায়োমাস থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করার জন্য ১০০০ কোটি টাকা লগ্নি করা হয়েছে।

(৪) আসানসােলে ২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। গ্রিড সিস্টেমের সাহায্যে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায় সেবিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

(৫) পুরুলিয়ার অযােধ্যা পাহাড়ে ৯০০ মেগাওয়াট পাম্পড স্টোরেজ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ২০০৭ সালেই চালু হয়েছে। বিকল্প শক্তিগুলির উৎসগুলিকে পরিকল্পনা মাফিক কাজে লাগাতে পারলে শক্তি সমস্যা অনেকটাই মিটবে বলে আশা করা যায়।

জয়দেব দে

লেখাটি কালান্তর (প্রকৃতি ও মানুষ) ৪ ঠা আগষ্ট ২০০৮ থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: