রাধানাথ সিকদার প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী

‘ইনি ডিরােজিও-বৃক্ষের একটি উৎকৃষ্ট ফল’ মন্তব্য রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থের খ্যাতনামা লেখক শিবনাথ শাস্ত্রীর।

জন্ম ১৮১৩। আমরা কি তাঁকে স্মরণে ও শ্রদ্ধায় বরণ করে নিতে প্রস্তুত।

রাধানাথ সিকদার। আধুনিক ভারতের প্রথম গণিতজ্ঞে-বিজ্ঞানী। ১৮০২, সালে ব্রিটিশরা এদেশে কর্নেল ল্যামটন-এর অধীনে স্থাপন করেন গ্রেট ট্রিগােনােমেট্রিক্যাল সার্ভে (জি টি এস)। উদ্দেশ্য, দেশজুড়ে জমি
জরিপের কাজ, ম্যাপ প্রণয়ন ইত্যাদি। ল্যামটনের মৃত্যুর পর ১৮২৩ সালে এই কাজের দায়িত্ব নিলেন খ্যাতনামা গণিতবিদ জর্জ এভারেস্ট (১৭৯০-১৮৬৬)।

এই কাজ করতে ট্রিগােনােমেট্রি (ত্রিকোণমিতি) জানা গণিতবিদের প্রয়ােজন সব থেকে বেশি। এভারেস্ট সাহেব এলেন হিন্দু কলেজে অঙ্ক জানা ছাত্রের প্রয়ােজনে। বাকিটা নিজেই শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন। হিন্দু
কলেজের খ্যাতনামা গণিত অধ্যাপক জন টাইটুলার রাধানাথকে জর্জ এভারেস্টের হাতে সঁপে দিলেন।

ছেলেটি অত্যন্ত দক্ষ ও প্রতিভা সম্পন্ন – টাইটলারের এই প্রশস্তি রাধানাথ কাজের মাধ্যমে অক্ষরে অক্ষরে
পালন করেছিলেন।

পিতার নাম তিতুরাম শিকদার। জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। ‘সিকদার’ পদবীর অর্থ হল এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পুলিশি দায়িত্ব প্রাপ্ত অধিকার। নবাবী আমল থেকেই চলে আসছিল এই সম্মান।
ইংরেজরা এসে অবশ্য এই দায়িত্ব প্রত্যাহার করে নেয়। প্রতিভাবান ছাত্র হিসাবে হিন্দু কলেজে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। সময়টা ছিল ১৮৩০-৩২।

প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, রেনেসাঁসীয় চিন্তার অন্যতম বিপ্লব সৃষ্টিকারী ঝড় ডিরােজিও (১৮০৯-১৮৩১) সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। সেদিনের কলকাতা কাপাচ্ছে গুটিকয় তরুণ ছাত্র – রসিক কৃষ্ণ মল্লিক (১৮১০-৫৮), দক্ষিণারঞ্জন মুখােপাধ্যায় (১৮১৪-৭৮), কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮১৩-৮৫), রামগােপাল ঘােষ (১৮১৫-৬৮), হরচন্দ্র ঘােষ (১৮০৮- ৬৮), শিবচন্দ্র দেব (১৮১১-৯০), রামতনু লাহিড়ী (১৮১৩-৯৮),
রাধানাথ সিকদার (১৮১৩-৭০), প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-৮৩)। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরও ৫/৬টি নাম।

রাধানাথকে বুঝতে ‘ডিরােজিও আগুনের উত্তপ্ত ঝড়কে উপলব্ধিতে রাখতে হবে। প্রগতিশীল চিন্তা,
পুরনােকে অস্বীকার, সংস্কারকে বর্জন, বিধবা বিবাহ সমর্থন, নারীশিক্ষার প্রসার, বিজ্ঞানমনস্কতাকে আবাহন।– এসবের এক পূর্ণ উত্তরাধিকারী হয়ে উঠেছিলেন রাধানাথ সিকদার।

রাধানাথ জরিপ বিভাগে চাকুরি করেন ১৮৩২ থেকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত। এজন্য তাকে বেশিরভাগ সময়টাই কলকাতার বাইরে থাকতে হত। জরিপের কাজে জর্জ এভারেস্ট আবিষ্কৃত ‘এক্স-রে সিস্টেম’-এর
হাতে কলমে বাস্তব প্রয়ােগ ঘটে রাধানাথের হাতে। দেরাদুনে ছিল জরিপ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ অফিস।

এখানে মুখ্যত গণনার (অঙ্ক কষা) কাজ হত। মাউন্ট এভারেস্ট’ নাকি রাধাচূড়া নিবন্ধে (উৎস মানুষ-জুলাই
২০০৯) আশীষ লাহিড়ী লিখেছেন, ‘সে বড়াে জটিল কাজ। জ্যোতির্বিজ্ঞান আর ত্রিকোণমিতি খুব ভালাে করে না জানলে সে কাজ করা যায় না।

প্রথমে কোনাে একটা জায়গা থেকে ভারী লােহার চেন দিয়ে কয়েক মাইল লম্বা একটা সরলরেখা টানতে হয়। তারপর দূরবীক্ষণ দিয়ে আকাশের কোনাে চেনা তারার অবস্থান দেখে তার সঙ্গে মাটিতে টানা ঐ সরলরেখার একপ্রান্তকে মিলিয়ে একটি অসমাপ্ত ত্রিভুজ আঁকতে হয়। সেই অসমাপ্ত ত্রিভুজের দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য আর কোণ মেপে ত্রিকোণমিতির ফর্মুলা দিয়ে তিন নম্বর বাহুর দৈর্ঘ্য হিসেব করে বার করতে হয়।

তখন গােটা ত্রিভুজটার আয়তন মেপে জরিপের কাজ চলে। এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়, ও পাহাড় থেকে সে পাহাড়। এ উপত্যকা থেকে সে উপত্যকা। এ ত্রিভুজ থেকে ও ত্রিভুজ। আঁকা হয়ে চলে ম্যাপ।

১৮৪৩ সালে জর্জ এভারেস্ট অবসর নিয়ে বিলেত ফিরে গেলেন। ওই জায়গায় বসলেন কর্নেল ত্যানডু ওস। তিনি রাধনাথকে ১৮৫১ সাল নাগাদ কলকাতার অফিসে নিয়ে আসলেন। রাধানাথ নিবিড় ভাবে
ব্যাপৃত থাকলেন এতদিনকার সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্যাদির নির্ভূল গণনা কাজে। উদ্দেশ্য হিমালয়ের শৃঙ্গগুলির সঠিক উচ্চতা পরিমাপ। এরকমই একটি অতি উচ্চ শৃঙ্গকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ১৫ নং চূড়া’ হিসাবে।
দুটি বিভিন্ন অবস্থান থেকে নেওয়া মাপজোক থেকে বারবার গণনা করে ঐ চূড়ার উচ্চতা বেরােলাে ২৯০০২ ফুট। এই উচ্চতা নির্ণয়ে বায়ুতে আলােক রশ্মির প্রভাবজনিত ত্রুটি এবং বরফের উপর আলাের
প্রতিফলন জনিত বিভ্রম – এই দুটি বিষয়কেও ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয়েছিল। ১৮৫৪ সালে তিনি এই মহাগণনা কাজের বিস্তারিত রিপাের্ট সরকারিভাবে জমা দিলেন।

মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা কি বদলাচ্ছে ? - পরিবেশ ডট কম
রাধানাথ সিকদার এর গননায় ১৫ নং চুড়া বা এভারেস্ট

 

 

অধিকর্তা আনড্র সাহেব বিলেতের রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সােসাইটিকে বিষাটা জানালেন। আন্তর্জাতিক ভাবে গৃহীত হােল এই সিদ্ধান্ত -১৫ নং চূড়াই পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতার অধিকারী।

কে এর আবিষ্কর্তা? এই চূড়ার নামকরণই বা কী হবে?

জর্জ এভারেস্ট সাহেব একটি নিয়ম প্রবর্তন করেছিলেন নামকরণের ক্ষেত্রে। শৃঙ্গের নাম হবে স্থানীয় মানুষের দ্বারা চিহ্নিত নামে। সেভাবেই এসেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, নন্দাদেবী, নাঙ্গা পর্বত, মাছের পুচ্ছ ইত্যাদি। ওই উচ্চ শৃঙ্গটির (১৫ নং) স্থানীয় নাম সাগরমাথা, চোমাে লাংমা, কেউ বলে দেওধুঙ্গা (দেবতার পাহাড়), কেউ বা জোমােকংকর।

এই শৃঙ্গের একদিকে নেপাল, অন্যদিকে তিব্বত ।ফলে নেপালিদের ডাকা নাম ব্যবহার করলে তিব্বতীরা রেগে যাবে।সেরকম তিব্বতীদের দেওয়া নামও ব্যবহার করলে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। শেষমেশ সরকারিভাবে ঘােষিত হােল – শৃঙ্গের নাম-এভারেস্ট। কারণ জর্জ এভারেস্ট প্রকৃত অর্থে এই মহাযজ্ঞের প্রধান বৈজ্ঞানিক হােতা ও সংগঠক ছিলেন। কিন্তু এর আবিষ্কর্তা কোনো সরকারি নথিতে রাধানাথের এই অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কৃতীর কোনাে স্বীকৃতি দেখা যায় না।

Funk & Wagnalls new Encyclopedia (Vol. 9) পৃষ্ঠা  ২৭৪-এ উল্লেখ আছে, ‘According to an Indian Government survey. undertaken in 1854, the summit is 29028 ft above sea level.
The English name conmemorates Sir George Everest (1790-1866), surveyor general of Indian from 1830 to 1843, who in 1841 first recorded, the location and height of the mountain এমন ভুল তথ্য প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে। আমরা, নির্জিব (?) ভারতীয়রা এটাই ভবিতব্য বলে অম্লান বদনে মেনে নিয়েছি কোনাে প্রতিবাদ ছাড়াই!

একটা ঘটনায় একটি প্রতিবাদের বিষয় এখানে উল্লেখ করা যায়। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী প্রমথনাথ বসু ১৮৯৮ সালে ‘The History of Hindu civilization during British Rule (৩য় খণ্ড) প্রকাশ করেন লন্ডন
থেকে। বইটি অতি উচ্চ প্রশংসিত বিদ্বৎমহলে। এই বইতে রাধানাথ সিকদার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে (পৃষ্ঠা- ১০১-১০২)।
Radhanath Sikdar was for sometime chief computer in the Survey of India Department. The following mention is made of him in the preface to the first edition of the Manual
of Surveying’ by Smyth and Thuillier :-
‘In parts III and IV the compilers have been very largely assisted by Babu Radha Nath Shikdar, the distinguished head of the computing Department of the great Trigonometrical Survey of India, a gentleman, whose intimate acquaintance
with the rigorous forms and mode of procedure adopted on the great trigonometrical survey of India, and great acquirements and knowledge of scientific subjects generally, render his ad particularly valuable. The chapters 15 and 17 up to 21 inclusive,
and 26 of part III, and the whole of part V are entirely his own. and it would be difficult for the compilers to express with sufficient force the obligations they thus feel under to him, not only for the portion of the work which they desire thus publicly to acknowledge, but for the advice so generally afforded on all subjects connected with his own Department’ THJS conton লিখিত ‘New India’ ~ পৃষ্ঠা ৪১-৪১]

১৮৫১ সালে সর্বপ্রথম এই সার্ভে ম্যানুয়াল প্রকাশিত হয়। বইটি অচিরেই সার্ভে কাজে অপরিহার্য হিসাবে বিবেচিত হয়। ১৮৫৫ সালে। বইটির মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। ১৮৭৫ সালে এর ৩য় মুদ্রণ প্রকাশিত হলে দেখা যায়, বইটির ভূমিকাটি সম্পূর্ণরূপে উধাও। বইতে রাধানাথের কোনাে নামগন্ধ নেই। ব্যাপক প্রতিবাদ ওঠে নানা মহল থেকে। নেটিভ বল বৃটিশ আভিজাত্যে আঘাত করছিল ?

Col, Sherwi৷৷ লিখিত [Friend of India (১৮৭৬ সালে বইটি প্রকাশিত হবার সামান্য পরে) গ্রন্থে রয়েছে তীব্র প্রতিবাদ, when bringing on a third edition & Smyth and Thullier’s Manual of Surveying for India’ the much respected name of the late Babu Radhanath Shikdar, the able and distinguished head of the computing department of the Great Trigonometrical Survey of India, who did so much to enrich the early editions of the ‘Manual’, had been advertently or inadvestently, removed from the preface of the last edition; while at the same time all the valuable matter written by the Babu had been retained, and that without any acknowledgement as to the authorship.’

দ্ব্যর্থহীন ভাষা তিনি আরও লিখেছেন, ‘I feel quite ashamed for those who have seen fit to exclude his name from the present edition …’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, কর্নেল শেরউইল ভারতীয়
রেভেনিউ সার্ভেয়র দপ্তরে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং রাধানাথ সিকদারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। (আরও জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ- ‘Reminiscences and Anecdotes’ by Ramgopal Sanyal, P. 25).
সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান গ্রন্থে ভুল উলেখ রয়েছে। এখানে ‘Auxiary Table (১৯৫১) এবং ‘The Manual of Surveying’ গ্রন্থের প্রণেতা বলে রাধানাথ সিকদারের নাম বলা হয়েছে। এটা ঠিক নয়।

প্রসঙ্গত আগ্রহী পাঠককে প্রয়াত বিশিষ্ট বিজ্ঞান ইতিহাসের গবেষক সিদ্ধার্থ ঘােষের একটি নিবন্ধ পড়তে অনুরােধ করব। কলের শহর কলকাতা’ গ্রন্থের একটি নিবন্ধ’ এভারেস্ট প্রমাণ মহসীন ও আরও
কয়েকজন’ (পৃষ্ঠা ১৮৫-১৮৮)। এই নিবন্ধ পাঠে জানা যায় সৈয়দ মহসীন ছিলেন বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভে কাজের উপযােগী যন্ত্র নির্মাতা (ইন্সস্ট্রুমেন্ট মেকার)। এই রচনায় রাধানাথ সম্পর্কে কিছু তথ্য রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে অসাধারণ গণিতজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ ও সার্ভে কাজে অতুলনীয় ভাবে দক্ষ রাধানাথের বৈজ্ঞানিক প্রতিভার দিকটি প্রায় অনালােচিত। তিনি কত ভাবে সমাজসেবী, দেশপ্রেমী, সাহিত্যানুরাগী-
স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে একনিষ্ঠ ডিরােজিয়ান ইত্যাদি বিষয় গুলি নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। প্রায় ২০০ বছর উত্তীর্ণ হতে গেল রাধানাথের জন্মের সময় থেকে। নব্য ভারতের সর্বপ্রথম এই গণিতজ্ঞ-বিজ্ঞানীকে কি আমরা যথাযােগ্য সম্মানের আসনে বসিয়েছি? অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজেদের অযােগ্যতার পরিমাপকে ঢের জরুরি বলে মনে করি।

– দীপক কুমার দাঁ

বিজ্ঞান অন্বেষক এর নভেম্বর- ডিসেম্বর ২০০৯ থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: